মুল গীতিকার কে?

আইলারে নয়া দামান গান নিয়ে নতুন আলাপ


প্রকাশিত:
৪ মে ২০২১ ১৪:২০

আপডেট:
২৫ জুলাই ২০২১ ০১:৫৪

এ অংশ লিখেছেন সেজান মাহমুদ। পরের অংশে জবাব দিয়েছেন সেজুল হোসেন
ঢাকা মেডিক্যালের ডাক্তারদের 'আইলারে নয়া দামান' গানটি ভাইরাল হওয়ার পর অনেকেই আমাকে মেসেজ দিয়ে জিগ্যেস করেছেন, আপনি তো ভালমন্দ কিছুই লিখলেন না? একজন গানের মানুষ, ডাক্তার হিসাবে কিছু তো লিখবেন?
আমি ভেবে দেখলাম এটা দেখার পর পর আমার যা সত্যিকার অনুভূতি হয়েছিল তা লিখলে বহু মানুষের গাত্রদাহের কারণ হবে। তবু লিখবোই যখন, যা আসলে অনুভব করেছি তা-ই লিখি:
এক। পারফরমার দের সাধুবাদ যে তাঁরা কোন অখাদ্য হিন্দি গান বেছে নেননি। বরং বাংলা গানের মূল শক্তি লোক-গান বেছে নিয়েছেন।
দুই। ছোটবেলায় খরার দিনে কাঠফাটা রোদের মধ্যে বৃষ্টির জন্যে দোয়া পড়তে হতো। সেইসময় গরম বালুতে পা পুড়েও গেছে। এখন বুঝি দোয়া দিয়ে মানুষ শান্তনা পায়, কিন্তু বৃষ্টি হয় না। তারচেয়ে মেঘের মধ্যে প্লেন দিয়ে সিলভার আয়োডাইড ছড়িয়ে দিলেই বৃষ্টি নামে, অন্ততপক্ষে সম্ভাবনা বাড়ে! তাই কোভিড তাড়ানোর দোয়ার চেয়ে এই গান ও নাচের প্র্যাকটিক্যাল উপকারিতা আছে। সুতরাং সাধুবাদ আবারো। কেউ আবার খামোখা আহত-নিহত হোয়েন না। আপনার দোয়া পড়ে ভাল লাগলে করবেন। নো ডিজরেসপেক্ট। আমি শুধু আমার কাছে কী অর্থবহ সেটা বললাম।
তিন। ফেসবুকে কিছু মানুষ অজ্ঞ, নিজে যে জানে না তা না বুঝেই তর্ক চালাতে থাকেন। এদের সংখ্যা নেহায়েতই কম না। আইলারে নেয়া দামান কার লেখা, কার সুর না জেনে সমানে ভুলভাল পোস্ট দিচ্ছেন এবং ভয়ানক আস্থার সঙ্গে হাসন রাজার গান, শাহ আব্দুল করিমের গান, অমুকের গান বলে তর্ক চালিয়েছেন এরা। অথচ মূল ভার্সনের গীতিকার শ্রীমতি দিব্যময়ী দাশ । তিনি একুশে পদক প্রাপ্ত দুই সন্তান পণ্ডিত রামকানাই দাশ ও সুষমা দাশের মাতা। দিব্যময়ীর কাছ থেকে ইয়ারুন নেসা গানটি নিয়ে সিলেট বেতারে গেয়েছিলেন ১৯৭২-৭৩ সালে । দিব্যময়ীর নাতনি (পণ্ডিত রামকানাই দাশের কন্যা) আমাদের প্রিয় কাবেরীদি (দাশ), ন্যু ইয়র্ক শহরে থাকেন।
চার। একবার ইদের আনন্দমেলায় গান লিখলাম শাকিলা জাফরের জন্যে; সুরকার মকসুদ জামিল মিন্টু ( যদি ভুল না করি)। গানের কথা এরকম-
পরশীরা সব মন্দ বলে
সবকিছু ভুলে গিয়ে
তোমার দিকে তাকালে
প্রেম তো হয় না রাধা না হলে!
বিটিভ’র প্রযোজক জানালেন ইদের অনুষ্ঠানে ‘রাধা’ ব্যবহার করা যাবে না। হোয়াট? আমি বয়সে তরুন, রাগী। বললাম, এক কাজ করি রাধা পাল্টে ‘গাধা’ ক’রে দিই। ‘প্রেম তো হয় না গাধা না হলে’ বললে ভালোই মানাবে। প্রযোজক মহা খেপলেন। আমিও কথা পরিবর্তন করলাম না। গান ইদের আনন্দমেলায় প্রচার হলো না। সাতদিন পর এক ম্যাগাজিনে হলো।
গল্পটি কেন বললাম? আইলারে নয়া দামান নিয়েও এইরকম ঘটনা আছে। তখন গানটি সিলেট বেতারে গাইবার সময় তাঁকে বাধ্যতামুলক কিছু শব্দ পরিবর্তন করতে হয় । যেমন - 'রাধা' শব্দ ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি আর ভনিতাতে যেখানে গীতিকারের নাম ছিলো তা গাইতে দেয়া হয়নি।
এই দুই ঘটনা আমি কী করে ভুলি? এসবের জন্যেই লিখতে চাইনি। যা হোক, কিছু মানুষ মূল কথা রেখে অন্য বিষয় নিয়ে ত্যানা প্যাচাবে তবু জানিয়ে রাখি- ঢাকা মেডিক্যালের ডাক্তার, নার্স যারাই এটা করেছেন তাঁরা প্রশংসার কাজ করেছেন। এই দুর্দিনে গান-নাচ-কবিতাই শক্তি, অন্ততপক্ষে মরবিড ভীতির বিপরীতে! বিপরীতে দাঁড়ানো সহজ কাজ না!!
 
