অজানা বিল গেটস, ইচ্ছে করে ফেল করা, গ্রেপ্তার হওয়া!


প্রকাশিত:
২৬ নভেম্বর ২০২০ ১১:১৭

আপডেট:
২৫ জুলাই ২০২১ ০১:৫৫

বিল গেটস। ছবি : সংগৃহীত

বিল গেটসের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই সৌম্যদর্শন মানুষটির ছবি, বিশ্বের পিছিয়ে পড়া বহু মানুষের কাছে যিনি আজ ঈশ্বরের প্রতিনিধি। সেই বিল গেটস, যিনি ১২০.৭ বিলিয়ন ডলার পকেটে নিয়েও ম্যাকডোনাল্ডের দোকানে লাইন দেন খাবার কেনার জন্য। যিনি মাইক্রোসফটের সঙ্গে পঁয়তাল্লিশ বছরের বন্ধন থেকে স্বেচ্ছা-মুক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন পৃথিবীর শরীর ও মন ভালো করার জন্য। এহেন বিল গেটসের জীবন জুড়ে ছড়িয়ে আছে বিচিত্র স্বাদের নানা কাহিনি। যে কাহিনিগুলিতে জড়িয়ে থাকা বিলের সঙ্গে এখনকার বিল গেটসকে মেলানো যাবে না।

লেকসাইড স্কুলের দুষ্টু বিল

অত্যন্ত মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও দুষ্টুমির জন্য স্কুলে বিশেষ সুনাম ছিল বিলের। সিয়াটলের লেকসাইড স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন ইচ্ছে করেই স্কুলের কিছু বিষয়ের পরীক্ষায় ফেল করতেন বিল গেটস। এ নিয়ে শিক্ষিকারা রাগারাগি করতেন। তাঁরা জানতেন বিল ইচ্ছা করে পরীক্ষা খারাপ দেয়। আসলে যে সব বিষয় বিলের ভালো লাগত না, ইচ্ছে করেই সেই সব বিষয়ের পরীক্ষা খারাপ দিতেন। একবার স্কুল কর্তৃপক্ষ বিল গেটসকে বলেছিল, ইংরেজি ক্লাসের জন্য শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন ছোটো ছোটো গ্রুপে ভাগ করে দিতে। বিল গেটস নিজের গ্রুপে কোনও ছাত্রকে রাখেননি। তিনি ছাড়া সেই গ্রুপে বাকি সবাই ছিলেন ছাত্রী। যাঁদের তিনি পছন্দ করতেন।
মাইক্রোসফটের সহ প্রতিষ্ঠাতা পল অ্যালেন ছিলেন বিল গেটসের সহপাঠী। লেকসাইড স্কুলে তাঁরা কম্পিউটার রুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতেন। কিন্তু তখন কম্পিউটার ব্যবহার করতে গেলে স্থানীয় ‘সি-কিউবড’ কোম্পানিকে টাকা দিতে হত স্কুল মারফত। বিনাপয়সায় কম্পিউটার ব্যবহার করার জন্য ‘সি-কিউবড’ কোম্পানির অ্যাডমিনদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার চেষ্টা শুরু করেছিলেন দুই বন্ধু।

রাতের বেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে ‘সি-কিউবড’ কোম্পানির ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া কাগজপত্র ঘাঁটতেন বিল ও অ্যালেন। দিনের পর দিন এভাবে ডাস্টবিন ঘাঁটতে ঘাঁটতে একদিন তাঁরা ডাস্টবিনে খুঁজে পেয়েছিলেন ‘TOPS-10′ সোর্স কোড। হ্যাক করে নিয়েছিলেন কোম্পানির লোকেদের অ্যাকাউন্ট। বেশ কয়েক মাস পর বিল ও অ্যালেনের কার্যকলাপ ধরে ফেলে কোম্পানি। ততদিনে প্রোগ্রামিং-এ চৌকশ হয়ে উঠেছিলেন বিল ও অ্যালেন।

