জহির হাসানের ৫ কবিতা


প্রকাশিত:
১৪ মার্চ ২০২১ ০০:৪৪

আপডেট:
৩১ মার্চ ২০২১ ১৫:০৮

 

ভালা কবিতা

ভালা কবিতা কাউরে লিখতে দেখলে

আমার চক্ষেতে পানি আসে কোন বা মায়ায়!

তারা জোট বান্ধি ফোঁটা হয়।

কে আগে ঝরিবে

কে আগে নামিবে ধরায়

প্রতিযোগিতা লাগায়!

’তোরা থামবি।’ আমি কই।

ধমকাই ওদেরে

কেউ ভালা কবিতা লিখে কহন জানস তোরা?

কেউ ভালা কবিতা লিখলে

তার কয়দিন পর সে মারা যায়!

তাই বুঝি শেষমেষ সে টিয়া পাখিরে হুদাই

আদর করে

লাল মরিচ খাবায় একা একা বিকাল বেলায়

একাকী একটা

অদৃশ্য

ব্রিজের উপর নিজেরে ফালাই আসে !

 

সু’খ’

সংস্কৃতে ’খ’ মানে ফুটা

জানি এক আমি আনন্দে হইলাম দুটা।

সু’খ’ মানে ’ভালা ফুটা’ এও জানি যেই

’ভালা ফুটা’ আনি দাও, নয় হারোবোনে খেই।

দুইডা ’আমি’ ’ভালা ফুটা’ খোঁজে বার হইল যন

হায়রে ভাইরে তারা পায় না তেমন ।

পথে মুখামুখি হইলে গলাটিপি ধরি তা নহ গোপন

দুজনের দুহজনে – যারা ছিল এক ’আমি’ এক মন

এখন ফুটার লাগি দুই মনে দুহজান

বিরাজিয়া দিনরাত খুঁজে একটু আছান।

আফসানা, দুই আমি এক করো ফের গাই এক গান

দেখা দিয়া ফিরাই দেও গো আগেকার সে পরান।

 

রঙ-রইদ

তোমার কিছু রঙ ছিল হৃদয়ে রইদ রূপে

মাছরাঙা বসল আমারই ডালে তাহারে নিতে

রঙগুলি ছিল তো ভালই পাই একটা ঘর

পাইত কুয়াশার এইখানে আলতো ঠোকর।

একটা বালিহাঁস সেও আসছে ভাগ বসাতে

নিঃসীম গান পাড়ে তাই তারে কি পারি তাড়াতে?

বিলের ঘ্রাণ পায়ে বাজিছে আমার তানপুরা

তোমার রঙ দিব, নাকি অমর উষ্ণ সুরা!

নকল কিছু রোদ দি, কইতাম, কিছুটা ভাগো

টেমা পড়া রইদ, তোমা রোদ, বুঝে নাকি তারা?

আমি ক্যান যে পাখি, তোমার রঙ লুকাই রাখি

আন্ধার অরবে, ফুরাই যাবা বলে না মাখি!

 

আফসানা -৬

আমি হারাই আমার মার্বেল

যে কালো যে নীল যে গোলাপী ধরে যে

যে আদতে রং খেকো –

আমার বুকের ভিতর তারে রাখতাম!

একদিন হারাই গেল।

আমি অন্ধ

আমি কার?

আমি কোনো পৃষ্ঠা ন!

কোনো পৃষ্ঠ ন!

আমাতে

প্রতিফলনের আগও নাই

পরও নাই!

তুই হইলে ভোর

আফসানা

আমার মার্বেল

কত রং ধরতো তোর!

 

আমার ফুপুর কইতর

আমার ফুপুর অদ্ভুত কইতর ছিল একটা

আমি ওর ভিতর থাকতাম বহুত সময় যেন ওর দোসর অমি

অনেক সবর সময়

যাক তারে সময়ই কইতে হয় তবু!

ভঙ্গুর ক্ষণস্থায়ী ঘর তৈয়ার করতাম ওর ভিতর

অনেক কল্পনার রঙ

লেপন করতে করতে ওর ভিতর অনন্তের বিন্দু বিন্দু গুঁড়া খোঁচায়ে খোঁচায়ে

বার করি ফেলতাম ওর অন্তরের ভিতরতে

ফলে গোপন দরকার হই  পড়ল আমার

গোপন আমি তাই পোষণ করতাম

গোপন রাখার মতো যেন আমার কিছু হই উঠল দিনে দিনে!

 

আর তন মনে হইতে থাকে

আমি না-কান্দি তোমায়

আমি না-হাসি তোমায়

এই দোনো ভাবদৌলত আসি পড়ে আমার ভিতর!

আর উল্টাপিঠে ভাবতাম

ওর হইতে

ঐ মিহি গুড়া গুড়া অনন্ত

আত্মীয়তা পাতাইতে

আসে কেমনে আমার সহিত, ধরা পড়ে আমার ভিতর

তখন তাদেরে আমি আমার পড়শি বলি না-

তাদেরে কোনো অবভাসও বলি না!