আইলারে নয়া দামান- গীতিকার প্রসঙ্গ সেজুল হাসানের জিজ্ঞাসা
 
আইলারে নয়া দামান গানটির সুরকার ও গায়িকার নাম জানা গেলেও দীর্ঘকাল পর গীতিকারের খোঁজ শুরু হয়েছে। প্রয়াত পন্ডিত রাম কানাই দাশ বলছেন এটা তাঁর মা শ্রীমতি দিব্যময়ী দাশের রচনা। কিন্তু রাম কানাই দাশের বোন সুষমা দাশ শুক্রবার একটা অনলাইন পোর্টালকে বলেছেন ‘এই গানটি কার লেখা তা তিনি জানেন না। মায়ের লেখা বলে তিনি কখনও শোনেননি।’
রামকানাই দাশের কন্যা কাবেরি দাশ আবার বেশ দায়িত্ব নিয়ে বলছেন এটা তার দাদী দিব্যময়ীর রচনা। জনগণ এখন কাকে বিশ্বাস করবে? পন্ডিত রামকানাই দাশ, কাবেরি দাশ নাকি সুষমা দাশকে। আমার বিশ্বাস সুষমা দাশে।
কারণ:
১. এই নিউজেই জানলাম- সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জফির সেতু সিলেট অঞ্চলের বিয়ের গান সংগ্রহ করে নিজ সম্পাদনায় ২০১৩ সালে বের করেছিলেন ‘সিলেটের বিয়ের গীত’ নামে একটি বই। অনেক তথ্য তালাশ করেও তিনি এই গানের গীতিকার কে তা জানতে পারেননি। তখনো জীবিত ছিলেন পন্ডিত রামকানাই দাশ। দিব্যময়ী দাশের বংশধররা তখনো-এখনো গান বাজনায় সচল থাকার পরও জফির সেতুর কাছে কেনো পৌছলনা দিব্যময়ীর নাম? এমনকি এই গানের বইটি ছাপা হওয়ার পরও?
২. কেউ বলছেন গানটি ৫০-৬০ বছর আগের। কেউ বলছেন শত বছর। কেউ বলছেন সিলেট বেতারের জন্য ১৯৭৩ সালের দিকে এয়ারুন্নেছা খানম নামের এক শিল্পীর কণ্ঠে গানটি প্রথম রেকর্ড হয়।
জন্মের পর এই গান আমি অনেক শুনেছি। ইউটিউবে অনেকের গাওয়া আছে। এতোবছরেও, গানটি ভাইরাল হওয়ার আগ পর্যন্ত এই গানটির সঙ্গে গীতিকারের নাম যুক্ত করার কোনও উদ্যোগ কেন ছিলোনা শ্রী দীব্যময়ীর স্বজনদের?
৩. সুষমা দাশ ১৯৭৪ সাল থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশ বেতারে পল্লিগীতির একজন শিল্পী হিসেবে গান পরিবেশন করে আসছেন। ২০১৭ সালে সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য একুশে পদক পেয়েছেন। এই বৃদ্ধ বয়সেও কোনো ধরনের পাণ্ডুলিপির সাহায্য ছাড়া তিনি অন্তত দেড় শ গান গেয়ে যেতে পারেন। এর বাইরে হাওরাঞ্চলের নানা ধারা-উপধারার অন্তত পাঁচ শতাধিক প্রাচীন গান তাঁর ঠোঁটস্থ। প্রাচীন লোককবিদের প্রায় ২ হাজারের অধিক গান তাঁর সংগ্রহে আছে।
