ইমাটা অন্ত্বসত্তা কিভাবে যে হলো সেটা এক অজানা রহস্য

সায়মা জেবীন শ্রেয়ানের গল্প অকৃতজ্ঞ


প্রকাশিত:
৩০ মে ২০২১ ১৩:৪৬

আপডেট:
৩১ মে ২০২১ ১৮:২৫

১.

গতকাল এক পথচারীর ঘুষি খেয়ে নাকটা ভেঙেই গেছে বোধহয়। নাকের চারপাশে কালচে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। বাসি রক্তের আঁশটে গন্ধ পাচ্ছি। পাশে ফিরে দেখি ইমার তিনটা বাচ্চা হয়েছে।পৃথিবী নামের এই লক্ষীছাড়া গ্রহে জন্মানোর উল্লাসে কিংবা বিতৃষ্ণায় নিরন্তর কুই কুই করে, কুকুরের বাচ্চাগুলো আর্ত ডাক ডেকেই যাচ্ছে। পাশে একটা টিনের কৌটার তলানীতে, অল্প একটু পানিতে, পোকা ভাসছে। প্রচন্ড গরমে তৃষ্ণায় গলা ফেটে যাচ্ছে । পোকাটা সরিয়ে পানিটা এক ঢোকে গিলে ফেললাম।

আমার মত রাস্তায় যাদের বাস ,এরকম এক আধবার মার খাওয়া তাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা নয়। খর্বাকৃতির হওয়ায়, খুব ছোট থাকতেই বাবা-মার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছি! তাতে যে আমার কপাল পুড়েছে, এমন কিছু না ।মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা কল্পনাতীত, আমি এই নতুন প্রতিকুল পরিবেশে- ভালোই মানিয়ে নিয়েছি।

আমার সাইজটা বেখাপ্পা ছোট। বামনত্বে না ভুগে, দৈত্যদশাতেও তো ভুগতে পারতাম! আমার মত ছোট আকারের মানুষের থেকে প্রায় প্রতিটা মানুষই -অনেক উঁচু। অল্প বয়স্ক কিশোররাও উচ্চতায় আমার চাইতে অনেক লম্বা। মানুষ যখন আমার দিকে মাথা নিচু করে তাকায়; নিজেকে খুব ক্ষুদ্র লাগে! এরচে দৈত্যত্বে ভুগলে আমি মাথা নিচু করে সবাইকে দেখতাম! সেটা আমাকে একটা ক্ষমতার অনুভূতি দিত! এই দুনিয়ায় আমার চাইতে প্রায় সবাই বিরাট, আমি তাই কেবলমাত্র সবার করুণা কিংবা বিদ্রুপেরই পাত্রই হতে পেরেছি, কারুর সমকক্ষ নই।

আমি আসলে জানিনা, আমার বাবা-মা কে বা কেমন। বাবা অথবা মা, কারুর কোন কথাই আমার তেমন মনে নাই। খুবই ঝাপসাভাবে মায়ের চেহারা মনে আছে। মনে আছে মানে, কোন রকম একটা নারীমূর্তি আরকি, এর বেশী কিছু নয়। কল্পনায় ভাবি আমার মা কোকড়া চুলের, টলটলে চোখের অসম্ভব সুন্দরী একজন মানুষ। সময়ের সাথে সাথে তার সৌন্দর্য আমার কল্পনায় বিবর্তিত হতে হতে আরও নিখুঁত হয়েছে। আমার কল্পনার রাজ্যে, আমার বাবা-মা সবচাইতে সুন্দর, অনেক বিত্তশালী। প্রায়শই পথচারীদের লক্ষ্য করে বেশ গর্ব সহকারে চেঁচিয়ে বলি “কোন বড়লোকের ব্যাটা আমি তোমরা যদি জানতে?”।কেউ উলটো রা করে না,কেউ যেন আমার অস্তিত্বই টের পায় না। আমি আমার বাবা মা সম্পর্কে অনেক সুন্দর সুন্দর আকাশকুসুম ভাবনায় মজতে ভালোবাসি ।এই মিথ্যা প্রবোধটুকু আমাকে অনেক আনন্দিত করে।হোক না মিথ্যা, দিনশেষে এই আনন্দটুকুই তো আসল!

