সমস্যাসঙ্কুল পৃথিবীতে মাসরুর আরেফিনের প্রেম ও লড়াই


প্রকাশিত:
৩১ মার্চ ২০২১ ১৬:১৪

আপডেট:
৩১ মার্চ ২০২১ ১৬:২৯

 

মিসবাহ জমিউল সংকলিত

মাসরুর আরেফিনের সাহিত্যের পরিমণ্ডলে যাত্রা কবি হিসেবে। এই শতাব্দীর প্রথম দিকে। কাব্যগ্রন্থ ‘ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প’ নিয়ে।প্রকাশ করেছিল দ প্রকাশন। এরপর দীর্ঘ বিরতি । প্রায় এক দশক পরে, ২০১৩ সালে যেন অজ্ঞাতবাস থেকে আবার ফেরেন। ফ্রানৎস কাফকার গল্পসমগ্র অনুবাদ করেন । বছর দুই পর  ২০১৫ সালে হোমারের `ইলিয়াড’ অনুবাদ করেন।শুধু এই দুই অনুবাদের জন্যই তিনি টিকে যেতেন। কিন্তু তার যাত্রা তো বহুমূখী। তাই  ২০১৯ সালে প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আগস্ট আবছায়া’। যেটি পাঠকসমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘আলথুসার’ প্রকাশিত হয়েছে ২০২০ সালে।একই বছর তার দ্বিতীয় কবিতার বই ‘পৃথিবী এলোমেলো সকালবেলায়’ প্রকাশিত হয়।মাসরুর আরেফিন তাঁর ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০২০ অর্জন করেছেন।

বেরুচ্ছে এবারের বইমেলায় মাসরুর আরেফিনের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’

 

এক

মাসরুর আরেফিন তার এ বই সম্পর্কে বলছেন ( ফেসবুক পোস্টে) :

আমার তৃতীয় উপন্যাস ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ আসছে এ মাসের ২৫ তারিখের পরে বইমেলায় ‘কথাপ্রকাশ’-এর স্টলে। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী আনিসুজ্জামান সোহেল।

কথা ছিল তৃতীয় উপন্যাস হবে ‘স্কয়ার ওয়ান‘। কিন্তু ওই দেড় লাখ শব্দের, ওই এক শ‘র ওপর চরিত্রের বিশাল গ্রন্থের কাজে তাড়াহুড়া করলাম না। ওটা আসবে এ বছরের শেষ ভাগে আশা করি।

‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ আগেই লেখা ও প্রকাশিত এক নভেলা ছিল। বেরিয়েছিল পাঁচ বছর আগে ‘সমকাল‘ পত্রিকার ঈদ সংখ্যায়। বন্ধুরা পড়ে অনেক ভাল বলেছিল গল্পটাকে, গল্পের ভাষাকে। ‘সমকাল’-এর ওই প্রায় ২০,০০০ শব্দের মধ্যে প্রমাণ সাইজ কোনো উপন্যাসের পূর্ণাঙ্গ উপাদান বিদ্যমান ছিলই। আর সেই ২০১৫ সালেই এর অধ্যায় টু অধ্যায় ড্রাফটিং-ম্যাপিং-ডায়াগ্রাম সব আমার করাই ছিল এক নীল নোট বইয়ের ৩৪ পৃষ্ঠা জুড়ে। তা নিয়েই কাজ করলাম গত দেড় মাস। দাঁড়িয়ে গেল প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার উপন্যাস—‘আন্ডারগ্রাউন্ড’।

একসঙ্গে পাঁচটা গল্প চলছে এতে পাশাপাশি: এক ভাই তিরিশ বছর পরে তার হারিয়ে যাওয়া বড় ভাইকে খুঁজছে দূর এক দেশের লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া এই বর্তমানে; দুই বন্ধু হিসাব মেলাতে চাইছে শৈশবের বরিশালে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর এক নিপীড়নের ঘটনার সঙ্গে পরের এক মাথা-ঘোরানো সাম্প্রদায়িক খুনের; নায়কের বিলিয়নিয়ার বন্ধু বলছে যে, সে ভেঙেচুরে শেষ ও সর্বস্বান্ত হয়ে পড়া এক স্বদেশী ছোটভাইকে সাহায্য করতে রাজি কেবল সেই ছোটভাইয়ের স্ত্রীর শারীরিক সঙ্গ পাওয়ার বিনিময়েই।—ব্যক্তিগত এসব গল্পের সূত্র ধরে নায়ক বুঝতে চায় পরিস্থিতির কোন্ জংশনে এসে ব্যক্তির জীবনের কাহিনীগুলো ব্যক্তিগতকে পেরিয়ে ইতিহাসের দুয়ারে এসে মেলে? বুঝতে চায়, রাষ্ট্রের কোন্ প্রাণহরণকারী ইচ্ছার থেকে একজন ব্যক্তি মানুষ হঠাৎ ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে?

শেষের এই প্রশ্নই তাকে টেনে নিয়ে যায় বিশ শতকের শ্রেষ্ঠতম রাশিয়ান কবি ওসিপ মান্দেলস্তামের বর্বর হত্যাকাণ্ডের দিকে। তাকে বলা হয়, সব লেখকের বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ করবার জন্য ১৯৩৮ সালে ওসিপের কলম যে থামিয়ে দেওয়া হল, সেই ঘটনার আদ্যোপান্তটুকু বোঝা গেলেই জানা যাবে এই পৃথিবী ও এর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদগুলো কারা চালায়, কীভাবে চালায় এবং কেন তারা তা ওভাবেই চালায়, আর কেন ঠিক নির্দিষ্ট ওই একভাবে সিস্টেমটা চলে বলেই টিকে থাকে রাষ্ট্র ব্যবস্থা?

পৃথিবীকে বোঝাবুঝির এমন এক টালমাটাল মুহূর্তে নায়কের সেই বিলিয়নিয়ার বন্ধু তাকে জানায়—না, সে ভুল; মাটির ওপরে ওভারগ্রাউন্ডে আসলে কোনো সত্যই নেই, সত্য আছে কেবল আন্ডারগ্রাউন্ডে, যেহেতু যা কিছু ঘটে তা কিছু ঘটানো হয় আন্ডারগ্রাউন্ড থেকেই। এবার আমরা মুখোমুখি হই আন্ডারগ্রাউন্ডের এক প্যারালাল পৃথিবীর, যেখানে ন্যায়-অন্যায়, বিচার-অবিচার, প্রেম-ঘৃণা, আমাদের স্বাধীনতা ও সেই স্বাধীনতা হরণকারী শোষণ ও জুলুম, এই সবকিছুর হিসাব আর বোঝাবুঝি ধনী ও গরীবে সম্পূর্ণ আলাদা। কেন?

মাটির ওপরের প্রকাশ্য পৃথিবী আর মাটির নিচের গোপন পৃথিবীর মধ্যে পার্সপেক্টিভের এত ফারাক থাকলে বর্তমান সিস্টেমের পক্ষে কী করে সম্ভব মানবসমাজের জন্য কোনো বৃহত্তর ঐক্যসূচক অর্থ খাড়া করা? তো, এভাবে কতদিন টিকবে আর এই সিস্টেম? কবে শেষ হবে এই অনাচার ও তামাশার, উন্নয়নের বর্ণচ্ছটা ও জনগণের দাবির নামে হালাল হওয়া সব নিষ্ঠুর ব্যবস্থার? আর শেষ হওয়াটা কি আদৌ জরুরি?

সঙ্গত কারণেই আন্ডারগ্রাউন্ডের সেই দুনিয়াকে দেখবার পরে নায়ক বুঝতে পারে কেন জঘন্য ওই কাণ্ডটা ঘটেছিল বরিশালে, কেন তার বড় ভাই পালাচ্ছে নিজের মায়ের কাছ থেকেও, কেন লোভের হিসাব চিরকালই করা হচ্ছে হয় টাকা না-হয় নারী শরীরের কারেন্সিতে, আর কেন ওসিপ মান্দেলস্তামদেরকে মরতেই হচ্ছে ক্ষমতা-মেশিন চালু রাখবার বৃহত্তর স্বার্থে। এসব যতই তার বোধগম্য হয়ে উঠতে থাকে, ততই তার ভাবনা এবার ঘুরপাক খেতে থাকে একটা মাত্র প্রশ্নকে ঘিরে—পৃথিবীর কোনোকিছুই যদি ভালভাবে না চলে, যদি বিপ্লব সে কারণে অনিবার্যই হয়ে ওঠে, তো সেই বিপ্লবের পরে কী?

মাসরুর আরেফিনের আরেকটি পোস্ট:

আমার কবিতা ‘নিয়ম মানতে হবে না দুনিয়াতে‘ থেকে তৃতীয় উপন্যাস ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’-এর জন্য অনেক প্রাসঙ্গিক একটি ছোট অংশ, ছুটির দিনে আপনাদের পড়বার জন্য।

যারা পুরো কবিতাটা পড়তে চান, তারা সেটা পাবেন বেশ খানিকটা নিচেরই এক পোস্টে (১৩ জুলাই ২০২০-এর পোস্ট)।

—-

স্যার, এই দেশের কী হবে যে দেশে

ডাহুক পাখি দেখতে লাগে মুরগির বাচ্চারই মতো?

পাখিগুলি খালপাড়ে ঝোপঝাড়ে কচুগাছে

পোকামাকড় খায় ধরে ধরে,

ওরা পানির নিচে ডুব দিয়ে চলে যেতে পারে দূরে দূরে

এবং এই পাখির লালা হাতে লাগলে পরে, হাত পচে খসে পড়ে।

স্যার, আমি সেই হাত-পচা ভয়ে

গেছি অ্যাপোলো হাসপাতালের গেটে;

বলেছি আমার বুক ধড়ফড় করে

ইঞ্জিন নৌকার পেছন দিকে থাকা পাখাদের মতো।

কিন্তু হাসপাতালে যারা রোগীদের ঘড়ি চুরি করে,

তারা কোনোদিনও কি স্বীকার করে আর কারা কারা

জড়িত ছিল সাথে?

তারা উল্টো বলে, তুমি ড্রাগন ভাইয়ের কথামতো

এ-জীবনে চলো নাই তাই তোমার বুকে ব্যথা।

তারপর তারা

শিমের-বিচি চালভাজা মুড়িভাজা খেতে খেতে

আমাকে অবিলম্বে থাপ্পড় মারে,

গালি দেয়,

বাড়ি দেয় ছোট লাঠি দিয়ে।

বলে, ফাইজুদ্দিন, কেন্নোর বাচ্চা তুই—ঢাকা ছাড়,

১৮০ টাকা দিয়ে ‘তিশা ক্লাসিক’ বাসে চেপে

কোম্পানিগঞ্জ পর্যন্ত গেলে যাবি,

সোজা কথা তোকে গ্রামে চলে যেতে হবে।

—স্যার এটুকুই কথা, আমি তাই এই সবকিছু নিয়ে

বিচার চাই আপনার কাছে।

আমি তখন আবার ড্রাগনকে অফিস রুমে ডাকি।

বলি—ড্রাগন, অন্যায় হয়ে গেছে, ন্যায়বিচার সবচে’ বড় কথা।

ড্রাগন এই দফা মেঝের উঁচু দিয়েও আসে,

মেঝের নিচু দিয়েও আসে।

সে বলে—স্যার, অনেককাল আগে পাবনায় বিমল বিশ্বাসের দলে

কাজ করে বুঝেছি শ্রেণীশত্রু বলে একটা কথা আছে,

আবার শহরের সৌন্দর্য বলেও তো আছে কিছু,

তাই ফেইজুদ্দিনকে কোনোদিনও মানাতো না এইখানে,

অতএব ন্যায়বিচার নিষ্পন্ন করা গেছে শহরের তরফের থেকে।

আমি তখনই সব বুঝে ফেলি যে কীভাবে

মরিচা খায় লোহা,

রেশমপোক খায় পাতা,

আর মিথ্যা খায় আত্মাকে,

যেভাবে রাশিয়ান প্রবাদে বলে,

—রাশিয়া, যেখানে বিপ্লব হয়েছিল।

তখন ড্রাগন থেমে ফের আমাকে বলে—

অ্যাপোলোর সামনে ফেইজুদ্দিন যা করেছে তা কি

বিপ্লবের চেয়ে কম কিছু?

যা গড়েছেন তার সবই আইন মেনে কি স্যার হয়েছিল?

অতএব আইনই সব থেকে বড় কথা,

আইন মেনেই তাকে বরখাস্ত করা গেছে।

 

দুই

স্কয়ার ওয়ান বেরুতে দেরি হবে

মাসরুর আরেফিন এ বিষয়ে বলছেন, ‘স্কয়ার ওয়ান’ নামের তার তৃতীয় উপন্যাস এ বছরই বইমেলায় প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনও মূল টেক্সটেরই অনেক এডিটিং ইত্যাদি বাকি থাকায় প্রচ্ছদ চূড়ান্ত হওয়া সত্ত্বেও বইটি প্রকাশ হতে দেরি হবে।প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী সব্যসাচী হাজরা। দারুণভাবে প্রচ্ছদে তুলে এনেছেন ঢাকার বিজয় সরণি স্কয়ার এলাকা, যার সংসদ ভবন প্রান্তে আমরা জানি দাঁড়িয়ে আছে চায়না-মেড ওই ফাইটার জেট। উপন্যাসে এই জায়গাটারই নাম ‘স্কয়ার ওয়ান‘, এক বিশেষ কারণে; আর এখানেই সারা দেশ থেকে এসে জড়ো হয়েছে এক লাখ দরিদ্র মানুষ—তারা বৈষম্যের অবসান চায়, তারা আকাশে উড়িয়েছে তাদের আন্দোলনের প্রতীকী পিগ-বেলুন।

নিচে দেওয়া হলো দেড় লাখ শব্দের এ উপন্যাসের মাত্র ৯০০ শব্দ। বইটা আসবে ‘কথাপ্রকাশ‘ থেকে।

———————

আমি কল্পনা করতে পারলাম না যে, কাল বা পরশু সকাল থেকে ঢাকাবাসী, ফার্মগেটের দিক থেকে সেনানিবাসের দিকে যেতে থাকা ঢাকাবাসী কুপার’স-এর পরেই আর কোনো খোলা মাঠ, আর কোনো মেহগনি-আম-মেঘশিরীষে আচ্ছন্ন পাখি ডাকা, রাতে ঝিঁঝি ও ব্যাঙ ডাকা খালি মাঠ দেখবে না। তারা তার বদলে সেখানে লেখা দেখবে—‘স্কয়ার ওয়ান—ক্যাম্প ৪১’ কিংবা ‘স্কয়ার ওয়ান—ক্যাম্প ৪২’। আর সেই ক্যাম্পগুলো থেকে ভোর-সকালে বাইরে মুখ বের করে শরীর পেছন দিকে বিরাট বাঁকিয়ে ঘুম ভাঙার হাই তুলবে, ধরা যাক, সারিয়াকান্দি, শেখের পাড়া, বীজভাটি ইত্যাদি নাম-না-জানা জায়গা থেকে আসা অগণন চরের মানুষ এবং তাদের হাতে তখন নিশ্চিত ওই সকালের সূর্যের আলোয় চকচক করবে তেল মাখানো লাঠি আর রড, আর তারা একসঙ্গে ওয়ান-টু-থ্রি বলে সেই রড বা লাঠি তাদের মাথার ওপরে তুলে একযোগে চিৎকার দিয়ে বলবে—‘গুড মর্নিং ঢাকা’।

খন্দকার আমাকে বললেন, ‘শোনেন, ভাল হবার চেষ্টা কইরেন না। শয়তান থাকেন।’

আমি তাকে আবার জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তাসমিম মনজুর কোথায়, খন্দকার সাহেব?’

তিনি আরেকটা সিগারেট ধরালেন। তার হাতে ধরা লাল রঙের বেনসন অ্যান্ড হেজেসের প্যাকেটের গায়ে উৎকটতার বিচারে পাতালে নামা এক ছবি—এক রেড়ির তেল-তিলের তেল-সরিষার তেলে পোড়া ফুসফুস, ফুসফুসের ভস্মাবশেষ বলা ভাল, ফুসফুসের অনির্বাপিত ভস্মস্তূপ বলা ভাল।

খন্দকার সিগারেটে একটা টান দিলেন এমনভাবে যে, তিনি যেন এই পৃথিবীর মন্দত্ব বিষয়ে চিন্তার পরমকে ছুঁচ্ছেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘তাসমিম কোথায় তার আমি কী জানি? তবে আপনারে আমি তো ডেভিড বিশ্বাসের গল্পটা বলছিই। ওই যে, শুধু দয়াপুর বাসস্ট্যান্ড থিকা কামারজানি পর্যন্তই তার উরসে দুইশ সত্তরটা বাচ্চা।’

আমি কেঁপে উঠলাম খন্দকারের কথায়। একদল বুলবুলি উড়ে এসে বসল আমাদের থেকে সামান্য দূরের বরইয়ের ডালে। তারা পাঁচ সেকেন্ড পরেই বরই থেকে লাফ দিল পাশের হিজলের ছায়াঘন, লম্ব-ডিম্বাকৃতির পাতায় পাতায়। হিজলের ফুল যা ছিল তা ঝরে পড়েছে ভোরেই, তবু যে কয়টা লালচে রঙ ফুল ভোর থেকে কোনোমতে আঁকড়ে ধরে ছিল মালার মতো দু একটা ঝুলন্ত মঞ্জরি, সেগুলো বুলবুলিদের ওরকম অর্গলহীন ধাক্কায় মাটিতে পড়তে লাগল টুপটাপ। বুলবুলিগুলো কিন্তু ফুল ঝরিয়েও স্থির হল না। তারা নিজেদের মধ্যে ছুটোছুটি-লাফালাফি-লড়াই চালাতে লাগল দুর্বৃত্তদের মতো—ওপর নিচ, ওপর নিচ, এই ডাল, সেই ডাল, এই মঞ্জরি, সেই মঞ্জরি।

খন্দকার দেখলেন আমি তাকিয়ে আছি হিজলটার দিকে। খন্দকার বুঝলেন, আমি কী দেখছি। তিনি বললেন, ‘এইগুলান বাংলা বুলবুল। ডেঞ্জারাস। ল্যাজের মইদ্দে রক্ত। এরায় যখন কাকরে তাড়া দ্যায়, এরায় যখন কাকরে তাড়া দ্যায়, এরায় যখন কাকজাতীয় পক্ষীরে তাড়া দ্যায়...এমন তাড়ান দিমু এইপার, দেইখখেন। আইজকে শুনলাম আমাদের পক্ষে ট্যাংক বাহিনীও আসতেছে। মাথা ঠাণ্ডা রাখেন। বাংলা বুলবুলের লড়ানি-ছড়ানি দেইখ্যা মাথা গরমের কাম নাই।’

হিজলের থেকে অল্প দূরে একটা বড়ডুমুর গাছে আমি দেখলাম এক একা বুলবুল তার লেজের ভাগের প্রাকৃতিক রক্ত-রংটুকু নিজের মাথা লেজের কাছে নিয়ে এমনভাবে দেখছে যে, মনে হচ্ছে সে কোনো তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সিম্ফনিতে যোগ দেওয়ার আগে দেখে নিচ্ছে তার স্বভাবের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে খুনখারাবি আছে কি-না।

...খন্দকার সিগারেটের শেষটুকু মাটিতে ছুড়ে ফেলে আমার চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘আপনারে স্কয়ার ওয়ানের সবচাইতে বড় নিয়মটা শিখাই সারওয়ার সাহেপ। এইখানে কোনোকিছুর হিসাপ মিলাইতে যাপেন না। কোনাকিছুরই না। হিসাপ মিলাইয়া মিলাইয়া পৃথিবীর এই অবস্থা। হিসাপ মিলানি বাদ। লোকমান সাক্ষাৎ শয়তান। সে সরকারের লোক। তারে একবার পিটাবেন, একবার আদর দেবেন। এইটাই কথা।’

আমি বললাম, ‘কিছু হিসাব যদি না-ই মিলাই তো, সামনে আগাব কেমনে?’

