বাংলাদেশের লোকায়ত জলবায়ুবিজ্ঞান: একটি প্রতিবেশ-নারীবাদী আলাপ


প্রকাশিত:
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০০:০৫

আপডেট:
৪ মার্চ ২০২১ ০৬:২৬

ফাইল ফটো

‘করপোরেট অভিযোজন বাণিজ্য’ ও পুরুষালি উন্নয়ন বলপ্রয়োগ

পূর্বের আফাল বায় বান

দক্ষিণে আফাল খায় ধান।

(হাওর ভাটি এলাকায় আফাল মানে বড় ধরনের ঝড়সহ পানির ঢেউ, খনার এই বচনে বোঝা যায় দক্ষিণ থেকে আসা আফাল ধানের জমিন তলিয়ে দেয়।)

মৌলভীবাজারের হাইল হাওর এলাকার জনগণ দেখিয়েছেন, স্থানীয় এলাকায় দিনে দিনে দুর্যোগের ধরন ও সময় পাল্টে গেছে। হাইল হাওরে ২০০০-২০০৩ সাল পর্যন্ত পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় ফসল তলিয়ে যায়, ২০০৪ সালে অকালবন্যায় ফসল নষ্ট হয়, ২০০৫-২০০৬ সালে ফসল নষ্ট হয় শিলাবৃষ্টিতে। ১৯৩৪ সালে হবিগঞ্জ জেলার নাগুরা এলাকায় স্থাপিত হয়েছিল উপমহাদেশের প্রথম গভীর পানির ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যা বর্তমানে ব্রির আঞ্চলিক কার্যালয় হিসেবে কাজ করছে। এই প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্য ছিল হাওর এলাকার জন্য বন্যা ও গভীর পানি সহনশীল ধান জাত উদ্ভাবন, কিন্তু আজ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠান তা করতে পারেনি। কিন্তু হাওর এলাকা থেকে সংগ্রহ করেছে নানা প্রজাতির গভীর পানি সহনশীল দেশি ধানের জাত, যার একটিও আজ হাওর এলাকায় তেমনভাবে চাষ করা হয় না। ঠিক একইভাবে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগ পেট্টা এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউিট (ব্রি) যৌথভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জন্য লবণাক্ত সহনশীল ধানজাত বাছাইয়ের জন্য এক বিরাট প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের লবণসহিষ্ণু দেশি ধানজাতগুলো সংগ্রহ করে। এই দুটি প্রকল্পই কৃষকের হাতে দেশি জাতের বন্যাসহিষ্ণুু ও লবণসহিষ্ণু ধানজাত তুলে দিতে পারেনি। হাওর ও দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার অনেকেই ধারণা করেন, এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে বন্যা ও লবণসহিষ্ণু দেশি ধানের জাতসমূহ এবং এদের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য ও তথ্য করপোরেট কোম্পানির বাণিজ্যিক গবেষণায় চলে যেতে পারে। এবং পেটেন্ট হয়ে যেতে পারে। কারণ জলবায়ুজনিত পরিবর্তনকে ব্যবহার করে এসব কোম্পানি সমানে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে তারা যেকোনো ধরনের পরিবেশগত চাপসহিষ্ণু এবং জলবায়ুসহনশীল বীজ বানাতে সক্ষম। তাদের কাছে লবণ কি খরা বা বন্যা বা তাপ কি ঠান্ডা বা কুয়াশা—সব সহিষ্ণু শস্য ফসলের বীজ আছে।

