রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর

রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যায় অশনিসংকেত


প্রকাশিত:
১২ অক্টোবর ২০২১ ১৪:১৭

আপডেট:
২৬ অক্টোবর ২০২১ ০২:০৩

সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহকে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। চল্লিশোর্ধ্ব এ রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মুহিবুল্লাহ নামে পরিচিত ছিলেন। ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি পিস ফর হিউম্যান রাইটস’ নামে একটি সংগঠনের চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহ ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে আলোচনায় আসেন। জেনিভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থায়ও রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি। পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমে তিনি ‘রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। মুহিবুল্লাহর পরিবারের সন্দেহ তার হত্যার সঙ্গে জড়িত ‘আরাকান রিপাবলিকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা)’। 

এ পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মুহিবুল্লাহকে হত্যার জন্য বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। তার মানে হচ্ছে, মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্ব সংঘাত এবার বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। মুহিবুল্লাহর এ হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে রোহিঙ্গাদের আরও শীর্ষ নেতা বাংলাদেশে ঘাপটি মেরে রয়েছে। তাদের কেউ কেউ যথেষ্ট শক্তিশালী। কেননা, অন্য একটি দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়ার পরও তারা প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতের নেতাদের নির্মূল করতে সশস্ত্র হামলা চালানোর ব্যাপারে আশ্রয় নেওয়া দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভয়ে ভীত নয়। 

এই যে নেতাগিরি, এর ভিত্তি কী! আমরা যদি একাত্তরে ফিরে যাই তাহলে দেখবো, শরণার্থী জীবনে আমাদেরও নেতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তো মাথার ওপর ছিলেনই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আমাদের দিকভ্রান্ত জাতিকে সামাল দিয়েছিলেন জাতীয় চার নেতা। তাঁরা শরণার্থী ক্যাম্পে গিয়ে নেতা হননি। তাঁদের জীবনই ছিল রাজনীতি। ধারাবাহিক সংগ্রামে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বোনা হয়ে গিয়েছিল ১৯৫২ সালে। রোহিঙ্গাদের কি তেমন কোনও ইতিহাস, তেমন কোনও নেতা আছেন? এ পর্যন্ত আমরা কি তার কোন সন্ধান পেয়েছি? তাহলে প্রশ্ন রেখেই এগোতে হয়, এখন যারা রোহিঙ্গাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের মূল উদ্দেশ্যটা কী? তারা কি মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান? স্বাধীন আরাকান চান? স্বাধীন আরাকানই যদি চান, তাহলে যে দেশটি বিপদে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিল সেখানে বসেই তারা কেন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন? কেন আশ্রয় দেওয়া দেশটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছেন? 

২০১৭ সালের অগাস্টে রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশ সীমান্তে নামে রোহিঙ্গাদের ঢল। সব মিলিয়ে এখন ১১ লাখের মতো রোহিঙ্গা রয়েছে বাংলাদেশে। তখন একটি বড় অংশ ধর্মের দোহাই দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে সোশাল মিডিয়ায় টানা ক্যাম্পেইন চালিয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে হাহাকার আর রোহিঙ্গা নারীদের দরকার পড়লে বিয়ে করার ঘোষণার মধ্য দিয়ে তথাকথিত ‘জিহাদ’ এ শরীকের কথাও কেউ কেউ সদম্ভে বলেছিলেন।  

তবে তখন কেউ ঘূণাক্ষরেও ভাবেননি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন কীভাবে হবে। এমনকি এ ধরনের পরিস্থিতিতে সমাধানে কী পদক্ষেপ নিতে হবে, সে ব্যাপারে আমাদের পররাষ্ট্রনীতিরও সঠিক দিক-নির্দেশনা ছিল না। নেই এখনো সুদূরপ্রসারী কোনও ‘রোডম্যাপ’। প্রাথমিকভাবে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের কিছু অংশকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হলেও, রোহিঙ্গা নেতারাই এর বিরোধিতা করছেন। রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ আবার ভাসানচরের তাবৎ সুযোগসুবিধা ছেড়ে পালিয়েও আসছেন। অদ্ভুত!

অং সাং সুচির ক্ষমতাগ্রহণের আগে মিয়ানমারের সামরিক সরকার নোবেল জয়ী এ প্রধান নেতাকে ঘরে বন্দি রেখে মৃত্যুর সময় তাঁর স্বামীর সাথে দেখা করতে দেয়নি। এখন আবার তাঁকে এমন এক ঘরে রেখেছে, যেখানে টয়লেট আর বিছানা পাশাপাশি। কাজেই রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমারের ক্ষমতাদখলকারী সরকারের কাছ থেকে কোনও কূটনৈতিক শিষ্টাচার আমা করাটা অবান্তর। 

আবার দেখুন মানবতার বার্তা নিয়ে যে অং সান সুচি শান্তিতে নোবেল পেলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর গণহত্যার প্রচ্ছন্ন সাফাই গেয়েছেন নানা কূটনৈতিক কথা বলে।  

মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে মোকাবেলার জন্য দরকার বুদ্ধি, কূটনীতি আর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। আমি ঠিক জানিনা বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর কী পদক্ষেপ নিয়েছে। বরং বরাবরই দেখছি সরকারী দল ও বুদ্ধিজীবীদের একাংশ দায়ী করছেন যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ নানা শক্তিকে। এই আমাদের আর এক রোগ। জঙ্গি ধরা পড়লে বলি এক দেশের উস্কানি,  চোর ধরা পড়লে বলি আরেক দেশের নাম। ছেলেবেলা থেকে পাশের দেশ, দূরের দেশ, আমেরিকা-রাশিয়া-চীন এদের দোষ দিতে দেখে বড় হওয়া আমরা জেনেছি এটা হলো দুর্বলের কাজ। 

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আমার মনে হয়, রাজনৈতিক সিদ্বান্তের জায়গায় আমরা ভুল অবস্থানে ছিলাম। এর কুফল ভোগ করতে হবে দীর্ঘকাল। বাড়ি চট্টগ্রামে হওয়াতে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জানি কক্সবাজার থেকে টেকনাফ, বিশেষ করে গহীন অরণ্যের এলাকাগুলো দীর্ঘকাল থেকেই সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য ছিল। সেখানে জঙ্গি ট্রেনিং-অস্ত্র-মাদক চোরাচালানের কথা সবাই জানেন। টেকনাফের অবস্থা এমনই, নেতার নাম পর্যন্ত হয়ে গেছে মাদকের নামে। তাহলে কি করে ভাববো যে সে এলাকায় বসবাসরত আশ্রয়হীন, কম লেখাপড়া জানা একদল শরণার্থী, যারা নতুন জীবনের জন্য মরীয়া- তারা খুব বেশিদিন সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে থাকবেন? 

দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কোটি কোটি টাকার খোয়াবে মশগুল সমাজের গডফাদারেরা এদের ওপর ভর করবে এটাই স্বাভাবিক। এবার চট্টগ্রাম গিয়ে শুনি সেখানকার মাদক ও নেশার জগত এখন রোহিঙ্গাদের দখলে। দখলে বলতে, সাপ্লাই আসার পর বিতরণ করে বিক্রি করানো হয় রোহিঙ্গা তরুণদের দিয়ে। সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেন অসহায় ও একরোখা এদের তরুণ-তরুণীদের টাকা দিয়ে বশ করা সহজ। আরো একটি কথা সবাই বলেন, এরা নাকি খুব ‘অপরাধপ্রবণ’। এর প্রমাণ অবশ্য আমি সিডনিতেই দেখেছি। এখানে ও কিছু শরণার্থী নামের উদ্বাস্তু বাংলাদেশ দূতাবাসের কোন কোন কর্মচারীর সহায়তায় জাল পাসপোর্ট বাংলাদেশি পরিচয় নিয়ে ঢুকে পড়েছেন। সাথে শরণার্থী হিসেবে আসা রোহিঙ্গারাও আছেন। আমি নিজের চোখে সিডনিতে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রকাশ্যে-রাস্তায় এদেশের নিয়ম ভেঙে মারামারি করতে দেখেছি। পুলিশের তৎপরতা আর চটজলদি ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে ঘটনা সেদিন বেশিদূর আগায়নি।

মিয়ানমারের অবহেলিত পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। জাতিগতভাবে তাদেরকে মূলধারায় কখনো ঢুকতে দেয়নি মিয়ানমার সরকার। নাগরিক হিসেবে দেয়নি স্বীকৃতি। কাজেই তাদের  মধ্যে অপরাধপ্রবণতা থাকবে সেটিই স্বাভাবিক। যারা আবেগ নিয়ে একসময় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য নানা ধরনের লম্ফঝম্প করছিলেন, তাদের আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারা। তারাই এখন এদের বিদায় না করতে পেরে সরকারকে দুষছে। 

কিন্তু পানি তো গড়িয়ে গেছে অনেক দূর। বলও চলে গেছে কোর্টের বাইরে। রোহিঙ্গাদের হাতে স্থানীয় বাঙালিদের মার খাওয়ার খবরও সংবাদ মাধ্যমে দেখেছি। এখন এটা মানতেই হবে এদের ফিরিয়ে দিতে যত দেরি হবে ততই বাড়বে মাদক, নেশা আর মারামারি। 

নেশা, সন্ত্রাস আর দাঙ্গার অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে এলাকা। দুর্ভাবনা এটাই মুহিবুল্লাহকে হত্যার পরও কি আমরা আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে পারবো রোহিঙ্গাদের নিজভূমে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য? আমরা কি পারবো এমন কোনও চাল দিতে, যাতে মিয়ানমার সরকার কূটনৈতিকভাবে দারুণ পর্যুদস্ত হয়? যদি না পারি, তাহলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির কেবল শুরুর ইঙ্গিত দিল মুহিবুল্লাহর হত্যা। আবেগ সরিয়ে মগজ খাঁটিয়ে এ সমস্যা সমাধান করতে হবে। আর এজন্য দক্ষিণ ও দক্ষিণ-এশিয়ার মানচিত্র ২০ বছর পর কী হতে পারে, তা দূরদৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টিতে দেখতে হবে আমাদের কূটনীতিবিদদের।

সিডনি থেকে



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top