কল্যাণী রমার ৫ কবিতা


প্রকাশিত:
১৪ মার্চ ২০২১ ০০:২৭

আপডেট:
৩১ মার্চ ২০২১ ১৫:০৯

 

আমিই তোমার শেষ ভাসিলিসা

সুন্দরী ব্যাঙ রাজকুমারী

সব তোমার পথেই পড়ে

উইলো গাছের শাঁস তোমার পাপের মত শাদা

ঊরুসন্ধিতে নতুন জল, কাজল ডাগর চোখ।

শরীরে ঘোড়ার রক্ত

তোমার বনের মাশরুমে নেশা।

 

তবু আমি যে ভেবেছি

ভালোবাসা মানে

তোমাকে জড়িয়ে সাগরে হেঁটে যাওয়া।

ভালোবাসা মানে

বাজপাখির পালক পাহাড়ে খুঁজে পাওয়া।

 

পিছনে ফির না, কুমার, রুপার রাজ্য জ্বলে।

পিছনে ফির না, কুমার, সোনার রাজ্য জ্বলে।

পিছনে ফির না, কুমার, হীরার রাজ্য জ্বলে।

 

আমি জলরঙ

আমি ধোঁয়াফুল

আমার আঙ্গিনা ভরা

সোনালি কদম গাছ, ভেজা বার্চবন

ফেলে আসা ছেলেবেলা

হারানো কানের দুল।

 

সামনে যেও না, কুমার, হীরার রাজ্য জ্বলে।

সামনে যেও না, কুমার, সোনার রাজ্য জ্বলে।

সামনে যেও না, কুমার, রুপার রাজ্য জ্বলে।

 

ঈর্ষা শিখিনি কুমার

বল, কাজল পরব চোখে?

আজো, শুধু তুমি ছুঁয়ে দিলে

আমার শরীর

বৃষ্টিভেজা স্প্রুসগাছ।

 

জোনাক পোকার আত্মহত্যা

খুব বেশি দূর যাওয়া হয়নি আমার। কেননা সেদিন সবক’টা পথে অনেক হোলি খেলা হয়েছিলো। মাথার চারপাশ ঘিরে যীশুর মত কাঁটা নয়, ফুলের মালা দিয়ে সেজে আবির-লাল হয়ে অন্ধকার বারান্দাটার পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম আমি। একবার এ মাথা থেকে ওমাথা। আবার ওমাথা থেকে এমাথা। আর সে পথেই শুয়ে ছিল সোনালি রাজকুমার। বেশ গভীর রাত ছিল সেটা। সকলেই প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিলো।

কে যেন বলছিলো যদি জোনাক পোকা ধরে কাচের বোতলে বেশি দিন রেখে দেওয়া হয়, খাবার দিলেও নাকি জোনাক পোকা কাচের দেওয়ালে মাথা কুটে মরে যায়। গল্পটার সত্যি, মিথ্যা আমি কোথাও খুঁজে পাইনি। তবু জোনাক পোকার আত্মহত্যার গল্পটা সারাদিন আমাকে ভীষণ আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো।

কে জানে হবে হয়ত তাই যখন রাজকুমার আমাকে বলল,‘আয়, পাশে এসে বস্’, আমি কাছে গিয়ে দেখলাম, ‘কি আশ্চর্য! আকাশে আজ এত তারা!’ ধীরে, ধীরে সবাই জেগে উঠল। ঝড় বাড়ল। চোখ বুজে খোলা রাস্তার উপর শুয়ে ততক্ষণে রাজকুমার এক অদ্ভুত গলায় বলতে শুরু করেছে, 

‘ভালোবেসে তাকে ঢেলেছি যে, ইস্ 

কন্ঠে কি বিষ, জানতে চেয়ো না।’
আমার বড় বেশি শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। পরদিন অনেক শিলাবৃষ্টি দেখে আমি প্রথমে বুঝতেই পারলাম না। ভাবলাম বুঝি একঝাঁক শাদা রঙের বক এসে ঘাসের উপর নেমেছে।

 

সূর্য ওঠেনি বলে

কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের জীবনে সারাদিন ধরে শুধু ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকে। সন্ধ্যার। জলের নীচে জল  আছে? শরীরে? আলোর নীচে আলো? অনেক দূরের একটা আকাশ থেকে সীগাল নেমে আসে। অথচ শরীরে তো সমুদ্র নেই।

দূরের রাস্তাটা কমলা রঙ ধরেছে। ওই রাস্তা ধরেই আমার যাওয়ার কথা ছিল। আকাশেও কমলা কমলা, ছাই রঙের মেঘ। ঝড় এভাবে হয়। আর যে আলোটা আকাশে ঝুলে আছে, সেটা বাসি আলো। কাল রাতের আলো। ভোর হ’লে ডুবে যেতে হ’য়,  এ চাঁদটা সে কথাটা ভুলে গেছে।

শাদা শাদা সীগাল। আমি ওদের জলের দিকে চলে যাওয়ার কোন একটা পথে পড়েছি? যেমন পড়ে থাকি? সকলের?

