ফারো আইল্যান্ড

ভাষার জন্য অবিরাম সংগ্রাম


প্রকাশিত:
২৫ এপ্রিল ২০২১ ১৩:০৪

আপডেট:
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১০:০৮

বলছিলাম ফারো আইল্যান্ডের ‘ফারো’ ভাষার কথা।
আটলান্টিক মহাসাগরের স্কটল্যান্ড, আইসল্যান্ড আর নরওয়ের মাঝে ১৮টি অভিক্ষিপ্ত সবুজ আগ্নেয়গিরিময় আইল্যান্ড নিয়ে গঠিত এই আইল্যান্ড।
৫০,০০০ হাজার জনসংখ্যা আর কেলটিক-ভাইকিং ঐতিহ্য সাথে নিয়ে ড্যানিশ উপনিবেশের অধীনে আজও তারা অর্ধ-স্বশাসিত।
ডেনমার্ক আর নরওয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের শাসন করে আসছে। স্বায়ত্ত শাসনের জন্য ফারোরা দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করে আসছে। আর এটি ফলপ্রসূ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে।
নাৎসিরা (ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি) ডেনমার্ক দখল করে রেখেছিল। শেটল্যান্ড আইল্যান্ড (বৃটেন) আর আমেরিকান মূল ভূখণ্ডের সান্নিধ্যে থাকা সত্ত্বেও বৃটেন তাদের জার্মান আক্রমণ থেকে রক্ষা করত। যুদ্ধের সময় ফারোবাসীদের ডেনমার্কের সাথে পাঁচ বছর কোনো রকম সম্পর্ক না থাকায় দ্বীপবাসীরা নিজেরাই নিজেদের পথ খুঁজে নেয়।
গত কয়েক দশক ধরে, অনেক ফারোও তাদের স্বাধীনতাকে একটি নতুন দিগন্ত দিয়েছে। তারা তাদের স্থানীয় ভাষাকে ধরে রাখার জন্য শুধু সংগ্রাম করছে তাই নয়, এটির বিস্তারও ঘটাচ্ছে।
১৩৮০ সালে যখন ফারোদ্বীপটি ডানো-নরওয়েজিয়ান রাজ্যের একটি অংশ ছিল তখন থেকেই ড্যানিশরা তাদের দমন করার চেষ্টা করেছে। আর ঠিক সে সময় থেকেই ফারোরা তাদের ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়াই শুরু
করে।
সংস্কারের সাথে সাথে এই প্রভাব আরও বেড়ে যায়। স্কুল থেকে ফারোদের সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। আইন আদালত এবং ড্যানিশ পার্লামেন্টের স্থানীয় ভাষার কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া জনগণের আর কোনো বিকল্প ছিল না।
অফিসিয়াল সব কাজেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ড্যানিশরা যখন রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছিল তখনও দ্বীপের বাসিন্দারা ঠিকই ফারো ভাষায় কথা বলত।
১৮৪৬ সালে লিখিত ভাষাটি কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে ফারো অর্থনীতিতে এবং ড্যানিশ বাণিজ্য একচেটিয়ার অবসান ঘটে, এতে জাতীয় আস্থা আরও বৃদ্ধি পায়।
১৮০০ শতকের শেষের দিকে, জনগণ তাদের নিজস্ব ভাষার সত্যতা জাহির করা শুরু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১২ সালে ফারোকে স্কুলে পাঠদানের বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ১৯২০ সালে লিখিত ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
১৯৪৮ সালে স্বায়ত্ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার পর, সরকারি ভাষা হিসেবে ফারো পরিচিতি পায়। তবু এখনও ড্যানিশ বাধ্যতামূলক বিষয় এবং ফারোর সকল ধরনের আদালত সংক্রান্ত কাজ অনূদিত হয় ড্যানিশ ভাষায়।
কৃষক এবং ভূমি মালিক জোনাস প্যাটারসন তার পরিবারের ১৭তম প্রজন্ম। কার্কজুবার গ্রামের বাসিন্দা তিনি। জোনাসের বাড়িটি এক কথায় একটি মিউজিয়ামের সমান।
ঐতিহ্যবাহী সব কিছুর চর্চা এখানে করা হয় যেমন, মাছ ধরা এবং পশুপাখির পালন। তার দাদার দাদার দাদা ছিলেন একজন কবি এবং একজন জাতীয়তাবাদী। তার নামও ছিল প্যাটারসন।
পূর্বপুরুষদের মতো ভাষা তার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তিনি ঐতিহ্যগত ভাষায় এখনও প্রতিটি মাছ ধরা আর শিকার করার হাতিয়ারের নাম বলতে পারেন। তার বাড়ি সেন্ট ওলাভ চার্চের কাছেই।
