ফারুক ওয়াসিফের ৫ কবিতা


প্রকাশিত:
১৪ মার্চ ২০২১ ০০:২১

আপডেট:
৩১ মার্চ ২০২১ ১৫:০৯

 

পৃথিবী

আমার বুকের থেকে

একটি চাঙর খ'সে

উপগ্রহ হয়ে যায়।

সে যদি আমার না-ই হয়,

কী করে পাথর দেবে আলো,

কী করে দুজন থাকি নিকট দূরত্বে?

আর,

কী উপায়ে রোজ রাতে চাঁদ

জোয়ারে জোয়ারে সব ঋণ শোধে;

পৃথিবীর ক্ষতস্থান জলে ভরে তোলে!

 

উড়নপাক যখন ছোটো হয়ে আসে

উড়নপাক যখন ছোটো হয়ে আসে

পাঠানো যায় না ডাক ঠিকঠাক নামে,

আমাদেরো গলার ওপরে পা

শাবলের ফলা খুঁড়ে নিচ্ছে গা

ফাঁসুড়ের হাসি দেখে দেখে আমাদেরো

দম চেপে আসে...

যেই ঘাটে জলচক্র শেষ, সেইখানে বসে আমি লিখি

—অন্ধকার ঠিকরে ওঠা দিনের নামচা।

বাতাসের ধার আরো বাড়ে,

দীর্ঘশ্বাস আরো ছোটো হয়ে আসে।

উড়নপাক ভুলে যাওয়া চিলের চিক্কুর

মিশে যাচ্ছে খাদে পড়া মানুষের সুরে।

মানুষেরা বেঁচে আছে শুনেছি কোথাও

জলেরজাজিমে তবে কে শুয়ে কে?

আমাকে বলো না আশা নামে কারো কথা

আমি তার ভাই, কবরে কবরে দামামা বাজাই।

আপন জানাজা পড়েছি যখন উরুডোবা ক্ষেতে

মউতের ম্যানেজার যখন ভরাচ্ছে টালিখাতা

অপেক্ষার নামে এই ক্ষণে আমাকে ডেকো না;

গাছেরা ঝরাচ্ছে দ্যাখো কার কার নাম লেখা পাতা?

উড়নপাক তাদেরো ছোটো হয়ে আসে,

আইন ও শৃঙ্খলার দালালেরা ভয় পায়

একা একা ঘেমে ওঠে মক্ষিমাতা—

গোলাম বা গাফ্ফার কেউ নেই কাছে;

খিলানে খিলানে চোর ডাকছে যেন বা কোকিল;

শিমুল ছড়ায় দশ দিকে ময়লা পরাগ—

সাফল্য জোটে না বেকারের,

বিক্রি হওয়ার জন্য বসে আছে সব, তবু

আমরা কখনো আর যুদ্ধে যাব না,

ফাটাব না হাতবোমা মৌচাকে মার্কেটে?

উড়নপাক যখন ছোটো হয়ে আসে,

খুনে কুচকাওয়াজ এসে থামে শিয়রে সবার;

শুনি কঠোর নির্দেশ, সান্ধ্যভাষণ, নিষেধ, গোপন শলাপরামর্শ, আর টর্চার সেল থেকে আসা শেষ কথা!

কাঁচের আড়ালে তৈরি সব পরিকল্পনা,

সবজান্তা বাণী আমি শুনি রাতের খবরে।

কারাগার ও কবরস্থানে চলে হুশিয়ারি:

যেন কবিরা কিছু জানে না

যেন বৃথাই ছবি তোলে আলোকচিত্রী

যেন অহেতুক কল্পনা করে শিল্পীরা

যেন শহীদেরা সবা আহাম্মক

শিশুদের কান্না যেন অর্থহীন কোনো ভাষা

নারীর যন্ত্রণা যেন এক প্রাকৃতিক অসুখ

নিপীড়িতের ফরিয়াদ যেন মনোবিকার

যেন পতাকার কাজ শুধু ফাঁস দেয়া মুখে—

যেন সকল মৃত্যুর জন্য

যেন সকল দুঃখের জন্য

যেন সকল সর্বনাশের জন্য

কেউ দায়ী নয়!