মাইক্রোসফটের সহ প্রতিষ্ঠাতা পল অ্যালেনের সঙ্গে বিল গেটস।

হার্ভার্ডের খামখেয়ালি বিল

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে বিল গেটস থাকতেন হোস্টেলে। আর ক্লাসে উপস্থিত না হয়ে পছন্দের কোর্স করে বেড়াতেন। এর জন্য বিস্তর সমস্যায় পড়তে হলেও, সমস্ত পরীক্ষাতে ‘এ’ পেতেন। হতবাক হয়ে যেতেন তাঁর শিক্ষকেরাও। হার্ভার্ডে থাকাকালীন, তিরিশ বছর ধরে অমীমাংসিত থাকা অঙ্কের এক জটিল সমস্যার সমাধান করে ফেলেছিলেন কুড়ি বছরের বিল । ‘প্যানকেক সর্টিং’ নামের ধাঁধাটির সমাধান করার পর, অঙ্কের প্রফেসরেরা বিলকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন। তাঁরা বিলের মধ্যে ভবিষ্যতের বেঞ্জামিন পিয়ার্সকে দেখতে পাচ্ছিলেন।

বিল গেটসের সমাধানটি, ১৯৭৫ সালে বিশ্ববিখ্যাত এক ম্যাথস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। এর কিছুদিন পর, আচমকাই হার্ভার্ড ছেড়ে বিল চলে গিয়েছিলেন নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্কে। বন্ধু অ্যালেনকে নিয়ে খুলে ফেলেছিলেন কম্পিউটারের মাইক্রোপ্রসেসরের জন্য কোড তৈরি করার কোম্পানি ‘মাইক্রোসফট’। বিলের শিক্ষক পাপাদিমিত্রউ বলেছিলেন, “অঙ্ক দিয়েই বিশ্বজয় করার ক্ষমতা রাখা বিলের মেধা বিফলে গেল”।


‘মাইক্রোসফট’ তৈরি করে ফেললেন বিল।

আলবুকার্কের বেপরোয়া বিল

আলবুকার্কে থাকাকালীন বিল লাগামছাড়া হয়ে উঠেছিলেন। মাইক্রোসফট অফিসের কাছেই ছিল মরুভূমি। রোজই কোনও না কোনও গাড়ি নিয়ে চলে যেতেন মরুভূমিতে। উদ্দামগতিতে গাড়ি চালাতেন মরুভূমির বুকে। একদিন একটি ‘পোর্সে ৯২৮ সুপারকার’ ভাড়া নিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছিলেন মরুভুমিতে। গাড়ির গতিবেগ তুলে দিয়েছিলেন ঘণ্টায় প্রায় দেড়শো কিমির কাছাকাছি। স্বাভাবিকভাবেই ঘটেছিল দুর্ঘটনা। পোর্সে গাড়িটির তলা কেটে বের করতে হয়েছিল বিল ও তাঁর বন্ধুকে। গাড়িটি সারাতে সময় লেগেছিল এক বছর।

ট্রাফিক আইন ভাঙার জন্য আলবুকার্ক শহরের পুলিশ বিলকে তিনবার গ্রেফতার করেছিল। এর মধ্যে একজন পুলিশই বিলকে ধরেছিলেন দু’বার। এই দুবারই বিল ‘পোর্সে ৯১১’ নিয়ে আলবুকার্ক থেকে সিয়াটল আসছিলেন। একবার রেড সিগন্যাল মানেননি, অন্যবার সঙ্গে ছিল না লাইসেন্স। তবে তিনবারই ধরা দেওয়ার আগে উল্কাগতিতে মাইলের পর মাইল গাড়ি চালিয়ে পুলিশকে নাজেহাল করে ছেড়েছিলেন বিল।


পুলিশের আর্কাইভে থাকা বিল গেটসের ছবি।

বিল গেটস যখন ‘বস’