ফারো সংস্কৃতি, পরিচয় এবং ভাষা গঠিত হতো আইল্যান্ডের কঠিন উন্মুক্ত আবহাওয়া আর দূরের বিক্ষিপ্ত জায়গা দ্বারা। বেঁচে থাকার জন্য একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা এই দ্বীপবাসীদের সম্প্রদায়ের দৃঢ় অনুভূতি দিয়েছে এবং তাদের জীবনযাত্রার পথ ছেড়ে দিতে অস্বীকার করেছে, যা তাদেরকে শীত, যুদ্ধ ও রোগ থেকে রক্ষা করেছে।
প্রতি রবিবার তিনি এখানে প্রহরীর কাজ করেন, চার্চে ঘণ্টা বাজান আর নিজেদের জাতীয় পোশাকে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানান।
ফারো আইল্যান্ডের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা কার্কজুবার। তোরশাভ শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়, বৃহত্তর ফারো আইল্যান্ডের একদম দক্ষিণের একটি গ্রাম। মধ্যযুগীয় সময় থেকে ধর্ম আর সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র বলা হতো এই গ্রামকে। অধিকাংশ মানুষ এখনও বলতে পারেন ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সাথে তারা এলাকায় কোন বাড়ির ভিতরে কোথায় বসতেন আর বাইরে কোথায় তাদের বাবা-মাকে এখন বিশ্রামের জন্য বসতে হয়। অনেকেরই মনে আছে নিজস্ব ভাষার জন্য ধর্মযুদ্ধের কথা। সেটি ছিল ১৯৬১ সাল যখন সর্বপ্রথম বাইবেল ফারো ভাষায় প্রকাশিত হয়।‘ডিকশনারি’ নামে পরিচিত যে মানুষ জোহান হেনড্রিক উইনথার পলসেনের বেড়ে ওঠা কার্কজুবারের মাটিতেই।এখানেই তিনি বিয়ে করেছেন প্রিয়তমা বিরনাকে, হয়ে উঠেছেন অদম্য একটি সম্প্রদায়ের অংশ এবং বড় করছেন চার সন্তানকে।
তিনি হয়তো সেই ছোট গ্রামেই জীবন কাটিয়ে দিতেন কিন্তু তার ভাগ্য লিখন যে রয়েছে ফারোর ইতিহাসে, তা কে জানত!
শিক্ষকতার পেশা থেকে অবসর নিয়েছেন জোহান। তিনি ফারো ভাষায় প্রথম ডিকশনারি তৈরি করেন। আর সেই পরিপ্রেক্ষিতে তার ডাক নাম দেওয়া হয় ‘ওরোয়াবোকিন’ অর্থাৎ ‘ডিকশনারি’। একইভাবে তার সন্তানদের বলা হয় ‘দ্য মনিকারস সনার ওরোয়াবোকিনা’ অর্থাৎ ‘ডিকশনারির ছেলে’ অথবা ‘দত্তির ওরোয়াবোকিনা’ অর্থাৎ ‘ডিকশনারির মেয়ে’।
জোহান হেনড্রিক উইনথার পলসেন ১৯৬০ সালের শেষের দিকে, শিক্ষক এবং কবি খ্রিস্টান মাত্রা পলসেনকে আমেরিকা থেকে ফিরে আসতে বলেন যেখানে তিনি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ভাষা শেখাচ্ছিলেন। ১৯৬১ সালে মাত্রা ফারো থেকে ড্যানিশ ভাষায় ডিকশনারি লিখেছিলেন এবং তিনি চেয়েছিলেন ফারো শব্দগুলোর অর্থ ফারো ভাষাতেই অনুবাদ করা হোক। নিজস্ব ভাষাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিতে এ ধরনের একটি ডিকশনারি অত্যাবশ্যক। আর তাই ৩০ বছর ধরে ১৯৯৮ সালে ডিকশনারি বের না হওয়া পর্যন্ত পলসেন তোরশাভ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভাষাবিদ গ্রুপের সাথে কাজ করেন।
নতুন জিনিসের জন্য পুরনো শব্দ
ডিকশনারিতে সংযুক্ত করার জন্য পলসেন প্রতিটি জিনিসকে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে মিলিয়ে বুঝানোর চেষ্টায় নতুন নতুন শব্দ খুঁজছিলেন। কারণ ড্যানিশ আইল্যান্ডের অফিসিয়াল ভাষা হওয়ার কারণে অনেক শব্দেরই অস্তিত্ব ছিল না। এই কাজটি সহজ করার জন্য তিনি পুরাতনের সাথে নতুন শব্দ জুড়ে দিলেন।ডিকশনারি নিয়ে কাজ করার সময় পলসেন ফারো ভাষা নিয়ে একটি রেডিও শো উপস্থাপনা করেন। তিনি যখন তার শ্রোতাদের কাছে এমন কিছু ফারো শব্দ জানতে চাইতেন যেগুলোর ব্যবহার খুব বেশি নেই, শ্রোতাদের উদ্যমী জবাবে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যেতেন। এমনও হয়েছে যে, রাস্তায় চলার সময় লোকে তাকে রাস্তায় থামিয়ে নতুন শব্দ জানিয়েছে। কাজ থেকে বিরতির দীর্ঘ সময় পরও তিনি অনেক নতুন শব্দ জেনেছেন। যেমন- ইউএসবি ড্রাইভকে ডাকা হতো ‘জিমি’ নামে।