খন্দকার বললেন, ‘সামনে আগাইতে কেউই কয় নাই। সবকিছু ভাইঙ্গা ফেলান। সামনে না পিছে, পরে দেখা যাইপে।’ আমি তার দাঁতের তমসাচ্ছন্ন ফাঁকের মধ্যে দেখলাম বাতাস কুণ্ডলী পাকিয়ে ভেতরে ঢুকে ফের বের হয়ে এল হিসহিস শব্দ করে।

এ সময়ে পাকা সিমেন্টের ওপরে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে দেখি তাকিয়ে আছে কমপক্ষে বিশটা লোক। সন্ধ্যা প্রায় নামে নামে। আকাশে ওড়া পিগ-বেলুনটা শেষ বিকালের বাতাসে সরে গেছে সংসদ ভবনের দিকে এবং ওখান থেকেই ওই শুয়োরের বাচ্চা বেলুন তার লেজ উঁচুতে তুলে এদিকে তাকিয়ে দেখছে আমাদের কার্যকলাপ।

খন্দকার আমাকে বললেন, ‘চলেন। আমি প্লেনের ওইখানে যাপো। পরে দেখা হপে।’

আমি তার হাত চেপে ধরলাম। বললাম, ‘তাসমিমের খোঁজ দেবেন। যা চান তাই দেব। একটা মেয়ের সাথে এইটা বিরাট অন্যায়। সে আমারে বিশ্বাস করে এই স্কয়ার ওয়ানে আসছে।’

খন্দকার কেমন যেন আমার বিড়াল মার্সেলের মতো করে উঠলেন। অর্থাৎ নতুন কেউ যখন মার্সেলের লেজে ভুলে পা দিয়ে ফেলে, তখন যেভাবে মার্সেল এক বোধাতীতরকমের তন্মনা খ্যাঁহ্যাঁহ্যাঁহ্যাঁ করে ওঠে তার ব্যাঘ্রদন্ত সব বের করে, সেরকম করে উঠলেন তিনি। তাকে এভাবে খ্যাঁ করতে দেখে চারদিকে স্লোগান উঠল তার দলের লোকদের: ‘জিনারদীবাসীহইইইই এক হও।’ তারপর: ‘জিনারদী জিনারদী, জলদি করো জলদি’। তারপর: ‘আমার তোমার নেতার নাম, খন্দকার যার নাম।’

স্লোগান থামতে খন্দকার তার দু হাত রাখলেন আমার মাথার ওপরে। আমি বুঝতে পারলাম না ব্যাপারটা কী? এরপর তিনি তার একই দু হাত রাখলেন আমার বুকের ওপরে। আমি বিভ্রান্ত হলাম আরও। এরপর তিনি তার একই দু হাত ঝট করে আমার দু প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে এক পকেট থেকে নাইন এমএম পিস্তলটা বের করে সেটা মোটামুটি আমার মাথা হয়ে বুলবুলি ভরা ওই হিজল গাছের দিকে তাক করে আমাকে বললেন, ‘ডেভিড বিশ্বাসে বলছে, আপনারেও বলপে—ন্যায় অন্যায় ঠিক করছে কারেন্ট সিস্টেম, আর এই সিস্টেম চইল্যা আসতেছে চার হাজার বচ্ছর। কিছুরে অন্যায় কইলেন তো আপনি সিস্টেমটারেই মানলেন। আবার ন্যায়বিচার চাইলেন তো আপনি আইনের বইগুলাই মানলেন, জাতীয় সংসদও মানলেন, এই দেশের কোর্ট-কাচারি, জজ-বিচারপতি-ম্যাজিস্ট্রেট সবই মানলেন...।’

এইবার তিনি একটু থেমে, পিস্তলটা আমার কপালে ঠেকিয়ে, যার ফলে ওই দূরে দাঁড়ানো দিলশাদ চিল্লিয়ে উঠলেন, ‘গুলি চালান, মাথা গুলিতে ফাটাইয়া দ্যান গো’, খন্দকার ওভাবেই আমার কপালের মাঝ বরাবর পিস্তলের ভেজা ভেজা নলটা লাগিয়ে তার দু পা অস্বাভাবিক ফাঁক করে আমাকে বলে বসলেন, ‘ন্যায়-অন্যায়, বিশ্বাস-অবিশ্বাস সব বুলেট দিয়া না উড়াইয়া দিছেন তো, সিস্টেম আপনার আন্দোলনের চাপে সব একটু আলগা কইরাই ফের সব বাইন্দা ফেলপে। মাত্রক ধরেন ছয় মাসের ভিত্রে। ন্যায়-অন্যায় উড়াইয়া দেন। বিচার চাওনের কিছু নাই। ওই মাতারির তিন ছেলেরে জবাই করা হইছে।সেইটারও বিচার চাওনের কিছু নাই। জবাইটা একটা কথা। বিচার আরেকটা কথা। জবাইটা সত্য। বিচারটা মিথ্যা। একটার সঙ্গে একটার কুনো কানেকশন নাই। ডেভিড বিশ্বাস সব বলপে আপনেরে। ওই মাতারির তিন পোলারে খুন করা আজমত, খলিল আর আনোয়ারের বিচার একটাই—আজমত-খলিল-আনোয়াররে পুরস্কার দিতে হপে, তাদেরে বলতে হপে আমাদেরে পথ দ্যাখান। তারা দেখাইপে, কী কইরা গলা কাটতে হয়। বুঝলেন? যাই।’

খন্দকার চলে যাচ্ছেন। আমি স্তব্ধ হয়ে সন্ধ্যার নামতে থাকা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছি। আকাশের রং কালো হবার বদলে দ্রুত লাল হয়ে উঠছে, যেনবা ঝড় হবে, এরকম; যেনবা আকাশের রং আকাশের রং নয়, যেন কোনো একটা কপটতা, কোনো একটা চালিয়াতি চলছে দিগন্ত থেকে দিগন্তে।

তিন

ফ্রানৎস কাফকা রচনাবলীঅনুবাদ করেছেন। করেছেন ইলিয়াডের হোমার। তিনি অনুবাদকাজেও সিদ্ধহস্ত

 

মেহেদী চৌধুরী খ্যাতিমান কবি কামাল চৌধুরী‘র ছোট ভাই। মাসরুরের  ‘হোমারের ইলিয়াড’অনুবাদ বইটি নিয়ে লিখেছেন, যারা পৃথিবীর এই প্রথম মহাকাব্যটা পড়েননি, কিন্তু ট্রয় নগরীতে হেলেন-অ্যাকিলিস-হেক্টর-ইউলিসিসের গল্পটা জানার ব্যাপারে আগ্রহ আছে, তারা বাংলায় ইলিয়াড নামের সাড়ে নয় শ পৃষ্ঠার এ বইটা কিনে দেখতে পারেন। প্রকাশক: পাঠক সমাবেশ। পাওয়া যায় সব জায়গাতেই। দু রকম দামে বইটা বাজারে আছে—নীল হার্ড বাঁধাইতে ও লাল সুলভ সংস্করণে।

মেহেদী চৌধুরীর লেখা

জন কিটস এর এক বিখ্যাত সনেট “On First Looking into Chapman's Homer” যা একসময় আমাদের পাঠ্য পুস্তকে ছিলো। অনেকেই তা পড়েছেন বলে অনুমান করি। কবিতাটা মনে পড়লো হোমারের মহাকাব্য ইলিয়াডের এক মহাকাব্যিক অনুবাদ কর্ম পড়তে গিয়ে। এর অনুবাদক মাসরুর আরেফিন। গ্রন্থের নাম “হোমারের ইলিয়াড”। প্রকাশকাল ২০১৫ ও প্রকাশক পাঠক সমাবেশ।

সমকালকে নিয়ে আমাদের যথাযথ মূল্যায়নে খুব কুণ্ঠা। বিশেষ করে লেখকের জীবিত থাকাকালীন সময়ে। সে লেখক গত হলেই তাকে নিয়ে ধন্য ধন্য পড়ে যায়। এইসব কারণে বাংলাদেশে সাহিত্য, দর্শন ও চিন্তার যত অগ্রসর হবার কথা, তার কিছুই হয়নি। সমকালে গুরুত্ব না দিয়ে মৃত্যু পরবর্তীতে অথবা বার্ধক্যে পৌঁছানোর পরে লেখককে গুরুত্ব দেবার দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়া খুবই দরকার। যার উদাহরণে এই পোস্টের সূত্রপাত।

কথাসাহিত্যের গুরুত্ব বোঝার জন্য মহাকালের অপেক্ষা করার কোন প্রয়োজন নেই। খুব সহজেই তা বোঝা যায়। খালি তুলনা করে দেখুন আলোচ্য কাজের সঙ্গে তুলনীয় কোনকিছু পড়েছেন কিনা ও তাকে আপনি কেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন।

মাসরুরের ‘ইলিয়াড‘-এর অনুবাদ পড়তে গিয়ে আমার মনে পড়েছে বুদ্ধদেব বসুর কালিদাসের ‘মেঘদূত’ অনুবাদের কথা। তিনি শুধু অনুবাদ করেই থামেননি। পুরো একটি গ্রন্থ লিখেছেন সেই অনুবাদকে ঘিরে। আজ ৭০ বছর পরেও সেই গ্রন্থ সাহিত্য অনুরাগীদের সঙ্গী। মাসরুরের অনুবাদকর্ম তুলনীয় কমপক্ষে সেই কাজের সাথে। তাহলে অনুবাদে মাসরুরকে কেন বুদ্ধদেব বসুর কালিদাসের সমমর্যাদা দেব না?

মাসরুরের অনুবাদটার একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো অনুবাদক গ্রিক না জানা সত্ত্বেও মূল গ্রিক থেকে অনুবাদের চেষ্টা করেছেন। যা সম্ভব হয়েছে হোমারের ব্যবহৃত প্রতিটি গ্রিক শব্দের ইংরেজি অনুবাদ খুঁজে বের করার মাধ্যমে। এ কাজটা আগে যিনি করেছেন তিনিই বলতে পারবেন কি পরিমাণ কঠিন! আমি এরকম ভাবে একবার একটা জাপানি গানের আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করেছিলাম। মাত্র ২৫-৩০ লাইনের জন্য ৪ ঘণ্টা সময় লেগেছিলো! সেখানে মাসরুর অনুবাদ করেছেন ১৫০০০ উপরে পঙক্তি। সব মিলিয়ে অনুবাদ গ্রন্থটার ভূমিকা ইত্যাদি সহ পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯০০ উপরে!

মাসরুরের ‘হোমারের ইলিয়াড’ বাংলা ভাষার সাম্প্রতিক সময়ের এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন ও তাকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন। এই বইটা বুদ্ধদেব বসুর কালিদাসের মতোই দীর্ঘদিন পরেও মানুষ পাঠ করবে। আশা করি আপনারা যারা নানা কারণে মাসরুর আরেফিনের প্রশংসা করতে কুণ্ঠাগ্রস্থ, তারা সে সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এগিয়ে আসতে পারবেন।

পরিশেষে : মাসরুর আরেফিনের সাথে আমার কোন ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। তিনি আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড নন। আমি জীবনে একবারই তাকে একটা সাহিত্য আলোচনাতে দেখেছি। সেখানে তার সাথে আমার কোন কথা-পরিচয় হয়নি।

চার

সাক্ষাৎকার

‘আগস্ট আবছায়া’ জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০২০ পাওয়ার পর দৈনিক সমকালের কালের খেয়া সাহিত্য ম্যাগাজিনের মাসরুর আরেফিন এ উপন্যাসটি সম্পর্কে সাক্ষাৎকারে দেন। এটি নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন ১: ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য পুরস্কৃত হলেন। পাঠকেরও ভাল সাড়া পেয়েছেন এ বই নিয়ে। এর আগে কাফকা অনুবাদ করে ‘ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩’ জিতেছিলেন। সম্প্রতি আপনার তৃতীয় উপন্যাসের জন্য নতুন প্রকাশকের সঙ্গে বড় অংকের অগ্রিম রয়্যালটি চুক্তিও সম্পন্ন হল বলে জেনেছি। তাহলে মানসম্মত সাহিত্যের পাঠক এদেশে এখনও আছে? আপনার কী মতামত?

উত্তর: ‘মানসম্মত সাহিত্য‘ বলে আমরা যে ধারনাটার কথা বলি তা সাহিত্যের ক্ল্যাসিক ঘরানায় বিশ্বাস রাখার থেকে আসে, যেখানে ভাল গল্প থাকবে, ভাল একটা প্লট থাকবে যা কিনা বিশ্বাসযোগ্য এক ন্যারেশনের মাধ্যমে বয়ান করা হবে, ভাল কিছু চরিত্র থাকবে, থাকবে দারুণ কিছু সাসপেন্সভরা মুহুর্ত, চিন্তায় নাড়া দেওয়া কিছু সংলাপ, ইত্যাদি। কথা হচ্ছে, এগুলো মানসম্মত-না এমন সাহিত্যেও থাকতে পারে, যা আবার কিনা অন্য অনেকের কাছে মানসম্মত বলেও মনে হওয়া সম্ভব। বুঝতে পারছেন আমি কী বলছি? সাহিত্যের মান নিয়ে বর্ণবাদী হবার আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই।

আমার লেখাকে স্ট্যান্ডার্ড লিটারির ফিকশন হিসেবে ধরা হলেই আমি বরং উল্টো দম-আটকানো এক বোধের মধ্যে গিয়ে পড়ি। তখন মনে হয় যে, এই তো আমাকে একটা নির্দিষ্ট বর্গে আটকানো হচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট পাঠক-প্রত্যাশার মধ্যে বেঁধে রাখতে চাওয়া হচ্ছে। আমি সাহিত্যিক উৎকর্ষতায় ভরা লিটারারি ফিকশন এবং কম উৎকর্ষের নন-লিটারির ফিকশন—এসব অ্যাকাডেমিক কথায় ভরসা রাখি না। বহু কালভিনো, বহু স্তানিসোয়াভ লেমের ‘সোলারিস’ দেখি আমার প্রিয়, যা এসব মারদাঙ্গা অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেশনের বাইরের। সাহিত্য বিজ্ঞান না, কিন্তু অ্যাকাডেমিক পরিমণ্ডল এটাকেও বিজ্ঞানের মতো তত্ত্ব দিয়ে ভরতে চায়, যেন বা প্লটলাইন ধরে ‘এ’ যদি বাম দিকে বাঁকা হাঁটে তো তাহলে ‘বি’ এসে ‘এ’-কে শুধু উদ্ধারই করবে না, সে বিষয়টাকে এবার ‘সি‘-র কাছে নিয়ে গিয়ে পাঠকের মনে জ্ঞানের-বোধের-বুদ্ধির-আধ্যাত্মিকতার আলোও জ্বালাবে।

আমি আসলে ইন্টারেস্টিং, সিম্পল আবার কমপ্লেক্স, গদ্যের চাল-ভাব-ভঙ্গি রাজসিক, অভিব্যক্তি কিছুটা জার্নালিস্টিক তবু লিরিক্যাল এবং গল্পটা লেয়ারড্, পরতে পরতে খোলে এমন, আবার সবকিছু নিট বা পরিচ্ছন্ন না, বরং কিছুটা অগোছাল, কিছুটা পথ হারানো, আর সেই পথ অবশ্যই বেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন, কিন্তু তাতেও হঠাৎ হঠাৎ নন-বারোক গদ্যে জীবনের আলোকেও ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা আছে—আমি এমন এক হিউম্যান কন্ডিশন তুলে ধরা, সোশ্যাল-পলিটিক্যাল কমেন্টারিকে কিছুটা মেটাফিজিক্স ও কিছুটা অ্যাবসার্ডিটি দিয়ে মুড়ে দেওয়া, টোনের দিক থেকে একদমই আবেগে ভরা না, বরং নিরাসক্ত ও আবছায়া ঘেরা, মুডের দিক থেকে কিছুটা অসহায়, কিছুটা বিষাদময়, কিছুটা স্যুডো-চিন্তাচ্ছন্ন—এমনই, এমনই আদতে সংজ্ঞা দিয়ে ধরতে গেলে পিছলে যায় মতো কিছুকে আমার সংজ্ঞার ‘মানসম্মত সাহিত্য‘ বলি।

অনেকে বলতে চান, চরিত্রের ইনার স্টোরির দিকে মন দাও। আমার এগুলো ভাল লাগে না। যা বলছি তা ব্যক্তিগত পক্ষপাত থেকে বলছি। এসব কোনো থিওরির কথা না। চরিত্রের ইনার স্টোরি, ঠিকভাবে ডেভলাপড ক্যারেক্টার, পাঠকের আবেগ নাড়া দেয় এমন প্লট লাইন ও সেন্ট্রাল মোটিফ, আবার অনেক কিছু নিয়ে অনেক মাথা ঘোরানো কমেন্টারি—এগুলো ফ্লবেয়ারিয়ান, টলস্টয়ান, জর্জ এলিয়টিয়ান বিষয়। আমি এসবে নেই, মানে এড়িয়ে চলি।

এই এড়িয়ে চলি বলতেই একটু ফকনার-ঘেঁষা, একটু সল বেলো-ঘেঁষা, একটু অমিয়ভূষণ-ঘেঁষা যে মানসম্মত কথাসাহিত্য আমার সংজ্ঞায় খাড়া হয়ে যায়, সেটাই আমাকে বলে দেয় যে—এড়িয়ে চলার কথাটা এখানে সজ্ঞানে বলছি বলেই—এক্সপেরিমেন্টেশনের দিকে যাবার একটা পক্ষপাত আমার মধ্যে আছেই। এজন্যই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ আমি বারবার পড়ি, তাঁর নিরীক্ষার বাড়াবাড়ি সত্ত্বেও পড়ি।

আর আমি মনে করি জীবনের গল্প বলতে সাহিত্যে যা বোঝানো হয়, সে গল্প যদি আপনি কোনো কালের ইতিহাসের নিরিখে না বলেন, সেটার মধ্যে যদি ওই মানবজীবনগুলোর সময় ও স্থানের, সমাজ ও রাজনীতির ইতিহাস বয়ানের বিন্দুমাত্র ঝোঁকও আপনার না থাকে, অর্থাৎ ধরেন আপনি শুধুই ব্যক্তির মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছেন, কিন্তু সেই মনকে তার কালের প্রেক্ষাপটের ওপরে না ফেলে আপনি সাহিত্যে সময়-নিরপেক্ষ, ইতিহাস-নিরপেক্ষ কোনো গল্প বা বয়ান নিয়ে কাজ করছেন, তো, আমি সেটা পড়তে রাজি না। সেটা দেখার জন্য আমাদের সাহিত্য পড়া বাদ দিয়ে মহাখালীর মোড়ে গিয়ে দাঁড়ালেই চলে, এ কথাটা আমি সবসময় বলি।

ভাল সাহিত্য পৃথিবীর একটা না একটা দিককে, সত্যকে, জীবনের সো-কল্ড সত্যকে, আপনার সামনে হাজির করবে, আর আপনার কালে আপনারই এতদিনের না-দেখা না-জানা সেই বিশেষ সত্যকে জেনে আপনি চমকে উঠবেন, ভয়ও পেয়ে যাবেন হয়তো। ভাল সাহিত্যে ঐতিহাসিকতা—জেনারালি যেটাকে আমরা ‘রাজনৈতিক চিন্তা‘ বলে থাকি—ভাল সাহিত্যে সেটা থাকেই; আর তা কমেন্টারির মতো না হয়ে আবছায়া মতো এবং তীর্যকভাবে হলেই ভাল, কারণ তাতে আপনি ফরমাল ডকুমেন্টেশনের ট্র্যাপ এড়াতে পারেন। আবার এও কারণ যে জীবন-সত্যের বোঝাবুঝি ব্যাপারটা তীর্যকই, ডাইরেক্ট না।

প্রশ্ন ২: আমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তরটা পেলাম না যে, এদেশে ভাল বইয়ের পাঠক আছে কি নেই? আর আপনার বইগুলো তো ভাল চলছে। ওর একটাও তো সরল সোজা না, তথাকথিত সাধারণ পাঠকদের জন্য না।

উত্তর: ওই উত্তরটাই তো দিলাম। বললাম যে, আমি সাহিত্যকে কীভাবে দেখি। বললাম যে, কেন জীবনের টুকরো টুকরো গল্পের হুমায়ূন ঘরানার বয়ান, সংলাপে সংলাপে রোজকার জীবনের খণ্ডচিত্র গাঁথা—ওসব আমার পছন্দের না। মে বি হুমায়ূন ঘরানা সাহিত্যে সবচেয়ে দামী যে বিষয়, অর্থাৎ মাইমেসিস, অর্থাৎ সাহিত্য বাস্তব জীবনের আয়না বা তারই নকল রুপায়ন, সে বিষয়টা, মে বি হুমায়ূন-সুনীল ঘরানায় অ্যারিস্টটলের ‘পোয়েটিকস‘ মেনে সেই মাইমেসিস বিষয়টার প্রতিই সবচাইতে বেশি সালাম ঠোকা আছে।

কিন্তু আমি যেভাবে সাহিত্যকে দেখি, তাতে ওটা আমার মে বি পছন্দই হতো যদি ধরেন সেখানে ওই সো-কল্ড মাইমেসিস-অতিরিক্ত সত্য দেখার একটা আকাঙ্ক্ষা থাকত। যেমন ধরেন সেসব লেখায় যদি থাকত এই বিশাল ও জটিল হিউম্যান প্রজেক্টটার রোজকার সংসারের হাসি-কান্না-সুখ-দুঃখের বাইরে গিয়ে কোনো একটা কিছুর উস্কানিমূলক উন্মোচন—ধরেন লেখক তার লেখায় কোনো একটা ‘মাননীয়‘-র চেয়ার ধরে টান দিলেন, কোনো একটা আইনের বইয়ের পাতা ছিঁড়লেন, কোনো একটা লিরিক্যাল গাছের পাতার পাশাপাশি সংবিধানের পাতাও মোচড়ালেন, যা কিনা আসলে গূঢ় অর্থে পাঠককে বলে দেবে যে হুমায়ূনের সংসারগুলোয় যে লোক কিনা বড় রুই মাছ নিয়ে আজ ঘরে ফিরল, সে কেন ওইটা নিয়ে ঘরে ফিরতে পারল? আর যে কিনা কাজের মেয়েকে মারছে সে কেন ভাবছে যে ওইটা ন্যায়সম্মত মার? যেহেতু সে তাকে খাবার বেতন সব দেয়? আর তারই পাশের ফ্ল্যাটে আবার কেউ কেন আজ টানা চারদিন শুধু ডাল দিয়েই ভাত খাচ্ছে, ডাল আর কাঁচামরিচ? এবং এই ভাগ্যবিতাড়িত লোকটাই কেন ভাবছে যে সবকিছুর সমাধান আছে ধর্মে, কিম্বা আছে বালু নদীর পাড়ে বাচ্চাদের হাসির মধ্যে, কিম্বা আছে পেট্রল স্টেশনে হাতে ম্যাচ নিয়ে ঢুকে যাবার মধ্যে?