২.

গতকাল মাহ্দী আমার নাকে জোড়সে একটা ঘুষি দিয়েছিলো। মাহ্দী হচ্ছে সেই পথচারী যার কথা শুরুতে বলছিলাম । মাহ্দীকে আমার একপ্রকার প্রতিবেশীই বলা চলে। এই ব্লকের পরের ব্লকে একটা বহুতল ভবনের কোন একটা মনোরম স্টুডিও ফ্ল্যাটে সে থাকে। খুবই দয়ালু, আর সুদর্শন পুরুষ। মাহ্দীর শরীর থেকে সিগারেটের পোড়া গন্ধ আসে।কালো বা গাঢ় নীল রঙের, এক রঙা পোশাকেই তাকে বেশীরভাগ সময় আবিষ্কার করি । আমার ইচ্ছা করে মাহ্দীর মত হতে, ওর জীবনটা পেতে ।মাহ্দীকে ঈর্ষা হয়, এতটা ত্রুটিহীন মানুষ সহ্য হয় না। মাহ্দী আমাকে অর্থ সহায়তা করে প্রায়ই, মাঝে মাঝে খোঁজও নেয়, তাতেও আমার ঈর্ষা প্রশমিত হয় না, বরং আরও বাড়ে। কদাচিৎ মাহ্দীকে খুন করছি ভাবতে ভাবতে ঘুমাতে যাই, সেই ঘুমটা আরামের হয় খুব।

রাস্তার ধারে টিনের বালতি পিটিয়ে, গান গেয়ে আমি ভিক্ষা করি। মোটামুটি হয় আমার গান ,তবে মন্ত্রমুগ্ধ হওয়ার মত না। বেশীরভাগ মানুষই মুগ্ধ হয় না, কেউ কেউ হঠাৎ হঠাৎ খানিকটা হয়, যতটা না আমার গায়কীতে, তার চেয়ে বেশী বোধহয়, তাদের প্রিয় গান গাইবার জন্য।থমকে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের প্রিয় গান শুনে ।এইজন্য আমি সব সময় চেষ্টা করি, জনপ্রিয় গানগুলো গাইতে, এতে পকেট কিছুটা হলেও ভরে।মাহ্দী কোন এক আজানা কারণে আমার গানে অনেক বেশী মুগ্ধ হয় , গান শোনা শেষে আমাকে দশটা ডলার দেয়। অন্যান্য পথচারীরা এতটা উদার না। কেউ কখনো দশ পেনি দেয়, কেউবা বিশ পেনি  ,বেশীর ভাগই দেয় পঞ্চাশ পেনি, ভাগ্য ভালো থাকলে এক-দুই ডলার।

 দশ ডলার দিয়ে অনেক কিছু কেনা যায় , আমার আর ইমার এক সপ্তাহের রসদ হয়ে যায় দশ ডলারে, সে হিসেবে বলা যায়, মাহ্দী আমার সবচে লাভজনক বাঁধা খদ্দের। এই জন্য মাহ্দীর আগমনে আমি উল্লসিত হওয়ার ভান ধরি, ঈর্ষা থাকুক আর যাই থাকুক , ডলারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার মত মূর্খ কেউ নয়।

৩.

গতকাল মাহ্দীকে দেখি এক সুন্দরীর সঙ্গে উল্লসিত গল্পে মজতে। আমি গান থামিয়ে ওদের দুইজনকে দেখলাম। নারীটি নিখুঁত সুন্দর, টানা টানা চোখ, টসটসে মোলায়েম বাহু, সরু কোমড়, চকচকে মসৃণ চামড়া। দূর থেকেই নারীটির গায়ের সুগন্ধির ঘ্রাণ আমার নাকে এসে বিঁধছিলো- কেমন যেন একটা জংলী ফুলের ঘ্রাণের মত।বলেছিলাম না, মাহ্দীকে ঈর্ষা হয় ,তখন আরও বেশী হলো। আমার জীবনের সবচে গভীর আকাঙ্ক্ষা বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপনে যেরকম সুন্দরীদের দেখায়, ওরকম কোন একজন সুন্দরীর প্রণয় সঙ্গী হতে। আমি জানি, এ ভাগ্য আমার নেই,তবে তা মানতে পারিনি কখনো। ওর সঙ্গের নারীটি বিলবোর্ডের নারীদের মত সুন্দর। আমার হাতের কাছে একটা আধাখাওয়া আপেল ছিলো। আমি আধাখাওয়া আপেলটা মাহ্দীর মাথা লক্ষ্য করে ছুড়ে দিয়ে,খিস্তি করে বললাম – “হারামী, আমার দশ ডলার কই রে?” জিনিসটা যে খুব ভেবে করলাম তা নয়, কেমন জানি নিজের অজান্তেই হয়ে গেল। 

আপেলটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গিয়ে লাগলো মাহ্দীর সঙ্গিনীর মাথায়। মাহ্দীকে কখনো রাগতে দেখিনাই । কিন্তু কালকের এ ঘটনায় সে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়েছিলো ,পেছনে ঘুরে, আমার কলার চেপে ধরে, নাক বরাবর বেদম একটা ঘুষি মেরে “অকৃতজ্ঞ” গালি দিয়ে দ্রুতই প্রস্থান করলো। আসলেই আমি অকৃতজ্ঞ, মাহ্দীর থেকে আমার প্রত্যাশা বেশী , যারা আমাকে দু পেনিরও সহায়তা করেনা আমার চোখে তারাই নিখুঁত, আর সবচে সমীহ করে চলি, খর্বাকৃতির হওয়ায়-যারা আমার শারীরিক ত্রুটিকে উল্লেখ করে দুইবেলা গালি দেয়, কুৎসিতভাবে কটাক্ষ করে, কখনো বা গায়ে হাত তোলে! মাহ্দীর পরার্থপরতায় আমি খুঁত খুজেছি, অহেতুক ঈর্ষা করেছি। এতখানি জানার পর, আমাকে অনেকেই হয়তো সাক্ষাত শয়তান ভাববে । আমি জানি আমি কোন শয়তান না, আমি বেশ ভালো মানুষই বলা যায়। কোন ক্রিমিনাল রেকর্ড নাই, বড় কোন নৈতিক স্খলনের ঘটনাই নাই আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে।দূর্লভগুণের সহজলভ্যতা সকল মানুষকেই লোভী বানায়,আমাকেও বানিয়েছে।

৪.

এই রাস্তার সামনে ফিলিপ চত্বরে প্রায় প্রতিদিনই নানারকম প্রমোদানুষ্ঠান চলে , সেগুলোকে আমি আগ্রহভরে দেখি। প্রতি সপ্তাহেই কতক এক্টিভিস্টকে দেখি, নানান সমস্যাকে কেন্দ্র করে চিৎকার চেঁচামেচি করেই যাচ্ছে অনর্গল ।এইতো এখনই, আমার সামনেই, প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে ঘোরাফেরা করছে কয়েকজন।মানবতার উৎকর্ষের লক্ষ্যে হাহাকার করছে, অথচ আমার সামনে রাখা ডলারের বাক্সটা কিন্তু ভরছে না! এই বাক্সটা যা কিছুটা ভরে মাহদীই ভরায়, কিন্তু ওকে প্ল্যাকার্ড হাতে কখনো হুলুস্থুল করতে দেখি নাই। ওরা মানবতা বলতে যে কি বোঝে ওরাই জানে!চোখের একবারে সামনেই মানুষের দূর্ভোগ কমানোর শত আহাজারি দেখছি তো প্রতিনিয়তই! এরপরেও রাস্তার থেকে উঠে, মাথার উপর ছাদ পাইনি কখনো। মাঝে মাঝে কেউ কেউ এক-আধটা স্যান্ডউইচ আমার হাতে ধরিয়ে -❝গরীবকে ত্রান দিচ্ছে ❞-এরকম একটা ভঙ্গিতে ছবি তুলে বাতাসে মিলিয়ে যায়!  আমিও সবগুলো দাঁত দেখিয়ে খুশি মনেই স্যান্ডউইচটা উঁচিয়ে, ছবি তোলায় অংশগ্রহণ করি। ছবি তোলার কাজটা হয়ে গেলে, এদের কাউকে দ্বিতীয়বার আর আমার দিকে ফিরে তাকাতে দেখি না। এটা মোটেই কোন অভিযোগ না, বাস্তবতা মাত্র, সবাই সমান ভাগ্য নিয়ে জন্মায় না- অন্ততঃ এইটুকু সত্যকে মেনে নিতে পেরেছি । ওরা ভাবে, ওরা পৃথিবী নায্যতায় পূর্ণ করবে , মানুষের দুর্দশা হটাবে, বাতাসে তেজস্ক্রিয়তা কমিয়ে পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করবে। আমার কেন জানি এসবে বিশ্বাস হয় না,পুরোটাই লোক দেখানো ভাঁওতা লাগে। 