দুনিয়ার ধনী দেশের ভোগ-বিলাসিতার কারণে পরিবর্তিত জলবায়ুগত বিপন্ন সময়ের সবচেয়ে বড় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে দক্ষিণের গরিব দেশগুলোকে, যারা সবচেয়ে কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ঘটান নিজেদের জীবন-জীবিকার ভেতর দিয়ে। দক্ষিণের গরিব দেশসমূহ ইতিমধ্যেই উত্তরের ধনী দেশগুলোর মহাবড় কার্বন-পদচ্ছাপে পদদলিত মথিত হয়ে নিজেদের সাংঘাতিক রকমের টিকে থাকার উত্সাহ ও অনুশীলন নিয়ে বেঁচেবর্তে আছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে করপোরেট কোম্পানিরা তৈরি করছে ভিন্ন ভিন্ন বাণিজ্য কৌশল। তারা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিপন্ন দক্ষিণের গরিব দেশের কৃষকদের অভিযোজনের জন্য তৈরি করে দিচ্ছে নানান অভিযোজনের কৌশল (যেমন যেকোনো জলবায়ুগত পরিবর্তনেই টিকে থাকে এমন বীজ)। তারা সরকারকে বাধ্য করাচ্ছে করপোরেট কোম্পানির এই নয়া-অভিযোজনিক বাণিজ্য মেনে নিতে। সরকার যাতে দেশের জলবায়ু-উদ্বাস্তু এবং বিপর্যস্ত কৃষকদের অভিযোজনের জন্য এসব করপোরেট পরামর্শ গ্রহণ করে কৃষকদের কোম্পানির বীজ কিনতে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। জলবায়ুগত পরিবর্তনের এই সময়ে ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ ইস্যুটিকে কব্জা করে গড়ে উঠছে বিভিন্ন করপোরেট কোম্পানির একক বাণিজ্য। দুনিয়ার ১০টি শীর্ষ বীজ কোম্পানি, যারা দুনিয়ার বীজের বাজারের ৫৭ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে, তারাই এই ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ ইস্যুটিকে বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করতে তত্পর হয়েছে। যেকোনো ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুতকৃত তাদের জলবায়ু সংবেদনশীলতার জন্য প্রস্তুত জিন (ক্লাইমেট রেডি জিন) এবং বীজ দিয়ে বাণিজ্য করার পাঁয়তারা করছে এসব দুনিয়াকাঁপানো করপোরেট কোম্পানি। জার্মানির বিএএসএফ, আমেরিকার মনসান্টো, জার্মানির বায়ার ক্রপ সায়েন্স, সুইজারল্যান্ডের সিনজেন্টা, আমেরিকার ডুপন্ট কোম্পানি ইতিমধ্যেই খরা-তাপ-ঠান্ডা-বন্যা-লবণাক্ততা প্রতিরোধী তথাকথিত ‘জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতকৃত জিনের’ পেটেন্ট করার জন্য ৫৩২টি পেটেন্ট দলিল জমা দিয়েছে। এর ভেতর খরা, লবণাক্ততা, পরিবেশগত চাপ, ঠান্ডা এবং তাপ প্রতিরোধী জিন পেটেন্ট করার জন্য জার্মানির বিএএসএফ কোম্পানি বিশ্ব বুদ্ধিস্বত্ব সংস্থার (ডব্লিউআইপিও) কাছে ২১টি পেটেন্ট অনুমোদন জমা দিয়েছে। সিনজেন্টা সাতটি, মনসান্টো ছয়টি, বায়ার ক্রপ সায়েন্স পাঁচটি পেটেন্ট অনুমোদন জমা দিয়েছে। এসব কোম্পানির ভেতর বায়ার ক্রপ সায়েন্স ২০০৬ সালে ৪৬,৯০০ কোটি টাকার কৃষি রাসায়নিক বিষের বাণিজ্য করেছে, সিনজেন্টা করেছে ৬,৪০০ মিলিয়ন ডলারের আর মনসান্টো ৩,৩০০ মিলিয়ন ডলারের। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বীজ কোম্পানি মনসান্টো ২০০৬ সালে ডেল্টা অ্যান্ড পাইন ল্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে ৪,৪৪৬ মিলিয়ন ডলারের কৃষিবিষের বাণিজ্য করেছে। আমেরিকার ডুপন্ট কোম্পানি ঘোষণা দিয়েছিল, ২০১২ সালের ভেতর তারা জিন প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত বিকৃত ভুট্টার বীজ বাজারে নিয়ে আসবে, যা খরাপ্রতিরোধী। International Devlopment Research Centre of Canada, The New Partnership for Africa’s Devlopment (NEPAD), Bill & Melinda Gates foundation, Buffett foundation, African Agricultural technology foundation, Asian Devlopment Bank (ADB), Japanese government, japanese International Research Centre for Agricultural Sciences এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, দাতা সংস্থা ও বহুপক্ষীয় ব্যাংকসমূহ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সহনশীল কৃষি ফসলের জাত উদ্ভাবনের জন্য National agricultural research programs of Kenya-Uganda-Tanzania-South Africa, CIMMYT, IRRI, Africa rice center এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। মাইক্রোসফটের মালিক দুনিয়ার শীর্ষ ধনী Bill & Melinda Gates foundation National agricultural research programs of Kenya-Uganda-Tanzania-South Africa, CIMMYT কে খরা প্রতিরোধী ভুট্টা তৈরির জন্য ৩২৯ কোটি টাকা (৪৭ মিলিয়ন ডলার) দিয়েছে, এই ভুট্টায় আমেরিকার মনসান্টো এবং জার্মানির বিএএসএফ কোম্পানির স্বত্বমুক্ত বাণিজ্য অংশীদার আছে। পারিবেশিক চাপ সহনশীল ধান তৈরির জন্য Bill & Melinda Gates foundation ১৩৩ কোটি টাকা (১৯.৮ মিলিয়ন ডলার) সাহায্য দিয়েছে IRRI এবং Africa rice center কে।৫৫

জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামাল দিতে যখন গরিব দেশগুলোর জনগণ হন্যে হয়ে তার প্রতিবেশ এবং প্রাণপ্রক্রিয়ার দিকে হাতড়ে মরছে, তখন এই জলবায়ু পরিবর্তন ঘটনাটিকে কাজে লাগিয়ে করপোরেট কোম্পানিরা নানা মুনাফার বাজার তৈরি করেছে। এর নাম দিচ্ছে কৃষিতে জনগণের অভিযোজন ও প্রশমন। পাশাপাশি গরম বা বৃষ্টি বা ঠান্ডাকে কাজে লাগিয়ে আরও প্রসারিত হয়েছে করপোরেট বাজার। এই বাজার দক্ষিণের গরিব দেশ হিসেবে বাংলাদেশের শহরের মধ্যবিত্ত বাঙালিদের কাছেও চলে এসেছে। বৈদ্যুতিক পাখা, ফ্রিজ, এসি, জেনারেটর, আইপিএসের বাজার তৈরি হয়েছে বাংলাদেশেও। জলবায়ু পরিবর্তিত এই সময়ে হেইজ অ্যান্ড হেয়ার, স্যামসাং, র্যাংগ্স, সিঙ্গার, গ্রি, ওয়ালটন, হুন্দাই কোম্পানিরা তাদের পণ্য উত্পাদন বাড়িয়ে দিয়েছে। করপোরেট কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত এই তথাকথিত মুক্তবাজারব্যবস্থা এসব করপোরেট বাণিজ্যের ভেতর দিয়ে বোঝাতে চাইছে, পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তিত হবেই আর কৃষককে এবং শহরের মানুষকে একেকভাবে এর সঙ্গে একেক রকম করে খাপ খাইয়ে নিয়ে অভিযোজিত হতে হবে। এটিই হলো সাম্প্রতিক করপোরেট অভিযোজন-প্রক্রিয়া। জলবায়ু পরিবর্তিত পৃথিবীতে কৃষকের জন্যও যেখানে করপোরেট বাজারের জলবায়ু সহনশীল বীজ ও কৃষিসামগ্রী থাকছে এবং পাশাপাশি শহরের মানুষের ভোগ-বিলাসিতার সামগ্রীগুলোও থাকছে। মানে এই জলবায়ু পরিবর্তিত অবস্থায় খাপ খাইয়ে নিতে হবে করপোরেট বাজারের পণ্য, পদ্ধতি এবং মর্জি অনুযায়ী। জলবায়ু বিপর্যস্ত জনজীবনের প্রতি নয়া-উদারবাদী দুনিয়ার এসব অভিযোজন বাণিজ্য ও উন্নয়ন কর্মসূচি শ্রেণিসমাজ কাঠামোর ক্ষমতা বিস্তারের সঙ্গে আগাপাছতলা জড়িত। জনগণের প্রান্তিক লোকায়ত জলবায়ুবিজ্ঞানকে দাবিয়ে রেখে এ ধরনের করপোরেট উন্নয়নবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পুরুষতান্ত্রিক বলপ্রয়োগেরই আরেক মারদাঙ্গা রূপ। চলতি আলাপ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সব ধরনের পুরুষতান্ত্রিক উন্নয়ন বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে জনগণের লোকায়ত জলবায়ু-ইশতেহারের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে।