এইগুলো সব আইডিয়ালিস্টিক পৃথিবীর জন্য আমাদের আকাঙ্ক্ষা। সাহিত্যে একে নিয়ে ভাল বাদে খারাপ কিছুই বলবার থাকে না। এবং এগুলোই জীবনের টিপিক্যাল মাইমেসিসে নেই, যেহেতু সিস্টেমের বিরুদ্ধে কনস্ট্যান্টলি খোঁচা দিতে থাকার ব্যাপারটা, সিস্টেমের গায়ে খোঁচা মারতে থাকার ব্যাপারটা আমাদের মতো দুপুরের ঘুম ও গরম ভাত দিয়ে ঘি ভালবাসা বাঙালির জীবন আচরণের মধ্যে নেই। হয়তো সেটা তাদের আগের ভুলে যাওয়া কোনো স্বপ্নে আছে, হয়তো কোনো নিরাক পড়া দিনের দুঃস্বপ্নে আছে।

তবে কথা এখানেই শেষ না। কথা হচ্ছে জীবন সিম্পল না। জীবনের মাইমেসিসও তাই সিম্পল হবার কথা না। কিন্তু আজব যে, জীবন সিম্পল না হলেও অনেক ভাল সাহিত্য সত্যিকার এক পর্যায়ে গিয়ে সিম্পলই। নন্দনতত্ত্বের আর্বিট্রারিনেসের এ এক আজব সত্য। তুর্গেনেভের ‘হান্টারস অ্যালবাম’-এর প্রতিটা গল্প সিম্পল, ভৈকম মুহম্মদ বশিরের ‘পাতুম্মার ছাগল’ সিম্পল, হুমায়ূনের ‘ফেরা’—যা আমার হিসেবে তাঁর সেরা লেখা—সেটাও সিম্পল, আবার বুদ্ধদেব বসু, সতীনাথ ভাদুড়ী ও ‘হারানের নাতজামাই’-এর মানিক কতো সিম্পল। ‘ইউলিসিস’-এ এসে যে জয়েস, তা কঠিন; কিন্তু হোমার নিশ্চয়ই তাঁর গল্পের এই আধুনিক বিশশতকী রূপান্তর দেখে মজাই পেতেন, তাঁর কাছে নিশ্চয়ই ‘ডাবলিনারস’-এর চাইতে ‘ইউলিসিস’-কেই মনে হতো হিউম্যান কন্ডিশনের বেশি কার্যকরী মাইমেসিস-ঘেরা ও মাইমেসিস-উত্তীর্ণ এক বয়ান।

ভাললাগা মন্দলাগার বিষয়ে এই যে পাঠকের নিজের দেখা ও বোঝা ও রুচির চোখ, তাঁর নিজের প্রিজম, তার নিজের মোটিভেশন, সেটাও বিরাট ব্যাপার। মানুষ সাহিত্য পড়ে ভাল মানুষ হতে চায় বলে আমার মনে হয় না, কিন্তু কোনো কোনো সাহিত্যিক ভাল মানুষ হবার বয়ান সাহিত্যে বাতলে দিতে চান। আমি ভাবি, দান্তের সময়ে সেটা ঠিক ছিল, কারণ জীবন তখন অনেক সিম্পল ছিল বলে আমার ধারণা। তাই দান্তের ‘প্যারাডিসো’ আমার ভালই লাগে, কিন্তু গোর্কির ‘মা’ লাগে না। এগুলোও সোশিওলজিক্যাল ও কালচারাল পক্ষপাত। এরও ব্যাখ্যা আছে।

আমরা এক কথায় বলি—কানেক্ট করা। আপনি সুতোয় সুতোয় কানেক্ট করতে পারেন, আবার মেটাফিজিক্যালি রফিক আজাদের মতো সুতোর ওপারেও কানেক্ট করতে পারেন, যেমন কমলকুমারের ‘বাগান কেয়ারি’—দশ পৃষ্ঠার গল্প, গত পরশু পড়লাম। সেখানে তিনি আমাকে কানেক্ট করালেন পৃথিবীর নিয়মকানুন উল্টে দেওয়া এক অরাজকতা হাজির করে—‘এই তুমুল অতিকায়, দারুন ক্ষিপ্ত কর্মপদ্ধতির মধ্যে ঐ দেহখানি পড়িয়া আছে; ইহা ঠিক যে, এহেন বৃহৎ পত্তনের, যাহা আড়ে বহরে কয়েক মাইল, যথার্থ মধ্যস্থলে নহে বটে, তবু ইহাই ঐ স্থান’।—কোন্ স্থান? মানুষের মৃত্যুর কথা কেউ এভাবে বলে? আর শেষে কী? উপনিষদের উল্লেখ।

সময়কে ধরে ঐতিহাসিকের কাঁপা-কাঁপা সত্য-মিথ্যার মাঝখানের—‘যথার্থ মধ্যস্থলে নহে বটে’—জায়গাটায় টান দিলে মানুষ কানেকটেড হয় বলেই আমার মনে হয়। কারণ পৃথিবীর প্রতিষ্ঠিত, সিস্টেমেটাইজড জ্ঞানকাণ্ডের সন্তান এই আমরা, আমাদের দৌড় মোল্লার মতো মসজিদ পর্যন্তই।

তো, আমি নিশ্চয় ওইটুকু বুঝি বলে পাঠকের সঙ্গে দিন দিন আরও আরও বেশি কানেক্ট করতে পারছি, আর তাই বাংলাদেশের হিসেবে, কঠিন বইয়ের মাত্র পাঁচশ পাঠকের মিথে আবদ্ধ এক ভূখণ্ডের লেখক হিসেবে আমার বই যে দুই-চার-ছয় হাজার কপি চলছে, সেটা আপনার চোখে পড়ছে। তবে আমার পড়ছে না এখনও। পঞ্চাশ হাজার লোক যদি আমার ভাষার সঙ্গে কানেক্টই না করতে পারল তো, আমি তাহলে মুখ খুললাম কেন, মুখ বন্ধই রাখতাম—এমনই আমার ভাবনা আর আক্ষেপ।

প্রশ্ন ৩: ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আপনি দূর ইতিহাসের নিয়ানডারথাল মানুষদের ঝাড়ে-বংশে নির্মূল হওয়াকে যুক্ত করলেন কেন? এসব ব্যতিক্রমী বিষয় উপন্যাসের জন্য কীভাবে নির্বাচন করলেন? কেন করলেন?

উত্তর: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড আমাদের দেশের অনেক মানুষের জন্যই অনেক বেদনার বিষয়। আপনি ধরেন আওয়ামী লীগ পছন্দ করেন না, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে পছন্দ না করে আপনার উপায় আছে? ফরিদপুরের এক গ্রামের সাধারণ ডাল-ভাত-শোল মাছ-সজনে ডাটা খাওয়া বাঙালি কিনা ওইরকম প্রবল প্রতাপশালী পাকিস্তানি এলিট শাসকদের বলে দিলেন—গেট আউট, এখান থেকে ভাগো। তারপর দেশের সেই স্থপতি কিনা এভাবে পরিবার-পরিজনসহ দল বেঁধে মারা গেলেন নিজ বাড়িতেই।

আমার জন্য এটা ছিল ব্যক্তিগত স্মৃতি নিয়ে পড়ে থাকারও একটা অবসেসিভ বিষয়। এখানেই ১৯৭৫-এর আগস্ট আমার কাছে আবছায়া, যেহেতু স্টাইলিস্টিক বা নির্মাণকৌশল লেভেলে না, মনস্তাত্ত্বিক লেভেলে গল্পটা আমার কাছে আসছে মেমোরি প্রসেসিংয়ের টেকনিক্যাল বিষয় যে স্মৃতি ব্রেনে জমা করা ও স্মৃতি রিট্রিভ করার স্ট্রাকচার ও প্রসেস, তা হয়ে। যদিও আমার উপন্যাস মেমোরি নিয়ে কোনো এনকোডিং ডিকোডিংয়ের সেমান্টিক ঘেঁষা আখ্যান না, কোনো মেমোরি এক্সপেরিমেন্টও না।

বিষয়টা হলো, আমার নিজের ৬ বছর বয়সে বরিশালে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটা গুমোট, ছায়াচ্ছন্ন, দূরস্মৃতি রয়েছে—অতএব ফিকশনাল উপাদান আমার ব্রেনের মধ্যে ছিল শুরুতেই, মানে আদি সত্য ও আদি মিথ্যার দোটানা নিয়ে খেলা করাটা আমি বেছে নিয়েছিলাম শুরুতেই, বইটা লেখার শুরুতেই। এটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিষয়। আবার আমাদের যে ‘অন্যের হাতে ইন্টারপ্রেটেড অভিজ্ঞতা’, যা আমাদের আসে বই পড়ে, মুভি দেখে, সেখানেও আমার স্মৃতিতে জমা আছে অসংখ্য হত্যাকাণ্ড—পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধ থেকে নিয়ে আলেকজান্ডারের এশিয়া বিজয় বা আনাবাসিস, বদরের যুদ্ধ থেকে নিয়ে ক্রুসেড, আর তারও আগের দি গ্রেট মাস মার্ডার—নিয়ানডারথাল মানুষদের গণহত্যাকাণ্ড। সবই কানেকটেড—যেহেতু আমার আখ্যান ইতিহাসের আড়কাঠ ধরে দাঁড়ানো, যেহেতু আমি বলছি যে, গ্র্যান্ড হিউম্যান হিস্ট্রির স্কেলে দেখলে সবই ‘মানব ইতিহাসে ক্রূর হত্যাকাণ্ড‘ নামের কাল্পনিক বইটার সূচিপত্রে আপনি একটার পরে একটা পাবেন, এরকম।

আবার আপনি ভাববেন বিষয়টা বুঝি তার মানে ক্রনোলজিক্যালি ভারটিক্যাল কিংবা ভারটিক্যালি সাজানো ক্রনোলজিক্যাল। না। টাইমকে এবার একটু স্পেসে স্পেসে ফেলেন তো দেখবেন, ১৫ই আগস্ট নামের একটা তারিখে একইরকম, অর্থাৎ হরাইজন্টালি, অর্থাৎ তারিখটাকে স্পেসে স্থির কল্পনা করে ধরলে দেখবেন যে, ইতিহাসে শুধু ওই একটা তারিখেই খুন হয়েছে ৯ কোটির ওপরের মানুষ।

ওইটা মাইমেসিসের বাইরের বিষয়, ওইটা তাই যার সামনে আপনার নীরব থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। ওটাই মার্কেসের শতবর্ষের নীরবতা, ওটাই হোমারের ইলিয়াডের পর্ব-২১ যেখানে একিলিস লড়ে স্কামান্দার নদীর সাথে!—কী অবিশ্বাস্য মানুষের এসব ইতিহাস। ওই ভয়ানক অবিশ্বাসের নিরিখে আপনি ১৫ আগস্ট রাতে ঢাকায় ২৫ জন মানুষের করুণ মৃত্যুকে মাপবেন তো...মানে আমি চাচ্ছিলাম ‘আগস্ট আবছায়া’ সে বিচারে হত্যাযজ্ঞের, রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞের একটা আর্কিওলজি হয়ে উঠুক। আর সেটা নিয়ানডারথালদের গণহত্যার সাথে কানেক্ট করা ছাড়া কী করে সম্ভব? যদিও বলে রাখা ভাল যে, আমি জানি না নিয়ানডারথাল হত্যাযজ্ঞ কতটা রাজনৈতিক ছিল, আর কতটা সামাজিক, আর কতটা এক্সিসটেনশিয়াল। আজও একটা মানসম্মত বইও পাইনি এগজাকটলি এই বিষয়ের ওপরে।

প্রশ্ন ৪: ‘আগস্ট আবছায়া’ কি ঐতিহাসিক উপন্যাস। আপনার অভিমত কী?

 উত্তর: এটা নিয়ে সেদিনই কথা বললাম ‘ঢাকা ট্রিবিউন’ পত্রিকার সঙ্গে। বললাম যে, আমাদের ক্যাটেগরাইজেশনের প্রতি ঝোঁকই এই বইটার কপালে ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস‘ নামের ক্যাটেগরি সিল দিয়ে দিয়েছে, কারণ এটা একজন বিখ্যাত ঐতিহাসিক চরিত্রকে নিয়ে লেখা, আবার এর কিনা কেন্দ্রবিন্দু সেই মানুষটার বিষাদময় হত্যাযজ্ঞ!

কী আমাদের পোড়া কপাল যে, এস্থেটিকসের এই পোস্ট-মডার্ন সময়ে এসে বিজয়ের ইতিহাস আমাদের কাছে কমেডি, আর ট্র্যাজেডির ইতিহাস আমাদের কাছে যথাযোগ্য ইতিহাস। তো, সন্দেহ নেই বঙ্গবন্ধুর ট্র্যাজিক হত্যাকাণ্ডের ওটুকুই ‘আগস্ট আবছায়া’র মূল কেন্দ্র, যার চারপাশে বইয়ের বাকি সব ঘুরছে। এখন আপনি যদি ‘কেন্দ্রবাদী‘ পাঠক হন, মানে ‘বনলতা সেন’-ই যদি হয় আপনার কাছে জীবনানন্দ দাশ, আর গ্রেগর সামসার পোকা হয়ে যাওয়াটাই হয় আপনার কাছে ফ্রানৎস কাফকা, তাহলে ‘আগস্ট আবছায়া’ ঐতিহাসিক উপন্যাস।

আর আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে, কেন্দ্রের বাইরে বৃত্তের পেরিফেরিতে, বৃত্তের বর্হিপরিমণ্ডলেই আছে আসল সত্যগুলো, আছে জীবনের মূল গল্পগুলো, এবং কেন্দ্রে লুকিয়ে আছ কেবল তত্ত্ব—এখানে এ উপন্যাসের বেলায় এই তত্ত্ব যে মানুষ ভায়োলেন্স ঘটায়, আর রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যাপারটা নিয়মেরই মতো—তো আপনি যদি কেন্দ্রের এই তুলনামূলক কম গুরুত্বে বিশ্বাস করেন, অর্থাৎ যেটা পোস্ট স্ট্রাকচারালিস্ট চিন্তার একটা গোড়ার কথা, তাহলে ‘আগস্ট আবছায়া’ এই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুর দূর বৃত্তাকার বর্ডার লাইনজুড়ে অনেকগুলো গল্পের তিনটা টাইম ও তিনটা স্পেসে ঘটতে থাকা এক ‘অনৈতিহাসিক‘ উপন্যাস, যা চরিত্রে জার্নালিস্টিক, ভাষায় লিরিক্যাল, দর্শনে মেটাফিজিক্যাল।

আমি ইতিহাসের সামান্যটুকু নিয়ে বাকিটাকে—সাধারণ পাঁচ-ছটা চরিত্রের এই ২০১৫-র পৃথিবীতে এক নতুন আগস্ট মাসে জীবনযাপনের বিষয়টাকে—ইতিহাসের উপাদানের মতো করে উপস্থাপন করেছি। আমার পুরো প্রজেক্টটাই তাই ছিল। অতএব, বিষয়টা তার কোর লেভেলেই একটা ছন্নছাড়া মতো বিষয়। আর মানব ইতিহাস কাজে ও কর্মের বিচারে যেহেতু ছন্নছাড়া মতো, যেহেতু অ্যাকশনের বহির্বৃত্ত অ্যাকশনের কেন্দ্রকে এই ইতিহাসে এমনিতেও মানে না, তাই ‘আগস্ট আবছায়া’-কে ঐতিহাসিক উপন্যাসের বর্গে ফেলতে আমার তেমন কোনো অসুবিধা নেই। তবে সেক্ষেত্রে শেষ হাসিটা আমার।

‘ঐতিহাসিক‘ ও ‘ইতিহাস-সংলগ্ন‘, এ দুটো যে পুরো আলাদা জিনিস এবং ইতিহাস-সংলগ্নতা নিয়ে যে আজও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা ডিপার্টমেন্ট তৈরি হয়নি—হয়তো পোর্স্ট-মর্ডানিজম এগোতে এগোতে তা হবে একদিন—সে কারণে হাসি।

কীভাবে আমরা জ্ঞানের ডিপার্টমেন্টালাইজেশন করে করে সব সৌন্দর্যকে, সব সত্যকে আলুভর্তা বানিয়ে ফেলি, এটা ভাবতেই আমার হরর বোধ হয়। ‘আগস্ট আবছায়া’-র শেষ অধ্যায় মানবের সেই মেটাফিজিক্যাল ও আনসিস্টেমেটিক ও আরবিট্রারি হরর নিয়ে লেখা একটা কিছু।

প্রশ্ন ৫: আপনার উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তো পুংখানুপুংখভাবে আছে বইয়ের ২০০ থেকে ২৪৫— মাত্র এই ৪৫টা পৃষ্ঠা জুড়ে। এই অংশ পড়ে অনেক পাঠকের মধ্যে রক্ত-হিম করা, আত্মা-হিম করা একটা অনুভূতিও হয়, অনেকে কাঁদো কাঁদোও হয়ে যান। এ অংশটুকু লেখার সময়ে আপনার অনুভূতি?

 উত্তর: এই পৃষ্ঠাগুলো লেখার সময়ে আমার অনুভূতি ছিল চোরের অনুভূতি। অর্থাৎ অন্য কারও ঘরে ঢুকে পড়েছি অনুমতি ছাড়া, তা-ও সেই ঘরের মানুষদের হত্যার দৃশ্যে, যাদের কিনা মাথার মগজ মেঝেতে ও দেয়ালে, কাপড়-চোপড়ের ঠিক নেই, তারা চিৎকার করে মৃত্যু ভয়ে কাঁপছেন, তাদের বাঁচার সম্ভাবনা ঘড়ির কাঁটার সাথে হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে—উফ, আমার এটা তো তাদের প্রাইভেসির বিরাট লংঘন। ব্যাপারটা আরও আপত্তিকর, কারণ আমি কোনো ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট লিখছি না। আমি আমার লিরিক্যালি গদ্যে তাদের মৃত্যুর করুণ মুহূর্তের যথাযোগ্য সুন্দর-করুণ এক ফিকশন বানাচ্ছি। পুরো ব্যাপারটা আত্মশ্লাঘার, যেখানে লেখক সৃষ্টিকর্তার রোলে দাঁড়িয়ে জিভে প্রশান্তির চুক-চুক শব্দ করা এক মহা আত্মতৃপ্তিতে থাকেন।

কথাসাহিত্যের পুরো বিষয়টাই বানানো, মেকি, সন্দেহ নেই। জীবনের গল্পগুলো আমরা লেখকেরা সেখানে কায়দা করে বলি, একটা নির্দিষ্ট ফরম্যাটে সুন্দর বোন-চায়না প্লেটে উপস্থাপন করে বলি, ভাবিও না যে নৈতিকভাবে কিছু ব্যাপার কত ভয়ংকর হতে পারে। আমি লেখার সময় সেটা বারবার ভেবেছি এবং দ্রুত আল্লাহ-আল্লাহ করতে করতে ওই ক‘টা পৃষ্ঠা পার করেছি।

‘ঢাকা ট্রিবিউন’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আমি এও বলেছিলাম যে, আমরা ভাবি আমরা অন্যের দুঃখকষ্ট, ট্র্যাজেডি, অশ্রু নিয়ে কথা বললে অসুবিধা কী? ভাবি, সাহিত্যিকের তো সেটা করার অধিকারও আছে। এটাই আমাদের অনেক দাম্ভিক ভাবনাগুলোর একটা। লেখক হিসেবে আপনি কাল্পনিক কোনো চরিত্র নিয়ে ভাবলে তবু একটা বিবেকের পর্দা মতো থাকে, সেটা কমবেশি তাও ঠিক আছে। কিন্তু বিষয়টা যদি হয় কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে নিয়ে? বঙ্গবন্ধুর মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইতিহাসের মানুষকে নিয়ে? তারপরও আমি কী সুন্দর উপন্যাসটা লেখার সময়ে ভাবলাম যে, বিষয়টা হালাল। শুধু তা-ই না, আরও ভাবলাম যে সারা পৃথিবী জুড়ে অদৃশ্য ঘুরতে থাকা যে সহিংসতার ও দুঃখ-শোক-যন্ত্রণার সুতো, তাদের মধ্যেকার কমন ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠা করা কী এক চ্যালেঞ্জিং লেখকসুলভ কাজ।

এগুলোই ফিকশন লেখার ভ্যানিটি, এগুলোই লেখকের জোর করে, কলমের জোরে অর্জিত দম্ভ- অহমিকা-ভড়ং। এসব ভাবলে খারাপ লাগে, ওই পৃষ্ঠা ক‘টার জন্য কেমন গায়ের মধ্যে কী যেন একটা হয়।

সেজন্যই হয়তো বাকি উপন্যাস জুড়ে, বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের ওই পৃষ্ঠাগুলো লেখার পরে, আমি অতটা তীর্যক ফ্যান্টাসি-নির্ভর সময়ের পিঠে চড়ে বসা উদভ্রান্ত বালক হয়ে গেলাম। উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে সময়ের সব হিসেব যে উল্টেপাল্টে গেল, আগস্ট যে পুরো আবছায়া এক অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেল, উপন্যাসটা যে কেমন যেন বাঁকা এক অন্ধকার গলিতে গিয়ে হামলে পড়ল—হতে পারে ওই ৪৫টা পৃষ্ঠা লেখার মধ্যে দিয়ে লেখকের বেসিক ভব্যতার ও নৈতিকতার দাগ পার হওয়ার আত্মগ্লানি থেকেই ওই ব্যাপারগুলো ঘটেছিল। আমি ইতিহাসের চরিত্রগুলো নিয়ে আর কোনো ফিকশন লিখতে চাই না। ইতিহাস কর্দয, ঘৃন্য, মহিষসুলভ।

প্রশ্ন ৬: মহিষ তো বইয়ের প্রচ্ছদে আছে, পুরো উপন্যাসজুড়ে আছে। এটাই তো উপন্যাসের প্রধান সিম্বল। নাকি?

উত্তর: উপন্যাসের পেছন প্রচ্ছদেই মহিষ নিয়ে বলা আছে যে, ‘কে বানাল এই গর্বোদ্ধত, মহিষ-নিয়ন্ত্রিত পাষাণ পৃথিবী?’ মহিষ তো এখানে রূপক বটেই। সে বুনো সহিংসতার, মানবের সব খারাপের, সব দুর্বিষহ মৃত্যুময়তার ও ধ্বংসের রূপক। কিন্তু এই যুগে এসে রূপক-নির্ভর কাজ আমি কী করে করি? তাই সেই একই মহিষ এখানে মাল্টিপল লেভেলে মাল্টিপল কাজ করা শুরু করল। উপন্যাসে দেখবেন সে যেমন পৃথিবীর বিনাশক চেহারার রূপক, তেমনই সে অনন্ত প্রবাহিত ট্র্যাজেডি ও কমেডি ভরা এই মানব-দুনিয়াটার গোঁয়ারের মতো চিরবহমানতারও রূপক, যে বহমানতাকে ধরেন নয় কোটি লোক একটা নির্দিষ্ট তারিখে—১৫ আগস্ট তারিখে—মরেও স্তব্ধ করতে পারেনি।

পাশবিকতা জীবনের একটা গোড়ার সত্য, আবার যে হিজল-তমালের সৌন্দর্যের সামনে কোনো মানুষের ধরেন পাশবিক রূপ ও প্রকারে গলা কাটা হচ্ছে, সেই হিজলের-তমালের পাতায় আবার যে রোদও খেলা করছে, এই বৈপরীত্যগুলো সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত প্রশ্নবোধক সত্য, প্রশ্নটা এমন যে এসব পড়তে গেলে আমাদের মধ্যে পৃথিবী সম্বন্ধে কেন ভারটিগোর বোধ হয়? উপন্যাসে একই মহিষ এভাবে নানা সত্যকে এখানে প্রকাশ করে। বইয়ে নেপালের এক দৃশ্যে এই মহিষ পৃথিবীর মেশিনটার ঘড়ং-ঘড়ং করে চলমানতার মেটাফোরও।

থাক, এসব থিওরেটিক্যাল কথাবার্তা বলতে ভাল লাগে না। আমাদের উপন্যাসগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার থাবা থেকে বাঁচাতে হবে। এই থাবা সবকিছুকে মেকি বানায়, আবার আমাদের সব সৃষ্টিশীলতাকে নব্বুই ভাগ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরেরও করে।

প্রশ্ন ৭: লেখক হিসেবে কবিতা, অনুবাদ ও কথাসাহিত্য—কোন্ মাধ্যম আপনাকে বেশি আনন্দ দেয়? কোনটায় আপনি বেশি স্বচ্ছন্দ?

উত্তর: সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ আমি কবিতায়। আমি বেসিক্যালি কবি। আমার সেই ‘বেসিক্যালি’র প্রমাণ সবাই পাচ্ছেন আমার গদ্যেও, যেটা কিনা জাতে কিছুটা অমিয়ভূষণ, কিছুটা বিভূতিভূষণ আর টেকনিক্যালি মার্সেল প্রুস্তের গদ্য।

এই যে কমার পরে কমা বসানো বাক্য, একেকটা দরজা পার হচ্ছে বাক্য, শেষে গিয়ে উঠানে পড়ে আবার হোঁচট খেয়ে এবার বাক্য যাচ্ছে মূল গেটের দিকে, তারপর হাতের ডানে মাধবীলতার ঝাড় দেখে আবার সে শ্বাস ফেলছে নান্দনিক হাহাকারের—এটা কবিতার বিষয়। যেমন বললাম যে এটা মার্সেল প্রুস্তিয়ান গদ্যকবিতা, যা কিনা ‘আরণ্যক’-এর বিভূতিভূষণও। কবিতা আর কথাসাহিত্যের মধ্যে ফারাকটাও আমি আর ধরে রাখতে পারছি না। আমার কবিতাগুলোও কথাসাহিত্য হয়ে উঠছে। সেটা হয়তো বেশি স্যাঁ-ঝন পের্স আর বেশি উৎপল পড়বার প্রভাব।

অন্যদিকে অনুবাদ আমার অন্যরকম ভালবাসা। কাফকা ও হোমার অনুবাদ করা থেকেই আমি বাংলা গদ্য লেখা রপ্ত করেছি। আগে আমার গদ্য একদমই হতো না। ওই দুই অনুবাদের পরে বাংলা ভাষাটাই আমার কাছে সোজা হয়ে গেল। কিন্তু হাতে সময় বেশি নেই বলে, বয়স অলরেডি একান্ন আর করোনা ও নিউমোনিয়া হওয়া থেকে কেমন যেন আমার কী এক শারীরিক-মানসিক ক্ষতিও হয়ে গেছে, তাই বলছি যে, আমি অনুবাদ হয়তো আর করব না, স্যাঁ-ঝন পের্সের ‘আনাবাজ’-টাই হয়তো শেষ। কারণ নিজের মৌলিক লেখার এখনও বহু কিছু বাকি।

প্রশ্ন ৮: কী বাকি? লেখক হিসেবে আপনার গন্তব্য কী?