বহুদিন সূর্য ওঠেনি বলে আমার হাতের পাতা জলে ভিজে আছে। কেউ কেউ বলেছিল স্বপ্নের ভিতর কোন কোন পথে নাকি সিংহদরজা আছে। সেইসব দরজা দিয়ে হেঁটে গেলে খোলা বনের মাঝে বাকিটা জীবন দাঁড়িয়ে থাকা যায়। আমি সেই পথগুলো চিনতে পারিনি। হাত থেকে টপ্‌টপ্‌ক’রে জল ঝরে পড়ছে। এইসব জলে শুধু মাটি ভিজে যায়। সমুদ্র হয় না।

 

মরণের গান

কাল সারা রাত বরফের ঝড় হয়েছে। কি ভীষণ শোঁ, শোঁ শব্দ। সারা বাড়ি থরথর করে কাঁপছিলো। তারাদের ঝড়ও হয়ত এমনই হয়। 
আমি বাইরে বরফের উপর গিয়ে বসেছিলাম। দুই হাঁটুর ভিতর মাথা গুঁজে শুধুই কাঁদছিলাম। আমার পা চলছিলো না। হাত চলছিলো না। একটুও নড়তে পারছিলাম না। 
কিন্তু ওভাবে তো বেশীক্ষণ বেঁচে থাকা দূরের কথা, কাঁদাও যায় না। ঠান্ডায় নিঃশ্বাস পর্যন্ত বরফের টুকরো হয়ে যায়। 
কোনমতে নিজেকে বস্তার মত টেনে হিঁচড়ে ঘরের ভিতর এনে ফেললাম। এক মেঝে ভর্তি বরফ গলা জলের মধ্যে কোনমতে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে মনে হ’ল ঘরের মেঝেটা বুঝি গ্লেসিয়ারের মত আস্তে আস্তে পায়ের নীচ থেকে সরে যাচ্ছে। 
আমি হাতের দশ আঙ্গুল দিয়ে বিচ্ছিরি ওই শাদা দেয়ালটা খামচে ধরলাম। যদি সেভাবেও শেষপর্যন্ত বেঁচে থাকা যায়। আমার নখ দেয়ালের ভিতর ঢুকে পিছলিয়ে নীচে নামতে নামতে ‘করর্ করর্’ করে উঠল। ছুরি দিয়ে মানুষের হৃৎপিন্ড চিরে দিলেও ঠিক এমনই একটা শব্দ হয়! 
মনে হ’ল একটা টানেলের ভিতর দিয়ে চলেছি। টানেলটার শুরুতে মৃত্যু দাঁড়িয়ে আছে, শেষেও মৃত্যুই দাঁড়িয়ে আছে। আসলে হয়ত শুধু থেমে থাকলেই জীবনের টানেলে বেঁচে থাকা যায়। তবু পা দু’টো যেহেতু শরীরের সাথে সেলাই করা আছে, না চলে তো পারা যায় না! 
আমি ভাবলাম টানেলটাতে হয়ত কোন আলোই থাকবে না। কিন্তু আশ্চর্য! পুরো টানেলটা পূর্ণ চাঁদের আলোতে ভেসে যাচ্ছিলো। ইস্পাতের তরবারির উপর আলো পড়লে যেমন সব উল্টোদিকে ঠিকরে পড়ে, ঠিক তেমন ধারালো শাদা সব কিছু। মরুভূমিতে বালুর উপর মরীচিকা হয়। আর এমন শীতের দেশে আকাশের উর্দ্ধ মরীচিকায় মনে হ’ল আমার মৃতদেহটা যেন আমারই চোখের সামনে ওই দিগন্তের উপর ভাসছে। 
আমি আচ্ছন্নের মত রান্না ঘরের মাংস কাটবার ছুরিটা দেখতে থাকলাম। এত্ত লোভ হচ্ছিলো! অজগরের চোখের সামনে মানুষ যেমন হাত, পা নাড়তে ভুলে যায়, ঠিক সেভাবে আমি গ্যাস ওভেনটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার শূন্য খুলির ভিতর সিলভিয়া প্লাথের সমস্ত কবিতা ফিনিক্স পাখির মত আগুনের ফুল হয়ে ফুটে উঠলো। 
