অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে দুশো বছর বিশ্বের অন্যতম নৃশংস সিরিয়াল কিলার


প্রকাশিত:
২৮ ডিসেম্বর ২০২০ ২২:৪৫

আপডেট:
৪ মার্চ ২০২১ ০৫:৫০

সংরক্ষিত আলভেজের মাথা

সিরিয়াল কিলারের প্রসঙ্গ উঠলে অনেকে আজও ‘জ্যাক দা রিপার’এর নাম করেন। কিন্তু ‘লেদার এপ্রন’ বা ‘জ্যাক দা রিপার’ পৃথিবীর প্রথম সিরিয়াল কিলার নয়। একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন মেনে অকারণে একের পর এক খুন করে যাওয়ার এই নৃশংস ধরন, তাহলে প্রথম কার মস্তিষ্কপ্রসূত? তর্কের অবকাশ থাকলেও পর্তুগালের সিরিয়াল কিলার দিয়েগো আলভেজকেই পৃথিবীর সেই প্রথম নৃশংসতম খুনি বলে মনে করা হয়। কে এই দিয়েগো আলভেজ? সেটা জানতে গেলে অবশ্য আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আজ থেকে প্রায় দু’শো বছর।

আজ থেকে দুশো বছর আগে বর্তমান স্পেনের গ্যালিসিয়াতে জন্মগ্রহণ করেন দিয়েগো আলভেজ। গ্যালিসিয়া তখন প্রাচীন পর্তুগালের অংশ। খুব ছোট থেকেই স্বাভাবিক জীবনের মোহ ছেড়েছিলেন আলভেস। অল্পবয়সেই গ্যালিসিয়া ছেড়ে লিসবনে পাড়ি জমান কাজের খোঁজে। সেখানকার ধনী অভিজাতদের বাড়িতে প্রথম জীবনে ছোকরা চাকরের কাজ করতেন দিয়েগো। ফাইফরমাশ খাটতেন। কিন্তু যৎসামান্য মাইনের দাসবৃত্তিতে কী হয়? আলভেজের স্বপ্ন ছিল বিখ্যাত হওয়া, অনেক টাকার মালিক হওয়া। আর সুখ্যাতির চেয়ে কুখ্যাতি অর্জন করা যে তুলনায় সহজ, সেটা সেই অল্পবয়সেই বুঝে ফেলেছিলেন আলভেজ। অবশ্য শুধুই বেশি আয়ের জন্য তিনি অপরাধের পথ বেছে নিয়েছিলেন কী না, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে।পর্তুগালের অর্থবান, ধনী সম্প্রদায় নয়, বরং নিরীহ গরীবগুর্বো চাষিরাই তাঁর প্রথমদিককার শিকার ছিল। সেসব দেখে মনে হয়, অর্থ উপার্জনের চেয়ে মানুষ খুন করার নৃশংস আনন্দই তাকে পেয়ে বসেছিল অনেক বেশি। যাই হোক,মানুষ খুনে দিয়াগোর হাতেখড়ি হয় ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২৬ বছর বয়সে।

একটা নির্জন সেতুর পাশে ঘুপচি অন্ধকারে ওৎ পেতে থাকত আলভেজ। সে জানতো বেচাকেনা সেরে ও পথেই বাড়ি ফেরে চাষিরা। একা ও পথে কেউ রাতের দিকে গেলে তার আর নিস্তার ছিল না। আলভেজের খপ্পরে পড়া মানুষেরা জীবিত ফেরত আসেনি কেউ। সঙ্গের যাবতীয় টাকাপয়সা লুঠ করে, তারপর সেই মানুষটিকে পাশবিকভাবে যন্ত্রণা দিয়ে খুন করা, এতেই ছিল দিয়েগো আলভেজের আনন্দ। খুন করার পর সেই ক্ষতবিক্ষত হতভাগ্য মৃতদেহটাকে সে টানতে টানতে নিয়ে যেত ২১৩ ফুট উঁচু একটা সেতুর উপর। ঐ উচ্চতা থেকে নীচের নদীতে ছুঁড়ে ফেলত সেই হতভাগ্য চাষির দেহ।

একটা দুটো না, এইভাবে মাত্র তিন বছরে প্রায় ৭০ জন নিরপরাধ’কে পাশবিকভাবে হত্যা করে আলভেজ। মেরে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়ায় প্রাথমিকভাবে এটা খুন, না আত্মহত্যা, তা নিয়ে ধন্দে পড়ে যেত পুলিশ। ওই সেতুর এত কুখ্যাতি হয়েছিল সেসময়, যে বেশ কিছুদিনের জন্য সরকারিভাবে ওই ব্রীজে মানুষ চলাচল নিষিদ্ধ করাও হয়। কিন্তু একের পর এক এই রহস্যজনক মৃত্যুর কিনারা হচ্ছিল না। শুধুমাত্র পাশব প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য কেউ একই পদ্ধতিতে একের পর এক ৭০জনকে খুন করতে পারে, এ কথা তখনও বিশ্বাস করা অসম্ভব ছিল। কৃষক মৃত্যুর তদন্ত চালিয়ে যেতে না পারায়, পুলিশও ঘটনাগুলোকে আত্মহত্যা বলেই তখনকার মতো ধামাচাপা দেয়।