শুরুর দিকে বিল গেটস মাইক্রোসফটের কর্মীদের গাড়ির নাম্বার মুখস্ত রাখতেন। তাঁর ঘরের জানালা দিয়ে পার্কিং লটের দিকে তাকিয়ে বুঝে যেতেন কোন কর্মী অফিসে আছেন বা নেই। এই ব্যাপারটি কর্মীদের সাংঘাতিক চাপে রাখত। তবে সংস্থা বড় হয়ে যাওয়ার পর অভ্যাসটা বজায় রাখতে পারেননি। ক্ল্যাসিক উইন্ডোজ গেম ‘মাইন সুইপার’-এর পোকা ছিলেন বিল গেটস। তাঁরই সংস্থার তৈরি গেমটি তাঁর কাজের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল। একদিন রেগেমেগে নিজের অফিসের কম্পিউটার থেকে গেমটি আন-ইনস্টল করে দিয়েছিলেন।

অসম্ভব কাজপাগল মানুষ ছিলেন বিল গেটস। একটানা কাজ করে যেতে পারতেন না ঘুমিয়ে। কাজ শেষ করে অফিসের মেঝেতেই ঘুমিয়ে পড়তেন। কোনও এক সোমবার, বিল গেটসের নতুন সেক্রেটারি সকালে অফিসে এসে তাঁর বসকে অফিসের ফ্লোরে অচৈতন্য অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলেন। বিল গেটস অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ভেবে সেক্রেটারি আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন। মহিলার চিৎকারে ঘুম ভেঙে যাওয়া বিল গেটস লজ্জা পেয়ে উঠে পড়েছিলেন ফ্লোর থেকে। জানা গিয়েছিল শুক্রবার রাতের পর একেবারে রবিবার রাতে ঘুমিয়েছিলেন বিল গেটস।

বিল গেটস যখন ‘বস’

আত্মমগ্ন বিল গেটস

বিশ্বের যে প্রান্তেই যান না কেন, প্রতি সফরে একজন কর্মী বিল গেটসের সঙ্গে থাকেন কেবলমাত্র বইয়ের ব্যাগ বওয়ার জন্য। বিমানে, গাড়িতে, মিটিংয়ের ফাঁকে বইই বিলের একমাত্র সঙ্গী। বছরে প্রায় ৭০-৮০ টি বই পড়েন বিল, সফরের একঘেয়েমি দূর করার জন্য। জটিল বইগুলির মধ্যে থাকে কোয়ান্টাম মেকানিকস ও অ্যালগোরিদমের বইও। বিল বলেন,” নতুন জিনিস জানার ও নিজের বোঝার ক্ষমতা যাচাই করার সেরা উপায় হচ্ছে বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকা”।

কৈশোরে বিলের প্রিয় বইয়ের নাম ছিল ‘ওয়ার্ল্ড বুক এনসাইক্লোপিডিয়া’। স্কুলজীবনেই শেষ করে ফেলেছিলেন সব কটি খণ্ড । বইপাগল বিল গেটসের সংগ্রহে আছে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির বিজ্ঞান বিষয়ক লেখার একমাত্র সংকলন ‘কোডেক্স লেস্টার’। দুষ্প্রাপ্য এই পাণ্ডুলিপিটি তিনি ১৯৯৪ সালে নিলামের মাধ্যমে কিনেছিলেন ২২৬ কোটি টাকা দিয়ে।

শুধুমাত্র চিন্তা করার জন্য বিল গেটস প্রত্যেক বছর এক সপ্তাহ ছুটি নেন। প্রচুর বই, খাতা ও কলম নিয়ে একটি ছোটো ঘরে স্বেচ্ছাবন্দি করে রাখেন নিজেকে। জীবনের গতিকে স্বেচ্ছায় মন্থর করে দিয়ে, এই এক সপ্তাহ ধরে পৃথিবীর নানা সমস্যার সমাধান বের করার চেষ্টা করেন।


বইপোকা বিল গেটস

”বিশ্বের যেকোনও ভালো কাজে আমি আছি”–বিল গেটস

বিল গেটস নিজের তিন সন্তানের জন্য জমা রেখেছেন মাত্র দুশো পঁচিশ কোটি টাকা। তাঁর কথায় সন্তানদের জন্য বিশাল টাকা রেখে যাওয়াটা তাদের প্রতি সুবিচার করা নয়। অথচ এই বিল গেটস, পৃথিবীর গরীব দেশগুলোর উন্নয়নে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দান করেছেন দু লক্ষ পঁয়ষট্টি হাজার কোটি টাকা।