আমার সামনেই, ফিলিপ চত্বরে এখন একটা মঞ্চ বানিয়ে এক শিল্পী গিটার বাজিয়ে দরদীয়া সুরে গাইছে –দারিদ্রের কষ্ট , ক্ষুধার কষ্ট কতটাই না তীব্র।আহা! যারা বলে- গৃহহীনের কষ্টের সাথে নিজের অবস্থার তুলনা করে, স্বচ্ছলদের নিজের সৌভাগ্যকে উপলব্ধি করা দরকার, ইত্যাদি ইত্যাদি- তাদের এই বোকা বোকা মিষ্টি বাক্যগুলো যে কতটা ভিত্তিহীন, সেটা কেউ না বুঝলেও আমি বুঝি।

আমার ধারনা,এই  মানুষেগুলোর কাছে "দারিদ্র" শব্দটা একটা নিছক ভাবালুতা মাত্র, আবেগকে বেঁচে জাতে ওঠার চেষ্টা।দারিদ্রকে এসব গানে বা আলোচনায় যতটা নিদারুণ মনেহয়,বাস্তবে এটা এতটাও অসহনীয় না,এই কথাটা আমি গ্যারান্টিসহই বলছি। ওরা, টিপটপ মানুষেরা, যেটা খেয়ে, যেটা পরে অভ্যস্ত, সেখান থেকে তাদের রাস্তায় নামিয়ে দিলে বিষয়টা যতটা করুণ হওয়ার কথা,ওরা ভাবে, দারিদ্র ব্যাপারটা বুঝি এমন। আমার মত চিরকালীন হতভাগার গল্পটা সত্যিই এতটাও করুণ না। এই যে, আমার তেমন কোন কাজ নেই , নিজের পদমর্যাদা খুয়ানোর ভীতি নেই, নিরন্তর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চাপ নেই। আমার সবচে বড় আনন্দ- আমার হারানোর তেমন কিছুই নেই।এই আনন্দটা অনুভব করার সৌভাগ্য কস্মিনকালেও ওদের হবেনা। হাহাহাহা!

৫.

হাত দিয়ে খুঁটে খুঁটে নাকের পাশের জমাট রক্তগুলো মুছার চেষ্টা করলাম, পুরাটা পরিষ্কার হলোনা। একটা থেঁতলে যাওয়া কলা আর ইটের মত শক্ত একটা পাউরুটি বের করে খাচ্ছি, আর দূর থেকে ভেসে আসা গানটা শুনছি – কি সুন্দর গলা! আমার গলাটা যদি এমন সুরেলা আর ভারী হতো তাহলে বোধকরি রোজগার আরেকটু বেশী হতো! আমার স্বরটা নিজের কানে কিশোরীদের থেকেও কিনকিনে লাগে। এই স্বরটা যেন আমাকে আরও মূল্যহীন বানিয়েছে। রাজ কপাল আমার!

৬.

গত সপ্তাহে একজন আধাখাওয়া মিডিয়াম রেয়ার মাংসের স্টেক দিয়েছিলো ডলারের বাক্সে। বাক্সে মাঝে মাঝে এরকম স্বাদের জিনিস পাই, এত স্বাদের জিনিস খেলে মনটা খুব খারাপ লাগে, লোভ বাড়ে। তাই এমন খাবার পেলেই চেষ্টা করি ইমাকে সেটা খাইয়ে দিতে, এ নির্মম দুনিয়ায়,সেই আমার সবচে আপনজন- ভালোমন্দ খেয়ে থাকুক না! 