এই সেই সেতু
একের পর এক মানুষ খুন করেও আলভেজের পাশববৃত্তি কমেনি। সাহসও বাড়তে থাকে। এরপর সে একটা ডাকাতদল গড়ে তোলে, এবং নানাদিকে লুঠতরাজ শুরু করে। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে একের পর এক নারকীয় অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছিল আলফেজ। কিন্তু কথায় বলে না, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। এক্ষেত্রেও হল তাই। এক ডাক্তারের বাকি ডাকাতি করতে গিয়ে সেই বাড়ির চারজনকে খুন করার চেষ্টা চালায় সে। কিন্তু এবার আর পুলিশের জাল কেটে পালাতে পারেনি এই হাড়-কাঁপানো খুনি। আইনের হাতে শেষমেশ ধরা পড়ে যায় বিশ্বের কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার দিয়েগো আলভেজ। তাকে জেরা করে বেরিয়ে আসে অনেক অন্ধকার সত্যি। পুলিশের সামনে একের পর এক চাষিদের খুন করার কথাও স্বীকার করে সে। এতগুলো মানুষকে নৃশংসভাবে খুন করার অপরাধে ১৮৪১সালে দিয়েগো আলভেজকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে পর্তুগাল আদালত৷ কিন্তু আলভেজের গল্প এখানেই শেষ নয়। আজও এই পৃথিবীর আলো-অন্ধকারের দিকে হিংস্র নিস্পলক চোখ মেলে তাকিয়ে আছে এই প্রাচীনতম সিরিয়াল কিলার।
একজন সাধারণ মানুষের স্বভাবে কীভাবে ছায়া ফেলে পাশব প্রবৃত্তি? সামাজিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বড় হয়েও কেউ একজন কীভাবে প্রায় নরখাদকের মতো একের পর এক অকারণ হত্যালীলায় মেতে ওঠে? কী সেই পার্থক্য, যা মানুষ থেকে নরপশুতে রূপান্তরিত করে কাউকে, সিরিয়াল কিলিংয়ের মতো ভয়াবহ হিংস্র প্রবৃত্তির দাস করে তোলে? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মরিয়া বিজ্ঞানীদের একসময় মনে হয়েছিল মানব-মনের সমস্ত রহস্যই হয়তো লুকিয়ে আছে মানুষের খুলির মধ্যে। ক্রিমিনালদের খুলির গঠন নিশ্চয়ই আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা! তা না হলে তাদের আচরণে এমন অস্বাভাবিক ব্যাপারস্যাপার থাকবে কেন? এই জিজ্ঞাসা থেকেই জন্ম ‘ফ্রেনোলজি’র।

খুলির আকার দিয়ে একজন মানুষের মানসিক তথা চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যগুলো খুঁজে পাওয়ার পদ্ধতির নামই ‘ফ্রেনোলজি’… দিয়েগো আলভেজকে যখন শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা ঘোষিত হল, সেসময় এই ফ্রেনোলজি নিয়ে রীতিমতো চর্চা চলছে নানা দেশে। আলভেজের মতো এমন নিরুত্তাপ ঠান্ডামাথার খুনির মস্তিষ্কের গঠন সম্পর্কে যে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ থাকবে, তাতে আর আশ্চর্য কী! এই সিরিয়াল কিলারের অন্তর্গত অপরাধপ্রবণতার কারণ অনুসন্ধান করতে তৎপর হয়ে ওঠেন বিজ্ঞানীরা। তাই ১৮৪১ সালে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর আলভেজের নিষ্প্রাণ দেহ থেকে তার মুণ্ডটি আলাদা করে সরিয়ে রাখা হয়। কাচের জারে ফর্ম্যালিনের দ্রবণে ডুবিয়ে তাকে সংরক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হয়। পরিক্ষানিরীক্ষাও কম চলেনি এই অপরাধীর মনস্তত্ত্ব নিয়ে। যদিও সেসব গবেষণাই দিনের শেষে ব্যর্থ, চরিত্রের ভিতর লুকিয়ে থাকা সেই আদিম শয়তানের খোঁজ মেলেনি সেদিনও। সেদিক থেকে ভাবলে সে আজও অধরা।

১৮৪১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ১৮০ বছর ধরে পর্তুগাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে কাচের জারে সংরক্ষিত রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সাংঘাতিক সিরিয়াল কিলার দিয়েগো আলভেজের মাথা। এই দুশো বছর কাচের আড়াল থেকে আশ্চর্য নিস্পৃহ চোখে সে তাকিয়ে আছে এই অঘটনপটিয়সী পৃথিবীর দিকে। দুটি শতাব্দির সমস্ত রক্তপাতের, হত্যালীলার, পাশব নারকীয়তার নীরব সাক্ষী সে।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top