উত্তর: গন্তব্য হচ্ছে আমার সব লেখালেখি মিলে পৃথিবীতে মানবের জীবন বিষয়ক একটা উল্টো আয়াতে লেখা ‘ইউজারস ম্যানুয়াল‘ পাঠককে দিয়ে যাওয়া, যে ম্যানুয়ালে মূলত থাকবে যা আমরা দেখি না, যায় আমাদেরকে দেখতে দেওয়া হয় না, যা আমরা দেখতে চাইও না, সেগুলো দেখা ও জানার এ-টু-জেড।

তার মানে, মানবের সংবিধান উল্টো আয়াতে এভাবে উল্টো করে লিখতে চাওয়ার মানে হচ্ছে—আমাকে আরও অন্তত দুই শ কবিতা, আর আরও তিনটে উপন্যাস এবং মোট পঁচিশটা ছোট গল্প (মাত্র পাঁচটা লিখেছি) লিখতে হবে। কেবল তারপরই আমি আশা করতে পারি যে, আমাদের ভয়গুলো, স্বপ্নগুলো, বোকামিগুলো, সংস্কার ও কুসংস্কারগুলো এবং সিস্টেমের সামনে আমাদের নতজানু থাকবার ধর্মীয় ও সেক্যুলার, এই দুই সত্য, তিন সত্য, চার সত্যগুলো সব মাসরুর আরেফিন নামের এক উদভ্রান্ত ও খ্যাপাটে লোক সংকেতে সংকেতে, প্রচণ্ডতা ও প্রশান্তি, এ দুয়েরই আবছায়ায় বলে দিয়ে যাবে।

পাঁচ

আগস্ট আবছায়া :স্ট্রিম অব কনসাশনেসএর এক পরিপূর্ণডালিম

(আগস্ট আবছায়া নিয়ে আশানুর রহমান খোকনের একটি লেখা। উঠান নামের একটি ওয়েব পোর্টালে)

ডালিম। ফলের নাম। পাকা একটা ডালিম ফলের শক্ত খোসাটা ফেলে দিলে পাওয়া যায় দানা। শত শত দানা। সেই দানার ভিতরে থাকে আবার শক্ত বীজ। আগস্ট আবছায়া নামের উপন্যাসটি পড়ে আমার ডালিম ফলটির কথায় প্রথমে মনে এলো। আর এমনটি মনে হবার epigraph হলো দু’জন। প্রথমজন ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আর অন্যজন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।

সাহিত্যে ‘চৈতন্যপ্রবাহ’ বলে একটা কথা আছে, ইংরেজিতে যাকে ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ বলে। বাংলা উপন্যাসে সর্বপ্রথম এই তত্ত্বের সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন বোধ করি ধূর্জটিপ্রসাদই। তাঁর বিখ্যাত ত্রয়ী উপন্যাস অন্তঃশীলা (১৯৩৫), আবর্ত (১৯৩৭) এবং মোহনা (১৯৪৩) তে। ধূর্জটি বাবু ‘অন্তঃশীলা’ দিয়ে একটি বিন্দু থেকে শুরু করে নানা চড়াই-উৎরাই এর মধ্যে ‘আর্বতন’ শেষে ‘মোহনা’য় এসে বৃত্তটি পূর্ণ করেন। আর এটা তিনি করেন সার্থকভাবে। আর এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপন্যাস অন্তঃশীলা পড়ে মন্তব্য করেছিলেন,

“দাড়িমের শক্ত খোলার মধ্যে শত শত দানা, আর প্রত্যেক দানার মধ্যেই একটি করে বীজ। ‘অন্তঃশীলা’ সেই দাড়িম (ডালিম অর্থে) জাতীয় বই। বীজ-বাণীতে ঠাসা। তুমি এতো বেশী পড়েছো, এবং এত চিন্তা করেছো যে, তোমার আখ্যানকে শতধা বিদীর্ণ করে বিস্ফুরিত হতে থাকে। আমার বোধ হচ্ছিল তোমার এই গল্পটিই তোমার চরিত কথা, গল্পের দিক থেকে নয়, আচরণের দিক থেকে। তোমার গল্পের পাত্রগুলি জীবনযাত্রায় একটু ঠোকর খেলেই তাদের মাথা থেকে ভাবনা ছিটকে পড়তে থাকে। –তোমার পাত্ররা তোমার মতোই চিন্তাশীল।”

‘আগস্ট আবছায়া’ পড়া শেষে তাই আমারও ডালিমের কথাটাই কেন জানি প্রথম মাথায় এলো।

এক

‘আগস্ট আবছায়া’ কি একটি ‘অন্তর্বাস্তবতা’ নির্ভর উপন্যাস? ইংরেজিতে যাকে বলে ‘Interior Monologue’। হয়তো পুরোপুরি বলা যাবে না তবে অনেকটা যেন তাই। কেন? আগস্টের এক সন্ধ্যায় লেখক যিনি উপন্যাসটির নায়কও বটে, যাকে সবাই ডাকে প্রফেসর নামে, তাকে আমরা দেখি কাফকার গল্পের ২য় খণ্ড অনুবাদের প্রস্তুতি নিতে নিতে মার্সেল প্রুস্তু’র উপন্যাসের চতুর্থ খণ্ড নিয়ে ভাবছেন। আবার সেটা ভাবতে ভাবতে অবলীলায় চলে যাচ্ছেন দু’দিন আগে মুম্বাই সফরে তার ড্রাইভার আয়ারের কাছে। এই যে বর্তমান থেকে অতীত, অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে আসা, এরকম ঘটনা আমরা দেখতে থাকি গোটা উপন্যাস জুড়ে। আর এভাবেই মনে হতে থাকে উপন্যাসটি ‘অন্তর্বাস্তবতা’। আমরা লেখকের বর্ণনায় মার্সেল এর মধ্যেও যেন তেমনটাই দেখতে থাকি, যেমনটা ‘অন্তঃশীলা’র নায়ক খগেন বাবু তার মৃত (আত্মহত্যাকারী) স্ত্রী সবিতা’র চিতায় পোড়া গন্ধ নাকে নিয়ে অবলীলায় ভাবতে পারেন উতলানো ভাতের হাড়ির গরম মাড়ে পুড়ে যাওয়া স্ত্রীর হাত নিয়ে, কিংবা চুল না বাঁধা স্ত্রী’র সাথে কথোপকথন চালিয়ে যেতে।

দুই

মুম্বাইয়ের ড্রাইভার আইয়ারের সাথে চমৎকার একটি কর্মক্লান্ত দিন কাটিয়ে হোটেলে নেমে ভাড়া মিটিয়ে নেমে যাবার আগে আইয়ার যখন বকশিস দেবার কথা প্রফেসরকে স্মরণ করিয়ে দেয় সেই মুহুর্তে আইয়ারের সাথে লেখকের ব্যবহারের মধ্যে যে ‘নিষ্ঠুরতা’টুকু পাঠকের চোখে লাগে সেখানে এসে মনে হয় আলবেয়ার কামুর ‘আউটসাইডার’ ‘মুরসল্ট’ আর ‘আগস্ট আবছায়া’র নায়ক যেন হাত ধরাধরি করে চলে গেলো। কারণ দু’জনের মধ্যেই আবেগ আছে কিন্তু সেই আবেগ নিয়ে কোন ভান নেই, ভণিতা নেই। তাই মুরসল্ট যখন বলে “মা মারা গেছেন আজ। হয়তো গতকাল, আমি ঠিক জানি না”, এই কথার মধ্যে যেমন কোন ভান নেই। ঠিক তেমনি দু’জন কর্মক্লান্ত মানুষের একজন, ড্রাইভার, অন্যজন তার যাত্রীর কাছে বকশিস চাইলে সে যখন বলে, ‘নো, থ্যাংক ইউ’ তখন মুরসল্ট আর আগস্ট আবছায়া’র প্রফেসরের মধ্যে পার্থক্য থাকে না। তারা যেন একাকার হয়ে যায় তাদের চরিত্রের আপাততঃ নিষ্ঠুরতা নিয়ে ভণিতাহীন হয়ে।

তিন

আইয়ারের সাথে আচরণে, সরফরাজ নওয়াজের সাথে বিতর্কে, কিংবা মেহেরনাজ বা সুরভী ছেত্রির সাথে রাগ-বিরাগ-অভিমানে যে ভণিতাহীন, আপাত শীতল আচরণের প্রফেসরকে দেখি, সে যেন একই সাথে ‘অস্তিত্ববাদী’ আবার একই সাথে একান্তই ‘প্রুস্তুীয়’। অস্তিত্ববাদীদের মতো প্রফেসর যেন নিজের কাজে, সমাজের কাজে এবং দুনিয়ার সব মানুষ ও প্রকৃতির কাজে অঙ্গীকারবদ্ধ মনে করে। আর করে বলেই একদিকে যেমন সব হত্যা, খুন ও ক্ষমতার উৎসের সন্ধান শেষে নিজের মধ্যে প্রতিশোধের লিপ্সা জাগিয়ে রাখে, আবার একই সাথে প্রকৃতি, ফল, ফুল, পাখি এবং মানুষের এই পৃথিবী নিয়ে ক্ষমতাশালীদের যে দ্বন্দ্ব, তার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারে না বরং নিজের ঝুঁকি বাড়ায়, বান্ধবী মেহেরনাজ এবং সুরভীকেও হারিয়ে ফেলে। আবার একই সাথে সে ভীষণ রকম প্রুস্তুীয় অর্থাৎ ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে। অর্থাৎ সে কেবলই যেন চিন্তা করে। আর চিন্তা করতে করতে, হয় তার ক্ষমতা ক্ষয় করতে থাকে অথবা ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিতে থাকে। ‘আলবারতাইন চলে গেলে মার্সেল তাকে ফিরে আসার জন্য চিঠি লিখবে কি লিখবে না সেটা ভাবতে থাকে। চিন্তা করে চিঠি লিখলে কি কি ঘটতে পারে। এভাবে ভাবতে ভাবতে সে সময়ক্ষেপণ করে আর একদিন খবর আসে আলবারতাইন মারা গেছে’। অর্থাৎ ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। চৈতন্যপ্রবাহী উপন্যাসের যেমনটা বৈশিষ্ট্য। আর এভাবেই প্রুস্তুের উপন্যাসের মতো ‘আগস্ট আবছায়া’ও আমাদের মনে কেবলই অসংখ্য সম্ভাবনা তৈরি করেও, একটা সম্ভাবনা যেন আরেকটা সম্ভাবনাকে নাকচই করতে থাকে। তাই উপন্যাসের নায়কের ১৫ই আগস্ট নিয়ে যে ‘অবসেশন’ সেখানেই যেন কাহিনি ঘুরপাক খেতে থাকে। গল্পের বিস্তার তাই তেমন ঘটে না কিন্তু ক্রমাগত গভীরতা বাড়ে।

চার

‘আগস্ট আবছায়া’ কি পরাবাস্তববাদী বা জাদুবাস্তবতাবাদী উপন্যাস? উভয় ক্ষেত্রেই যেমনটা জাদু ও বাস্তবতার মিশেল থাকে? Obsessed প্রফেসর যখন অস্ত্র ব্যবসায়ী ইব্রাহিমের কাছে যায় অস্ত্র কিনতে তখন নানাভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার পেক্ষাপট ও কারণ বর্ণনা করতে করতে থাকা ইব্রাহিম হয়ে যায় ‘সরীসৃপ’। ৩২ নম্বর বাড়ির হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিতে প্রফেসর হয়ে যায় ‘অদৃশ্য মানব’। মার্কিন দূতাবাসে ইন্টারোগেশনের সময় প্রফেসরের নিজের শরীর পেটের ভিতর ঢুকে যায় আর তার পুরুষাঙ্গটি বের হয় মুখ দিয়ে। কিংবা যেভাবে মেহেরনাজ কোরিয়ানদের পক্ষ নেয়। বসুন্ধরা আবাসিকে কোরিয়ানদের নেতৃত্বে বিশ্বসংঘে ১০০/১০০ গজ প্রস্থ এবং ১৫০/১৫০ গজ দৈর্ঘ্যের সমান লম্বা প্রান্তরে বিশাল মহিষের ভূড়ির বর্ণনা শুনি সেটা সেই জাদুবাস্তবতায়। এই বর্ণনাও আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে থাকে যেমনটা হয়ে থাকে সব সফল জাদু বাস্তবতার গল্পে-উপন্যাসে, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বা শহীদুল জহিরের উপন্যাসে। মার্কেজের কথারই যেন সত্যতা দেখি লেখকের বর্ণনায়। জাদু বাস্তবতা বুঝাতে মার্কেজ যেমন বলেন-’ আকাশে হাতি উড়ছে বললে মানুষ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আপনি যদি বলেন ৪২৫টি হাতি আকাশে উড়ছে, মানুষ বিশ্বাস করলেও করতে পারে’। ‘আগস্ট আবছায়া’র লেখক যখন সংখ্যা দিয়ে সুনির্দিষ্ট করে বর্ণনা করেন তখন পাঠক হিসাবে আমরাও যেন বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক দোলনায় দুলতে থাকি।

পাঁচ

উপন্যাসের নায়ক প্রফেসরের দু’জন বান্ধবী আছেন। তিনি অবিবাহিত। দু’জনের সাথেই তার সম্পর্ক একই সাথে, এবং কোনটাই ‘প্লেটোনিক লাভ’ নয়। একজন তার কাছাকাছি থাকেন, তার ছাত্রী এবং বয়সের পার্থক্যও অনেক। একই সাথে দু’জন নারীর সাথে একই জনের সম্পর্ক থাকাকে ফরাসী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া বুর্জোয়া মূল্যবোধের সাথেই যেখানে সঙ্গতিহীন, সেখানে বামপন্থী সাহিত্য বোদ্ধারা যে ভুরু তুলে, নাক কুঁচকে, প্রফেসরকে তুলোধুনো করবেন তাদের ‘নৈতিকতার চাবুকে’ সেটা অনুমেয়। ‘আগস্ট আবছায়া’র লেখকের ‘ইভান তুর্গেনেভ’ প্রীতি তার লেখায় বিবৃত। সেই তুর্গেনেভের একটি কম পঠিত বা অখ্যাত একটি ছোট গল্পের নাম ‘আন্দ্রেই কলোসভ’। লেনিন নিয়ে লেখালেখির কারণে এই গল্পটি আমাকে পড়তে হয়েছিল। কলোসভ একটি মেয়েকে ভালবাসতো। ভাল সম্পর্ক থাকতেই সে মেয়েটিকে ছেড়ে যায় এবং আরেকটি সম্পর্কে জড়ায়। কিন্তু লেনিনের স্ত্রী নাজেদদা ক্রুপ্সকায়ার ধারণায় লেনিন কলোসভের প্রেমকে ‘বিপ্লবী’ মনে করতেন। কেননা কলোসভের এই প্রেমের মধ্যে তিনি দেখেছিলেন ‘প্রেমের শুচীতা’। কেন? কারণ কলোসভ তার নতুন ভালবাসার জন্য যে বদনাম বা কলঙ্ক তাতে দমে যায়নি। যখন একজন বুঝতে পারে পুরাতন সম্পর্ক তার হৃদয়কে পূর্ণ করতে পারছে না, তখন সেই সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণভাবে বের হয়ে আসতে পারলেই সে কেবল বুঝতে পারে ‘প্রেমের শুচিতা’ জিনিষটি কেমন। ম্যাড়মেড়ে, একঘেয়ে সম্পর্ক যারা টেনে চলে তাদের পক্ষে সেটা বোঝা সম্ভব নয়। আর এই কারণেই লেনিন ও ক্রুপস্কায়া গল্পটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন। কিন্তু এখানেও তো সেই এক পুরুষ, এক নারীর সম্পর্ক, একই সময়ে। অথচ ‘আগস্ট আবছায়া’র নায়কের একই সাথে সম্পর্ক দুই নারীর, আর আমরা জানতে পারি সেই দুই নারীর একজন, মেহেরনাজও বহুগামী আর সুরভী তার শারিরীক উত্তেজনা মেটায় ‘সেক্সটয়’ দিয়ে। নারী-পুরুষ সম্পর্কে উপন্যাসের কোথাও তাই ফরাসী বিপ্লব প্রসূত এক নারী এক পুরুষ বা বিপ্লবী ‘প্রেমের শুচীতা’ রক্ষিত হয়নি। আর ধর্মীয় মূল্যবোধের দিক থেকে উপন্যাসের আরেক চরিত্র সরফরাজ নেওয়াজদের শাসানি, সামাজিক শাসনে প্রফেসর-মেহেরনাজ নিয়ে বসুন্ধরায় পোস্টারিং তো আছেই। কিন্তু প্রফেসর নিজেও কি নারী পুরুষ সম্পর্কের ধারণায় সেই মূল্যবোধের প্রভাব থেকে মুক্ত? নাকি প্রেমের সম্পর্কের সূতো ঢিলা হবার মূহুর্তে একটি অসফল এবং আপাত নিরানন্দ যৌনক্রিয়া শেষে অসুখী মেহেরনাজকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আমাদের সেই ধারণাকে শক্ত ভিত্তি দিলেন? নাকি প্রফেসর নিজেও মনে করেন একই সাথে বহু নারীর সাথে সম্পর্ক থাকতে পারে? আর সেটাই যদি হবে তবে মেহেরনাজের বহুগামিতায় প্রফেসর বিমর্ষবোধ করেন কেন? আমরা দেখি লেখক যেন প্রফেসরের সম্পর্ক কোন নৈতিকতা বা মূল্যবোধের দঁড়ি দিয়ে বাঁধতে চাননি। আর তাই দেখি মেহেরনাজের সাথে বিছানায় যাওয়া আর সুরভীর সাথে ফোনসেক্স চলে কাছাকাছি সময়ে ।

দু’জন মানুষ ভালবাসলেই কি এক হয়ে যেতে পারে? কোন Gap কি থাকে না? সেই গ্যাপ কি শুধু স্থানিক যেমনটা সুরভীর সাথে? আমার ব্যক্তিগত মত পাশাপাশি বিছানায় থাকা দু’টো মানুষের মধ্যেও একটা গ্যাপ বা ফাঁকা জায়গা থাকে। সেটা যেমন একটা ‘বাফার’, কিছুটা স্বাস্থ্যকর, আবার একই সাথে সেই গ্যাপটাও মাঝে মাঝে ভরতে হয়। তাই সুরভী সেই ‘গ্যাপ’ পূরণের উপায় হিসাবে ব্যবহার করে গান, পাশ্চাত্যের গান। আর মেহেরনাজ ও প্রফেসর ব্যবহার করে ফুল, লতা, পাখি, বিভূতিভূষণ, কাফকা, প্রুস্তু, বোর্হেসকে।

ছয়

‘আগস্ট আবছায়া’র লেখক মাসরুর আরেফিন বলেছেন যে ১৫ই আগস্ট নিয়ে তাঁর obsession গত ৩০ বছরের। উপন্যাসটি লিখে সেই ‘ঘোর’ বা ‘আবিষ্টতা’ থেকে তিনি মুক্ত হয়েছেন। কিন্তু যে মানুষ ত্রিশ বছর ধরে একটা বিষয় নিয়ে ভীষণ রকম ‘ঘোর বা আবেশের’ মধ্যে থাকে তাঁর সংবেদনশীলতা সাধারণ মাত্রার নয়, তার থেকেও বেশি কিছু। সেই ঘোর কাটাতে, নিজের ভিতরের অনেক প্রশ্নের উত্তর পেতে যে উপন্যাসটি তিনি লিখলেন, অথবা বলি যে লেখাটা একদিন শুরু হয়ে শেষ হলো তার মধ্য দিয়ে তিনি কী সেই obsession থেকে মুক্তি পেলেন? আমার মনে হয় এই আপাত মুক্তি অন্য একটি ‘ঘোর’ বা obsession এর মধ্যে লেখককে ঠেলে দিয়েছে। আর দিয়েছে বলেই ‘আগস্ট আবছায়া’র মধ্যেই লেখক বলছেন ‘টুঙ্গিপাড়ার সেই বিদ্রোহের’ কথা। যার নেতৃত্বে ছিল বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাজের ছেলে বৈকুন্ঠ। ইতিহাসের কোন একটি ঘটনা যাঁকে obsessed করে, তিনি সেই obsession থেকে মুক্ত হন আরেকটিতে আবিষ্ট হতে। তাই লেখককে লিখতেই হবে ‘টুঙ্গিপাড়ার বিদ্রোহ’। আর আমরা প্রতীক্ষা করবো বৈকুন্ঠের পাশাপাশি মৌলভী শেখ আব্দুল হালিমের জন্য, যিনি সেনাবাহিনীর বেয়নটের মুখেও বঙ্গবন্ধুকে পাকছাপ ও জানাজা না পড়িয়ে দাফন করতে দিবেন না। নিশ্চিতভাবেই আমরা জানবো সেই ১৫ই আগস্ট রাতে হারিকেনের স্বল্প আলোয় বুক ভাঙা কান্না নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম কবিতাটি লেখা হবে। লিখবেন মৌলভী শেখ আব্দুল হালিম। আর এটাও জানবো যে, কবিতাটি তিনি লিখবেন আরবীতে। আমরা আরো জানবো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দ্বিতীয় কবিতাটি লিখবেন আরেক বাংলাদেশী উর্দু কবি, যিনি মাত্র ২৩ বছর বয়সে জহরলাল নেহরুকে নিয়ে ‘ভিক্ষুক’ নামের একটি কবিতা লিখে হুলিয়া মাথায় নিয়ে ইন্ডিয়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৫১ সালে। আমরা দেখবো কবি আসাদ চৌধুরীর অনুবাদে কবি নওশাদ নূরী ১৯৭৫ সালের ১৭ই আগস্ট তাঁর ‘নজমে টুঙ্গিপাড়া’য় লিখবেন,

 

“সহজ সরল গাঁয়ের মানুষ

 

মতলব-পাঁকা ঝানু বিশারদ

 

বস্তিতে থাকা বস্তিবাসীরা

 

রাজনীতি-বিশেষজ্ঞবৃন্দ

 

তোমরা কি জানো, তোমরা কি জানো?

