সরকারের গোপন নথি ফাঁসের চেষ্টা !

রোজিনার সঙ্গে হঠাৎ কেন এমন আচরণ, কি হতে পারে শেষে ?


প্রকাশিত:
১৮ মে ২০২১ ১২:৫৯

আপডেট:
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১১:৫১

সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দ্য কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে)।

মঙ্গলবার (১৮ মে) সকাল ৮টার দিকে তাকে আদালতে নেওয়া হয়। সিএমএম আদালতের হাজতখানায় তাকে রাখা হয়েছে বলে অপার বাংলাকে জানান হাজতখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম। এর আগে সোমবার পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যান। সেখানে ৫ ঘণ্টার বেশি সময় তাকে আটকে রেখে হেনস্তা করা হয়। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সোমবার রাত ৯টায় তাকে সচিবালয় থেকে শাহবাগ থানায় আনা হয়। সেখানেই সোমবার রাত কাটান রোজিনা।

মঙ্গলবার সকালে রোজিনা ইসলামকে জিজ্ঞাসবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে সরকারি নথি চুরির অভিযোগে হওয়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার পরিদর্শক আরিফুর রহমান সরদার রিমান্ডের এ আবেদন করেন। কিন্তু আদালত এ আবেদন নামঞ্জুর করেছেন। আগামী বৃহস্পতিবার তার জামিনের আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।

রোজিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ 

‘বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র এবং ডকুমেন্টস চুরির’ অভিযোগে দৈনিক প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে িএকাধিক সূত্র জানায় সরকারের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করায় রোজিনা অনেক আগে থেকেই টার্গেট ছিলেন। লেখক ও সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ জানান, রোজিনা একজন ভাল সাংবাদিক হিসেবে    মুক্তিযুদ্ধের পদকের সোনায় ফাঁকি বের করেন, করোনার সময়েও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ দুর্নীতি ফাঁস করেন। প্রথম আলোর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য তিনি দেশে-বিদেশে পুরষ্কৃত। অনেক প্রশাসনিক কেলেংকারির গোমর ফাঁস করেন।

সাংবাদিকরা রয়েছেন রোজিনার পাশে 

সোমবার বিকাল থেকে রাত অব্দি সাংবাদিকরা শাহবাগ থানার সামনে ছিলেন। সচিবালয়েও যখন তাকে আটকে রাখা হয়েছিল তখনও সচিবালয় বিট করেন এমন সাংবাদিকরা খবর পেয়ে তাৎক্ষনিক ভাবে ছুটে যান এবং এমন ব্যবহারের কারণ জানতে চান। যদিও সেসময় কোনো সদুত্তর পাননি। সোমবার রাতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে মন্ত্রণালয়ের ভেতরে রোজিনা ইসলামকে আটকে রাখার, তাকে সেখান থেকে পুলিশের গাড়িতে তোলার স্থিরচিত্র এবং ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে একজন নারী রোজিনা ইসলামের গলা হাত দিয়ে চেপে ধরেছেন।

সাংবাদিক মুন্নী সাহা লিখেছেন, কার গলা চাপলেন? মনে রাখুন। রোজিনারা একা নন... গলা চাপলেও ভালো সাংবাদিকতা গলা ছাড়ে। আরও জোরে।

সাংবাদিক প্রণব সাহা গলা চেপে ধরার ছবিটি শেয়ার করে লিখেছেন, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ নতুন কিছু নয়। সবাই চান সংবাদমাধ্যম ‘আমার’ পক্ষে থাকবে। অনেকে থাকেও হয়তো। কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব পালন করার সময় গলা টিপে একজন সাংবাদিককে হত্যার চেষ্টা, তা মেনে নেবো না। অসুস্থ রোজিনার চিকিৎসা সবার আগে হতে হবে। আরও দাবি মামলার আগে আটকে রেখে হত্যা চেষ্টার বিচার চাই।

সাংবাদিক মানষ ঘোষ ছবিটি শেয়ার করে লিখেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদের পাশাপাশি রোজিনা ইসলামকে হত্যা চেষ্টার মামলা হোক।

সিপিজের এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক আলিয়া ইফতিখার বলেন, ‘বাংলাদেশে কঠোর ঔপনিবেশিক আইনের ধারায় সাংবাদিককে আটক ও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনায় আমরা শঙ্কিত। এই আইনে দুঃখজনকভাবে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।’

সিপিজের এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ এই গবেষক আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ ও সরকারকে বুঝতে হবে রোজিনা ইসলাম একজন সাংবাদিক। তাঁর কাজ জনসেবামূলক। অবিলম্বে রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করে তাঁকে মুক্তি দিতে হবে।’

প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ সিপিজেকে বলেন, রোজিনা ইসলাম গত মাসে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন।
সাজ্জাদ শরিফ আরও জানান, থানায় নিয়ে যাওয়ার আগে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে রোজিনা ইসলামকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় আটকে রাখা হয়।

রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলন বর্জন করেছে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ)।

সচিবালয় বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন বিএসআরএফের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ সংবাদ সম্মেলন বর্জনের ঘোষণা দেন। এর আগে সংবাদিকেরা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন।

সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেছা বেগমসহ কয়েকজন কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার জন্য বসেন। তখন বিএসআরএফের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ বলেন, সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা করার ঘটনার প্রতিবাদে সাংবাদিকেরা এ সংবাদ সম্মেলন বর্জন করছেন।

রোজিনার গলা চেপে ধরা আমলার বিরুদ্ধে মামলা করবেন রোজিনার স্বামী

রোজিনা ইসলামকে নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে তার পরিবার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেছা বেগম ও কনস্টেবল মিজানসহ আরও ৫-৬ জনকে আসামি করে রোজিনা ইসলামকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে মামলা করা হবে।

মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত প্রাঙ্গণে রোজিনার স্বামী মনিরুল ইসলাম মিঠু বলেন, আমার স্ত্রীকে নির্যাতন করা হয়েছে। তার গলা চেপে ধরা হয়েছিল সচিবালয়ে। তাকে গুম করার উদ্দেশ্যে সচিবালয়ে আটকে রাখা হয়। আমার স্ত্রীর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। আমার স্ত্রীর ওপর যে নির্যাতন করা হয়েছে এর বিরুদ্ধে আমরা মামলা করব।

ভাইকে যা বললেন রোজিনা

সোমবার রাত সোয়া ২টায় রোজিনার সঙ্গে দেখা করেন তার ভাই মো. সেলিম। এ সময় তারা প্রায় আধাঘণ্টা কথা বলেন। পরে থানা থেকে বের হয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন সেলিম।

তিনি বলেন, ‘সে (রোজিনা) বারবার বলেছে, আমি এমন কোনো অন্যায় করিনি, এমন কোনো অপরাধ করিনি, আমার সঙ্গে সম্পূর্ণ অন্যায় করা হয়েছে, অপরাধ করা হয়েছে। আমি মানসিকভাবে বিপর্যন্ত। আমি আমার বন্ধুদের কাছে সাহায্য কামনা করছি।’

সেলিম আরও বলেন, ‘রোজিনা মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছে। … ও (রোজিনা) এ কথাটাই বলেছে, আমি প্রচণ্ড রকম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।’

মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ও (রোজিনা) প্রচণ্ড সাহসী একজন মেয়ে। কিন্তু সচিবালয়ের মধ্যে ওকে নির্যাতন করা হয়েছে। ওরে শুধু মারা হয় নাই, ওর বুকের ওপরে ওই অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি এক মহিলা আছে পা চাপা দিয়ে ধরছে, গলা চাপ দিয়ে ধরছে।’

তিনি জানান, ‘রোজিনা আমাকে এই কথাটি জিজ্ঞেস করছে যে, আমার সাংবাদিক বন্ধুরা কি আমার পাশে আছে? আমার বড় ভায়েরা কি আমার পাশে আছে? আমি বলছি, সব সাংবাদিক ভাইয়েরা আছে। ও বারবার সাহায্য কামনা করছে। আমার এই দুঃসময়ে আমার ভায়েরা, আমার বন্ধুরা যাতে আমার পাশে থাকে। ও বার বার এই কথাটাই বলছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি ওর ভাই হিসেবে বলতে চাই, আপনারা রোজিনার পাশে ছিলেন, পুরো প্রক্রিয়াটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত থাকবেন।’

কি হতে পারে শেষে?

মামলার অভিযোগ পত্রে বলা হয়েছে, সোমবার দুপুর ২টা ৫৫ মিনিটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবের একান্ত সচিবের দপ্তরে রোজিনা ইসলাম নামে একজন নারী প্রবেশ করে। এসময় একান্ত সচিব দাপ্তরিক কাজে সচিবের কক্ষে অবস্থান করছিলেন। উক্ত নারী দাপ্তরিক গুরুত্বপূর্ণ কাগজ পত্র শরীরের বিভিন্ন স্থানে লুকানো এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ছবি তোলেন। এসময় সচিব দপ্তরের দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য মো. মিজানুর রহমান খান তা দেখতে পান এবং বাধা প্রদান করেন এবং তিনি নির্ধারিত কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে কক্ষে কি করছেন মর্মে জানতে চান। এসময় তিনি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেন। পরে অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেসা বেগম, উপসচিব জাকিয়া পারভিন, সিনিয়র সহকারী সচিব শারমিন সুলতানা, সচিবের একান্ত সচিব মো. সাইফুল ইসলাম ভূঞা, সিনিয়র সহকারী সচিব মোসাদ্দেক মেহেদী ইমাম, অফিস সহায়ক মোহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম, সোহরাব হোসেনসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও স্টাফরা ঘটনাস্থলে আসেন। অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেসা বেগম তল্লাশি করে তার কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, ডকুমেন্টসের ছবিসহ মোবাইল উদ্ধার করেন। এতে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি ডকুমেন্টসগুলো চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিলেন।  এসময় সচিবালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে শাহবাগ থানার মহিলা পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে তাকে জিম্মায় নেন।  বর্তমানে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ভ্যাকসিন ক্রয়/ সংগ্রহ সংক্রান্ত নেগোসিয়েশন চলমান রয়েছে এবং খসড়া সমঝোতা স্মারক ও নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট প্রণয়ন কাজ চলমান রয়েছে৷ সমঝোতা স্বাক্ষর নিয়ে পক্ষদ্বয়ের মাঝে প্রতিনিয়ত পত্র ও ই মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ হচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সন্নিবেশিত রয়েছে।  

 

উক্ত নারী যেসব ছবি তুলেছেন তার মধ্যে উল্লিখিত কাগজপত্রও ছিল। এসকল তথ্য জনসমাগমে প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট দেশ সমূহের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উল্লিখিত কাগজপত্র গুরুত্বপূর্ণ বিধায় মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত আছে, যা পরবর্তীতে বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রদর্শন করা হবে।  

একজন আইনজীবি জানান,রোজিনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে সেটি প্রমাণিত হলে ১৪ বছরের কারাদন্ড আদালত দিতে পারেন তবে আসামী জামিন পাবেন বলে মনে হচ্ছে। আবার সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহই কাজ। সেইদিক যদি আদালত বিবেচনা করেন তবে আসামী দ্রুত খালাসও পেতে পারেন।

 

 



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top