লোকায়ত জলবায়ুবিজ্ঞানের প্রান্তিকতা ও জলবায়ু ন্যায়বিচার

দক্ষিণ দুয়ারী ঘরের রাজা

পূর্ব দুয়ারী তার প্রজা।

পশ্চিম দুয়ারীর মুখে ছাই

উত্তর দুয়ারীর খাজনা নাই।

(খনার বচন। খনার এই বচনটি আমাদের জানান দেয় প্রান্তিক জনগণ তার গৃহনির্মাণ থেকে শুরু করে জীবনযাপনের সব ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রতিবেশ এবং প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেন। যেমন গৃহনির্মাণের ক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগণ স্থানিক প্রকৃতিকে বিবেচনা করেন, পাশাপাশি শহরের ভোগ-বিলাসী জীবন জলবায়ু পরিবর্তিত অবস্থায় আরামের জন্য করপোরেট কোম্পানিরা কোনো পণ্য যেমন বৈদ্যুতিক পাখা বা তাপানুকূল বা এসিকে গৃহনির্মাণের একটি অংশ হিসেবে মনে করেন।)

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জনগণের ক্ষেত্রে ‘অভিযোজন’, ‘প্রশমন’, ‘খাপ খাওয়ানো’, ‘আত্তীকরণ’—এ রকম নানান উন্নয়ন সম্পর্কের কথা আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এসব উদ্যোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনগণের নিজস্ব কায়দা ও চিন্তাভাবনা অনুযায়ী হচ্ছে না বা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেশের জনজীবনের নিয়ত পরিবর্তনশীল জলবায়ুবিজ্ঞানকে উন্নয়নবাদী ক্ষমতাকাঠামোতে আরও বেশি প্রান্তিক করে তোলা হচ্ছে। উন্নয়নবিদ বা নীতিনির্ধারকেরা অধিকাংশ সময়ই জনগণের স্বর ও আহাজারিকে বোঝার জন্য সময় ও পরিস্থিতি তৈরি করছেন না। তাই দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নানা প্রশমন উদ্যোগ যেমন নবায়নযোগ্য কোনো শক্তি প্রকল্প৫৬ বা বনায়ন কর্মসূচি যখন নেওয়া হয় তখন দেখা যাচ্ছে সেসব উদ্যোগের ফলে আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের বাস্তু ও প্রতিবেশের অধিকার হারায়। বিমান যানের কারণে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নির্গমন প্রশমনে ডাচ কোম্পানি ২০০২ সালে উগান্ডাতে একটি বনায়ন কর্মসূচি শুরু করে। উগান্ডার ফরেস্ট্রি স্টেওয়ার্ডশিপ কাউন্সিল (এফএসসি) ১৯৯৯-২০০২ পর্যন্ত সাত হাজার হেক্টর এলাকায় এই বনায়ন কর্মসূচি অনুমোদন করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে দি উগান্ডান ওয়াইল্ডলাইফ অথরিটি (ইউডব্লিউএ) এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্থানীয় আদিবাসীদের উচ্ছেদ করার জন্য নানাভাবে বল প্রয়োগ করে, প্রায় ৫০ জন আদিবাসী ২০০৪ সালে মারা যায়। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াতে বায়ুফুয়েল তৈরির জন্য আগ্রাসী পামবাগানের জন্য নানাভাবে উচ্ছেদ হচ্ছেন।৫৭

পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে ভারতীয় এলাকায় খরা ও বন্যা প্রতিরোধে নিম, শিরীষ, অশ্বত্থ, বট, ভারতীয় রাবার, কদম, বকুল, সোনাঝুরিগাছ লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বিশেষজ্ঞদের তরফ থেকে।৫৮ এ ক্ষেত্রে অবশ্যই বাংলাদেশের বিবেচনায় রাখা জরুরি কী ধরনের গাছ কোথায় কোন অঞ্চলে লাগানো হবে, তার পরামর্শ যখন জনগণ না দিয়ে বিশ্বব্যাংক কিংবা এডিবি দেয় তখন তা কীভাবে প্রাকৃতিক বনকে রাবার বা আগ্রাসী ম্যাঞ্জিয়াম-ইউক্যালিপটাস-একাশিয়ার বাণিজ্যিক বাগানে পরিণত করে। জলবায়ু পরিবর্তনকেন্দ্রিক প্রশমনের জন্য বন সংরক্ষণ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগসমূহ বরাবরই বননির্ভর জনগোষ্ঠী ও আদিবাসীদের বাদ দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করে। যেমন: ইকো পার্ক, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা, গেম রিজার্ভ, অভয়ারণ্য, অভয়াশ্রম, জাতীয় উদ্যান ইত্যাদির মাধ্যমে যত না বেশি জনগণসহ প্রাণবৈচিত্র্য বা প্রতিবেশের উপকার হয় তার চেয়ে বেশি তা পর্যটন কোম্পানির বাণিজ্য স্বার্থকেই চাঙা করে।

আদিবাসীরা মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নির্গমনের জন্য কোনোভাবেই দায়ী নন। গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়াতেও আদিবাসীদের কোনো ধরনের সর্বনাশা ভূমিকা নেই। দুনিয়ার ৩৭০ মিলিয়ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্থায়িত্বশীল কার্বননিরপেক্ষ এবং অনেক জনগোষ্ঠী একেবারেই খুব কম কার্বন পুড়িয়ে জীবনযাপন করেন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য গৃহীত প্রশমন উদ্যোগসমূহ বিশেষ করে কার্বন ফার্টিলাইজেশন, নবায়নযোগ্য শক্তি উত্পাদন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের সময় আদিবাসীদের অবাধ, স্বাধীন, পূর্ব অনুমতি ও সম্মতি থাকে না বা নেওয়া হয় না।৫৯

পৃথিবীব্যাপী এখন পর্যন্ত তালিকাভুক্ত প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার সপুষ্পক উদ্ভিদের প্রায় ৩০০০ প্রজাতির উদ্ভিদ মানুষ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে। এই ৩০০০ প্রজাতির ভেতর মাত্র ২০০টি প্রজাতি মানুষ চাষ করে, যার ভেতর মাত্র ১৫-২০টি প্রজাতি অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।৬০ পুস্তকি গবেষকেরা বলে থাকেন, একটা সময় সারা দুনিয়ার মানুষ প্রায় আশি হাজার উদ্ভিদ প্রজাতি থেকে নিজেদের বৈচিত্র্যময় খাবার জোগাড় করত। চলতি দুনিয়ায় মানুষের খাদ্যসামগ্রীর প্রায় পঁচাত্তর শতাংশেরই সরবরাহ আসছে হাতে গোনা মাত্র আটটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহূত উদ্ভিদ প্রজাতি থেকে। ১৯০০ সালের পর থেকে দুনিয়ায় নানা শস্য ফসলের বৈচিত্র্যময় জাতসমূহকে নানা কায়দায় নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে, এ পর্যন্ত শস্য ফসলের নানা জাতের ৭৫ শতাংশই বিলুপ্ত হয়েছে। সারা দুনিয়ায় কৃষিপ্রাণসম্পদের এই নিশ্চিহ্নকরণ ঘটেছে ১৯৬০-এর দশকে প্রবর্তিত তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে। কৃষকদের ঐতিহাসিক যে কৃষি আবহাওয়ামণ্ডলে সবচেয়ে কম কার্বন ছাড়ত, সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে চালু হওয়া রাসায়নিক কৃষি আবহাওয়াচক্রে কার্বন ছাড়ছে অনেক গুণ বেশি। যেখানে কৃষকদের ন্যূনতম কোনো ভূমিকা নেই। বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগণ এখনো পর্যন্ত তার নিজের সারা জীবনে সবচেয়ে কম কার্বন ব্যবহার করে, অনেকে কার্বননিরপেক্ষ জীবন যাপন করে, অনেকে হিসাব করার চেয়েও কম গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন ঘটায়। বাংলাদেশের জনগণ এখনো কম কার্বনভিত্তিক খাদ্যতালিকা গ্রহণ করে, কম কার্বন কৃষি-জুম অর্থনৈতিক জীবন যাপন করে এবং বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগণ এখনো পর্যন্ত দুনিয়ার সাম্প্রতিক উষ্ণ হয়ে ওঠা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়, কারণ এই দেশের জনগণ কোনো সর্বনাশা ‘কার্বন-পদচ্ছাপ’৬১ এখনো রাখেনি এই মাতৃ-দুনিয়ার বুকে। অথচ এ দেশের প্রান্তিক মানুষ এটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না যে পরিবর্তনের জন্য নিজেরা আমরা দায়ী নই, আমাদেরই কেন সেই পরিবর্তন মোকাবিলায় জান-প্রাণ-সম্পদ দিয়ে দিতে হবে?