ইমাটা অন্ত্বসত্তা কিভাবে যে হলো সেটা এক অজানা রহস্য , এখানে তো রাস্তায় রাস্তায় কুকুর ঘোরেনা। এখন ইমার এই বাচ্চা তিনটাকে নিয়ে কিছু একটা করতে হবে। পোষা কুকুরদের বিনামূল্যেই ক্লীব করানো যায় এখানে, কিন্তু আমার আলসেমির জন্য নড়তে ইচ্ছা করেনা। যেসব অভিযাত্রীরা দেশ বিদেশ ঘোরা ছাড়া জীবনকে অপূর্ণ ভাবেন, তারা আমার জীবনকে বিস্ময়ের সাথে দেখবেন।আমি একটা জায়গায় বসে দীর্ঘ সময় অনায়াশে পার করতে পারি। বেশীরভাগ সময় কাটে বিলবোর্ডের নানান বিজ্ঞাপনের দিকে তাকিয়ে, বিশেষতঃ সুন্দরীদের দিকে তাকিয়ে আর ইমার সাথে আড্ডা দিয়ে। মাঝে মাঝে মানুষের কাজকর্মও পর্যবেক্ষণ করি, কখনো বা আবার নিজের সাথে নিজেই দাবা খেলে বুদ্ধিতে শান দেই। প্রায়ই ভাবি মাহ্দীকে একবার দাবা খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানাবো,একা একা খেলে আনন্দ নেই, কিন্তু আলসেমির জন্য বলা হয়ে ওঠেনা। এভাবে করে একপ্রকার নির্ঝঞ্ঝাটেই আমার দিন যায়, রাত পোহায়।

ডলার বাক্সটায় মাঝে মধ্যেই আজগুবি সব জিনিসপত্র পাওয়া যায়। একবার একটা ডিজিটাল ডায়েরী পেয়েছিলাম, অসম্ভব স্লো, কিন্তু কাজ চলে যায় একরকম। আরেকবার পেয়েছিলাম একটা দাবার বোর্ড, সেই সাথে দাবার ঘুটিগুলোও ছিলো, তবে বেশ কয়েকটা ঘুটি মিসিং ছিলো।সব মিলিয়ে চারটা বড়ে, দুটো হাতি আর একটা নৌকা ছিলোনা।তবে আমি শোলা আর কার্ডবোড কেটে, হারানো ঘুটিগুলোর এবড়োখেবড়ো বিকল্প বানিয়ে নিয়েছি। অবসরে নিজের সাথে নিজে দাবা খেলে সময় পার করি। পাঁচকয়েক বছর আগে আবার একদিন, আধ্যাত্মবাদীদের একটা দল আমার বাক্সে একটা আত্মা-আহবায়ক টুপ করে ফেলে গেল। একদম নতুন, বাজারের লেটেস্ট ভার্সন। এই প্রথম একেবারে আনকোরা কিছু একটা পেলাম! অডিও ম্যানুয়াল শুনেশুনে, আত্মাকে আহবান করা শিখলাম ভালোমতই। ঠিক করলাম, ইমা মাহিরের আত্মাকে ডাকবো। আহা, সবার প্রিয় ইমা মাহির! তিন জেনারেশন আগের অভিনেত্রী তিনি।এককালে নাকি বিলবোর্ডের অধিকাংশ বিজ্ঞাপনে, ইমা মাহিরকেই দেখা যেতো! আমার কল্পনায় আমার মায়ের চেহারাটা বিবর্তিত হতে হতে কবে যে হুবুহু ইমা মাহিরের মত হয়ে গিয়েছিলো, আমি নিজেই সেটা খেয়াল করিনি! মায়ের মুখচ্ছবিতে তাকে বসালেও ইমা মাহির কিন্তু আমার জন্য মাতৃমূর্তি নয় একেবারেই। বরং যুবতী ইমা, আমার সবচাইতে প্রিয় আবেদনময়ীদের একজন।