যেন ভবিষ্যৎ বলে কিছু নাই আর,

মানুষ বলেও কিছু আর বিরাজ করে না।

 

 

ফেলানি

১.

...বাপো হে, হামাক নিয়া যাও কেনে মাওভাইয়ের দ্যাশে

পিতনাত বসিয়া হামি গাথুনি ক্যাশও রে

বাড়িত মুই যাবার চানু, পথও ক্যানে শ্যাষও রে

কাঁটাতারত বিঁধনু মুই, কুনটি হামার দ্যাশও রে।...

২.

ক্যাম্পের ধোঁয়ায় ডানাঝোলা এক পাখি,

বাজকালো সীমান্তে পতাকার মতো নত।

ছেঁড়া মানচিত্র কাঁটাতারে কাঁপে—

ধোঁয়ায় ধোবিত ধুসর এক কাক

বাজকালো আকাশে গুয়ের্নিকা আঁকে

বাঁকা হস্তরেখা নিয়ে দাঁড়িয়েছে কে ও—

এ কার মেয়ে গো, কাহার দুহিতা?

নদীও নীরব চোরাকারবারি

—মোহনায় গড়ে দেশ,

সীমান্ত কখনো হয় না নীরব;

গুলি, কাঁটা, ফ্লাডলাইট—মানুষেরা জব্দ

হুতাশেতে মরে যাওয়া দেশ আজ খুব স্তব্ধ।

আমার বুকের গুলি শুধু বলে কথা,

গতিবিদ্ধ রক্তমাংস নিয়ে বলে কথা।

বাংলার গো-গ্রাম গন্ধমাখা চুল উড়িয়ে

জারুলের মতো কিশোরীরা বলে কথা।

এই প্রেতকালে, রক্তের ফিনিক ফাটা জ্যোছনায়—

ধোঁয়ায় ধোবিত দেশের ফেলানী খাতুনেরা সব

অকাল সন্ধ্যায় অর্ধনমিত পতাকা হয়ে ওড়ে।

৩.

উড়ুক্কু মাছেরা হাঙরের গ্রাস থেকে পালাতে পালাতে জল ছেড়ে লাফ দিয়ে আকাশে কিছুটা ওড়ে। সমুদ্র সারসের লম্বা ঠোঁট তখন তাদের পায়। পাখির ঠোঁটে আটকে, পাখির দৃষ্টিতেই সেই মাছ শেষবারের মতো দেখে নেয় তার সাগর।

তাড়া খেয়ে ফেলানিরা উঠে গিয়েছিল সীমান্তের কাঁটাতারে। হয়ে গিয়েছিল সীমান্ত–শিকারির সহজ নিশানা। গুলিবিদ্ধ মরালের মতো বিমূঢ় ফেলানি চিৎকার করে উঠেছিল।

সে তখন কোনো ভূখণ্ডের নয়, তখন সে শূণ্যের। শূণ্যেই পাখির মতো গুলি খায় শূণ্যকে ভাগ করা সীমান্তে। শূণ্যেই সে আটকে থাকে—কয়েক ঘন্টা।

রাষ্ট্রহীন ফেলানি সাড়ে তিন ঘন্টা ধরে দুই রাষ্ট্রের সীমান্তরেখা জুড়ে রক্তনদীর কল্লোল ঝরিয়েছে। কত ঘৃণা জমে জমে কাঁটাতার হয়?