পরিবেশগত পরিবর্তনে সাড়া দেওয়া এবং পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে এই জনপদের জনগণ জান দিয়েছেন, রক্ত ঝরিয়েছেন। নেত্রকোনার সুসংদুর্গাপুরে হাজং জনগণ সুসং রাজার হাতি বাণিজ্যের বিরুদ্ধে হাতীখেদা আন্দোলন করে জান দিয়েছে, মধুপুর শালবন বাঁচাতে মান্দি যুবক পীরেন স্লান শহীদ হয়েছেন, উত্পল নকরেক তাঁর শরীর দিয়ে বাঁচিয়েছেন বন, মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ফুলতলা চা-বাগানের অবিনাশ মুড়া বুকের রক্ত ঢেলে পাহাড় জনপদ রক্ষা করেছেন, সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় ভাসান পানির আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণ হাওর জলাভূমির প্রাতিবেশিক সার্বভৌমত্ব দাবি করে রাষ্ট্রের জুলুম সয়েছে, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা পাহাড় বাঁচানোর জন্য স্থানীয় বাঙালি জনগণ আন্দোলন ঐক্যবদ্ধ করেছে এবং পাহাড় বাঁচাতে শহীদ হয়েছেন সালিক মিয়া ও ধনু মিয়া। পরিবেশ আন্দোলনের ক্ষেত্রে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ‘র্যাডিক্যাল’ প্রতিক্রিয়াকে অনেকে৬২ গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, আবার অনেকে৬৩ গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না। কিন্তু তার পরও এ দেশের জনগণ প্রতিবেশ প্রক্রিয়ায় তার অবস্থান ও সাড়াকে নানা প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে স্পষ্ট করতে চেয়েছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনকে ঘিরেই এই জনপদের কৃষি কি জুম কি জীবন ‘অভিযোজিত (এই শব্দটি নিয়ে বিদ্যায়তনিক কাঠামোতে বাহাস থাকতে পারে, আমরা আপাত নিরপেক্ষতা বজায় রেখে শব্দটি ব্যবহার করেছি) হয়েছে। জনগণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার স্বতঃস্ফূর্ত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজস্ব ঐতিহাসিক কায়দায় চলমান অভিযোজনের ইতিহাস শামিল রাখতে আগ্রহী। আর এটাই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই জনপদের প্রান্তিক মানুষের অবস্থান। এই অবস্থান ‘কম কার্বন অর্থনীতির’৬৪ পক্ষে, ‘কম কার্বনভিত্তিক খাদ্যতালিকা’৬৫ এবং জীবনধারণের পক্ষে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নানা প্রশমন ও অভিযোজন উদ্যোগের জন্য নেওয়া হচ্ছে নানা প্রকল্প এবং খরচ করা হচ্ছে কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যেকোনো ধরনের খাপ খাওয়ানোর সূত্রসমূহ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এবং প্রাণবৈচিত্র্যর ভেতরেই রয়েছে। প্রান্তিক জনগণের লোকায়ত বিজ্ঞান এবং জীবন অনুশীলন সেসব সূত্র পাঠ করতে জানে, তাই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত যেকোনো ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে একমাত্র জরুরি কাজ হবে জনগণের লোকায়ত ধারণা এবং চর্চার দিকে কেন্দ্রীয় মনোযোগ নিয়ে তাকানো এবং জনগণের ভাবনা এবং চিন্তার ভেতর দিয়েই এই সর্বনাশা কার্বন-পদচ্ছাপ পাড়ি দেওয়া সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপন্ন দুনিয়ায়, যখন ধারণা করা হচ্ছে উষ্ণতার কারণে গলে যাবে বরফ আর বরফগলা পানিতে ডুবে যাবে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক অঞ্চল তখন বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগণের একটাই দাবি, ধনী দুনিয়ার মানুষের ‘স্বভাব’ বদলানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বাংলাদেশের জনগণ চায় জলবায়ু পরিবর্তন অবশ্যই একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই ঘটতে থাকুক, যেখানে পরিবর্তনের তারতম্যগুলো জনগণের জীবনযাপন দিয়ে পাঠ করা সম্ভব হয় এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের ঐতিহাসিক অভিযোজনের চলমানতা বিরাজিত রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু যেকোনো ধরনের সর্বনাশা কার্বন-পদচ্ছাপের বিরুদ্ধেই বাংলাদেশের জনগণের অবস্থান। আর এই সর্বনাশা কার্বন-পদচ্ছাপ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেই জনগণের লোকায়ত প্রতিরোধ প্রস্তুত, কারণ বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগণ ঐতিহাসিকভাবেই কার্বন-নিরপেক্ষ জীবন যাপন করে।

জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলা ও দায়

জলবায়ু বিপর্যয়ের বৈশ্বিক দায় আমরা কীভাবে সামাল দেব? যে দেশের গ্রামীণ জনগণের কোনো ভূমিকা নেই এ বিপর্যয়ে। অথচ বাংলাদেশকে এ বিপর্যয়ের অনিবার্য আঘাত সইতে হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু দেনদরবারে জীবনের ঐতিহাসিক বহমানতা অস্বীকার করে জলবায়ু-বিপর্যস্ত মানুষের রক্তাক্ত আখ্যানকে মুদ্রানির্ভর অর্থনীতির মনস্তত্ত্ব দিয়ে দরদাম করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে ‘জলবায়ু-দরকষাকষি’। ‘অভিযোজনের’ নামে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে একটার পর একটা ক্ষমতার চোখরাঙানি। কিন্তু আমাদেরও এ বৈশ্বিক দায় থেকে মুক্তির জন্য জলবায়ু-সংগ্রামে প্রস্তুতির কারিগরি ও রাজনৈতিক দর্শনকে স্পষ্ট করে তোলা জরুরি। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে কেবল বৈশ্বিক জলবায়ু-দেনদরবার নয়, আমাদের কিছু প্রাথমিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নিজস্ব কাজ ও দায়িত্বও আছে। যেমন জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশের নানা প্রান্তের সব জনগণের ঐতিহাসিক ধারণা, লোকায়ত প্রক্রিয়াকে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধারাবাহিক ‘জাতীয় জলবায়ু জনদলিল’ প্রকাশ করা জরুরি। পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতির ভেতর বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগণের টিকে থাকার লড়াই ও কার্যকৌশলসমূহ সম্মতি ও অনুমোদনক্রমে নথিভুক্ত করা দরকার। বাংলাদেশের স্থানীয় প্রজাতি, স্থানীয় প্রাণসম্পদ ও বৈচিত্র্য এবং জনগণের লোকায়ত কৃষি-জুম ও উত্পাদন সম্পর্ককে সার্বিকভাবে বিবেচনা করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশের নিজস্ব মোকাবিলা উদ্যোগ তৈরি করা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার নামে, করপোরেট অভিযোজন বাণিজ্য, পরিবেশ-স্বাস্থ্য-জীবিকা-স্থানীয় অর্থনীতি এবং সার্বিক জীবনব্যবস্থাকে ন্যূনতম প্রভাবিত ও বিপন্ন করে এমন কোনো ধরনের বাণিজ্য-প্রকল্প-স্বার্থ-উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ও বাতিল করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জনগণের গণ-উদ্যোগসমূহকে জোরদার ও ইতিবাচকভাবে গণমাধ্যমসমূহে প্রচার ও প্রকাশ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি জনগণবান্ধব রাষ্ট্রীয় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাকে প্রভাবিত করে, জলবায়ু পরিবর্তনকে উসকে দেয় বা জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে, এমন সব রাষ্ট্রীয় অভ্যন্তরীণ প্রকল্প-বাণিজ্য-ব্যবস্থার জোরদার রাষ্ট্রীয় আইনি ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ-মূল্যায়ন এবং রাষ্ট্রীয় পরিবেশ আইনে বিচার ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা কার্যকর করা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিশ্চিহ্ন, বিপন্ন, বিলুপ্ত, বিলুপ্তপ্রায়, বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকা প্রাণসম্পদ, বাস্তুসংস্থান, শস্য ফসলের বৈচিত্র্য, জীবিকা, ঐতিহ্যগত পেশা ও জীবনধারা, স্থানীয় সম্পদনির্ভর অর্থনীতি ব্যবস্থার ধারাবাহিক জনদলিল তৈরি এবং জনগণের সার্বিক অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সংরক্ষণ এবং জীবনজীবিকা ও উত্পাদন সম্পর্কের ধারাবাহিকতা শামিল রাখা। জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য দায়ী তথাকথিত উন্নত ও ধনী রাষ্ট্রের খবরদারি ও ভোগ-বিলাসিতা ও নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় অবস্থান গ্রহণ। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সার্বিকভাবে দায়ী রাষ্ট্র এবং পক্ষসমূহের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক, রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক জনগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দেশের ভেতর স্থানীয়-আঞ্চলিক-জাতীয় কর্মউদ্যোগ গ্রহণ এবং একইভাবে সার্ক বা দক্ষিণ এশীয় এবং একটি বৈশ্বিক জলবায়ু মোকাবিলার বন্ধুত্বপূর্ণ কর্মসম্পর্ক তৈরি। জলবায়ু পরিবর্তন-প্রক্রিয়ার শিকার, বিপন্ন-নিশ্চিহ্ন প্রজাতি এবং জীবন-জীবিকা রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্থানীয় ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা জোরদার করা এবং একটি রাষ্ট্রীয় জলবায়ু পরিবর্তন ত্রাণ সহযোগিতা সেল জোরদার করা। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বহুপক্ষীয় ব্যাংক, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাদের গৃহীত পদক্ষেপ, ঋণ বা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাদের নির্ধারিত উন্নয়ন পরিকল্পনাকে অবশ্যই প্রাথমিকভাবে উন্মুক্ত-অবাধ-জনগণসমর্থিত ও জনগণ অনুমোদিত হতে হবে। একটি জনগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে সেসব তথাকথিত সাহায্য বা ঋণ গ্রহণ বা বর্জনের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা থাকতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দেশের প্রান্তিক ভূমিহীন, ক্ষুদ্র কৃষক-জুমিয়া, আদিবাসী, সংখ্যালঘু, নারী, প্রবীণ, শিশু, প্রতিবন্ধী জনগণের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সবার নিজস্ব শ্রেণীগত অবস্থান সাপেক্ষে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে রাষ্ট্রীয় আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের আগে অবশ্যই তা জনগণের সম্মতি, প্রস্তাব ও সুপারিশের ভিত্তিতে করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক, আন্তরাষ্ট্রিক, দ্বিরাষ্ট্রিক আইন, নীতি, ঘোষণা, সনদ স্বাক্ষর-সমর্থন ও অনুমোদন করার আগে তা বাংলাদেশের জনগণের কাছে উন্মুক্ত করে জনগণের সম্মতি ও অনুমোদনক্রমে আন্তর্জাতিক দলিলে স্বাক্ষর ও অনুমোদন করার একটি কার্যকরী রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া থাকতে হবে। যেসব রাষ্ট্র এখনো পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দলিল ও নথিতে স্বাক্ষর করেনি বা অনুমোদন ও সমর্থন করে না, সেসব রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে সুস্পষ্ট করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার শপথ, সাহস, শক্তি, সম্ভাবনা, সম্পদ, অভিজ্ঞতা, কৌশল কেবল দেশের গরিব জনগণের ভেতরেই ঐতিহাসিকভাবে বহমান। ঐতিহাসিকভাবেই ঔপনিবেশিক ক্ষমতাকাঠামো জনগণের এই লড়াকু জীবন ও সম্পদকে গুরুত্ব না দিয়ে বারবার তছনছ করেছে এবং জনগণের যাপিত জীবনের জলবায়ু পঞ্জিকাকে উল্টেপাল্টে দিয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর থেকে এই দীর্ঘ সময়েও গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে নানা সবক ও তুবড়ি ছোটালেও পরিবেশ-প্রতিবেশের নিরাপত্তা প্রশ্নে কখনোই একদানা পরিমাণও ‘গণতান্ত্রিক’ হতে পারেনি রাষ্ট্র। রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি জনগণের প্রতিবেশীয় গণতান্ত্রিক অধিকার এবং জলবায়ুগত নিরাপত্তা। অথচ রাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে জনগণের রাষ্ট্রকে বারবার এক অনিবার্য বিপর্যয় এবং পুরুষতান্ত্রিক বাণিজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। চলতি সময়ের এই অসহ্য জলবায়ুজনিত পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের গরিব জনগণ কোনোভাবেই দায়ী না হলেও জলবায়ুজনিত পরিবর্তনের সব ধাক্কা ও সর্বনাশ প্রশ্নহীনভাবে সামাল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের গরিব জনগণকেই। এই প্রক্রিয়া বদলানো দরকার। সব ঔপনিবেশিক চাপ, করপোরেট-বাণিজ্য, প্রশ্নহীন ক্ষমতা এবং পৃথিবীকে নিয়ে যাচ্ছেতাই গুন্ডামি করার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো জরুরি। জনগণের ঐতিহাসিক গণপ্রতিরোধ বারবার এই সাহস ও সাক্ষ্য দেয়, রুখে দাঁড়ানোর ভেতর দিয়েই এক জনগণতান্ত্রিক পরিবেশ নির্মাণ করা সম্ভব। আমাদের এই দুনিয়া কারও একার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, একে এলোপাতাড়ি ফালি ফালি করা বা দোকানে কেনাবেচা করার কোনো অধিকার কারও নেই। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য সত্যিকার অর্থেই এক জনগণতান্ত্রিক গণপ্রতিরোধ ও জলবায়ু লড়াই জরুরি। এর কোনো বিকল্প নেই। জনগণের জলবায়ু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, জনগণের যাপিত জীবনের ভেতরেই আছে জলবায়ুকে আগলে রাখার প্রতিরোধী ইশতেহার।