সেদিন ছিলো বসন্তের রাত,বাতাসে ছিলো নতুন পাতার মিষ্টি ঘ্রান।কোন চাঁদ ছিলো না আকাশে। স্ট্রীট ল্যাম্পের ঝাঁপসা আলোতে, আত্মা আহবায়কটা নিয়ে শিড়দাড়া টান টান করে বসলাম, ম্যানুয়াল অনুসরন করে ঠিকঠাক মত ডাকলাম, সেই বহু আকাংখিত আত্মাকে।তাকিয়ে দেখি খানিকটা দূরে ফিলিপ্স স্কোয়ারে দেবদারু গাছে ঝুলে থাকা একটা ব্যানার আচমকা দুলে উঠলো, আমি রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে দেখছি,অপেক্ষা করছি কিছু একটা ঘটবার।থেকে থেকে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে । এতক্ষণে সবার বোঝার কথা আমার জীবনটা দারুণ একঘেয়ে, উত্তেজনাপূর্ণ কোন ঘটনা ঘটেইনা বলতে গেলে, কখনো উত্তেজনার ন্যুনতম আভাস পেলে আমার  সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে ওঠে।

কিছুক্ষন অপেক্ষার পর, কিছুই ঘটলো না, আমি নিশ্চয়ই কোন ভুল করেছি -মনে হলো, তাই আবার চেষ্টা করলাম, তারপর আবার, এরপর মোহাচ্ছন্ন হয়ে বারবার চেষ্টা করতেই থাকলাম। ঐ রাতে একখানা ব্যানার দুলে ওঠা, আর ব্যানারের নিচ থেকে একটা প্রমাণ সাইজের বাদুর উড়ে যাওয়া ছাড়া, উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই ঘটলো না। আমার আগেই বোঝা উচিৎ ছিলো, আধ্যাত্মবাদীদের মত দুনিয়ার তাবৎ বুজরুকিতে বিশ্বাস করা মানুষের বেলায় যে ডিভাইস কাজ করেনাই ,সেটা অবশ্যই কাজের না। ভগ্নচিত্তে, বেদনায় কাতর হয়ে, সেইরাতে ঘুমোতে গেলাম। রাস্তার এক ভিখারীর ভাগ্য যে কোনদিনই প্রসন্ন হবেনা, এটা তো জানা কথা। জীবনে বড় কিছু ঘটে যাওয়ার এই আশাটা যখনই জন্মায়, তখনই প্রস্তুত হতে হয় আশাভংগের নিষ্করুণ যন্ত্রণাকে বরণ করে নেওয়ার জন্য।

 

পরদিন ঘুম ভাঙ্গার পর যেটা দেখলাম, তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না একেবারেই। আমার ডলার বাক্সে কে যেন একটা ফুটফুটে কুকুরছানা রেখে গেছে! কুকুরছানাটিকে দেখে তো বাধহীন আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম, ততক্ষণাৎ ভুলে গেলাম গতরাতের ইমার আত্মাকে আহবান করতে না পারার ব্যর্থতাকে। নাহ ,আমি তাহলে এতটাও দুর্ভাগা না। ওইদিন থেকে আজ অবধি আমার বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা,আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসবে জড়িয়ে আছে -এই কুকুরটা। কুকুরের কি নাম দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। বিগতরাতের জন্যই বোধহয়, বেশী মাথা না ঘামিয়ে চট করে ওর নাম দিয়ে দিলাম -ইমা। যদিও শুরুতে বুঝিনি,  ওটা একটা মেয়ে কুকুর ছিলো । অনেকদিন পর সেদিন আর একটা উত্তেজনাপূর্ণ দিন কাটলো, সারাদিন ব্যস্ত ছিলাম ইমা কে নিয়ে।নিজে সারাদিন কিচ্ছু খেলাম না। নিজের খাবারের পুরোটাই ইমাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করলাম। আমার একটা ছেড়া প্যান্ট গুটিয়ে গোল করে ইমার ঘুমানোর ব্যবস্থা করলাম।

 ৮.