আফ্রিকার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে একবার কিছু স্বেচ্ছাসেবী গিয়েছিলেন বিল গেটসের কাছ থেকে দান পাওয়ার আশায়। সব শোনার পর, ব্ল্যাঙ্ক চেক সামনে রেখে টাকার অঙ্ক বসিয়ে নিতে বলেছিলেন বিল গেটস। ভয়ে ভয়ে চেকে টাকার অঙ্ক বসিয়েছিলেন স্বেচ্ছাসেবীরা। চেকটি কিছুক্ষণ ধরে দেখে বিল গেটস বলেছিলেন, “সংখ্যাটি পাল্টাতে হবে”। স্বেচ্ছাসেবীরা ভেবেছিলেন চেকটিতে তাঁরা বেশি টাকা লিখে ফেলেছেন। বিল গেটস বলেছিলেন, “দাঁড়ান আমি করে দিচ্ছি”। এর পর চেকে লেখা সংখ্যাগুলির ডানদিকে আরও দুটি শূন্য বসিয়ে দিয়েছিলেন।

আফ্রিকার মানুষের পাশে বিল গেটস।

তাঁর থেকেও ধনী আছেন একজন, না তিনি জেফ বেজোস নন

একবার বিল গেটস তখন পৃথিবীর ধনীদের তালিকায় একনম্বরে, তাঁকে এক ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা জিজ্ঞেস করেছিলেন তাঁর চেয়েও ধনী কেউ আছেন কিনা! প্রশ্নের উত্তরে তিনি একটি কাহিনি বলেছিলেন।

নিউইয়র্ক বিমানবন্দর দিয়ে একবার কোথাও যাচ্ছিলেন বিল গেটস। তিনি তখনও ধনী হননি। বিমানবন্দরের বাইরে থাকা এক কাগজ বিক্রেতার কাছ থেকে কাগজ নিয়ে কাগজটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সঙ্গে খুচরো না থাকায়। কাগজ বিক্রেতাটি বিল গেটসকে বিনামূল্যে কাগজটি দিয়ে বলেছিলেন, তোমায় পয়সা দিতে হবে না। কয়েকমাস পরেই আবার ঘটেছিল একই ঘটনা। সেদিনও বিক্রেতা কাগজটি বিল গেটসকে বিনামূল্যে দিয়ে বলেছিলেন, আমি আমার লাভের পয়সা থেকে কাগজটা তোমায় দিচ্ছি তুমি নাও।

উনিশ বছর পর বিলগেটসের মনে পড়েছিল কাগজ বিক্রেতার কথা। দেড় মাসের চেষ্টায় খুঁজে বের করেছিলেন কাগজ বিক্রেতাকে। জিজ্ঞেস করেছিলেন,

-তুমি আমায় চেনো?

-হ্যাঁ তুমি বিল গেটস।

-তোমার কি মনে আছে আমি তোমার থেকে একবার বিনা পয়সায় কাগজ নিয়েছিলাম।

– হ্যাঁ, আমি তোমাকে দুবার বিনা পয়সায় কাগজ দিয়েছিলাম।
বিল গেটস এরপর কাগজ বিক্রেতাকে বলেছিলেন, তোমার যা দরকার আমায় বলো। আমি তোমায় সাহায্য করতে চাই। কাগজ বিক্রেতা হেসে বলেছিলেন, সে দিনের সাহায্যের মূল্য তুমি কীভাবে মেটাবে! তখন আমি গরিব ছিলাম তুমিও গরিব ছিলে। আজ তুমি বড়লোক, তাই সাহায্য করতে চাইছ। কিন্তু এখন তোমার সাহায্যের আমার আর দরকার নেই।

চোখে জল এসে গিয়েছিল বিলের। অনুভব করেছিলেন, কাউকে সাহায্য করার জন্য বড়লোক হওয়ার দরকার নেই। দরকার বড় একটি হৃদয়। জীবনের সেরা শিক্ষাটি নিয়ে ফিরে এসেছিলেন ধনকুবের বিল গেটস, তাঁর থেকেও ধনী কাগজ বিক্রেতার কাছ থেকে।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top