ডিকশনারি আসার আগে ফারোদের কাছে তাদের ভাষা আর সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অন্য পন্থা ছিল। যখন তাদের ভাষায় আদালতে, চার্চে অথবা স্কুলে কথা বলা যেত না তখন তারা নিজেরাই নিজেদের ভেতর ফারো ভাষার চর্চা চালাতো। আইসল্যান্ডবাসীদের মতো তাদের একটি শক্তিশালী মৌখিক ঐতিহ্য আছে। এর মধ্যে রয়েছে পালাগান আর কল্পকথা যেগুলো তাদের জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবেই ধরা হয়।
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ফ্রান্স আর ইউরোপের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা রিং বা চেইন নাচগুলো এখনও বেঁচে আছে। এই নাচ দ্বীপবাসীকে একসাথে করে, একটি সম্প্রদায়কে একত্রিত করে আর তাদের শুরুর গল্প শোনায়- যে গল্পে থাকে তাদের ভাষা লিখিত হওয়ার আগের কাহিনী, কঠিন আবহাওয়ার সাথে সাথে আগুন আর খাবার নিয়ে বেঁচে থাকার গল্প।একটি গ্রামের প্রাণশক্তি
স্ট্রেময়ের তোরশাভ থেকে ফেরিতে থেকে অল্প দূরত্বেই স্যান্ডয়ের একটি ছোট্ট ভূখণ্ড রয়েছে। আইল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমের দিকে পালাগানের প্রাণ বলতে ‘দালুর’ নামের একটি সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়। এখানে পালাগানকে জানা হয় ‘গ্রামের প্রাণশক্তি’ হিসেবে। শত শত বছর ধরে এই গানের সাথে সাথে নেচে আসছে তারা।ফ্যাশনেবল মানুষ
ফারো সংস্কৃতিতে পোশাক খুব শক্তিশালী একটি অংশ। অনেকে তাদের পরিবারের সাথে ছবি তুলতে, বিশেষ দিনে চার্চে যেতে অথবা জুলাই মাসের শেষে জাতীয় দিনে প্রথামাফিক পোশাক পরতে ভালোবাসেন।ক্লাবএছাড়াও স্পেশাল দিনগুলোতে যেমন ‘রিং নাচের’ দিন জাতীয় এই পোশাক তাদের সব সময় পছন্দ।যেটুকু জায়গা বেঁচে আছে
কঠিন আবহাওয়ার সাথে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য আর ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা এক প্রকার অসম্ভব ছিল। কিন্তু ফারো জনগণ তাদের উন্নতি নিজেরাই খুঁজে নিয়েছে।তারা জানে কীভাবে মাটির উপরের পাতলা স্তর ব্যবহার করে আলু ফলাতে হয়, কীভাবে এঞ্জেলিকা (রান্না ও ঔষধে ব্যবহৃত সুগন্ধী লতাবিশেষ) এবং রুবার্ব (চীন ও তিব্বতের এক ধরনের গাছের শেকড় থেকে তৈরি জোলাপ) ফলাতে হয়, কীভাবে সমুদ্র এবং বন্যজীবনের খুব ভালো ব্যবহার করতে হয়।শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানকার অধিবাসীরা প্রকৃতির কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে বেঁচে আছে। খাবার রান্না করা হয় একদম ফ্রেশ আর যদি অল্প কিছু বেচে যায় তাহলে সেটি ফেলে দেওয়া হয়। সবুজ মাঠে ভেড়ারা একদম মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে ভেড়ার পালকে দড়ির সাহায্যে চারনভূমির নিচের দিকে নামিয়ে দেওয়া হয় যেন পুরো এলাকার সঠিক ব্যবহার হয়!মাছ ধরার স্বতন্ত্র উপায়
ড্যানিশ পার্লামেন্টের ফারো দ্বীপপুঞ্জের এমপি ম্যাগনি আরজের মতে, ফারোরা সমুদ্রে তাদের সাহসের জন্য বিখ্যাত। স্থানীয়রা নর্থ আটলান্টিকের পানি থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। আদতে ফারো অর্থনীতি নির্ভর করছে মাছ আর জেলেদের ওপর।স্থানীয়রা তাদের নিজস্ব এ আয়ে খুশি। ডেনমার্ক ১৯৭০ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ হলেও তারা কখনোই হয়নি।


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top