 নাকটা ফুলে গিয়ে আগুনের মত জ্বলছে ,মাথাব্যাথাও হচ্ছে, বোধহয় জ্বরও এসেছে। চেহারাটা কতটুকু ভচকে গেছে কোন একটা আয়নায় দেখতে পারলে ভালো লাগতো। শুয়ে শুয়ে বিলবোর্ড দেখছি ।সামনে ইলেকশান। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরা নানান চমক জুড়ে জুড়ে বিজ্ঞাপন বানাচ্ছে। চোখ ধাঁধিয়ে যায় বিজ্ঞাপনের এত এত কড়া রঙ চোখে লাগলে। আমার মত গৃহহীণ মানুষেরাও ভোট দিতে পারে , আমি দেইনা। কে ক্ষমতায় আসলো -গেলো, তাতে আমার যে কিছু আসবে যাবেনা সেটা এতদিনে জানা হয়ে গেছে।এ কেবল জশ আর খ্যাতির খেলা, আমাদের ভাগ্যের থোরাই পরিবর্তন হয়! আমি কেবল অপেক্ষা করছি সুন্দরীদের জন্য। বারবার ঘুরে ফিরে নির্বাচনী প্রচারণাই চলছে, এসব দেখতে ভালো লাগছে না আর!

আজকের দিনটা ভালো যায়নি। ডলারের বাক্সে পাওয়া ডিজিটাল ডায়েরীটায়, আমি হিসাব রাখি আমার কোন দিন কেমন গেলো- ভালো ,মন্দ না বিশেষত্বহীন। মাঝে মাঝে সারাদিনের বিক্ষিপ্ত ভাবনাগুলোকে সমন্বিত করে, রেকর্ড রাখারও চেষ্টা করি। আমার বেশীর ভাগ দিনই যায় -বিশেষত্বহীন। ভালো দিন আর মন্দ দিন চক্রাকারে আসে- আর দশটা মানুষের মতই। আজকে আমার দিনটা মন্দ যাচ্ছে। নাকের ব্যাথায় যে এমনটা হচ্ছে তা নয়। মার খাওয়াটা তো আর নতুন কিছু না। কেন যেন মনেহচ্ছে, মাহ্দী বোধহয় আমাকে আর কোন অর্থ সাহায্যই করবেনা। মাহ্দীর সাহায্য ছাড়াও দিন যাবে, তবে কষ্ট হবে বেশ। আবার ভাবি -ভালোই হলো মাহ্দী আমার স্বভাবের দফারফা করছিলো। বেশ অলস হয়ে পড়ছিলাম ,এখন খানিকটা হলেও হাত পা চলবে, ফের মনে হলো -না, ওর সাহায্যটাই বরং সহজ ছিলো । এত খেটে কি লাভ?

৯.

সন্ধ্যা নেমেছে।আধবোজা চোখে রাস্তার মানুষজন দেখছি। ব্যস্ত ভংগিতে সবাই হেটে বাড়ি ফিরছে । কাউকে একটু থেমে দেখার ফুরসত নাই কারুর।সবাই যার যার মত করে ব্যস্ত, তার তার নিজস্ব যাতনাগুলোকে নিয়ে।সবাই ভাবছে পৃথিবীটা বুঝি কেবল তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। অন্যসবাই আমার ভাগ্যকে আলাদা ভাবলেও, আমার নিজেকে আলাদা লাগেনা মোটেই, আর দশজনের মতই মনে হয়। ইমার বাচ্চা তিনটার নিরন্তর কুইকুই শব্দ মাথায় সুঁই এর খোচার মত বিঁধছে, তাতে মাথাব্যাথা আরও বেড়েছে। আমি জানি, এ শহরে দয়া অনেক দূষ্প্রাপ্য। মাহ্দীর এই দূর্লভ গুণটা আছে।উপলব্ধি হলো- মাঝে মাঝে অন্যের প্রতি অন্যায় আচরণের সবচে বড় ভুক্তভোগী, মানুষ কিন্তু নিজেই হয়।নিজের উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে, আমার মাহ্দীর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিৎ।

