অন্যরকম যুদ্ধের সেনাপতি অ্যাসাঞ্জ


প্রকাশিত:
১৬ নভেম্বর ২০২০ ১৩:৫২

আপডেট:
৪ মার্চ ২০২১ ০৬:৩৮

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। ছবি : সংগৃহীত

ইতিহাস হয়তো উল্টো পথে হেঁটে আবারও বর্বর যুগে প্রবেশ করতো যদি জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মতো কোনো যোদ্ধার আবির্ভাব না হতো। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। গতবছর ইকুয়েডর তাড়িয়ে দিতে পারে অ্যাসাঞ্জকে, চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না অ্যাসাঞ্জ, মৃত্যু শয্যায় অ্যাসাঞ্জ এই খবরগুলো বেশ জোর প্রচার হলেও অ্যাসাঞ্জ পিছিয়ে নেই। তিনি তার কাজ করে চলছেন নিজের নিয়মে। কারণ কালের অন্ধকারতম সময়েও সত্য এগিয়ে যায় নিজের আলোয়।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ

কে এই জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ
জুলিয়ান পল অ্যাসাঞ্জ বিশ্বজুড়ে সবার নজর কেড়েছেন উইকিলিকস নামের ওয়েবসাইটটির মাধ্যমে। তবে প্রকৃতপক্ষে তিনি অস্ট্রেলিয়ার একজন বিখ্যাত সাংবাদিক, প্রকাশক ও ইন্টারনেট কর্মী। এই কম্পিউটার জিনিয়াস তার ঈর্ষণীয় বুদ্ধিমত্তা (IQ) ব্যবহার করেছেন বিশ্বের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইট হ্যাক করতে।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ

১৯৭১ সালে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের টাউন্সভিলে জন্মানো সাদা চুলের খুব সাধারণ এই মানুষটি সারা দুনিয়ার মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দুতে। কারণ তিনি বিশ্বের একক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শুরু করেছেন ‘প্রথম সাইবার যুদ্ধ’। এ যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে কোনো দেশ কিংবা দেশের সরকারের বিরুদ্ধে নয়। নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধি, একবিংশ শতাব্দীর রবিন হুড হলেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ।

প্রথম জীবন
তার শৈশব আর দশটা সাধারণ শিশুর মতো ছিল না। মা ও সৎ বাবা ব্রিট অ্যাসাঞ্জ এক ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার গ্রুপ চালাতেন। তাদের কোনো বাড়ি ছিল না তাই শৈশব থেকেই যাযাবরের মতো জীবন তার। সৎ বাবা ব্রিট অ্যাসাঞ্জের সাথে বিচ্ছেদের পর ১৯৭৯ সালে তার মা তৃতীয়বার বিয়ে করেন। ১৯৮২ সালে ৩য় বারের মতো বিচ্ছেদ ঘটলে দুই সন্তান সঙ্গে নিয়ে পালান মা ক্রিস্টিন ক্লেয়ার। জুলিয়ানের বয়স তখন ১১, ছোট ভাইটিকে কেড়ে নেওয়ার জন্য তাদের পিছু নেন সৎ বাবা। যার কারণে দীর্ঘ ৫টি বছর পালিয়ে বেড়াতে হয়। এই পাঁচ বছরে ৩৭ বার জায়গা পরিবর্তন করতে হয়েছে তাদের।

কম্পিউটারের প্রতি ছিল অসীম আগ্রহ জুলিয়ানের। খুব দ্রুত তিনি কম্পিউটারে দক্ষ হয়ে উঠেন। তবে তার বিশেষ দক্ষতা ছিল কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড ভেঙে লুকানো তথ্য উদ্ধার করায়। ইন্টারনেট তখনো এতটা প্রচলিত হয়নি। ফোনের লাইনে চুরি করে কথা বলার মতো কাজও করতেন জুলিয়ান। তবে ধীরে ধীরে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষ হয়ে উঠলে শুরু হয় তার হ্যাকার জীবন। ১৯৮৭ সালে তিনি হ্যাকিং শুরু করেন মেনডেক্স (mendax) নামে। হ্যাকিংয়ে এতটাই দক্ষ ছিলেন যে, সবচেয়ে সুরক্ষিত কম্পিউটার নেটওয়ার্কেও ঢুকে পড়তে পারতেন এক নিমেষে।

এ সময় অন্য দুজন হ্যাকার বন্ধুর সাথে ‘ইন্টারন্যাশনাল সাবভারসিভস’ নামে একটি হ্যাকার গ্রুপ তৈরি করেন। তাদের কাজ ছিল, সিস্টেমের কোনো ক্ষতি না করে গোপন তথ্য সংগ্রহ করা। তারা পেন্টাগন, ইউএস এর অন্যান্য প্রতিরক্ষা দপ্তর, মিলনেট, ইউএস নেভি, নাসার মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষিত কম্পিউটার নেটওয়ার্কও হ্যাক করেন। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর ধরা পড়লে কয়েক হাজার ডলার জরিমানা দিয়ে তার হ্যাকিং জীবনের সমাপ্তি ঘটে। এরপর বিনা খরচে সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য সফটওয়্যার তৈরির কাজ শুরু করেন।

