ছবির জন্য ফটো সাংবাদিক হত্যা


প্রকাশিত:
১৭ নভেম্বর ২০২০ ০০:৫৬

আপডেট:
১৭ নভেম্বর ২০২০ ০১:০৬

পুলিৎজার জয়ী ছবিটি তুলেন কেভিন কার্টার

২৬ শে মার্চ, ১৯৯৩ সালে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় সুদানে দুর্ভিক্ষের দুঃখকষ্টের চিত্র তুলে ধরার সময় একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছিল, যার পাঠক প্রতিক্রিয়া ছিল অস্বাভাবিক তীব্র এবং নেতিবাচক। কিছু লোক মত প্রকাশ করেছিল ছবির সাংবাদিক কেভিন কার্টার অত্যন্ত অমানবিক কাজ করেছেন।

তিনি ছোট্ট মৃতপ্রায় মেয়েটির সাহায্যের জন্য কিছু না করে ক্যামেরায় তার ছবি তুলে ধরেছেন। তার উচিৎ ছিল ক্যামেরা ফেলে মেয়েটিকে সাহায্য করা। এর কয়েক মাস পর ফটো-সাংবাদিক কেভিন কার্টার ছবিটির জন্য পুলিৎজার পুরস্কার জিতে নেয়। যার ফলে বিতর্কের ঝড় ওঠে সাধারণ মানুষের মধ্যে। যার সমাপ্তি ঘটে জুলাই ১৯৯৪ এ কেভিন কার্টারের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে।

মানসিকভাবে বিচ্ছিন্নতার কারণে কার্টার এবং তার মতো অনেক ফটো-সাংবাদিক এরকম অগণিত ট্রাজেডির সাক্ষী হয়েছিল এবং তাদের চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে তিনি মোটেই মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। তিনি যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন তা তাকে অত্যন্ত গভীর এবং মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।

দক্ষিণ আফ্রিকাতে কার্টার যখন বেড়ে উঠেছিল বর্ণবাদ তখন খুব সাধারণ একটি বিষয়। একজন ফটো-সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি অনুভব করেন শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গ নয় বরং কৃষ্ণাঙ্গদের জাতিগত বিরোধও (যেমন জাওসাস ও জুলু গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ) পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।

সেরা কাজটি তুলে ধরতে কার্টার কয়েকজন ফটো-সাংবাদিকের সাথে যুক্ত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার একটি সংবাদপত্র যার নাম দেয় ব্যাং-ব্যাং ক্লাব। সে সময় ফটো-সাংবাদিকেরা ‘ব্যাং-ব্যাং’ শব্দটি ব্যবহার করতো দক্ষিণ আফ্রিকান শহরগুলোতে যে চরম সহিংসতা বিরাজ করছিল তা প্রকাশ করতে।

ফটো-সাংবাদিক রেবেকা কার্টারের ছবি তুলছেন। ছবি : সংগৃহীত

কয়েক বছরের মধ্যে কার্টার মারাত্মক হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করে। যার মধ্যে ছুরিকাঘাতে হত্যা, বন্দুক-যুদ্ধ, এবং নেকলেসিং (একটি বর্বর হত্যাকাণ্ড, যেখানে তেল ভরা একটি টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে ভিকটিমের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়) অন্যতম।

কার্টার সুদানে একটি বিশেষ কাজের দায়িত্ব নেয়, যেখানে তিনি বিখ্যাত শকুনের ছবিটি তোলেন। তিনি কয়েকদিন ক্ষুধার্ত মানুষদের গ্রাম ভ্রমণ করে অতিবাহিত করে। এ সময় তিনি সশস্ত্র সুদানের সৈন্যদের দ্বারা ঘিরে ছিলেন। যে কারণে তিনি ছোট্ট মেয়েটিকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিলেও সৈন্যরা এটির অনুমতি দেয়নি।

দক্ষিন আফ্রিকার সহিংস পরিস্থিতিতে বেড়ে ওঠা কার্টার সিদ্ধান্ত নেন শুধু শ্বেতাঙ্গদের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গদের নয় বরং তাদের নিজেদের মধ্যে যে সহিংসতা তা তুলে ধরা প্রয়োজন