ঋণস্বীকার

এ আলোচনাটি কোনোভাবেই সম্ভব হয়ে উঠত না, যদি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষজন নিজেদের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো বিনিময় না করতেন। তাঁদের সবার কাছে এই প্রবন্ধ চিরজীবনের জন্য ঋণী হয়ে রইল। মূল লেখাটির রচনাকাল ২০০৮। পরবর্তী সময়ে এই খসড়াকে কেন্দ্র করে দেশ ও দেশের বাইরে বিভিন্ন আলোচনা ও সেমিনারে বিভিন্ন মাত্রার উপস্থাপন করা হয়েছে। খসড়া লেখাটিকে হালনাগাদ করে একটি নতুন চলমান লেখায় রূপান্তর করা হয়েছে, এমনকি চলতি লেখাটির শিরোনামও পাল্টে গেছে।

তথ্যসূত্র

১. টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের চুনিয়া গ্রামের প্রবীণ জুমিয়া নারী অনিতা মৃ (৭৭), প্রবীণ সাংসারেক মান্দি দার্শনিক জনিক নকরেক (৯৬), যাঁরা বেশ সময় নিয়ে মান্দি (গারো) সমাজে কীভাবে প্রতিবেশ ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের জন্য নকমান্দির উদ্ভব হয়েছিল এই ইতিহাস শুনিয়েছেন ২০০৮ সালের জুলাই মাসে। টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের আদি বাসিন্দা মান্দি আদিবাসীরা এক ঐতিহাসিক সভ্যতা নির্মাণ করলেও বাঙালি রাষ্ট্র, বন বিভাগ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বহিরাগত মুসলমানদের দখল, খ্রিষ্টান মিশনারির চাপ, বহুজাতিক সার-বীজ কোম্পানির বাণিজ্য, রাবার ও আগ্রাসী বাগানসহ নানান বলপ্রয়োগ মান্দিদের সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।

২. Global paleoclimatic data for 6000 Yr B.P., T.Webb,111, ASC11 documentation files of NDP-011, 1985.

৩. ড. দিলীপ কুমার দত্ত, ড. সুব্রত কুমার সাহা এবং কুশল রায়, ‘সহজ পাঠ: জলবায়ু পরিবর্তন’ (প্রথম অংশ: ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণী), অ্যাওসেড, খুলনা, বাংলাদেশ, ২০০৪, পৃ. ২৫।

৪. দেখুন : http://www.epa.gov/climatechange/science/pastee.html

৫. Bridget Allchin, ‘Early Man and Environment in South Asia 10,000 BC-AD 500,’ in Nature and the Orient : the Environmental History of South and Southeast Asia, Edited by Richard H. Grove, Vinita Damodaran and Satpal Sangwan, Delhi: Oxford University Press, 1998, p.47-48.