দূরের চার্চ থেকে ঘন্টার শব্দ ভেসে এল। অথচ আমার কেন যেন হঠাৎ মনে হ’ল আমি বুঝি একটা জলশঙখ কানে দিয়ে সমুদ্রের শব্দ শুনছি। দূরে কোথায় যেন ক্লান্ত জলকন্যারা গান গাচ্ছে। সে গান একাকী ‘লুন’দের ডাকের মত সমস্ত অস্তিত্ব কাঁপিয়ে দিয়ে আমাকে দিশাহারা করে ফেলল। 
হাতের উপর নিজের রক্তমাখা হৃৎপিন্ডটা বের করে রাখলাম। হৃৎপিন্ডটা শরীরের বাইরে বের হয়ে এসেও এত্ত ভীষণ ধুকপুক করছিলো। আমি ভাবলাম কে জানে এভাবেই বোধ হয় মায়াবিনীরা ক্রিস্টাল বলের দিকে তাকিয়ে রুপালি, কমলা, হলুদ, লাল মেঘ দেখে জীবনের সব স্বপ্ন বলে দেয়। স্বপ্নহীন আমি নিজের হৃৎপিন্ডের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম আমার হাতের ভিতর লাল রঙের গুবরে পোকার মত হৃৎপিন্ডটা জ্বলজ্বল করছে। কালো, কালো কি অদ্ভুত সুন্দর ছিট, ছিট তাতে। ওই কালোগুলো আমার পাপের রঙ। 
কেন যেন মনে হ’ল যদি এখন এই মাংসপিন্ডটা মাটিতে ছুঁড়ে দিই, কে জানে হয়ত এত কিছুর পরও আমার হৃৎপিন্ডটা পাড়িয়ে যখন ওরা চলে যাবে, এই হৃৎপিন্ড থেকেও হয়ত দাঙ্কোর মতই আলো ছড়াবে। মানুষ তো মরে না! 
আমার দুই চোখ বেয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়তে থাকল। ঠোঁট থরথর করে কাঁপছে। হাতদুটো মুঠো করে আমি কোনমতে মেঝে আঁকড়ে ধরে বহুবারের মত আর একবার, শেষবার বাঁচবার চেষ্টা করলাম। রোজারির এক একটা কালো পুঁতির ভিতর এক একটা নিঃশ্বাস গুনে বাকি রাত আমি কোনমতে শুধু গেয়ে কাটালাম, ‘তুমি কিছু নিয়ে যাও বেদনা হতে বেদনে...’ 
রান্নাঘরের ছোট জানালাটাকে মনে হ’ল যেন তা সেই ক্যান্টারবেরী ক্যাথিড্রালের অপরূপ কারুকাজ করা এক গথিক স্টেইনড গ্লাস উইনডো হয়ে গেছে। লাল, নীল কাচের যীশু আর মেরীর মুখ জুড়ে শীতকালের সূর্যের আলো আমার হাতে ধরে থাকা ছুরির উপর এসে পড়ল। 
কোনমতে নিজেকে মাটির উপর দিয়ে টেনে হিঁচড়ে নীল রঙের দরজাটা খুলে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার একটু আগে আমি শুধু দেখলাম সব শাদা বরফ ফুঁড়ে কিভাবে যেন তিনটা সোনালি রঙের ক্রোকাস ফুটে উঠেছে! ঘরের ভিতর থেকে অকারণেই চাঁদহীন আমাকে ভাসিয়ে দিয়ে গান ভেসে এল, 
‘ও চাঁদ, চোখের জলের লাগল জোয়ার দুখের পারাবারে, 
হল কানায় কানায় কানাকানি এই পারে ওই পারে।। 
আমার তরী ছিল চেনার কূলে, বাঁধন যে তার গেল খুলে; 
তারে হাওয়ায় হাওয়ায় নিয়ে গেল কোন্ অচেনার ধারে।।’

 

আলো নিভছে

আমি সকলের আগে ঝরা পাতা দেখব বলে বাড়ীর সব ক’টা দরজা খোলা রেখেই দৌড়ে বের হ’য়ে পড়েছি। এত্ত ভয় করছে। কেবলই মনে হচ্ছে সময় বুঝি আমার শেষ হতে চলেছে। আমি সত্যিই হয়ত সেই হেমন্তে কোনদিন আর পৌঁছতে পারব না। আসলে আজ বসে আমি যে এক সামনের হেমন্তের কথা ভাবছি। সেই হেমন্ত যা কোনদিন কোথাও আসে না।