তাঁর গাওয়া প্রাচীন ২২৯ টি গান, জীবনী, স্বাক্ষাৎকার নিয়ে আজিমুল রাজা চৌধুরী' সুষমা দাশ ও প্রাচীন লোকগীতি' নামে একটি বই ২০২০ সালের মার্চে প্রকাশ করেন। এটিই তাঁকে এবং তাঁর গান নিয়ে রচিত প্রথম বই। আমার কৌতুহল হলো ‘নয়া দামান’ তাঁর মায়ের রচনা হলে তিনি সেটা অতি নিশ্চিতভাবে গাইতেন এবং সেটা এই বইয়ে স্থান পেতো।
৪. 'এখনো সঠিক সুর-লয়ের সন্ধানে পথ চলি' শিরোনামে প্রথম আলোতে ২০১৭ সালে সুষমা দাশের একটি সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন সুমনকুমার দাশ। সেখানে তিনি বলছেন ‘‘হাওরাঞ্চলে যেকোনো উৎসব মানেই লোকগানের আয়োজন। বছরের প্রায় পুরোটা সময় এ বাড়ি-ও বাড়িতে নানা ধরনের গানের আসর লেগেই থাকত। কত শত গান। ধামাইল, সূর্যব্রত, কীর্তন, গোষ্ঠ, সুবল মিলন, পালা, উরি, বাউলা। এসব গান বাপ-ঠাকুরদা, মা-দিদিমা আর পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সেই ছয়-সাত বছর বয়সেই শুনে শুনে পরম্পরাসূত্রে শিখেছিলাম। সেই গান শেখা আজও শেষ হয়নি। এখনো সঠিক সুর-লয়ের সন্ধানে পথ চলি।’
সেখানেই তিনি জানান- অনেক প্রাচীন লোকগান এখনো তাঁর স্মৃতিতে সজীব রয়েছে।
প্রশ্ন হলো- এতো সজিব ও প্রাণবন্ত এই লোকশিল্পী যার কাজই লোকগানের চর্চা করা, রপ্ত করা, পরিবেশন করা ‘নয়া দামান’ গান কেন তাঁর জানার সীমানার বাইরে থাকবে, যদি সেটা তাঁর মায়ের রচনা হয়?
(সুষমা দাশ যে এই গানটি তাঁর মায়ের না বলে সাংবাদিককে জানিয়েছেন এটার সত্যতা আমি জানি না। যেহেতু তিনি জীবিত এবং আস্থাশীল সেটা আরো ভালো করে জানার সুযোগ আছে। আমি নিশ্চিত তিনি অন্তত বিভ্রান্ত করবেন না। যদি তিনি এটা না বলে থাকেন, আর যদি তিনি এটা বলেন যে এই গান দিব্যময়ীর রচনা, আমার খুব আনন্দ হবে এই ভেবে যে এখন থেকে অন্তত গানটিকে আর সংগ্রহ বলে চালানো হবে না। আর অসাধারণ এই গান পাবে মায়ের সন্ধান।
 


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top