ছোট্ট মেয়েটির কী ঘটেছে তা জানতে চেয়ে পাঠকদের কাছ থেকে বেশ কয়েকটি ফোন কল এবং চিঠি পাওয়ার পর, নিউইয়র্ক টাইমস একটি বিরল পদক্ষেপ গ্রহণ করে। পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা যা জানত তা বর্ণনা করে সম্পাদকের নোট প্রকাশ করে। ফটোগ্রাফার রিপোর্ট করেছে যে শকুনটিকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর মেয়েটি স্বাস্থ্যের অনেকটাই উন্নতি হয়েছে কিন্তু মেয়েটি শেষ পর্যন্ত সেন্টারে (যেখানে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল) পৌঁছাতে পেরেছে কিনা তা জানা যায়নি, জানানো হয় সম্পাদকের নোটে।

কেভিন কার্টার এবং বাকি ব্যাং-ব্যাং ক্লাবটি দিনের পর দিন এই ধরনের কাজ করে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিল। এর জন্য তাদের অনেককেই অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়েছিল। কার্টারের ক্ষেত্রে এই মূল্য ছিল তার নিজের জীবন।

কোকেন এবং অন্যান্য ড্রাগ কার্টারের নিত্য সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা তাকে তার পেশাগত ভয়াবহতার সাথে মোকাবিলা করতে সহায়তা করতো। তিনি তার বন্ধু জুডিথ ম্যাটলফকে মাঝে-মাঝেই বলতেন যে তিনি নিজেকে একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে মনে করেন।

বন্ধু জানান কার্টার তার অপরাধ সম্পর্কে কথা বলতো কারণ চোখের সামনে হত্যার শিকার হওয়া মানুষদের ছবি তোলেন তিনি কিন্তু তাদের বাঁচাতে পারেন না। এই বিষয়গুলো তাকে হতাশার গহ্বরে ঠেলে দেয়। আরেক বন্ধু রিদওয়ান ভ্যালি জানান, যে কেউ ওকে দেখলে বুঝতে পারতো কীভাবে কেভিন হতাশার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল।

কিছুদিন পরেই কার্টারের প্রিয় বন্ধু ও সহকর্মী ব্যাং-ব্যাং ক্লাবের সদস্য কেন ওস্টারব্রেককে গুলি করে হত্যা করা হয়। কার্টারের মনে হতে থাকে ওস্টারব্রেকের জায়গায় সেও হতে পারতো। উল্লেখ্য সেদিন সে দলের সাথে ছিল না। কারণ পুলিৎজার জেতায় তাকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়েছিল। একই মাসে নেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়।

নেকলেসিং একটি বর্বর হত্যাকাণ্ড, যেখানে তেল ভরা একটি টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে ভিকটিমের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ছবি : সংগৃহীত

কেভিন কার্টার জাতিগত বর্ণবাদের ভয়াবহতা তুলে ধরার জন্য এভাবেই তার জীবনকে উৎসর্গ করেছিল। তিনি জানতেন বেঁচে থাকতে পুলিৎজার পুরস্কার তার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে বিষণ্ণতার কুয়াশায় হারিয়ে তিনি এই ভয়ানক ভুলটি করেন।

টাইম ম্যাগাজিনের হয়ে তিনি মোজাম্বিক ভ্রমণ করেন। ফিরে আসার সময় তার তোলা সমস্ত ছবি ফেলে আসেন প্লেনে। যার মধ্যে প্রায় ১৬ রিল ছবি ছিল। যা কখনোই পুনরুদ্ধার করা হয়নি। কার্টারের জন্য এটাই ছিল শেষ। এক সপ্তাহেরও কম সময়ে তিনি মারা যান। তিনি একটি পার্কে যান। তার গাড়ির এক্সহস্ট পাইপ বন্ধ গাড়ীতে ছেড়ে দেন এবং কার্বন মনোক্সাইডের বিষক্রিয়ায় মারা যান।

কেভিন কার্টার জাতিগত বর্ণবাদের ভয়াবহতা তুলে ধরার জন্য তার জীবনকে উৎসর্গ করেছিল

পুলিৎজার পুরস্কার তার উপর চাপ সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু এটি সরাসরি তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়নি। এটি শুধুমাত্র জমা হওয়া মানসিক চাপ আর অপরাধবোধের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। কিন্তু তার এই স্মরণীয় ছবির জন্য সুদানের দুর্ভিক্ষ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। কার্টার মানুষের চেতনায় একটি গভীর নাড়া দিয়ে গেছেন।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top