তবু এক হাঁটু কমলা পাতার উপর দাঁড়িয়ে মচ্ মচ্ শব্দ তুলে মনে করছি পৃথিবীটা এখন বুঝি পুরোপুরিই আমার হাতের মুঠোয়। যদি চাই এই এখনি এই বাদামি পাতার ভিতর মাটির উপর আমি তার পাশে হয়ত সত্যি সত্যিই শুয়ে পড়তে পারব। এবং হাত দিয়ে যদি মুখ ছুঁয়ে দেখি তবে চেষ্টা করেও তার মুখে শতাব্দীর পায়ের ছাপ আমি একটাও কোথাও খুঁজে পাব না। হয়ত বিশ্বাসও করে ফেলব যে আমাদের চামড়ায় মাটির উপর লাঙ্গলের মত সময়ও শেষ পর্যন্ত কোন বলিরেখাই কাটতে পারে না।

তাকে আমি চব্বিশ বছর দেখি নি। জানি না কেন ভেবেছিলাম মানুষের চোখ আর ঠোঁট বুঝি পাথরে খোদাই করা থাকে। এবং মানুষের চোখের আলো এতটাই শক্তিশালী হয় যে পাহাড়ের ওপারে সব ডাইনোসর হেঁটে চলে যাওয়ার পর ঘাসের রঙও উপত্যকায় সবুজ ম্যালাকাইট হয়।

তবু ভোরবেলা গ্রামের বাড়ীর আঙিনা গোবর দিয়ে লেপা না হ’লে যেমন ফেটে ফেটে ধূলো হয়ে যায়, মানুষের সব চামড়াও সেভাবেই খসে পড়ে গেল। এবং মানুষ ভুলে গেল সেই সব পথের গল্প। যেখানে সে আমার সাথে হেঁটেছিলো। হলদে মধুফুল পায়ের কাছে ছড়িয়ে পড়েছিলো সেদিন। আমি দশ আঙ্গুলে মধুফুলের টুপি পড়ে সেই ভোরবেলায় কত যে হেসেছিলাম। আর মধুফুল শুষে মধু খেতে গিয়ে ভুল করে তাকে জীবনের প্রথম চুমু খেয়েছিলাম। এক ফোঁটা ছটফটে শিশির পায়ের কাছে ঝরে পড়ে গিয়ে বলেছিলো ইচ্ছে করলেই পৃথিবীটাকে যে কোন সময় রাজপ্রাসাদ করে ফেলা যায়। এবং ইচ্ছে করলেই সারা জীবন হাতের ভিতর হাত আঁকড়ে ধরে হেঁটেও যাওয়া যায়।

সেই সব ইচ্ছেগুলো এখন আমার পায়ের কাছে কমলা, বাদামি, লাল পাতা হয়ে ঝরে পড়ে আছে। আর আমি বোকার মত কয়েকটি লাল রঙের সুগার ম্যাপল, হলদে রঙের রিভার বার্চ, সোনালি রঙের এ্যাস্পেনের পাতা কোনমতে দুই আঙ্গুল দিয়ে ছুঁতে পেরেই ফ্যালফ্যাল চোখ করে ভাবছি এইবার আমিও বুঝি এই কমলা পৃথিবীর উপর তার পাশেই শুয়ে থাকব। অথচ এদিকে আমার সব তাড়াহুড়োর অনেক আগেই তার মুখের সব বলিরেখা আমার পায়ের নীচে, ওই পাতার স্তূপে ঝুরঝুর করে আমার জন্মের আগে ঝরে গেছে।

 

লেখক পরিচিতি: কল্যাণী রমা-র জন্ম ঢাকায়। ছেলেবেলা কেটেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ভারতের খড়গপুর আই আই টি থেকে ইলেকট্রনিক্স এ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল কমুনিকেশন ইঞ্জিনীয়ারিং-এ বি টেক করেছেন । এখন আমেরিকার উইস্কনসিনে থাকেন। অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট সিনিয়র ইঞ্জিনীয়ার হিসাবে কাজ করছেন ম্যাডিসনে। প্রকাশিত বইঃ আমার ঘরোয়া গল্প; হাতের পাতায় গল্পগুলো – ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা; রাত বৃষ্টি বুনোহাঁস – অ্যান সেক্সটন, সিলভিয়া প্লাথ, মেরি অলিভারের কবিতা; মরণ হ’তে জাগি – হেনরিক ইবসেনের নাটক; রেশমগুটি; জলরঙ; দমবন্ধ।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top