উইকিলিকস
ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র ভেঙ্গে দেওয়ার প্রধান উপায় হচ্ছে তাদের গোপনীয়তা ধ্বংস করা। এ রকম ভাবনা থেকেই ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নে পড়াকালীন ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে শুরু করেন উইকিলিকস নামের ওয়েবসাইটটি। উইকিপিডিয়ার আদলে তৈরি এই ওয়েবসাইটটির কাজ সাধারণ জনজীবনের সাথে সম্পর্কযুক্ত গোপন নথিপত্র বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করা।

উইকিলিকসের ওয়েবসাইটে লেখা এটি একটি অলাভজনক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের এর প্রধান সম্পাদক। অ্যাসাঞ্জ ছাড়াও আছেন আরো পাঁচজন নিয়মিত ও প্রায় আটশত অনিয়মিত কর্মী। উইকিলিকসের অফিসের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই, কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সবাইকে বাধ্য হয়ে গুপ্ত জীবনযাপন করতে হয়।

গ্রেফতার, কারাবাস, যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর চেষ্টা, বিচার এসব পরিস্থিতির কারণে আমার বিশ্বাস ও আদর্শে কোনো পরিবর্তন হবে না। বরং এসব ঘটনার কারণে আমার আদর্শগুলো যে সত্য ও সঠিক তা প্রমাণিত হয়েছে।-জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রথম আঘাত ছিল ২০০৭ সালে বাগদাদে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের ককপিট বেসামরিক লোকদের হত্যার দৃশ্যটি। ৩৮ মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করে উইকিলিকস এই ঘটনার প্রমাণ হিসেবে। এছাড়া তৎকালীন আফগানিস্তান যুদ্ধের নব্বই হাজার গোপন দলিল প্রকাশ করে হইচই ফেলে দেন অ্যাসাঞ্জ। কিন্তু কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন অনেক। বিশ্বখ্যাত ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের নিউ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড এর মধ্যে অন্যতম।

উইকিলিকস বাংলাদেশ
উইকিলিকস বাংলাদেশ বিষয়ক ৩৮,০০২টি খবর প্রকাশ করেছে এ পর্যন্ত। এর মধ্যে আছে বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে ‘সরকারি ডেথ স্কোয়াড’ হিসেবে নিন্দিত র‌্যাবকে যুক্তরাজ্য সরকারের উদ্যোগে প্রশিক্ষণ দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত এই বাহিনীর কাজ কর্মে সন্তুষ্ট হয়ে তার বিলুপ্তিতে বিরোধিতা করে। এছাড়া র‌্যাব সদস্যরা ব্যাপকভাবে মানবাধিকার ছাড়াও অপহরণ, চাঁদাবাজি ও ক্রসফায়ারে হত্যা করার জন্য মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণের সঙ্গে জড়িত বলেও উইকিলিকস প্রকাশ করে।

বিভিন্ন দেশের গোমর ফাঁস করলেও অ্যাসাঞ্জ নিজেও আছেন মারাত্মক ঝুঁকিতে। বিভিন্ন সময় তাকে ফাঁসানোর জন্য নানান ফাঁদ পাতা হয়েছে। যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধেও অভিযুক্ত হয়ে জেল খাটতে হয়েছে তাকে। ইকুয়েডরে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে থাকলেও বারবার ইকুয়েডর থেকে বের করে দেয়ার হুঁশিয়ারি জানানো হয়েছে তাকে।

এডওয়ার্ড স্নোডেন

এতকিছুর পরও অ্যাসাঞ্জের অকুতোভয়। আর সবচেয়ে মজার বিষয়টি হচ্ছে এত লক্ষ লক্ষ ফাঁশ হওয়া দলিলগুলোর সত্যতা নিয়ে কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠান প্রশ্ন তুলছে না। তাদের একটাই অভিযোগ। আর সেটা হচ্ছে গোপনীয়তা। সরকারের এই প্রশ্নের আরেক মোক্ষম জবাব দিয়েছেন এডওয়ার্ড স্নোডেন ২০১৩ সালে সাধারণ মানুষের জীবনে আড়িপাতা নিয়ে ইউএস সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো ফাঁস করে দিয়ে।

অ্যাসাঞ্জ যখন সরকারের কুকর্ম ফাঁস করে বিতর্কিত গোপনীয়তার প্রশ্নে, তখন স্নোডেন দেখিয়েছেন সরকার কীভাবে সাধারণ মানুষের গোপনীয়তা হরণ করছে। এখন প্রশ্ন একটাই, গোপনীয়তা কি তবে শুধু ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর অধিকার?




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top