রজনীগন্ধা খাসী


প্রকাশিত:
২৩ নভেম্বর ২০২০ ১৩:৩৯

আপডেট:
২৩ নভেম্বর ২০২০ ২১:২৪

তরিক খান। ছবি : সংগৃহীত

জার্মানি এবং পোল্যান্ডের সীমানায় পোল্যান্ডের স্টেটিন শহরে তোলা এই ছবিটা প্রায় ৫ বছর আগে। বার্লিন যাবার পরের দিন রাতে এক কনস্যুলার এর বাসায় ডিনার খেতে খেতে তিনিই বললেন আপনারা কাল স্টেটিন ঘুরে আসতে পারেন। এখান থেকে মাত্র ২/৩ ঘন্টার জার্নি। আমরাও সিদ্ধান্ত নিলাম তবে তাই হোক।

পরের দিন এ্যাম্বাসীর আয়োজিত একটা মাইক্রোবাসে করে সকাল সকাল শুরু হল আমাদের স্টেটিন যাত্রা। বার্লিনের যে অংশ সে সময়কার পশ্চিম জার্মানির অংশ ছিল সেই অংশের কোন একটা জায়গায় ছিল আমাদের হোটেল। যাত্রা শুরুর ঘন্টাখানেকের মধ্যেই আমরা বার্লিনের পূর্ব জার্মানি অংশে ঢুকে পড়লাম। ১৯৯০ সালে দুই জার্মানি এক হয়ে যাবার প্রায় ২৫ বছর পরেও তদানীন্তন পুর্ব জার্মানির বর্তমান মলিন চেহারাটাই যেন বলে দিচ্ছিল ভাগ হয়ে যাওয়া পুর্ব জার্মানির বার্লিন কতটা ভিন্ন রকম ছিল। বাড়ী ঘরের চেহারাও আলাদা। যেতে যেতেই পথের ধারে তখনও দন্ডায়মান দেখা যাচ্ছিল ভেংগে দেয়া বার্লিন ওয়ালের কিয়দংশ। ফেরার পথে দেখব বলে তখন আর বার্লিন ওয়াল দেখতে নামা হয়নি আমাদের।

অল্প কিছুসময় পরেই আমরা শহর অতিক্রম করে চলে এসেছি হাইওয়েতে। হাইওয়ের দুই ধারে চিরহরিৎ অরণ্যের মত সুউচ্চ সারি সারি গাছ, তার মধ্যে মধ্যে নাম না জানা আরো কত ছোট ছোট গাছ, লতা, গুল্ম মিলিয়ে অদ্ভুত একটা দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে যেন। এরই মধ্যে দুপুরের খাবার সময় হয়ে গিয়েছে দেখে আমাদের একটা ম্যাগডোনালসে নিয়ে গেল ড্রাইভার। আমরা চটপট যার যার পছন্দের বার্গার নিয়ে আবার চেপে বসলাম গাড়িতে। খেতে খেতে অনেক গল্প করলাম আমরা। আমাদের এক সম্মানিত সিনিয়র কলিগ তখন আমাদের "রজনীগন্ধা খাসী'র" গল্প করলেন। খাসীকে জন্মের পর থেকে রজনীগন্ধা ফুলের গাছ আর ফুল খাওয়ালে নাকি তার মাংসে রজনীগন্ধা ফুলের ঘ্রান পাওয়া যায়। আমরা হো হো করে অনেকক্ষন হাসলাম সবাই। ঢাকায় এসে আমাদের রজনীগন্ধা খাসী খাওয়া হবে এরকম একটা মৃদু আভাসও পাওয়া যাচ্ছিল মনে হয়।

গল্পে গল্পে আমরা ততক্ষনে ঢুকে গিয়েছি পোল্যান্ডের সীমান্তবর্তী স্টেটিন শহরে। আস্তে আস্তে পূর্ব জার্মানির চেয়েও গরিব একটা চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল আমাদের চোখে। রাস্তাগুলো অসমান, কোথাও কোথাও ভাংগা, দুই একটি জীর্নশীর্ন কারখানার মত কিছু একটা চোখে পড়ল আমার। শেষে ড্রাইভার আমাদের নিয়ে একটা নদীর পাশে নামিয়ে দিল। নদীর পাড়ে নেমেই যে জিনিসটি সবার আগে আমার নজর কাড়ল তা হল তীরে নোংগর করা একটা কার্গোর পিছনে ইংরেজীতে লেখা 'DARIA', বাংলায় যাকে প্রায় দরিয়া'র মতই শোনায়। আমি নিকটবর্তী সহচরকে বললাম, ভাষা আসলে একই জিনিস। এখানেও কার্গোর গায়ে লেখা দরিয়া। আমার সত্যি সত্যি 'ওরে নীল দরিয়া' গানটি মনে এসেছিল। এই ছবির পেছন দিকে যে কার্গোটি আবছা দেখা যাচ্ছে, ওটার পেছনেই মনে হয় লেখা আছে 'দরিয়া'।

নদীর তীর ধরে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে আমরা শহরটা ঘুরে দেখার জন্য হাটতে শুরু করলাম। যতখানি জায়গা আমরা ঘন্টা দুয়েক হেটে দেখতে পারলাম তাতে কিছুক্ষন পরে পরেই চোখে পড়ল দারুন সব সুন্দর সুন্দর ডিজাইনের গীর্জা। বিকেল হয়ে যাওয়ায় আস্তে আস্তে কর্মজীবী মানুষদের রাস্তায় দেখা গেল। সবাই বাড়ী ফিরছে। সবগুলো চৌরাস্তার মোড়ে বিস্তীর্ণ ফাকা জায়গা। মনে হয় কয়েক হাজার মানুষ একসাথে হাটলেও কারো গায়ের সাথে ধাক্কা লাগবে না। কথায় কথায় জানতে পারলাম এই শহর নাকি প্রুসিয়ারও আগে সুইডিশদের দখলে ছিল এবং তাদেরই বানানো এই শহরের মূল নক্সা। প্রায় হাজার বছর আগে বানান একটা শহরের নক্সা এতটা আধুনিক হতে পারে ভেবে যেমন চমকিত হচ্ছিলাম তেমনি এক চিলতে চাপা কষ্টও পাচ্ছিলাম মনে মনে। মনে হচ্ছিল আমরা কি কোনদিনই ওদের মত সুদূর প্রসারী চিন্তা করতে পারব না?

ফিরে আসার আগে আমরা একটা এ্যান্টিক শপে ঢুকে কয়েকটি স্যুভেনির কিনেছিলাম। বেশ সুন্দর সুন্দর ফ্লাওয়ার ব্যুকে দেখে খুব কিনতে ইচ্ছে হচ্ছিল আমার। কিন্তু বিদেশ বিভুইয়ে কাকেই বা ওই সুন্দর ফুলগুলো দেব, তা ভেবে আর কেনা হয়নি সেগুলো। কিন্তু সেই নানা রঙের ফুলের বাহারি বর্ণচ্ছটা এখনো যেন চোখে লেগে আছে আমার



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top