 

পথের শুরুটা হয়েছিল এইখানে,

 

পথ খোয়া গেল, হায়, সেও এইখানে।

 

হে আমার প্রিয় অবোধ শিশুরা

 

যুদ্ধ-মাঠের অবোধ সেনানী

 

শক্ত বাজুর নৌকার মাঝি

 

মুক্ত দেহাতি নওজোয়ানেরা

 

তোমরা কি জানো, তোমরা কি জানো?

 

এইখানে থির ভূমিকম্পের গাছ

 

অগ্নিগিরির চারা আছে সাথে বোনা।”

 

সাত

আপনি যদি পপকর্ণ খেতে ভালবাসেন তবে আমার সাথে একমত হবেন যে সেই ভাললাগাটার জন্য আপনার ‘চোয়াল’ এক সময় ব্যথা করবে। কারণ পপকর্ণ তো আর গিলে খাওয়া যায় না, চিবোতে হয়। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের গদ্যটাও গিলে খাবার নয়, উপন্যাসের ভাষার সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সেই চিবানোতে। পাঠককে আরাম দেয় না বটে তবে চিবানো শেষ হলে খাওয়ার পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায়। কমা, সেমিকোলন দিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠার কখনও এক তৃতীয়াংশ বা অর্ধেকটা জুড়ে যে দীর্ঘ বাক্য তাতে ‘লিটল ম্যাগ’ চর্চার কিছুটা গন্ধ থাকলেও ভাষার উপর লেখকের গভীর দখলই নির্দেশ করে। আবার একই সাথে রবীন্দ্রনাথ যেমন ধূর্জটিপ্রসাদের উপন্যাস সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তোমার পাত্ররা তোমার মতই চিন্তাশীল’, ঠিক তেমনি এই উপন্যাসের চরিত্রগুলোও চিন্তাশীল এবং শিক্ষিত। সরফরাজ নেওয়াজের মতো মানুষগুলোকেও তাই বিদেশী ডিগ্রিধারী হতে হয়। উইলিস বার্নস্টেইনও কাব্যমোদী হয়, মার্সেল প্রুস্তু পড়ে। আর তার পাঠানো এলিজাবেথ বিশপের কবিতাটির তাৎক্ষণিক অনুবাদটি দেখে ব্রাত্য রাইসু কমেন্ট করে ‘ভয়ংকর’ বলে। আবার অস্ত্র ব্যবসায়ী ইব্রাহিমও সেখানে কোন হেলাফেলার নয়।

 উপসংহার : এভাবেই গোটা উপন্যাসটিকে আমার ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ এর আরেকটি সফল দলিল মনে হলো। আর সেই উপন্যাস পাঠের আনন্দ পেতে পাঠক হিসাবে আমাকে ডালিমের শক্ত খোসা ছাড়িয়ে শত শত দানা, আবার দানার ভিতরে শক্ত বীজের সন্ধান করতে হলো। মাসরুর আরেফিন এর এই উপন্যাস তাই টুক করে গিলে ফেলার নয়, উপন্যাসটি পাঠ করতে পাঠককে হয়তো চিবানোর প্রস্তুতি লাগতে পারে। চোয়াল ব্যথা হতে পারে তবে সব শেষে পাঠক ডালিম খাবার পরিপূর্ণ আনন্দ পাবেন বলেই বিশ্বাস করি। বাংলা সাহিত্যে ‘চৈতন্যপ্রবাহী’ উপন্যাসের ধারায় ধূর্জটিপ্রসাদের ঐ তিনটি লেখা এবং বুদ্ধদেব বসু ‘তিথিডোর’ এর পর ‘আগস্ট আবছায়া’ নিঃসন্দেহে আরেকটি শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। আর তাই কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো করে বললে বলতে হয়, এরকম একটি লেখা এই সময়ে শুধুমাত্র মাসরুর আরেফিন এর পক্ষেই লেখা সম্ভব

 

আলথুসার: বাংলা উপন্যাসের বিশ্বায়ন

 

(কামরুল হাসান দৈনিক প্রথম আলোতে ২০২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর লেখেন আলথুসার উপন্যাস নিয়ে। শিরোনাম, আলথুসার: বাংলা উপন্যাসের বিশ্বায়ন)

লেখাটি হবহু তুলে ধরা হলো :

তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘আলথুসার’।আলথুসার হলেন ফরাসি দার্শনিক; বিখ্যাত মার্ক্সবাদী। রাষ্ট্র যে একটি দমন-পীড়নমূলক যন্ত্র, এই তত্ত্বের উদ্‌গাতা তিনি। বাংলার বেশির ভাগ পাঠক তাঁকে চেনে না। ফলে, এক দুর্জ্ঞেয় রহস্য নিয়েই তারা যায় বইটি সংগ্রহ করতে। মাসরুরের ব্যাপক পঠনপাঠন ছায়া ফেলে যায় তাঁর উপন্যাসে, ফলে কখনো সেগুলো হয়ে ওঠে একধরনের কোলাজ, বিশেষ করে সে টেনে নিয়ে আসে কবিতাকে। কাহিনির সঙ্গে মিশে যায় প্রবন্ধ, ধারাভাষ্যের পাশে বসে থাকে কবিতার স্তবক।

‘আলথুসার’ পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে আমি হোর্হে লুইস বোর্হেস পড়ছি, কখনো মনে হয়েছে প্রবন্ধ পড়ছি, কখনো উপন্যাস। এটি মাসরুরের শক্তি হতে পারে, হতে পারে তাঁর দুর্বলতাও। আর এই যে একটি দিনের ভেতর এত ঘটনার ঘনঘটা, তা মনে পড়িয়ে দেয় গত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’-এর কথা। মাসরুরকে আমি বলব ডিটেলিংয়ের মাস্টার। কল্পনার অকল্পনীয় বিস্তার তাঁর লেখায়, আর ফিকশন বা উপন্যাস তো কল্পনাই। উত্তম পুরুষে লিখিত বলে তা হয়ে ওঠে বিশ্বাসযোগ্য।

‘আলথুসার’ আমার মতে একটি রাজনৈতিক উপন্যাস। রাষ্ট্র কীভাবে নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করে তার ‘হার্ডওয়্যার’ সেনাবাহিনী, পুলিশ, কর্মচারী দিয়ে, আবার তার ‘সফটওয়্যার’ প্রোপাগান্ডা, মগজধোলাই, সূক্ষ্ম প্রচারণা দিয়ে মাসরুর তা উন্মোচিত করেন এ উপন্যাসে। একদল পরিবেশবাদীর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে আসে রাষ্ট্রের নিপীড়ন, ভেতরকার কলকবজা, আর এমনকি এসব পরিবেশবাদী আন্দোলনের গতি-প্রকৃতিও। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, পৌরনীতি, সমাজবিজ্ঞান আর সংস্কৃতি, পরিবেশদূষণ ইত্যাদি নিয়ে মাসরুরের ব্যাপক পড়াশোনার প্রতিফলন ঘটতে থাকে পাতায় পাতায়। মাসরুর যে পাশ্চাত্য ঢঙের আধুনিক, তা বুঝতে সময় লাগে না। তাঁর চরিত্রগুলো ছুৎমার্গবিবর্জিত। এই আন্তর্জাতিক চরিত্র বোঝা যায় যৌনতার বর্ণনায়, যা প্রোভোকেটিভ হয়েও সীমান্ত মেনে চলে, তবে কোনোরূপ ভণিতা করে না।

ঘটনার সূত্রপাত উপন্যাসের নায়ক তরুণ ব্যাংকারের ট্রেনিং নিতে লন্ডন যাওয়া আর তার আলথুসারপ্রীতি–উদ্ভূত আগ্রহ থেকে অক্সফোর্ড স্ট্রিটের কোথাও আলথুসারের লন্ডনে অবস্থানকালে বাড়িটিকে খুঁজে বের করে স্বচক্ষে দেখার মাধ্যমে। টিউব স্টেশনে নামতেই তাকে পাকড়াও করে লন্ডনের পুলিশ। তারা ভাবে নায়ক ওই পরিবেশবাদীদের আন্দোলনে যোগ দিতে এসেছে। বস্তুত নায়ক ‘এক্সটিংশন রেবেলিয়ন’ নামের পরিবেশবাদীদের সম্পর্কে ওই পুলিশের মুখেই প্রথম শুনল, আর সে জানতই না সমুখে অক্সফোর্ড স্ট্রিটে পরিবেশবাদীরা এক বিশাল গণজমায়েত বসিয়েছে। পুলিশের হাত থেকে মুক্ত হয়ে সে ও তার দুই আত্মীয় গিয়ে পড়ে পরিবেশবাদীদের ভেতর, আর লেখক জড়িয়ে পড়ে আন্দোলনের সঙ্গে। সেখানে মেগান নামের এক মেয়ে তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তবে তার মূল আগ্রহ এই কৌতূহলোদ্দীপক পরিবেশবাদীদের আন্দোলনে প্রফেসর স্যামুয়েল ও উইলিয়াম স্কিপিং নামের কিছু ব্যতিক্রমী চরিত্র। পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের বিপক্ষে এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে গিয়েই সে ফেঁসে যায়, প্রফেসর স্যামুয়েল তাকে টানতে টানতে নিয়ে আসে এক প্রত্নঘরে, যেখানে বিরাট টেবিলের ওপর শায়িত এক তিমি—সেটাই ওই প্রজাতির সর্বশেষ তিমি, সেই তিমি আবার কথা বলে (পরাবাস্তব)।

এই পরাবাস্তবতা ছড়িয়ে আছে মাসরুরের লেখায়, বিশেষ করে তাঁর সিগনেচার গদ্যে। মাঝেমধ্যোই সে নস্টালজিক হয়ে ওঠে, তখন ভেসে ওঠে শৈশবের ধানসিঁড়ি নদী, জীবনানন্দ, বরিশাল আর ঝালকাঠি। ‘এক্সটিংশন রেবেলিয়ন’-এর সদস্য ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে সে যে সবিস্তর বর্ণনা লেখে তার কৈশোরকালের স্মৃতির, তা তো পরাবাস্তবতায় মোড়ানো। বস্তুত মাসরুরের গদ্য গতিশীল ও এলোমেলো। একধরনের মাতাল গদ্য বলা যায়, যা পা ফেলছে এলোমেলো, কিন্তু সঠিক পথেই, যাচ্ছে সে গদ্য সঠিক গন্তব্যেই। মাঝেমধ্যে সে তার কল্পনার বল্গাঘোড়াগুলোকে ছেড়ে দেয় আর তারা এসে পড়ে অধীত জ্ঞানের এক জগতে। ফলে এখানে যে গদ্যের জন্ম হয় তা অধিবিদ্যক। কখনো টাইম মেশিনে চড়ে সে লন্ডনের হাইড পার্ক থেকে চলে আসে বরিশালের মিশন রোডে, তার শৈশবে, জীবনানন্দ দাশের বাড়িতে।

এই উপন্যাসের একটি অন্যতম প্রধান দিক হলো ‘সত্যকথন’, গ্রিকরা যাকে ‘পারহেসিয়া’ বলে। এই পারহেসিয়া বা সত্যকথন উপন্যাসের নায়ক লেখককে বারবার বিপদগ্রস্ত করেছে, করেছে অজনপ্রিয়, কিন্তু সে সত্য উদ্‌ঘাটনে ও সত্যকথনে পিছপা হয়নি। বস্তুত পারহেসিয়া হলো দমন–নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য বড় হুমকি। রাষ্ট্র সত্যকে ভয় পায়। সে লুকিয়ে রাখে সত্য আর প্রচারণা করে মিথ্যা।

মাসরুরের ডিটেলিংয়ের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে লুই আলথুসার লন্ডনের যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন সেই বাড়ির প্লাম্বিং সিস্টেম নিয়ে বুড়ো ক্লেইজের বর্ণনা, যিনি আলথুসারকে শেষাবধি এক পানির পাইপের মিস্ত্রি বানিয়ে ছাড়েন। যৌন অবদমন ও ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব মাসরুরের লেখার ভেতরে পাশ্চাত্যের উপন্যাসের মতোই আড়ালহীন, কিন্তু শিল্পসম্মত। লেখকের দুর্বলতা যে নারীকে ঘিরে, সেই মেগানের দ্বিতীয় রাতেই নারীশরীরলোভী পুলিশ কনস্টেবল মার্কের শয্যাসঙ্গিনী হওয়া অ্যান্টিরোমান্টিক। তবে আধুনিক মননের লেখক কিন্তু নির্বিকার। কারণ, তাঁর কাছে চরিত্রচিত্রণই জরুরি, আর তিনিই তো তৈরি করেন চরিত্র, তিলকে তাল বানান আর কল্পনার পরিদের ছেড়ে দেন শব্দের বাগানে।

এক প্রতিভাবান মার্ক্সবাদী ফরাসি দার্শনিকের দর্শন যেমন এ উপন্যাসের বিষয়, তেমনি তাঁর জীবনের এক ভয়ংকর ট্র্যাজেডি এ উপন্যাসে বিধৃত। আলথুসার ছিলেন ঘুমের ভেতর হেঁটে বেড়ানো একজন মানুষ, যিনি বিশ্বাস করতেন পরিবার হলো নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রথম ইউনিট। মানসিক অবসাদে ভোগা এই বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ঘুমের ভেতরে গলা টিপে হত্যা করেন তাঁর স্ত্রী হেলেনকে, যিনি নিজেও বামপন্থী ছিলেন। অর্থাৎ আলথুসার একজন উন্মাদ মস্তিষ্কের খুনি। আলথুসারের পক্ষে-বিপক্ষে লেখকের তাত্ত্বিক ডিসকোর্সটি খুবই বুদ্ধিদীপ্ত, জ্ঞানসঞ্চারী নিঃসন্দেহে। কিন্তু সেসব বিশুদ্ধ দার্শনিক তত্ত্ব উপন্যাসের পাঠকদের মন ও পঠনকে ভারী করে তুলতে পারে।

প্রথম উপন্যাস থেকেই বোঝা গেছে, কোনো প্রথাগত বিষয় নিয়ে মাসরুর লিখবেন না। ছিঁচকাঁদুনে গল্প লিখবেন না, হাঁটবেন না কোনো চেনাজানা পথে। ‘আলথুসার’ তার বিষয়বৈচিত্র্যে খুবই আলাদা। এমন বিষয় নিয়ে বাংলায় কোনো উপন্যাস লেখা হয়নি। ‘আগস্ট আবছায়া’ নিয়ে যে বিতর্ক উঠেছিল, ১৫ আগস্ট নিয়ে সেটাই প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস কি না, ‘আলথুসার’ নিয়ে তেমন বিতর্ক ওঠার সুদূরতম কোনো সম্ভাবনা নেই। এই উপন্যাসের মঞ্চ লন্ডন শহর, তা আমাদের চেনাশোনা গণ্ডির এতটাই বাইরে যে মনে হয় বিদেশি কোনো উপন্যাস পড়ছি। ব্রিটিশ চরিত্রগুলো এত নিখুঁতভাবে অঙ্কিত যে তা একমাত্র পশ্চিমা লেখকদের পক্ষেই জানা সম্ভব। এভাবে মাসরুর কি উপন্যাসের বিশ্বায়ন ঘটানোর সম্ভাবনা জাগানোর সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি পাঠক থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন তাঁর বিষয়কে? উপন্যাসের ভেতর পোস্টারের বাণী, চুক্তিপত্রের ধারা ছাপানো অভিনব, প্রবহমান গদ্যের ভেতর তারা কঠিন সব প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়, তবে বৈচিত্র্য আনে নিঃসন্দেহে। পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে লেখকের পঠন-পাঠন বিস্ময়কর। ‘এক্সটিংশন রেবেলিয়ন’-এর মঞ্চে তাঁর পরিবেশসংক্রান্ত বক্তৃতা কেবল কৌতূহলোদ্দীপক নয়, জ্ঞানগর্ভ। ব্রিটিশ চরিত্রদের বেশ ভালোই অধ্যয়ন করেছেন তিনি, তাঁর লেখায় প্রবলভাবে ফুটে থাকে যৌন অবদমন, ফ্রয়েড থাকেন আলথুসারের সমান্তরাল। এসব ক্ষেত্রে মাসরুর খুবই আধুনিক, বলা যায় পাশ্চাত্যের ঘরানার। ভাবি, এসব তাকে বিযুক্ত করে নিয়ে যায় কি না উপন্যাসের এমন এক জগতে, যে জগৎটি বাংলার পাঠকের কাছে ভিনদেশ। এই যে প্রতিদিন লাখ লাখ কলকারখানার ধোঁয়া উড়িয়ে, কোটি কোটি যানবাহনের তেল পুড়িয়ে আমরা বাতাসে ছেড়ে দিচ্ছি লাখ লাখ টন কার্বন, যা উষ্ণ করে তুলছে পৃথিবীর তাপমাত্রা, যার প্রভাবে গলছে মেরু অঞ্চলের বরফ, বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, যাকে আমরা বলি গ্রিনহাউস ইফেক্ট, বনজঙ্গল ধ্বংস আর জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলা সেই বিপন্ন পৃথিবীকে রক্ষা করতে সচেতন হচ্ছে মানুষ। ‘আলথুসার’ উপন্যাসে এই পরিবেশ বিপর্যয়ের তথ্যগত ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও মেলে, সেখানে আটলান্টিকে তিমি শিকার থেকে সুন্দরবন—সব চলে আসে।

চরিত্রগুলোর মিথস্ক্রিয়ার মধ্যেই মাসরুরের কলমে ঝরনাধারার মতোই বেরিয়ে আসে প্রকৃতি বর্ণনার অনুপম গদ্য, যা একান্তই মাসরুরীয়। মনে হয়, এও এক অবসেশন মাসরুরের, তিনি তখন সেই গদ্যের মোহে উপন্যাসের কনটেক্সটকেও কিছুক্ষণ ভুলে থাকেন। তাকে উদ্ধার করে পরাবাস্তবতা। টাইম মেশিনে চড়ে এক লহমায় লন্ডনের হাইড পার্কের ভেতরকার সার্পেন্টাইন হ্রদের বৃক্ষাবলির জগৎ ছেড়ে চলে আসেন বরিশালের মিশন রোডে, জীবনানন্দ দাশের বাড়িতে। তাঁর উপন্যাসে কেবল বিলুপ্তপ্রায় ধূসররঙা তিমি নয়, কথা বলে ওঠে বিড়াল (যেন চেশায়ার ক্যাট) ও কুকুর। মাত্র দুদিনের ঘটনা নিয়ে ৩৮৪ পৃষ্ঠা লিখে ফেলার পর ঔপন্যাসিক শেষ অধ্যায়টি রেখে দেন তাঁর বাড়ি ফেরার কাহিনি বর্ণনের জন্য। বস্তুত, আমি ভাবছিলাম তিনি কীভাবে এই পরিবেশবাদী আন্দোলনকে ঘিরে মার্ক্সবাদী তত্ত্বের ডিসকোর্স উদ্‌ঘাটিত উপন্যাসটি শেষ করবেন। লেখককে, এখানে এসে মনে হলো, পথ হারানো পথিক।

‘আলথুসার’ উপন্যাসটির বিষয়বস্তু, ভাষা, ট্রিটমেন্ট—সবই জটিল। উপন্যাসের ভেতর যাঁরা প্রেম–পরিণয়–বিরহ খোঁজেন, তাঁরা হতাশ হবেন। যাঁরা তরল ও সরল গদ্য পড়ে পড়ে ভেবেছেন উপন্যাস বুঝি কিছু খুচরো সংলাপ আর পরিচিত চরিত্রের হাসি–ঠাট্টা–মশকরা, তাঁরা মাসরুরের চৌকাঠে এসে হোঁচট খাবেন। মাসরুরের গদ্য এক স্লিপওয়াকারের মতো মাতাল—ঘুরে বেড়ায়, আবার এক প্রবল যুক্তিবাদীর মতো তত্ত্বের দুনিয়ায় পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টে যায়। তার গদ্য জটিল ও প্রবহমান, নেশা–জাগানিয়া ও নস্টালজিক। বস্তুত, মাসরুরের এই উপন্যাস ঘোষণা করল নতুন ধরনের উপন্যাসও লেখা হচ্ছে বাংলাদেশে। সমকালীন বাংলা উপন্যাসে ‘আলথুসার’-এর মতো এমন বই আগে আসেনি। এর বিষয়বস্তু অভিনব ও বৈশ্বিক, ভাষা কাব্যিক ও গতিময়, প্লট জটিল এবং ডিসকোর্সটি বুদ্ধিবৃত্তিক। সুতরাং ‘আলথুসার’কে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলা যায়।

সব মিলিয়ে মাসরুর আরেফিনের ‘আলথুসার’ আমার জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে এর তুলনা আছে কি না জানি না, থাকলেও স্বল্প। ‘আলথুসার’, এককথায়, একটি মাস্টারপিস!