 

যাক, ও সকালের প্রথম শীত রোদে উড়াল দিত

ফুপুর মেয়ে বেলি

কিছু কী তার টের পাইত!

আমি দেখতাম সে কইতর যখন সে

উড়তে উড়তে দুই পাহাড়ের ফাঁকা

জায়গাতে গিয়া শূন্যের উপর শুই থাকত!

 

পরে খেয়ালে আসে

যে দুই পাহাড়ের মাঝখানে পাতা একটা জালে গিয়া ধরা দিত সে!

 

জালে, ধরা পড়ার যে ভীতি তার মধ্যে

একদমই না ছিল-

আমি খোঁজ পাই যেন

এইটাও একটা গোপন খবর ওর

শুধু তার প্রকাশ পায়

কথার ভিতর-তাই আমি কাউরে জানাই না

গোপন নিঁদমহলার খবর!

 

সে প্রতিদিন সেই নিমকিন জালের ভিতর

গিয়া ধরা দেয়

আর কে যেন জিগাসা উসকায়ে দেয়

জিগা, জিগা, জালের মালিক কে?

 

আমি খোঁজ লাগাই কেমনে

হাজার হাজার মাইল উড়ি আসি

ফুপুর কইতর তবু সে মেয়ে কইতর রয়

তার জন্যে কে এই মহাশূন্যে ওয়েট করে!

মহাশূন্যের চোখে ছিটকাই পড়ার মতো

যেন কোনো তুচ্ছ কিছু নাই আহা!

এই কথা আমার মনে হাসতে আসে, আমি থামাই তারে, বলি তারে

প্যাঁচ তো সহজ কিছু নয়, তারে কেন তাইলে প্যাঁচ কবো,

জালের পাতা প্যাঁচ বুঝতে কেন এতদূর তবে আসা!

 

যাক যেহেতু পাতা জাল

দুই পাহাড়ের নিশানা বরাবর একটা কইতরের

আমাদের তালগাছের বেড় দিয়া বাড়ি, হাঁসপোষা পুষ্করিণী

সবুজ মাঠ এককথায় আমাদের সোনাদিঘি গ্রাম ছাড়ি

কেন সে এত উপরে

পাতা জালে

ছুটি ছুটি গিয়া ধরা দেয়,

বেলির কাছে কী জিগাস করা ঠিক হবেনে!

 

নাকি বেলি সবই জানে

কইতর প্রতিদিন রঙ পাল্টায়  নরমে

তার পায়ের

তার পালকের

তার ঠিকানাহীন গগনের পথগুলি

কইতরের এসব রহস্য

আমি কই না

সকল ইশারা থামি থাকে পড়ি থাকা ঘাসের ভিতর

স্টেশনের পুরানা ট্রেনের বগির মতো!

 

কেউ কাউরে আমরা যেন  সন্দেহ করি না,

আমরা দুজনের দিকে

কী একটা সৌরভে তাকাই যেন শুধু ধুধু পাশাপাশি বসি!

স্যানে আকাশের রহস্য

প্রাধান্যে উলি উঠে পর্দা

রহস্যের রহস্য অদৃশ্যমোড়া বেড়া ও বেড়ির

মালিকানা বাকহীন থাকতেই থাকে!

 

তারে ফলো করি  যেন

আমারা কি টের পাই না দুজনে

আমাদের

কইতরের রহস্য সবসময়ই চুপের চাপে রয়!

 

লেখক পরিচিতি : জহির হাসান। জন্ম ২১ নভেম্বর ১৯৬৯, যশোর জেলার পাইকদিয়া গ্রামে মাতুলালয়ে। শৈশব ও কৈশোর কাটছে যশোর ও ঝিনাইদহের গ্রামে। লেখালেখির শুরু ৭ম শ্রেণি। প্রথম কবিতা প্রকাশ ১৯৮৪ সালে যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক স্ফ’লিঙ্গ পত্রিকায়। আগ্রহ ধর্ম, ভাষা, দর্শন ও চিত্রকলায়। পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে। প্রকাশিত কবিতার বই: পাখিগুলো মারো নিজ হৃদয়ের টানে (২০০৩), গোস্তের দোকানে (২০০৭), ওশে ভেজা পেঁচা (২০১০), পাতাবাহারের বৃষ্টিদিন (২০১২), খড়কুটো পাশে (২০১৪), আয়না বিষয়ে মুখবন্ধ (২০১৬), আম্মার হাঁসগুলো (২০১৭), বউ কয় দেখি দেখি (২০১৮), বকুলগাছের নিচে তুমি হাসছিলা (২০১৯), আম্মার আরও হাঁস (২০২০) ও আমি ও জহির (২০২১) ভাষা ও চিন্তামূলক বহি : জলপাই গাছের রব (২০২১) অনুবাদ : এমে সেজেরের সাক্ষাৎকার ও আধিপত্যবাদ বিরোধী রচনাসংগ্রহ (২০১১) । সাক্ষাৎকার পুস্তিকা (কবি উৎপলকুমার বসুর সাক্ষাৎকার) : কথাবার্তা (সপ্তর্ষি প্রকাশন, কলকাতা, ২০০৬)।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top