দূর থেকে দুটো মানুষের মূর্তিকে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখছি। অনেকটা কাছে আসার পর মাথা তুলে দেখি মাহ্দী ও তার বান্ধবীটা আমার দিকে ঝুঁকে আছে । আহা নারীটি কি সুন্দর! সেই জংলি ফুলের সুঘ্রাণটা কড়াভাবে নাকে এসে আছড়ে পড়ছে। মাহ্দীর ভাগ্যের প্রতি ঈর্ষা, ওর প্রতি কৃতজ্ঞতাকে বেশিক্ষণ টিকতে দিলো না। মাহ্দী বিড়বিড় করে কিকিসব যেন বলছিলো তার সঙ্গিনীকে। কথাগুলো আমি ঠিকমতো খেয়াল করতে পারলাম না, কেবল নারীটিকেই বুভুক্ষের মত তাকিয়ে দেখছি। যতটা সম্ভব আমার মস্তিষ্কে এঁকে নিচ্ছিলাম তার পূর্ণাঙ্গ চিত্রটা- তার উড়ন্ত চুল , তার টসটসে ঠোঁট , সরু সরু আংগুল , ঢেউ খেলানো কোমড়,মসৃণ ত্বক। আঁকতে আঁকতে, অকস্মাৎ নিজের হাতে আবিষ্কার করি প্রাকৃতিক তন্তু দিয়ে বোনা হাওয়াই মিঠাই এর মত হালকা, ভীষণ তুলতুলে, সিল্কের মত মসৃণ একটা কম্বল।পুরো কম্বলে সোনালি তন্তুর সুক্ষ্ম কাজ করা, হাতের বুননই হবে। এই দূর্লভ জিনিস নিজের চোখে দেখার সৌভাগ্য কোনদিন যে হবে, ভাবিনি।আস্তাকুড় থেকে প্লাস্টিকের খসখসে একটা মাদুর কুড়িয়ে, সেটাকেই গায়ে জড়িয়ে, এযাবৎকাল পার করেছি। বুঝতে পারলাম-মাহ্দী গতদিন আমাকে ঘুষি দেওয়ার ঘটনায় অনুতপ্ত। তাই এই কম্বলটা উপহার দিচ্ছে। সারাদিনের বিতৃষ্ণার ভাবটুকু কেটে গিয়ে মুহুর্তেই একটা সতেজ অনুভূতি বোধ করলাম ।বিদায়ের মুহুর্তের মাহ্দীর সঙ্গিনী দুটো আশার কথা শুনিয়ে আমার হাতটায় অকস্মাৎ আলতো করে চেপে ধরলো! আমার হাতের উপর তার হাতের স্পর্শের বিস্ময়ে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। তার কন্ঠটাও কি দারুণ! বিদায়ের মুহুর্তে তাকে ঠিকমতো একটা ধন্যবাদও দিতে পারলাম না। মুখ দিয়ে কোন শব্দই বেরুলো না।

১০.

নাহ,আজকের দিনটাকে আমার ভালোই গিয়েছে বলতে হবে। সুন্দরী একজন নারীর ছোঁয়া পেলাম ,নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আছি, মিষ্টি সেই গন্ধটা আঁটকে আছে আমার হাতে! আমার মত একজন খর্বাকৃতির ভিখারীর হাতে! ফুসফুস ভর্তি করে বড় বড় শ্বাস টেনে, নাক দিয়ে সেই গন্ধটাকে শুঁকছি অবিরত।অবশেষে, মাহ্দীর সৌভাগ্যের একটা অংশ আমার হাতের মুঠিতে আবদ্ধ হলো আজ,আজকে আমিই যেন জয়ী। চোখ বুজলেই নারীটিকে আমি সম্পূর্ণ দেখতে পাচ্ছি, স্পর্শ করতে পারছি তাকে, যেখানে খুশি সেখানে, যেভাবে খুশি সেভাবে। মাহ্দীর দেওয়া কম্বলটিকে গায়ে জড়িয়ে আমি আমার কল্পনা রাজ্যে খানিকটা ক্ষীপ্র পশুর মত, খানিকটা উন্মাদের মত বিচরণ করতে করতে, নিজেকে তৃপ্ত করতে থাকলাম।আজ আকাশে মস্ত একটা চাঁদ উঠেছে। গাছের পাতার ঝিরিঝিরে শব্দ বাতাসে সুর তুলেছে। আলো আঁধারীতে মাথার কাছে কুকুরের বাচ্চা তিনটা লাগাতার চিৎকার করেই যাচ্ছে- কুই কুই কুই, কুই কুই কুই।

 

 



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top