সীমান্ত মানে মাটি। মাটিতে দাগ ছাড়া সীমান্ত হয় না, মানচিত্র হয় না, রাষ্ট্র হয় না। জীবিত ফেলানির সীমান্ত ছিল, কিন্তু মৃত ফেলানি কোনো পার্থিব সীমান্তে ছিল না ওই কয়েক ঘন্টা। নিহত দেশের প্রতীক হয়ে ওঠার জন্য ওই সময়টা দরকার ছিল। কাঁটাতারে ঝুলে থাকার আগেও তার দেশ ছিল না, কাঁটাতারে লটকে থাকার ওই সময়টাতেও তার দেশ থাকেনি। সে তখন দেশ ও মাটির ঊর্ধ্বে।

ঘৃণা ও ভালবাসার সীমান্তে শহীদ হয়েছিল যীশু। ফেলানি ইতিহাসের সীমান্তের শহীদ। নিষ্পাপের রক্তে ভিজেছে দুই দেশের সীমান্ত সংসার। রক্ত দিয়ে এই সংসার ভাগ হয়েছিল, রক্ত দিয়েই সেই ভাগ রক্ষা করা হচ্ছে। মাঝখানে পথ নেই, পরিখা আছে, কাঁটাতার আছে। সেই পরিখার খাদ ভরে যাচ্ছে আরো আরো রক্তে।

আমাদের সীমান্তে কোনো সংঘাত নাই, অপঘাত আছে।

৪.

বাপো, ক্যান আসেন রোজ। ফিরি যান।

আমি কই আসিছি মা, আমি এই দাড়ায়ে রয়েছি। আমি এরমই দাড়ায়ে ছিলাম। কই থেকে মোরে শেল মারিল মা। একটা চাকতির মতো আমার বুকে চ্যাপে ধরিল সেই থেকে আর ছাড়িছে না। তোক হামি লিতে আসিছি।

ফেলানি নামে না। তখন সন্ধ্যা। কাঁটাতার কোণাকুণি পেরিয়ে পাখিরা ফিরছে। ফেলানি চুল বান্ধে ওড়না ঠিক করে। এখনই সময়। ওই যে পাড়াগাঁর অরুণিমা সান্যালেরা দুই বোন উঠে বসেছে। কত কত সাল আগে দাঙ্গাবাজেরা তাদের ধর্ষণ করে মেরে ফেলেছিল। ওই যে, গরুচোর রহমত আর দুলাল, ওই যে চাষা সুবল, জোয়ার্দার, হাবলু, চেংটু, আব্বাসেরাও উঠে বসেছে।

এদের সবাইকে ছেড়ে এখন ফিরবে না ফেলানি। রাত আরেকটু বাড়লে আকাশে যখন পেল্লায় চাঁদ উঠবে, তখন ওদেরকে মনে হবে কাঁটাতারে বসা এক ঝাক পাখি। একটু পরেই একসঙ্গে তারা উড়াল দেবে আকাশে। ওপরে উঠে যাবে, এত ওপরে যে, সেখানে আর কোনো জাতীয়সংগীত কোনো কুচকাওয়াজের আওয়াজ তাদের নাগাল পাবে না।

 

তিলাঘুঘু

কুয়াশার ঘূর্ণি ঘেরে আমাকে আবার

চিলমারী বন্দরের বালি ধুয়ে যায়

অন্ধকারে ছুটে যায় ভেজা ট্রেন—ডাকে

ট্রেন থামে বৃষ্টি থামে, যাত্রীরাও নামে;

আমি নামি না কোথাও

আমি যাচ্ছি যতদূর ততদূর পিছুডাক এসে

রাখে না পিঠের পরে চেনা হাত,

স্মৃতির ছায়ারা প্রসারিত হয়ে ছুঁতে পারে

এমন গোধূলী সুর্য সেখানে জ্বলে না।

ছোটো ছোটো শহরের আলো-অন্ধকার ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে যাচ্ছি

ঝড়ের শিসের মতো গর্জনিয়া নদী থেকে দূরে,

খাতা খুলে বসে থাকা স্টেশনমাস্টার কি জানে গন্তব্য আমার?

তার লগবুকে লেখা আছে কোন স্টেশনের নাম?