আলথুসার : মাসরুর আরেফিনের আরেকটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী উপন্যাসপ্রকল্প

আলম খোরশেদ

বাংলা কথাসাহিত্যের সাম্প্রতিকতম চাঞ্চল্যকর সংঘটনা মাসরুর আরেফিন। তাঁরই দ্বিতীয় উপন্যাস ‘আলথুসার’-এর (মূল ফরাসিতে উচ্চারণ আলথুসের হলেও আমরা বাঙালিরা গোড়া থেকেই এমন উচ্চারণেই অভ্যস্ত) অংশবিশেষ যখন গেল বছর দৈনিক প্রথম আলোর ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হয়, তখনই তা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল এই লেখকের। আর সেই রোমাঞ্চকর পাঠাভিজ্ঞতার সূত্রেই ধারণা করা গিয়েছিল যে, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সমকালীন কথাসাহিত্য তথা উপন্যাসের আঙিনায় এক প্রবল বিস্ফোরণের জন্ম দিতে যাচ্ছে এই আলথুসার। বস্তুত ঘটলোও ঠিক তা-ই। গেলো বইমেলার সবচেয়ে আলোচিত সিরিয়াস প্রকাশনা ছিল এটিই। শুধু তা-ই নয়, প্রথমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত, সাড়ে ছয়শত টাকা গাত্রমূল্যের এই ঢাউস গ্রন্থখানির বিক্রিও ছিল ঈর্ষণীয়রকম ভালো। আর এখন, ফেসবুকে ভেসে আসা এর বিবিধ পাঠপ্রতিক্রিয়া পড়ে মনে হচ্ছে, ঢিলটা মাসরুর মনে হয় ঠিক জায়গাতে এবং ঠিকঠাক অভিঘাত সহকারেই মারতে সক্ষম হয়েছেন।

আমার নিজেরও খুব কৌতূহল ছিল মাসরুর আমাদের যৌবনের অন্যতম প্রিয় মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ আলথুসারকে নিয়ে কীভাবে একটি আস্ত উপন্যাসের জন্ম দেন, সেই সাহিত্যিক সৃজনকর্মটি প্রত্যক্ষ করা। সত্যি বলতে কী, পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাসের প্রথম দুই অধ্যায়ে এর মূল উপজীব্য খোদ আলথুসারকেই যেন ঠিক সেভাবে পাওয়া যায়নি। তাই পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থপাঠের জন্য আগ্রহের পারদ ছিল টানটান। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, পরিবেশবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী এক্সটিংকশন রেবেলিয়ন ও তাদের তৎকালীন বিলেত-কাঁপানো গণ-অবাধ্যতা আন্দোলনের আদর্শ ও অভিঘাত বিষয়ে জানার দুর্নিবার ঔৎসুক্য। ঘটনাচক্রে, মেলাশেষে খোদ লেখকের কাছ থেকে উপহারস্বরূপ একটি সস্বাক্ষর গ্রন্থলাভের সৌভাগ্য হয় এই অধমের, যদিও তা পাঠের অবকাশ হয়নি অদ্যাবধি। অবশেষে, করোনাজনিত বাধ্যতামূলক গৃহবাসের সুযোগে হাতে তুলে নেওয়া গেল মাসরুর আরেফিনের প্রিয় আলথুসারকে। কেঁচে গণ্ডূষ করে পড়তে শুরু করি ফের একেবারে গোড়া থেকে। এবং কিমাশ্চর্যম! মাত্র দেড়দিনে একটানা পড়ে শেষ করি সাড়ে তিনশত ঠাসবুনট পৃষ্ঠার আপাতজটিল, কিন্তু একইসঙ্গে অপ্রতিরোধ্য, এই অত্যাশ্চর্য গ্রন্থখানি।

কী আছে এই বইয়ে যা পাঠককে এরকম আষ্টেপৃষ্টে টেনে ধরে? প্রথমত এর বিষয়ভাবনা। আলথুসারের মতো জটিল, দুর্বোধ্য এবং জীবনের একপর্যায়ে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়া একজন দার্শনিককে নিয়ে, তা-ও স্রেফ তাঁর জীবনকাহিনি নয়, প্রধানত রাজনীতি ও দর্শন নিয়ে, উপন্যাস লেখার ভাবনাটাই তো পাঠককে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে।

তার সঙ্গে যদি যুক্ত হয় খোদ লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে, পরিবেশবাদী সংগঠন এক্সটিংকশন রেবেলিয়নের সম্প্রতি আয়োজিত সুবিশাল, সহিংস আন্দোলনের বিশদ ও রোমহর্ষক বর্ণনা, তাহলে তো একেবারে সোনায় সোহাগা! বস্তুত এই দুই চমকপ্রদ ও ব্যতিক্রমী বিষয়ের স্বর্ণসম্মিলনে, আর লেখকের স্মার্ট, সপ্রতিভ ও আকর্ষণীয় রচনাকৌশলের গুণেই এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হয় এই উপন্যাস।

এর কাহিনিসূত্র সংক্ষেপে এরকম। উপন্যাসের নায়ক একজন রাজনীতিসচেতন, প্রকৃতিপ্রেমিক, দর্শনশাস্ত্রের অনুরাগী উচ্চপদস্থ ব্যাংকার, আলথুসারের জীবন ও কর্ম যার সার্বক্ষণিক অবসেশন। সে একটি পেশাগত প্রশিক্ষণ কর্মশালায় যোগ দিতে লন্ডন গিয়ে ঘটনাচক্রে এই জঙ্গি পরিবেশবাদী সংগঠনটি এবং তাদের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে পড়ে, এতটাই যে, এক পর্যায়ে সে তার লোভনীয় চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে, তাদের প্রস্তাবিত বাংলাদেশ শাখার দায়িত্ব নিয়ে দেশে ফিরে আসে শৈশবের স্মৃতিজড়ানো, প্রিয়কবি জীবনানন্দখ্যাত ধানসিড়ি নদীটিকে রক্ষার ব্রত বুকে নিয়ে। বলাইবাহুল্য, অচিরেই মোহভঙ্গ হয় তার। সে গভীর হতাশার সঙ্গে আবিষ্কার করে, এই বাহ্যত প্রগতিশীল পরিবেশবাদী দলটিও বস্তুত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও বৃহৎ পুঁজির ক্রীড়নকমাত্র। সে তখন তার শেষ আশ্রয়, প্রিয় দার্শনিক আলথুসারশিষ্য ফুকোর বরাত দিয়ে গ্রিক দর্শনের সেই বিপজ্জনক ‘পারহেসিয়া’ তথা ঝুঁকিপূর্ণ সত্যোচ্চারণের মধ্যেই আপাত পরিত্রাণ খোঁজে, বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস, শোষণ ও ক্ষমতার মদে মত্ত, মথিত জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অনপনেয় আগ্রাসন থেকে।

এতো গেলো স্রেফ উপন্যাসের কাহিনি তথা গল্পের অন্তর্নিহিত শক্তির জায়গাটির কথা। কিন্তু একেও বহুগুণে ছাপিয়ে যায় এই উপন্যাসের বহুস্তর কাঠামো, অনবদ্য উপস্থাপনা, অপূর্ব বর্ণনাকৌশল, স্বাদু, স্বতন্ত্র ও বুদ্ধিদীপ্ত ভাষারীতি, ডিটেলের বিশদ ব্যবহার, সর্বোপরি লেখকের অগ্রসর জীবনবীক্ষা, সমাজভাবনা ও বোধের বিস্তার। বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয় লেখকের ভাষারীতি ও ডিটেলপ্রীতির কথা।

আমরা জানি, মাসরুর আরেফিন মূলত কবি। আর তাঁর সেই অকৃত্রিম কবিসত্তার বিপুল বহিঃপ্রকাশই যেন লক্ষ করি আমরা এই গ্রন্থের পাতায় পাতায়, অবিরল বর্ণনায় ও অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণে। সেই সঙ্গে রয়েছে রীতিমতো দার্শনিক আলোচনার অফুরন্ত উৎসার : আলথুসারের তো বটেই, প্রসঙ্গত মার্ক্স, ফুকো, গ্রামসি, কান্ট, চমস্কিরও। ভাষার ওপর অপরিসীম কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ না থাকলে জটিল ও গুরুগম্ভীর দর্শনের আলোচনাকে এরকম অবলীলায় একটি উপন্যাসের শরীর ও আত্মার ভেতরে চারিয়ে দেয়া যায় না। আলথুসার তাই আর পাঁচটা উপন্যাসের চাইতে একেবারেই আলাদা। এটি একাধারে একজন শক্তিমান কবি, দায়বদ্ধ দার্শনিক এবং বিপ্লবী সমাজচিন্তকের লেখা উপন্যাস, বাংলা কথাসাহিত্যের যার সমতুল্য কিছু খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

আর মাসরুরের ডিটেলপ্রীতি ও তার অতুলনীয় প্রয়োগপ্রতিভার কথা এই স্বল্প পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না। লন্ডনের রাস্তাঘাট, দোকানপাট, সাবওয়ে স্টেশন, গাছপালার বর্ণনা থেকে শুরু করে এর পুলিশবাহিনির পোশাক, পিস্তল ও সাঁজোয়া যান, খাদ্য, পানীয়, ঔষধ, গিটার, গ্রে হোয়েল ও হোয়াইট মালবেরির বংশলতিকা এবং অবশ্যই আলথুসারের লন্ডনবাসের বিখ্যাত বাড়িটির চিত্রল বয়ান – সর্বত্রই তিনি ডিটেলের পরাকাষ্ঠা দেখান। অপরদিকে, তার শৈশব-কৈশোরের বরিশালের নদী, বৃক্ষ, পুষ্প, পাখি ও প্রকৃতি; বগুড়া রোডে জীবনানন্দের সেই বিখ্যাত ভিটেবাড়ি, কোলকাতায় ট্রামে চাপা পড়ে তাঁর করুণ মৃত্যুর দৃশ্য এবং সরু এক ফিতেরূপী, নোংরা নর্দমাসম আজকের ধানসিড়ি নদীর বিশ্রী ও বীভৎস চেহারার যে চিত্র-বর্ণ-গন্ধ ও স্পর্শময় বর্ণনা দেন তিনি, তা বাস্তবের কোনো শক্তিশালী, দূরাভিসারী ক্যামেরায় তোলা দৃশ্যচিত্রকেও বুঝি হার মানাবে। তবে, একটি কথার উল্লেখ এখানে অসমীচীন হবে না বলেই মনে করি। ডিটেল বর্ণনার প্রতি লেখকের এই দুর্নিবার আকর্ষণ, কখনও কখনও পরিমিতি হারিয়ে প্রায় মুদ্রাদোষে পর্যবসিত হবার উপক্রম হয়েছে যেন। এবিষয়ে লেখকের আরেকটু সচেতন ও সতর্ক হওয়াও জরুরি বলে মনে করেন এই বিমুগ্ধ আলোচক।

তা, সীমাবদ্ধতার কথা যখন উঠলোই তখন আরেকটু বলি। পূর্ব অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ‘প্রথমা প্রকাশনী’র বইগুলোর সম্পাদনার মান সাধারণত আশনুরূপ হয় না, তদুপরি তাদের গ্রন্থসমূহ প্রভূত মুদ্রণপ্রমাদে কণ্টকিত থাকে হামেশাই। অন্যান্য সকল বিবেচনায় অনন্যসাধারণ এই গ্রন্থটিও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে তাই অবলীলায় ছাপা হতে দেখি ‘পুনঃপৌনিক’ কিংবা ‘উদ্বিগ্নহীনভাবে’র মতো ব্যাকরণঅশুদ্ধ শব্দ, এখানে ‘ত্বরিত’ হয়ে যায় ‘তড়িত’, নৌকার ‘গুন’ পাল্টে যায় অঙ্কের ‘গুণ’ এ, ডব্লিউ এইচ অডেনের নামে ভর করে অনাকাঙ্ক্ষিত ‘এইড’ আর ‘এমব্লেম’ রূপান্তরিত হয় ত্রুটিপূর্ণ ‘এমবেলম’ এ।

খোদ লেখকের তরফেও কিছু শিথিলতা চোখে পড়ে গ্রন্থে, যা ঠিক বাঞ্ছনীয় নয়। বইয়ের ভেতরে আমরা দেখি চট্টগ্রামের বিখ্যাত কর্ণফুলি বন্দর পরিণত হয় অস্তিত্বহীন কাপ্তাই বন্দরে, ফরাসি যুক্তিবাদী দার্শনিক নিকোলা মালব্রঁশ তাঁর পৈত্রিক পদবী বদলে হয়ে যান ‘মালেব্রাঞ্চ’, আর ফরাসিভাষী গিনি দেশের উবেরচালক মামাদুকে ভুলভাল উচ্চারণে ফরাসি বলতে শুনি।

তবে, এহ বাহ্য! মাসরুর আরেফিন যে তাঁর এই দ্বিতীয় উপন্যাস আলথুসার এর মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই বাংলা কথাসাহিত্যের বহুপুরাতন, জীর্ণ ও প্রথাজর্জর অঙ্গে ও আত্মায় নতুন রক্তের সঞ্চার করে সম্পূর্ণ নতুন প্রাণের স্পন্দন জাগাতে সক্ষম হয়েছেন, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। তাঁর প্রিয়তম কবি জীবনানন্দ দাশের শতবর্ষ আগে উচ্চারিত পঙক্তিসমূহের প্রতিধ্বনি করে মাসরুরও তাই বলতেই পারেন :

‘কোনো এক নতুন-কিছুর

আছে প্রয়োজন,

তাই আমি আসিয়াছি, আমার মতন

আর নাই কেউ।’

বাংলা ভাষার প্রথম বৈশ্বিক ঔপন্যাসিক মাসরুর আরেফিনের জন্য রইল আমাদের অযুত অভিনন্দন।

 

আট

মাসরুরের  দুই কাব্যগ্রন্থের মধ্যে প্রস্তুতিকাল ১৯ বছর

লিখেছেন হানযালা হান

মাসরুর আরেফিনের প্রথম কবিতার বই ‘ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প’ বেরোয় ২০০১ সালে। সে বছর বইটি বেশ আলোচিত ছিল। তাঁর দ্বিতীয় কবিতার বই ‘পৃথিবী এলোমেলো সকালবেলায়’ বেরোল ২০২০ সালে। এর মানে এই বইয়ের জন্য তিনি প্রস্তুতি নিয়েছেন ১৯ বছর। এত বছর তিনি লেখালেখি করেননি এমনটা নয়। উপন্যাস লিখেছেন, কখনো বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ করেছেন। কিন্তু কবিতা লেখেননি বললেই চলে। লিখলেও সেসব ছাপেননি। ফলে এই বই পড়তে বসে এই ১৯ বছরের আবেগ ও যন্ত্রণার এক আশ্চর্য মিশেল টের পাওয়া যায়। মোট ২৩টি কবিতা আছে। সবই দীর্ঘ। ভাবের ঠাসবুনন। প্রথম কবিতায় লিখেছেন, ‘পৃথিবী এলোমেলো—সকালবেলায়, উন্মত্তও বেশ, আর/কারোরই নিবৃত্তি নেই অপরের ক্ষুপিপাসা থেকে, যা কিনা গন্ধবহ, ক্ষার। প্রাণ যাকে বলি তার চোলাই চলছে দ্যাখো দলমতনির্বিশেষে, যদিও কিছু কম ভেলভেটগ্রাসের চাদর পাতা আছে হিজলের পাশে।’

‘জীবনে প্রথম যেবার এ শহরে আসি’ কবিতায় সদরঘাটে এক লোক জানায়, ‘তারা প্রায় দুবছর না খেয়ে আছে—।’ এভাবে মায়ার শহরের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।

গদ্য ঢঙে লেখা কবিতাগুলোর ভেতরে একটা সুর রয়ে গেছে। এই সুর মনে করিয়ে দেয় টি এস এলিয়টের ‘দ্য লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রক’।

এই বইয়ের প্রতিটি কবিতা পড়ার সময় নতুন নতুন বোধের উদয় হয়। আমার মনে হয়, কবিতাগুলোর সার্থকতা এখানেই। হয়তো এ কারণেই হোর্হে লুইস বোর্হেস বলেছেন, ‘প্রতিবার কবিতা পড়ার সময় শিল্পের সৃষ্টি হয়।’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছে সমাবেশ।

নয়

কেন পৃথিবী এলোমেলো সকালবেলায়!

লিখেছেন, আশরাফুল আলম শাওন

এখন সময় যত যাচ্ছে, ভবিষ্যত কমে আসছে, অতীত বাড়ছে, এবং জীবন ক্রমশ আরো জটিল হয়ে উঠছে, মাঝে মাঝে খুব ভালো ফিকশনও বিরক্তিকর ও অর্থহীন লাগে। মনে হয় এই বানানো জিনিস, মনগড়া চরিত্রদের কাহিনী পড়ে আমার বা দুনিয়ার কী আসবে যাবে! আমার বিনোদনের উদ্দেশ্যও তো সেভাবে হচ্ছে না। তখন হয়তো একটু-আধটু ইতিহাস, কিছুটা রিলিজিয়াস টেক্সট, ম্যাথ-সায়েন্স-টেকনোলজি রিলেটেড কিছু পড়া যায়।

তবে যে বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য এই লেখাটা শুরু করেছি, সেই বিষয়—কবিতা, আমি পড়ি ঘটনাক্রমে। খুব একটা ইচ্ছাকৃতভাবে না। তবে আমি মনে করি আমি কবিতা বুঝি।

কবিতার একটা নতুন বই—‘পৃথিবী এলোমেলো সকালবেলায়’ বইটা, বলা ভালো বইটার বেশিরভাগ কবিতা আমাকে নাড়া দিতে পেরেছে। আমার সংবেদনশীলতা যে জায়গা থেকে কাজ করে ও প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেই জায়গাটা স্পর্শ করতে পেরেছে, সঠিক বোতামে চাপ দিতে পেরেছে। তা না হলে আমি এটা নিয়ে কেনই বা কথা বলছি!

কবিতা হচ্ছে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ধরনের আর্ট! এই কথাটার পেছনে আমার যুক্তি বা আমার দৃষ্টিভঙ্গি আগে ক্লিয়ার করি। আমাদের মানুষদের এই জগত, এই মহাবিশ্ব, এই মহাবিশ্বের সবকিছু মৌলিকভাবে যে জিনিস দিয়ে তৈরি সেটা হচ্ছে ভাষা। আমরা যা কিছু করি, যা কিছু দেখি, যা কিছু ভাবি, আমাদের সকল স্মৃতি সবকিছুই আমাদের মস্তিষ্কে ভাষার মাধ্যমে প্রসেস হয়। মানুষের মস্তিষ্ক বা কগনিটিভ সিস্টেম ইনপুট হিসাবে ভাষাকেই গ্রহণ করে এবং প্রসেস করে ভাষাকেই আউটপুট হিসাবে বের করে। আমরা যখন কিছু দেখি, আমাদের মস্তিষ্কে ভাষা প্রসেস হয়ে সেই দৃশ্য তৈরি হয়। আমাদের মস্তিষ্ক যখন কোনো স্মৃতি তৈরি করে, সেই স্মৃতিকে সে ভাষা দিয়েই সংরক্ষণ করে রাখে।

আর এই ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো এর নিয়ম বা সিনট্যাক্স। মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, মস্তিষ্ক—আমাদের কগনিটিভ সিস্টেম কাজ করে এই সিনট্যাক্সের যুক্তিতে। একজন মানুষ যখন একদম ছোট থেকে বড় হতে থাকে, সে যখন ভাষা শিখতে থাকে তখন সেই ভাষার মাধ্যমে তার মস্তিষ্কের প্রোগ্রামিং হয়। সিনট্যাক্স, অর্থাৎ কোন শব্দের পর কোন শব্দ কিভাবে বসে অর্থ তৈরি করবে—সেই লজিক দিয়েই আমাদের মস্তিষ্ক পরবর্তীতে কাজ করতে থাকে। দেখবেন, একজন পাগলও যখন কথা বলে, সে সিনট্যাক্সের বাইরে কিছু বলে না। হয়তো তার কথার কনটেক্সট ঠিক নাই, কিন্তু সিনট্যাক্স ঠিক আছে। বলা হয়, সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর সেদিন স্থাপিত হয়নি যেদিন মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখেছিল, যেদিন মানুষ প্রথম ভাষা ব্যবহার করেছিল, সেদিন সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল।

তো, কবিতার সাথে ভাষার সিনট্যাক্সের ক্ষমতার কী সম্পর্ক?—কবিতা এই সিনট্যাক্সের ক্ষমতা ও কার্যকারিতাকে সবচেয়ে যথাযথভাবে ব্যবহার করে। সিনট্যাক্সকে একটু অন্যভাবে ব্যবহার করে, খুব সামান্য আয়োজন করে, খুব অল্প চেষ্টায় অনেক বিরাট অর্থ বা মেসেজ বা কথা বলে দেয়। অন্য কোনো আর্ট ফর্ম ব্যবহার করলে যেটা করতে বিরাট আয়োজনের দরকার হতো। এবং সিনট্যাক্সের অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে সেই আর্টফর্ম এত ভালোভাবে বা এত যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারত না। এবং এইভাবে কবিতা ভাষার নতুন নিয়ম বা নতুন সিনট্যাক্সও তৈরি করে।

যে বইয়ের কবিতাগুলি নিয়ে কথা বলার জন্য আমি এই লেখা লিখছি—সেখান থেকেই উদাহারণ দিই:

 

অ্যালেক্সা, যুদ্ধ কি বাস্তবেই হয়েছিল,

বাস্তবেই অগ্নিশালায় কুশাসনের ওরা

কথা বলছিল ক্রুজার ডেস্ট্রয়ার নিয়ে?

তুমি সেই নদীর নামটুকুই জানো

কপোতাক্ষ সেটা,

দেখি ক্রুজারের নাম কী ছিল বলো,

সেই সাবমেরিন সেই টর্পেডো-বুলেট...

তোমার কথামেশিনও কি ওদেরকে ডাকে ‘কমরেড’?

ওকে!

দেখি বলো তাহলে তোমার ওই একঘেয়ে সুরে একটানে

এই জীবনের মানে

অ্যামাজনের অ্যালেক্সা যন্ত্রটিকে এখানে প্রশ্ন করা হয়েছে কোনো একটা ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে। ঐতিহাসিক সেই যুদ্ধের ঘটনা এখানে তৈরি করা হয়েছে জাস্ট কয়েকটা নৌ-যুদ্ধযানের কথা বলে। মজার ব্যাপার হলো, সেই যুদ্ধাস্ত্রগুলির মধ্যে হঠাৎ করে কী এক উদ্দেশ্যে কপোতাক্ষ নদীর নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথায় অ্যালেক্সা, কোথায় ক্রুজার আর সাবমেরিন আর কোথায় যশোরের কপোতাক্ষ! কিন্তু এই সবকিছু দিয়ে একটা ধাঁধার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে অ্যালেক্সাকে। চরম ক্ষমতাবান মেশিনের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে—মেশিন মানে যে কোনো যন্ত্র—সেটা অ্যালেক্সাই হোক বা বা ‘সাবমেরিন-টর্পেডো-বুলেট’; “তোমার কথামেশিনও কি ওদেরকে ডাকে ‘কমরেড’?”

কিন্তু পরের লাইনেই এসে পুরো সিনারিও বদলে গেছে, কারণ অ্যালেক্সা এখানে কোনো বিষয়ই না, সম্বোধন করার জন্য একটা সাবজেক্ট মাত্র। বরং এখানে উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন—অ্যালেক্সাকে জিজ্ঞাসার ভান করে, মানবজাতিকে বা নিজেকেই বিদ্রুপের সাথে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে:

ওকে!

দেখি বলো তাহলে তোমার ওই একঘেয়ে সুরে একটানে

এই জীবনের মানে

মানে, এই জীবনের মালিক, যে আমি কথা বলছে, সে নিজেই তার জীবন ও বহুকাল ধরে ঘটতে থাকা এতসব ঘটনার অর্থ ও উদ্দেশ্য জানে না, আর অ্যালেক্সা তুমি আসছো বাহাদুরি দেখাতে! কতটা মারাত্মক বোকা তুমি অ্যালেক্সা!