৬. ড. দিলীপ কুমার দত্ত, ড. সুব্রত কুমার সাহা এবং কুশল রায়, ২০০৪, পৃ. ২-৪।

৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭-২৮।

৮. আশরাফ-উল-আলম টুটু ও মিজানুর রহমান বিজয়, পাল্টে যাওয়া জলবায়ুর উল্টো-পাল্টা খেলা, উপকূলীয় উন্নয়ন সহযোগী (সিডিপি), খুলনা, বাংলাদেশ, ২০০৩, পৃ. ১৯।

৯. Manuel C. Molles Jr., Ecology: Concepts and Applications, NY : McGrawHill, 2002, p. 541.

১০. Roger L. DiSilvestro, ‘There is an Environmental Crisis,’ in The Environmental Crisis: Opposing Viewpoints, edited by Neal Bernards, Opposing viewpoints series, San Diego : Greenhaven press Inc, 1991, p.22-23

১১. Mahfuzul Haque, Climate Change: Issues for the Policy Makers of Bangladesh, Dhaka: EDA, 1996, p. 19.

১২. আশরাফ-উল-আলম টুটু, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে লবণাক্ততায় বিপন্ন দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল, উপকূলীয় উন্নয়ন সহযোগী, খুলনা, বাংলাদেশ, ২০০৪, পৃ.৩৬-৩৭।

১৩. Mahfuzul Haque, 1996, p. 19.

১৪. Narottam Gaan, Environment and National Security: the Case of South Asia, Dhaka: The University press limited, 2000, p.67

১৫. Cunninnham, William P., Cunninggham, Mary Ann and Saigo, Barbara Woodworth. 2003, Environmental science : a global concern (7th edition), McGrawHill, NY, p.42-46

১৬. Gaan, Narottam. 2000, p.4-7.

১৭. চান্দারবিলের বাসুদেবপুর গ্রামের প্রবীণ কৃষক শ্রী কালীপদ মণ্ডলের (৭৫) কাছ থেকে এটি সংগ্রহ করা হয়েছে। বাসুদেবপুর, মুকসুদপুর, গোপালগঞ্জ।

১৮. ‘Indigenous perspectives on climate change needed, Northern researcher says,’ Science Daily, 27 March 2005, source: http://www. sciencedaily.com/releases/2005/03/050325152457.htm

১৯. Ancha Srinivasan, ‘Local Knowledge for Facilitating Adaptation to Climate Change in Asia and the Pacific : Policy Implications,’ IGES-CP working paper (2004-002).

20. Neeraj Vedwan, ‘Culture, Climate and Environment : Local Knowledge and Perception of Climate Change among Apple Growers in Northwestern India,’ Jounal of Ecological Anthropology, vol 10, 2006, p.4-18.

21. Neeraj Vedwan and Robert E. Rhoades, ‘Climate Change in the Western Himalayas of India : a Study of Local Perception and Response,’ Climate Research, Vol 19: 109-117, 2001, source : www.int-res.com

22. Jan Salick and Anja Byg, Indigenous Peoples and Climate Change (eds), Tyndall Centre for Climate Change Research, Oxford, 2007.

23. Emily Kirkland, ‘Indigenous Knowledge and Climate Change Adaptation in the Peruvian Andes,’ 5/11/2012, INTL1450: Political Economy of the Environment in Latin America, 2012.

24. Lars Otto Naess, ‘Adaptation to Climate Change: A Role for Local Knowledge,’ Tyndall Centre for Climate Change Research, Indigenous Peoples and Climate Change Symposium, April 12-13 2007, Environmental Change Institute, Oxford University Centre for the Environment.

25. Patrick P. Kalas and Alan Finlay, ‘Planting the Knowledge Seed-Adapting to Climate Change using ICTs: Concepts, Current Knowledge and Innovative Examples,’ Swiss Agency for Development and Cooperation and Open Research, Building Communication Opportunities (BCO) Alliance.

২৬. আতিউর রহমান, এম আশরাফ আলী, ফারুক চৌধুরী এবং মাহবুব হাসান, জনপ্রতিবেদন ২০০২-২০০৩: বাংলাদেশের পরিবেশ, ঢাকা: উন্নয়ন সমন্বয়, ২০০৫, পৃ. ২৭৩-২৭৯।

২৭. সুকান্ত সেন, দেওয়ান মুহম্মদ আলী ইমরান, এহতেশাম রেজা, মোহাম্মদ জাহিদ হাসান ঢালী এবং সিলভানুস লামিন, জলবায়ু পরিবর্তন: লোকায়ত জ্ঞান ও অভিযোজন, ঢাকা: বারসিক, ২০০৭, পৃ. ১৩-৩০।

২৮. দেওয়ান মুহম্মদ আলী ইমরান, ‘বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের একটি স্বাদ আছে,’ বারসিকের নিয়মিত প্রকাশনা ‘আমাদের পরিবেশ’ নামক পুস্তিকায় জানুয়ারি ২০০৮ সংখ্যায় প্রকাশিত।

২৯. Community based adaptation to climate change bulletin (a summary of the second international workshop on community-based adaptation to climate change), V-135 : N1, 4 March 2007, IISD and IIED.

30. Seith Abeka, et al., Women Farmers Adapting to Climate Change: Four Examples from Three Continents of Women’s Use of Local Knowledge in Climate Change Adaptation, Diakonisches Werk der EKD e.V. for ‘Brot für die Welt’ and Diakonie Katastrophenhilfe Stafflenbergstraße 76 D-70184 Stuttgart Germany, 2012.

৩১. ড. দিলীপ কুমার দত্ত, ড. সুব্রত কুমার সাহা এবং কুশল রায়, ২০০৪, পৃ. ২৩-২৬।

৩২. দীপক কুমার দাঁ, পরিবেশ সংকটে বিপন্ন পাখি, আগরতলা: জ্ঞান বিচিত্রা প্রকাশনী, ১৯৯৯, পৃ. ১০১।

৩৩. ড. আলী নওয়াজ, খনার বচন কৃষি ও বাঙ্গালী সংস্কৃতি, ঢাকা: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ১৯৮৯, পৃ. ১২৮।

৩৪. এই অংশটুকু ?



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top