বাতাসের স্রোতে তিস্তার বালু ধুয়ে যায়,

চরের রহস্যরোদে বেদনা-ডালিম কেন ফাটে,

হঠাৎ দৃশ্যটা দেখে ঈশ্বরের মন করে হুহু—

ঘুরে ঘুরে বাথানের বালি খুটে খাই

আমি আর তিলাঘুঘু।

 

কার বুকে জমে আছে কতটুকু জল

আমার প্রথম ভয় ছিল এক দিনকানা কূপ;

আকাশে সে ছুঁড়ে দিত কালো কালো ছায়া।

আকাশ ফিরিয়ে দিত না কিছুই;

শিউরে উঠতো শুধু বাঁকা বাঁশঝাড়—

গাছেরও পতনভয় আছে, আছে বজ্রবিধির শাসন—

পাতারা নির্ভার শুধু, পাতার সমাজে

চুপচাপ ঝরে যাওয়া আছে

সুফিনৃত্যে ঘুরে ঘুরে নেমে যেতে থাকা;

পানি কিংবা আগুনের কাছে—

নয়নে নিহিত বাঁশপাতা নিয়ে কেউ

শুশ্রুষার জল খুঁজতে নেমে যেতে পারে?

বুকভরা জল নিয়ে কেউ বসে আছে,

শুকায় বিরান ঘাট, কলার মান্দাস।

চরাপড়া খাদ জাগে সময়ের বুকে,

মনের মটকায় ঘোরে অভাবী বাতাস।

বহুদিন হলো পৃথিবীতে জল নাই,

শুধু সীসা শুধু সীসা শুধু সীসাভার।

সুগভীর নলকূপ তাই খুঁড়ে যাই—

যদি থাকে কারো বুকে জলের সাঁতার।

জল থেকে দূরে দূরে কত আর বানাব নগর!

ভাড়ায় চালিত দেহ, খোপ খোপ বাক্স আর বাড়ি,

বাসের জানালা ভরা সারি সারি কাত করা মুখ;

বোমায় বিধ্বস্ত যেন এশিয়া বৈরুত।

জুয়াড়িরা খেলে দিয়ে করেছে আনাড়ি

ফাঁকা ইঁদারার মতো তাদের জীবন ...

সেসকল দেশে আমি উঁকি দিয়ে দেখি,

কার বুকে জমে আছে অবশিষ্ট জল।

কার বুকে খাঁ খাঁ করে বালি আর বালি,

ভয় হয়, কার বুকে অন্ধকূপ জমাচ্ছে গরল।

 

লেখক পরিচিতি : ফারুক ওয়াসিফের জন্ম ১৯৭৫ সালে, বগুড়ায়। প্রথম পাঠ বগুড়া মিশন স্কুলে, স্নাতকোত্তর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবিতা ও গল্প লেখা দিয়ে শুরু হলেও প্রতিরোধী রাজনীতিতে জড়িয়ে যান ছাত্রকালেই। পেশাগতভাবে প্রথম আলোর সহকারি সম্পাদক। একই পত্রিকার নিয়মিত কলাম লেখক। কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। আগ্রহের বিষয় জাতি ও জাতীয়তাবাদ, ইতিহাস, সাহিত্য ও রাজনীতি। কবিতার বই, জল জবা জয়তুন (আগামী প্রকাশনী, ২০১৫), বিস্মরণের চাবুক (আগামী প্রকাশনী, ২০১৭), প্রবন্ধের বই, জীবনানন্দের মায়াবাস্তব (আগামী প্রকাশন, ২০১৭), বাসনার রাজনীতি, কল্পনার সীমা (আগামী প্রকাশন, ২০১৬), ইতিহাসের করুণ কঠিন ছায়াপাতের দিনে (শুদ্ধস্বর, ২০১১), জরুরি অবস্থার আমলনামা (শুদ্ধস্বর, ২০০৯)। অনুবাদের বই, সাদ্দামের শেষ জবানবন্দি (প্রথমা, ২০১২)।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top