থার্ড পারসন অ্যালেক্সাকে উদ্দেশ্য করে বলার ভান করে, যে বলছে সে নিজেই একটা সাবজেক্ট হয়ে গেল—একই পঙক্তির মধ্যে মাত্র একটা লাইনের ব্যবধানে, শুধু সিনট্যাক্সকে একটু অন্যভাবে ব্যবহার করে, বলার ভঙ্গির মধ্যে একটা ধাঁধা বা হেঁয়ালি তৈরি করে।

বাংলা বা যে কোনো কবিতার যে প্রচলিত ভাষা, এই বইয়ের কবিতা সেটা থেকে আলাদা। আর এই ২০২০-১৯ সালে এসে সময়ের যে স্বাদ ও গন্ধ, এই বইয়ে সেটা আছে; ২০২০-১৯ সালে, আশির বা নব্বইয়ের দশকের বাতিল হয়ে যাওয়া স্বাদ এই বইতে অন্তত পাওয়া যাবে না।

এই বইয়ের বেশিরভাগ কবিতা আমাকে কেন নাড়া দিল! আমার কাছে কেন অসাধারণ মনে হলো! অ্যালেক্সা বা এআই-এর মতো আধুনিক ও সময়োপযোগী জিনিস এসেছে এই কারণে? সিনট্যাক্সের ধাঁধা আছে, এই কারণে?—না। সরল উত্তর—এই কবিতাগুলির বিষয় ও কবিতার সাটেলটি বা সূক্ষ্মতার কারণে। কবিতা বা যে কোনো আর্টের অসাধারণ হয়ে ওঠার পেছনে দুটি জিনিসের গুরুত্ব অনেক বেশি—উইট বা বুদ্ধিমত্তা ও সাটেলটি বা সূক্ষ্মতা। উইট তো আছেই, যে বিষয়গুলি নিয়ে এই বইয়ে কথা বলা হয়েছে, সেই বিষয়গুলি নিয়ে এত সূক্ষ্মভাবে কথা বলা, প্রশ্ন করা, চ্যালেঞ্জ করা এবং সবচেয়ে বড় কথা, বিদ্রুপ করা—জেনারেলি কোথাও পাওয়া যায় না।

এই বইয়ের দুই-একটা বাদে, সব কবিতাকে বলা যায় দুইটা ধরনের মধ্যে—দার্শনিক ও রাজনৈতিক; ফিলোসফিক্যাল ও পলিটিক্যাল। এবং যে কবিতাগুলি রাজনৈতিক সেগুলিও কোনো একটা পর্যায়ে গিয়ে একটা দার্শনিক প্রশ্ন নিয়ে আসছে; আবার যে কবিতাগুলি দার্শনিক কোনো একটা ধারণাকে প্রশ্ন করছে সেটাও কোনো এক পর্যায়ে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। যেমন, ‘জীবনের মানে’ নামে যে কবিতা আছে, এখানে এই বিষয়টাই একটা দার্শনিক চেতনা থেকে আসা। ‘জীবনের মানে’ নিয়ে যদি কবিতা লেখা হয়, সেটা নিশ্চিতভাবেই একটা দার্শনিক চেষ্টা হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে কবিতাটার জার্নি মূলত একটা রাজনৈতিক বোঝাপড়া, দার্শনিক ভূমিতে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। অনেক দীর্ঘ সময়ের মাপকাঠি দিয়ে ইতিহাসকে দেখলে, অনেক উপর থেকে দেখলে, কোনো একক ব্যক্তির জীবনের মানে বলে কিছু হয় না, কারণ একজন ব্যক্তিসত্তা বলে কিছু আর আলাদা করা যায় না। একটা কম্যুনিটির বা জনগোষ্ঠীর সংগ্রামের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই সামগ্রিকভাবে তাদের জীবনের মানে হয়ে ওঠে। এখানে বলা হয়েছে, হিটলারের আমলে নাৎসিদের জীবনের মানে ছিল হিটলারের নাৎসিবাদ, মুসলমানদের ক্ষেত্রে সেটা হয়তো হতে পারে ইমাম মাহদীর জন্য অপেক্ষা। কিন্তু পরে এই কবিতাটা আরো বড় একটা রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে নিয়ে গেল—এক বর্ণবাদী জার্মান জেনারেল, যার এশিয়ান, আফ্রিকান ও মুসলিমদের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা—তার বক্তব্যের মাধ্যমে। কিন্তু, মজার ব্যাপার হলো, এই জার্মান জেনারেলের এই ঘৃণাটাও কোনো একজন ব্যক্তির একক অনুভূতি না, বরং তা পুরো ওয়েস্টের, পুরো পাশ্চাত্যের এই এশিয়া, আফ্রিকা ও মুসলিমদের প্রতি সামগ্রিক একটা অনুভূতি। কখনো মোলায়েমভাবে চাপা দেওয়া, কখনো খুব কুৎসিতভাবে প্রকাশিত।

একইরকম ঘটনা ঘটছে ‘সম্ভবত আক্রোশ থেকে’ নামের এই কবিতাটাতেও। ‘আমি কে’ এই দার্শনিকভাবে ক্লিশে অথবা ক্লাসিক প্রশ্ন নিয়ে কথা বলা হয়েছে—কিন্তু দার্শনিক কোনো রাস্তার ধারেকাছে যাওয়া হয় নাই। অসাধারণ এই জিনিসটা হয়ে উঠেছে ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ নিয়ে একটা সূক্ষ্ম বিদ্রূপ—একজন মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক, শ্রেণীগত, পারিবারিক, পলিটিক্যাল, জাতিগত এত এত পরিচয়ের কারণে পৃথিবীতে এত বিশৃংখলা তৈরি হচ্ছে, কেউ এই পরিচয় ব্যবহার করে আক্রমণ করছে, কেউ বা এই পরিচয়ের কারণেই আক্রমণের শিকার হচ্ছে।

এই বইয়ের বেশিরভাগ বা বলা ভালো সবগুলি কবিতাই একটা কাজ করছে—রাজনৈতিক ও দার্শনিক বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করছে। সবগুলি কবিতায়ই রাজনৈতিক বক্তব্য ও ফিলোসফিক্যাল বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করার মিশ্রণ ঘটেছে। আর সেই কাজ করতে গিয়ে মাসরুর আরেফিন, কোনো নির্দিষ্ট ডিসকোর্সের বা বক্তব্যের ভিতর দাঁড়িয়ে নেই, বা কোনো একটা কনটেক্সটের মধ্যে আবদ্ধ থাকেননি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, বিশেষ করে বইয়ের প্রথমদিকের কবিতাগুলিতে, শেষের দিকের কবিতাগুলিতে তিনি একটা কসমিক, একক ভয়েসে, অনেক উপর থেকে, অনেক বড় একটা টাইম ফ্রেমে দেখছেন এমন টোনে কথা বলছেন। কোনো একটা নির্দিষ্ট ঘটনা বা উদাহারণ নিয়ে আসলেও তিনি সেটাও একটা মহাকালের, মহাজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছেন। অনেকটা এরকম—মানবজাতি তোমরা তো অনেক কথাই বলছো, অনেক সিরিয়াস ভাব দেখাচ্ছো, কিন্তু তোমার এই সবকিছুই তো একটা আত্মপ্রবঞ্চনা। তুমি যতই পাশ কাটাও, তোমার এই সবকিছুর যে কোনো মানে নেই, এই সবকিছু যে তোমাকে কোথাও নিয়ে যাবে না—এর চেয়ে বড় সত্য তো আর নেই। সরাসরি বললে, উনি স্ক্রিপচারের টোনে কথা বলছেন। স্ক্রিপচারের টোনটা কেমন? বাইবেল—ওল্ড টেস্টামেন্ট, নিউ টেস্টামেন্ট বা ধর্মগ্রন্থের যে টোন, সেই টোন। ধর্মগ্রন্থের এই টোন এই বইয়ের কবিতার একটা ইউনিক বৈশিষ্ট্য, এবং সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। বাংলা ভাষায়, ধর্মগ্রন্থের এই কসমিক টোনে এত সাবলীল বা স্বচ্ছন্দভাবে লেখার উদাহারণ আর নাই। আমি আর সব বাদ দিয়ে, শুধু এই একটা কারণ, শুধু এই স্ক্রিপচারের কসমিক টোনের জন্য এই বইটা বেছে নিতে রাজি আছি। এটা পুরোপুরিভাবে ইউনিক এবং মুগ্ধ করার মতো।

যেমন এই বইয়ের ‘রিক্ততা’ কবিতাটা—এটা যে কী শক্তিশালী কবিতা! এখানে যে চরিত্ররা আসছে তাদের নাম, যেসব ঘটনা ও ভৌগোলিক বর্ণনা এসেছে মনে হয় এখানে বিপরীত বা উলটা-এক্সোডাসের মতো কিছু একটা তৈরি হয়েছে। মুসা নবীর নেতৃত্বে হিব্রু জনগোষ্ঠী লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে যে মহিমান্বিত এক্সোডাস ঘটিয়েছিল, এখনকার দুনিয়ার এই অর্থহীন রাজনৈতিক বাস্তবতা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে—হয়তো তাদেরই কারণে, এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে একদল উদ্বাস্তু মানুষের ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা—কত অবর্ণনীয়, কিন্তু বাস্তব:

যখন আর্মার্ড বক্সার ভেহিকলগুলো লাইম পাড়তে আসে,

কেমন হুম হুম শব্দ আসছে দূরের ওই

কাণ্ডারী-হারানো জাহাজের থেকে,

রানিম আবুদকে ডেকে ডেকে বলছিল,

আমাকে নিয়ে যেয়ো, বাবু, আমাকে নিয়ে যেয়ো সাথে,

কেমন খ ধ্বনির হাসি চাপছিল ফটো সাংবাদিক মেয়েটা নিজেই পানিতে পড়ে গিয়ে,

তখনই বাঁশি—আমাদেরকে বলা হলো পন্টুনের থেকে দূরে সরে যেতে।

আমিও এই ফাঁকে কবিতা লেখার অবকাশ পেয়ে

বুঝলাম পৃথিবী শূন্য পৃথিবী ফক্কা পৃথিবী ফোঁপরা বটে;

 

এরকম অসংখ্য উদাহারণ পাওয়া যাবে এই বইয়ের অনেক কবিতায়, অনেক লাইনে। যেমন ভোরের গল্প কবিতাটা, এটা পুরাই একটা কেয়ামত:

 

তো, সেইখানে দেখি মেঘের একপাশে কী গাঢ়

লাল আভা, অগ্নিগিরি যেন, অন্য পাশ কালো,

পৃথিবী তবু শান্ত বটে, জাগছে দূরে

বনশ্রী-রামপুরা দিগন্তরেখা ধরে—

মনে হলো ব্যাপারটা এমনই কি হবে মহাপ্রলয়ের দিনে?

এরকম বিভ্রান্তকরই হবে তবে, যেভাবে আগুন

লেগেছে বলে মনে হচ্ছে প্রথম সারির মেঘেদের পেছনের দিকে?—

হাহ্ আজকেই কি সেই মহাপ্রলয়ের দিন না-কি?

 

এরকম বহু বহু উদাহারণ আছে। যেমন:

এটাও বিশ্বাস করো, ওইটাও করো, এই তো চেহারা!

আর জীবনে যা যা করেছো খোকা তুমি,

তার দাম দিতে হবে না বলো?

 

এখানে এসে—এই কসমিক স্বরের কারণে আমার একটা স্প্যানিশ প্রবাদের কথা মনে পড়েছে—“Take what you want and pay for it, says God.”

“আর জীবনে যা যা করেছো খোকা তুমি,

তার দাম দিতে হবে না বলো?”

জীবনে সবকিছুই করা যাবে, যা খুশি তাই, শুধু তার উপযুক্ত দামটা পরিশোধ করতে হবে। এর চাইতে বেশি সরল এবং অনিবার্য আর কী হতে পারে?

এই বইয়ের অনেক কবিতাতে প্রকৃতি খুব বড়ভাবে আসছে, খুব তাৎপর্যপূর্ণভাবে ‘এতগুলি ব যেহেতু আছে’ কবিতাতে পাখিদের নিয়ে যে অবজার্ভেশন আছে সেটা চমৎকার। আমার মনে হয়েছে পাখিদের নিয়ে ওই দেখার ভঙ্গিটাও কসমিক দেখার ভঙ্গি:

এসব ভাবছি এলোমেলো আর দেখছি যে

বড় ডানার ছোট ও সুতীক্ষ্ণ কিছু পাখি

জোর চিৎকার তুলে সাঁ-সাঁ উড়ে এসে

আছড়ে পড়ছে মেহগনি জাম জারুলের গাছে,

এমন যে মনে হয় এ-পৃথিবীতে

মানবপ্রজাতি নিয়ে শেষ ভাবনাটুকু

মানুষ নয় পাখিদেরই ভাবা হয়ে গেছে।

 

অথবা

 

ভোরে চোখ খুললেই না জানি মহাপ্রলয় দেখা হয়,

এমন যেন সামনে এক নিঃসীম শূন্য মাঠ

যেখানে থাকবে সাদা বালির পরে বালি

যেমন এখানে রয়েছে এই বালু নদীর পাড়ে—

সেখানে সন্ধ্যায় পাখি ওড়ে

পাখিরা উদ্ধত আস্ফালিত ওড়ে।

 

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের নিয়ে করা ওয়ের্নার হেরজগের একটা বিখ্যাত ডকুমেন্টারি আছে, নাম—Into the abyss; সেই ডকুমেন্টারির শেষে একজন যাজক বলে—“once you feel good about your life, you do start watching what the birds do. what the doves are doing. like the hummingbirds. why there are so many of them!”

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের কনফেশন করাতে করাতে যে যাজক জীবনের অর্থহীনতা বা অসাড়তার কথা বুঝে গেছে, তারপর পাখিদেরকে কৌতূহল নিয়ে দেখছে, তার সাথে এখানে পাখিদের উদ্ধত আস্ফালিত উড়াউড়ি দেখতে থাকা কবির কী সুন্দর মিল!

প্রকৃতি আরো ব্যাপকভাবে এসেছে জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু নিয়ে যে কবিতা লেখা হয়েছে সেটাতেও। থাক, এটা নিয়ে আর না বলি, যত বলব ততই কম হয়ে যাবে। জীবনানন্দকে নিয়ে লেখা বাংলা ভাষার সবচেয়ে সেরা লেখা এই ‘ছাতু’ কবিতা—কোনোভাবেই এটা আমার অত্যুক্তি নয়।

এই বইয়ে দুটি কবিতা আছে যেটা খুব একটা বিশুদ্ধ ভয়ের মুখোমুখি ফেলে দেয়। ‘কেন চিনতে পারছি না কোনোকিছু’ ও ‘কোনো এক বনের কিনারে’।

এই বইয়ের বেশিরভাগ কবিতা নিয়েই আক্ষরিক অর্থেই অনেক অনেক কথা বলা যায়। এগুলি শক্তিশালী এবং এতটা আলাদা যে তারা সেটা ডিজার্ভ করে। ব্যক্তিগত কথাবার্তা ও ক্যাজুয়াল স্বরের যে গতানুগতিক ও নিজস্ব অভিজ্ঞতা কবিতার ক্ষেত্রে পাওয়া যায় সেটা এখানে পাওয়া যাবে না।

এই বই আপনাকে অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে নিয়ে যাবে। একটা ভৌগোলিক-ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক-দার্শনিক-বিদ্রুপাত্মক এক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা দেবে, আর সেই ভ্রমণ যদি পুরোপুরি শেষ করা যায় তাহলে হয়তো মনে হবে—যেটা এই বইয়ের সবগুলি কবিতাই কোনো না কোনোভাবে প্রমাণ করেছে—মানুষের জীবন এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় ঘটনা, তবুও এটা অর্থহীন একটা ব্যাপার, সম্ভবত!—লাইফ ইজ দ্য মোস্ট মিস্টিরিয়াস ফেনোমেনন ইন দিস ইউনিভার্স, ইয়েট মিনিংলেস, মেবি!

 

১০

সাম্প্রতিক  কয়েকটি কবিতা

পৃথিবীর প্রতি কিছু ভালবাসা

...

দীর্ঘ দীর্ঘ এক দিন শেষে

তার সাথে দেখা হল ফার্মগেট ব্রিজের বাম পাশে;

সমাগত সন্ধ্যার সত্য-উন্মোচনকারী এক হাওয়া

তখন চারদিকে ঘোড়াদের লেজের পাশে পাশে।

ঘোড়াগুলি পুলিশের বোঝা যাচ্ছে ঘোড়াগুলি দুলে দুলে

যাচ্ছে রাজারবাগ থেকে,

তখনই ঘোড়ার পিঠে দেখা গেল তাকে—

যাকে আমি এ শহরের বিবেক বলে জানি,

যেহেতু সে এসেছে জিনারদীর থেকে।

—সে দেখতে সুন্দর

—সে দেখতে রীতিমতো

—সে রোমান সহিসদের মতো!

চারপাশে কলোসিয়াম জুড়ে বিরাট গর্জন শোনা গেল এ সময়ে এসে,

মানে এই দুঃসময়ে আওয়াজ-বাওয়াজ মানুষেরই—

এই বিশেষ প্রজাতিটিরই—তখন ফার্মগেটের চারপাশে।

আর আমি তাকে এরই মাঝে মাথা এই তুলে

(যেহেতু সে ঘোড়ার পিঠে বসে আছে)

জিজ্ঞেস করে বসেছি জনতার ভাবাবেগ দেখে, যে—বলো,

বড় জিনিসের কাছ থেকে বড় চাওয়াই কি সব মানুষের থাকে?

ঘুম ছাড়া কিছু মানুষ তো কিছুই চায় না পৃথিবীর কাছ থেকে।

তখনই ঘোড়া ডেকে উঠল চিঁ-হি চিঁ-হি চিঁ-হি,

আর সহিস আমাকে বলে দিল,

সত্য জানবার ইচ্ছা যদি থাকে তো জিনারদী চলে যেতে।

—পাঁচরুখি মঠখোলা বান্টি, ওই পথ দিয়ে যাবেন কিন্তু তারপরই,

সব নাম দী দিয়ে নামের শেষটুকু, মাধবদী আনন্দী নরসিংদী পড়ে পথে,

আর উল্টো দিকে মৈষাদী আছে, তারপর সোজা যার শেষে এক নদী,

চরনগরদী জিনারদী আর জিনারদী শেষ হলে—

নদীর ঘোলা জলের নিচে দেখবেন সেইখানে

বড় সাবমেরিন রাখা ভূতের মতো করে।

কিন্তু এত দী দিয়ে নাম রাখল কেউ কেন, দাদা?

—ভাইয়েরা আমার, আমাদের হারানোর কিছু আছে?

সহিসের চিৎকার শুনতেই মনে হল

আমি সমস্যাকণ্টকিত এই পৃথিবীর কোনো একটা রোমে,

কোনো এক অ্যাড্রিয়াটিকের পাশে

কান পেতে আছি সাবমেরিনের বাইরের দিকে—

ভেতরে শোনা যাচ্ছে হা হা হা হা হা হা হা হা ধ্বনি,

শোনা যাচ্ছে থাপ-থাপ উমো-উমো মতো

নানা শব্দ ওইভাবে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত;

মুখ-চাপা বুক-চাপা মুখে মাফলার চাপা

সাবমেরিনের ভেতর ভাগে কারা কারা বলছে মূলত

এই কথা এত কথা বলে—

বৃহত্তর সমাজের কাছে পোপ ইমাম পণ্ডিত চোর সাধু

ও পিম্পের কাজে আসলে কি কোনো ফারাক ঘটে?

পৃথিবীতে যে কোনো কিছু লজিক্যালি বলা সম্ভব যেহেতু, করাও সম্ভব বটে!

তার সাথে দেখা হলেই এভাবে মনে হয় চিরকালই

পাগল হয়ে যাওয়াটুকু শুধু বাকি,

কিম্বা বিকৃত মস্তিষ্কের কোনো খুনি,

‘ছিটিয়াল‘ বলে যাকে জিনারদীর লোকে।

আসলে বললেও অসুবিধা নেই তাতে,

কারণ সম্রাট নিরো সৃষ্টির শুরু থেকে

যে আগুন জ্বালিয়েছেন রোমের আশপাশে,

তা হলকার মতো কেঁপে ছুটে ছুটে এসে

জ্বলতে থাকে ঠিকই জিনারদীর পাড়া ও গলি পথে

ইতরবিশেষ না রেখে, গরমিল মিল অমিল সব হিসাব বাদ দিয়ে

সব কাপড়ে ও পাড়ে সব খড়ে সব ঘাসে,

আগুন পৃথিবীর প্রান্ত ছুঁয়ে বাঁশি শোনে ও হাসে।

আমি দেখি তার আঁচ ভালই তো লেগে গেছে

আমাদের ত্বক চুল ও নখে,

এখন সাবমেরিন-ভেজানো পানি ছিটানো হোক তাতে,

মুখে প্রস্রাবও করে দিতে পারো চাও যদি,

আঁচ থেকে স্ফুলিঙ্গ হয়ে ওঠা থামাবার কাজে।

হুমম, ঘোড়াগুলো ছুটে গেছে লাগামের থেকে চি-হিঁ চি-হিঁ হেসে;

আর এইবার হুক্কা ও এঁটেল মাটি দিয়ে গড়া চুলা ইত্যাদি

বীভৎসদর্শন জিনিসের অগ্নিপ্রজ্জ্বলন প্রক্রিয়ার পশ্চাতের দিকে,

ম্যাচের কাঠি ঠুকে দিতে চাইছে কে যেন কে কে।

এইভাবে অকস্মাৎ জিনারদীর ঘোড়ার সহিসের সাথে দেখা হলে,

বিতৃষ্ণার বিপরীতে,

পৃথিবীর প্রতি কিছু ভালবাসা বোধ করা গেল,

খামারবাড়ির পাশে ছোট এক মোরগফুল বুক তুলে ফুটে আছে দেখে।

আর আগুনের আঁচে তোমার লাল মুখ দূর থেকে দেখে

মনে হল নিরোর কথা ভুলে গেলেই চলে চোখ বুজে,

ভুললেই চলে জিনারদীর জমিদারটিকে তার গিন্নিকেসহ,

যে কিনা সন্দেহ নেই লেডি ম্যাকবেথেরই মতো,

হতে পারে আরও খারাপ কিছু,

হতে পারে তারা যারা সাবমেরিনে থাকে

যারা কথা বলে কেমন ড্র ড্র আওয়াজ করে করে,

হতে পারে—সান্ত্বনার কথা—তুমি আছো বলে

এখনও ধারণা করছি যে টানা বারান্দা ধরে

মানুষেরা আজও পাখি পোষে মূলত রং ভালোবেসে,

যদিও আহ্লাদী করে বলে—গানও;

এবং এই পৃথিবীতে সময় টানা এক প্রভাতের টানেলেরই মতো,

যেখানে বস্তুত হারানোর নেই কিছু—

ভয় লাগে এই-ই যা, বাকিটা সোজা আছে।

 

ততক্ষণে স্টেডিয়াম ঘিরে

...

ভালই তো চুপচাপ আছ সব দেখে

গ্যালারিতে বসে ভুজিয়া খাচ্ছ মন দিয়ে

আর গোলগোল লিচু ধরনের কিছু রেখেছ হাত ব্যাগে

যদিও খেলা দেখবার টিকিট ঠিকই কেটেছিলে

সামনেই মাঠে খেলা চলছে মারাত্মক রকম ও প্রকারে

সাইটস্ক্রিনে সেটা দেখা যাচ্ছে ভালমতো

দেখা যাচ্ছে এমনকী লাল জার্সি পরা সীমানা ধরে দাঁড়ানো এক ছেলে

রেফারিকেই বলে দিল খানকির ছেলে

আর তা শুনে প্রতিপক্ষের ছিল যারা তারা

খুন করে ফেলবে বলল কাকে কাকে

এবং সবই আবার দেখি ধরা হচ্ছে ভিডিওতে

এবং তুমি ভাবছ দেশটা বুরকিনা ফাসো হয়ে গেল কিনা

আছ সাউথ সুদান নাকি মৌরিতানিয়াতে

তারপরও তোমার মন বাস্তবতার চাইতেও বড় বলে

তুমি এই সকল কিছু বাদটাদ দিয়ে

এই সকল কিছু জীবনের ছোট গলিতে ফেলে রেখে

হেসে হেসে পড়ে যাচ্ছিলে সিটের পেছনের দিকে

কারণ এক লাল পাছা বানর পড়ে গেল অর্জুনের ডাল থেকে

অর্জুন গাছটা ছিল স্টেডিয়ামের ঠিক পাশে

আর তোমার বান্ধবী বানরের পড়ে যাওয়া

কিম্বা ওর খোলা ও উন্মুক্ত পেছন দিক ওরকম লাল

ওরকম ক্রিমসন দেখে

স্বাভাবিক নারীলক্ষণ যাকে বলে সেইসব রেখে

তোমাকে ধরে টেনে সোজা করল গ্যালারিতে

এবং বলল কী সুন্দর খেলা চলছে দূরে দ্যাখো ওরা লাল জার্সি পরা

চার লোক মিলে সিগার ঠোঁটে চিপে খেলা বাদ দিয়ে

পিস্তলে হাত রেখে

গন্ধ বেরুচ্ছে তো ওদের সস্তা সিগারের থেকে

এত অবাকই বা হচ্ছ কেন এইসব দেখে

মানে তুমি এর চাইতে ভাল কিছু সুস্থ কিছু আশা করেছিলে?

এই প্রশ্নটা রাখলাম তোমার প্রতি ভালোর সুগন্ধে ভেসে ভেসে

যেহেতু গন্ধ আসছে বেশ পারফিউমের মতো সব দিক থেকে

নাকি ওটা মৌ মৌ করে আসছে বেবি তোমারই জুতোর তলা থেকে

ওই আমি জুতো মাঠের দিকে উঁচু করতেই দেখি

শুকতলির কিনারগুলি ঘিরে

গু মেখে আছে কিছু

কী সুন্দর বাখরখানি চেপ্টে যাবার মতো করে রীতিমতো

এমনকী লেপ্টে-টেপ্টেও আছে

এভাবেই ঘিন্না ধরে গেল সবকিছুর প্রতি

যা যা শরীরী ও যা যা অশরীরী আছে অশরীরীই বেশি

মনে হল মানুষের স্বাধীনতার মাত্রা বেড়ে গেছে

চাইলে সে রাতে বাড়ি ছেড়ে

ঘুমাতে পারে কোনো ড্রেনেজ পাইপেরও মাঝখানে

চাইলে সে বসে পড়তে পারে এমনকী হাত দুলদুল করে

পারে যে কাউকে মেরে বসতে ও উচ্ছন্নে যেতে

চাইলেই পারে এমনকী বলতে যে শুরু হয়ে গেছে এগিয়ে আসো খোকা

ভুল হয়ে গেছে পিছিয়ে যাও বোকা

ততক্ষণে স্টেডিয়াম ঘিরে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে রোদ বাড়ছে অতি দ্রুত

গাছের কাণ্ড শাখা ডাল ঘিরে আওয়াজ উঠছে কট কট করে

পাতায় সরসর শব্দও হচ্ছে বেশ হাওয়া থেকে হাওয়াদের থেকে

এমনকী বানরের পরে অর্জুনের একটা ডালও ভেঙে পড়ল রাস্তার ‘পরে

কেমন দীর্ঘ সময় বাতাসের ঘাড় চিপে ধরে

পতন হল তার খণ্ডিত সবুজ পাতাগুলো

মজবুত মধ্যশিরা মানে ফ্রণ্ড যাকে বলে

তা প্রথমে জড়িয়ে ধরে তারপর ছেড়ে দিয়ে

ডাল পড়ল মাটিতে পড়ল ঝর ঝর করে

আর আমার মনে হল ভালই তো লজ্জা লাগছে সকলেরই

জুতোর তলার দিকে এইরকম গু মাখানো দেখে

ঠিক যেমন হবে কোনো পাগল পাড়ায় ঢুকে গেলে

কোনো পাগল তোমার বাড়ির বাগানের মাঝখানে

দাঁড়িয়ে পড়ে টেনে টেনে

যদি ধরো পলকজুঁইয়ের ডালপালা তছনছ করে

যদি ধরো আমাদের সুগন্ধিভরা ফুলগুলো হাতে মুঠো করে

অজস্র চার পাপড়ি আলাদা করে করে টিপে দিতে থাকে চিপেও দিতে থাকে

যদিও দৃষ্টিনন্দন মায়াবী এক প্রকারে

এ পর্যায়ে তুমি ভয় ভয় ও দুঃখের থেকে

শেষমেশ বললে তোমার হানি বেবি সোনামনিটাকে

পাগল বাগানে দাঁড়িয়ে গোপনাঙ্গে এমনকী হাতটুকুও না রেখে

দ্যাখো পেশাব করছে মালতীলতার গোড়ার দিকটাতে

মধুমঞ্জরির লাল ফুলগুলোর ঠিক নিচে

কেমন শরীর বাঁকা করে কোমর সামনে ঠেলে দিতে দিতে

অতএব চলো সোনা জরুরি যাওয়া যাক এই স্টেডিয়ামের কাছ থেকে

পরিস্থিতি এখানে যেহেতু বানরটানর সব মিলে

কুচকুচে বুরকিনা ফাসো ঘরানার হয়ে আছে

যেখানে আমরা ফেঁসে গেছি ভালমতো

তাই আমার কিন্তু এ মুহূর্তে হাঁসফাঁস উঠে গেছে চলো চলো

আর মূল কথা যেহেতু তোমার বান্ধবীর ব্যাগে গোলগোল লিচু ধরনের কিছু

এমনিতেই আছে যেগুলো খেয়ে নিয়ে মুখ ভাল করে মুছে

বেঁচে থাকা যাবে বেঁচে থাকা যাবে ভুজিয়া শেষ করে

------

মেঘনার পাড়ে

মেঘনার পাড়ে

ঢাকা থেকে বেড়াতে এসে লোকগুলি নানাবিধ খারাপ কাজ করে

যেমন দেখা যায় কিছু তিক্ত বাক্যবিনিময়ের পরে 

ফুটো করে দেওয়া হল নৌকার তলা

তার ফলে যে ভ্যালু এলো

অর্থাৎ প্রত্যেকে সমান আয় করছে ধরি যদি 

তাহলেই বুঝবেন কী বলা হচ্ছে মেঘনার ঘাটে

প্রেম ভরোভরো দিনে বঞ্চিত প্রতারিত মাঝিদের সাথে

ঢাকা থেকে বান্ধবীকে কিছু একটা ভাল কথা হাসির কথা বলে

কুটিপাটি এইখানে সঙ্গে নিয়ে এসে

আর ক্যামেরার পেছন দিক থেকে কেউ কাগজ উঁচু করল তো তুমি

ঢাকার বান্ধবীর সাথে আনা কাবাবটাবাব যা আছে গোগ্রাসে

খাবে বলে মনস্থির করেছিলে

হাওয়া-পল্লবিত এই মেঘনার পাড়ে এসে

হাওয়া থরোথরো নদীটির ধারে নদীটির দিকে

চোখ রেখে বললে তুমি তাকে

তোমাকে ভালোবাসি বেবি

আমাদের মধ্যে আর কোনো বৈষম্য নেই কোনোদিন সোনা

আমরা এসেছি তো মেঘনার মতো এক পাড়ে

প্লিজ প্লিজ নদীতীরে

হাতে সেনা ব্র্যান্ডের পানি এটা অনেক দরকারি

আর দুই বড় প্লাস্টিক জার আছে লবণ-মসল্লা ইত্যাদি মেশানোর কাজে

এনেছি লাল লাল মগ হলুদ হলুদ বড় বাটি

এবং এই দ্যাখো সুখের মিলন ব্র্যান্ড নামে জন্মনিরোধক দরকারি বস্তুটি

এবং আনারস কাটবার নিষ্করুণ দীর্ঘ দা-খানি

আর শেষদিকে যখন নৌকা দুলবে খুব বেশি

তখন নদীর বিশ্রী সেই বাড়াবাড়ি দেখে

মানে বলছি ওহ গড এই জীবনে সোনামনি

বাঘের খাঁচার মতো দেখতে অবাস্তব রোড ব্যারিয়ারগুলি

পার হতেই হবে আনারস খেতে খেতে

মেঘনা-টেঘনা-মাটি-পাথর-পাহাড়-মরুভূমি-অন্তরীপ ইত্যাদি

পেরিয়ে যে বিপুল বোবা চরাচর রয়েছে পৃথিবীতে

সেটা কিন্তু এই ঘাটেরই মতো কিছু

নানা ঘাটের নানা লোক এসে মিলে

এই ঘাট কায়রোর তাহরির স্কয়ার বলে মনে করো

সেখানে ছেলেপিলে দুষ্টুমি কম করেছে নাকি?

কিম্বা শাহবাগে কিম্বা অকুপাই ওয়াল স্ট্রিটের দিন শেষের রাতে

ছেলেমেয়ে সব ওরকম সব শুকনো খটখটে পিচে

ভদ্র হয়ে ছিল জিপার থেকে দূরে সব সালোয়ার ফিতে থেকে?

তাহলে তাহলে তাহলে

এরকম এরকম পাখি ওড়া মেঘনার পাড়ে

পেছনে ওই দূরে সন্ধ্যার হাওয়ায় দুলছে পেয়ারাগাছগুলি

আর গ্রামের ওই দিকে কাঁঠালের নিচে নিশ্চিতই আতাফল ধরে আছে গাছে

রোদের কষ্টে বুঁদ হয়ে থাকা লজ্জাবতীগুলিসহ

যাদের পাশে লাল সোনালুও রয়েছে বেশ কটা

আর ভ্যানগাড়ির পেছনের দিকটাতে

কাপড় খুলবার কোনোমতে একটি আলমারি

সেখানে দাউদকান্দি ব্র্যান্ডের কলাবতী

আহা কীরকম ওই কলাবতীর গাছগুলি

ওদের ফুলে রঙের কোনো ব্যাকরণ মানা হয়নি যে সোনাপাখি

তুমি তারপরও বলো গ্রামবাংলা সুন্দরই?

এই কথার উত্তরে মুচলেকা দিয়েই বলছি যে

খোদার সিস্টেম উল্টানো সোজা কোনো কথা কোনোদিনও?

রাস্তার পিচ হলে অন্য কথা ছিল

আর এ তো নদীর কলকলে মেঘনার পানি

নাম বাবুনু হলেই তো ভাল হতো লক্ষ্মী হতো হানি

মানে বলছি যে যদিও সবুজ পৃথিবীতে

অং অনুস্বর সং সুচিকে সেনাবাহিনীর হ্যান্ডসাম ছোকরারা

আকস্মিক পেটে মারল লাথি

কিন্তু তুমি এসেছ সুদূরের ঢাকা থেকে আমার প্রেমিকা তুমি হানি

এই সুবৃহৎ নদী নাম যার মেঘনা সেই ঘাটে

সেইটাও কম কথা নাকি?

অতএব খারাপ কিছু প্রশ্নই আসে না যে খারাপ কোনো কিছু

অতএব সিংহাসনে বসো আঁকাবাঁকা সিংহাসনে এসে

যদিও বলাই বাহুল্য যে নদীর কালো পানি

আতঙ্ক জাগানোই বটে নদীর কালো পানি

আর আমিও তোকে ছেড়ি এই ঘাটে নিয়ে এসে

পুরুষ ছাগলের মতো কিম্বা ক্ষ্যাপা কুকুরটুকুর বুঝি

হাঁটু ভাঁজ কর তুই বললাম বলে

হাত পা সব ভেঙে ভিক্ষা করাব নাকি নাকি?

আমাকে এত অবিশ্বাস কেন বেবি

এই মেঘনার ঘাটে ভাঙ্গনরোধ করবার তাড়নার থেকে

দুর্বল প্রবল অত্যাচারিত আর আত্মসাৎকারী

সকলেই মুখপোড়া সকলেই গালপোড়া লোকগুলি

যাই বলো তাই বলো বলতে চেয়ে লজ্জা কোরো নাকো

কোনো ভূখণ্ডেরই অত্যাচারী জালিম কিছু নিয়ে

তাই টিস্যু পেপার বের করো দেখি দেখি

তোমার কমলা রং ব্যান্ডানাটা ধরে দেখি

এইরকম অপূর্ব সুন্দর দিনে ভরসন্ধ্যায় নদীতীরে

ওরা গুন্ডাই বটে ওরা যথেষ্ট খারাপ ছেলেগুলি

পারাপারের মাশুল চেয়ে বসতে পারে তাই চলো

আর শোনো নৌকার তলাগুলির তলা থেকে

ঢপারত ঢপারত আওয়াজ হচ্ছে বড় বেশি

এবং পাঁচ ছজন চানাচুরওয়ালা দেখি

ঝিড়িং ঝিড়িং শব্দ করে করে

লাল পাজামার নিচে সোনালি রেক্সিনের পাড় পরে

গালে বড় বড় দুই দাগটানা বেনিনের গোত্রপতিদের মতো

বলে গেল মেঘনার পাড়ে

ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা লোকগুলি নানাবিধ খারাপ কাজ করে ছি ছি

-----------

যা সত্য তা বলতেই হবে

যা সত্য তা বলতেই হবে—

ভুটান যাবার পথে সুনামি হয়েছিল,

দু হাজার চার সালে যেবার পৃথিবীতে সুনামি হয়ে গেল,

ওই পৃথিবী ভুটানের মধ্যেই আছে আর ভুটানও পৃথিবীর মাঝখানে,

এবং কুচবিহারও তাই কুচবিহারও একই—

সেই কুচবিহারের পথে গাড়ি ছুটছিল জলদাপাড়া পার হয়ে,

এক শিং গণ্ডারেরা যেইখানে বনের ফাঁকফুকো দিয়ে

জানবেন যে পথে নেমে আসে,

তখন চেঙমারিতারি দূরে আর ধানক্ষেত পেটের নিচে রেখে

যত বক যত ফিঙে ইত্যাকার বকপঙতি পাখি—

ওই দৃশ্যে অসম্ভাবনীয় ছিল তারা,

তবু যা সত্য তা বলতেই হবে, কারণ ওই-ই ছিল ঘটনাপরম্পরা।

যেমন আমার ছোট মেয়ে ‘বক‘ ‘বক‘ বলতেই বোঝা গেল,

এ পৃথিবীতে গণ্ডার ছাড়া যাকে বলে স্বাভাবিক সরলতার কথা ধানক্ষেত পাশে রেখে—তা নেই।

মানে বলছি যে যদি ভুটান যাও ওই ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে

কিছু আতঙ্ক কিছু ভ্রম কিছু জটিলতা যেহেতু এমনিই থাকে তাতে,

সেহেতু গণ্ডারের ডাক কল্পনা করে নিয়ে

ভয় পাচ্ছিল আমার স্ত্রী ও ছোট মেয়ে।

এভাবে গণ্ডার আমাদের মনে রেখাপাত করে ছিল বলে,

বকগুলি এইবার অপসৃত হল সোঁদাল পিয়াল ও শিরীষের বনে,

যেখানে হিজলও ছিল কিছু, যদিও ড্রাইভার ইজ্জল হিজ্জল এভাবে বলছিল—

গণ্ডারের পৃথিবী বলে কথা!

যার নিম্নভাগে অতি সঙ্গোপনে সুনামির প্রস্তুতিই চলছিল—

যেমন কাঠচাঁপার পেছনের দিকে শুঁয়োপোকা গোপনে চুপচাপ থাকে,

যেমন গুলমোহর গাছের কাণ্ড বেড় দিয়ে

কুচবিহারের বিখ্যাত ডিলমাগ্রি সাপ বিশ্রাম নিচ্ছিল মন খচখচ নিয়ে,

কারণ তারা ঠিকই টের পাচ্ছিল গণ্ডারেরা ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে

আনাজি কলামোচা মাড়িয়ে-ভাড়িয়ে চলে গেছে।

—কেন কেন কেন?

তার মানে পৃথিবীতে কিছু একটা হবে আজ রাতে—

আর ওই ভয়-ভয় পরিবেশে আমি শেষমেশ আর না পেরে

বললাম—ভুটান যাচ্ছি তো রডোডেনড্রন পুষ্প দেখা হবে,

ওরা রডোডেনড্রন কেসাঙজিয়া বলে,

রাজ গ্র্যান্ডমাতা আশি কেসাঙ ছোদেনের স্মৃতি মনে রেখে, অতএব মন শান্ত করো।

তবে জয়গাঁও বর্ডার পার হতে কমলার বাগান দেখা গেল শেষে—

ওরা যাকে নারঙ্গি বলে ডাকে,

ফলগুলি নারঙ্গির মতো আপত্তিকর নাম নিয়ে

কী সুন্দর ঝুলছিল ও দুলছিল,

যে-নাম শুনলেই আপনার মনে হবে

যেভাবে নারকীয় ক্ষোভ-সংক্ষোভ মনে ক‘রে আগুন হাহা-হুহা করে,

যেভাবে কুশপুত্তলিকা দাহ ঘটে, যেভাবে বাতাসে খড় পোড়ে!

ততক্ষণে ভুটান এসে গেছে, রডোডেনড্রন দেখা যদিও বাকি,

আর ফুন্টশলিং পার হয়ে আমরা যেই চোরাগোপ্তা গা-ছমছমে পাহাড়ের ঢালে,

ড্রাইভার, ভুবন তার নাম, বলল—মাটি কাঁপছে মাটি কাঁপছে গো বাংলার বাবু,

আপনারা গণ্ডার ব্যাগে নিয়ে চলে এলেন নাকি?

আর ওই—বোল্ডার পড়ে গেল পথে

আর ওই—বন্ধ হল থিম্পুতে যাওয়া এক ডিগ্রির শীতে

আর ওই—রাতভর হাডেদের ঘরে থাকা উঁচু ভাড়া দিয়ে

আর ওই—ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে পথে-আটকা প্রায় শত গাড়ি

আহ্, সুতোর মতো কী আমার এক ন্যাশনাল হাইওয়ে!

তবে এতকিছুর শেষে ভোরে আকাশ যেন কাচ,

সূর্য তার পেছনের পাশে,

তাতে করে সামান্য যে ঘাস,

তার ডগাটুকু যেন তরবারির ফলা,

তার ডগাটুকু যেন পৃথিবীর বুকে পেপারকাটা ছুরি,

এমনই স্পষ্ট দৃশ্যগত বাস্তবতা—

পৃথিবীতে এত বাস্তব সব কী করে থাকে তাও রাত্রির সুনামির শেষে?

তাই এগিয়ে এল হাডে নামের ভুটানি বালিকার বাবা,

বলল—এসেছেন তো বাংলাদেশ থেকে,

আর রাতেই তো সমুদ্র পৃথিবী খেয়ে গেল,

হুম, যা সত্য তারপরও তা বলতেই হবে—

যেমন আপনাদের চারুলতা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে শুধু রংঢং করে,

সে কিন্তু ওসব বাদ দিয়ে চা বানালেই পারে, চা বানালেই পারে,

কিন্তু বাঙালি যে!—

আপনারা অভিশপ্ত বাঙালিরা সস্তা চা-পাতা জলে গুলে খেয়ে পৃথিবীর পোঁ ধরেছেন বেশি,

আর ওই গণ্ডার ওই প্রিডেনটাটা

এখনও আদি ও অকৃত্রিম কিছু, মূলপদার্থ যাকে বলে,

মৌল ও নিকষিত বাস্তবিক ছিল তারা কাল রাতে—তারা বাস্তবেই দৌড় দিছে,

অতএব সুনামি হয়ে গেল।

ওই আমি দেখি তার ছোট মেয়ে হাডে,

পুরো নাম হাডে দরজি বা হাডে শেরিং মতো কিছু হবে,

সে দাঁড়িয়ে এক ক্ষমাহীন কালস্রোতে ছারখার প্রিডেনটাটার পাশে

কিছু রডোডেনড্রন ফুল হাতে নিয়ে,

কাল রাতে যারা মারা গেছে হুটহাট করে, তাদের মনে করে,

মৃত গ্র্যান্ড রাজমাতা আশি কেসাঙ ছোদেনকে মনে করে—অতএব মন শান্ত করো।

অতএব যে অর্থে দুঃখ-শোক নিয়তই মানুষের বুকে এসে লাগে

(যেহেতু সাগরের ঢেউ জঙ্গলের ফাঁকফুকো দিয়ে

এক শিং গণ্ডারগুলি তাড়িয়ে নিয়ে আছড়ে পড়েছিল),

সে অর্থে বোঝা গেল মৃত্যুসংবাদ জীবনের মাঝখানেই থাকে,

আর জীবনও সুবিশাল দায়গ্রস্ত সাগরতীর ধরে

ছিন্নমূল এক আলো—খাপচা খাপচা মতো, বহু মৃত্যুর মাঝখানে।

জীবনের সবকিছু তাই এক অর্থে কাগাবগা, এক অর্থে যে সে, এক অর্থে ফাঁকি;

এবং কুচবিহারও তাই, গণ্ডারের জলদাপাড়া কুচবিহার আজও একই।

-------

হাঁসগুলিগুলি

হাঁসগুলি মোটা-পেট প্রেগন্যান্ট মহিলাদের মতো;

হাঁসগুলি ভারী-পেট ঘাসে ঘোরা কিছু কিছু জানোয়ারের মতো;

হাঁসগুলি স্নিগ্ধতা—যেরকম পৃথিবীর সন্ধ্যাবেলাগুলি ছিল,

যখন আকাশে তারা অগুনতি, তারা শত শত;

হাঁসগুলি হিংস্রতা—মালিকের দারোয়ানের চোখেদের মতো।

একেকটা সাদা হাঁস সাদা ডেইজি ফুল হয়ে জলে ভেসে ছিল,

তাদের ঠোঁটগুলি ছিল বেশ ওই ফুলেদেরই মতো—

মাঝখানে হলুদে পুষ্পিত;

কিন্তু হিবিস্কাস-গেরবেরা-কার্নেশান

যেমন দেখতে সাদা তবে ভয়াবহ এলোমেলো,

সেরকমই হাঁসগুলিকে কে বা কারা গোলমাল করে দিয়েছিল—

পালকের দিকে ডানাদের দিকে

গলা বাদ দিয়ে সব সব দিকে

হাঁসগুলি, আহা, প্রতারিত বঞ্চিত স্নেহ-বিবর্জিত।

আর তারা, দারওয়ানেরা, শ্রুতি ম্যাডামের কথা মতো

পরোটা দিয়ে হাঁস ভুনা খেয়ে

—সঙ্গে মালিকের ভদকাও—

কীরকম আকাশগঙ্গা জলে ভেসে যাচ্ছিল

পৃথিবীর বাগানের বেড়া ধরে কেমন মারাত্মক ও দ্রুত!

তাদের যাবার মধ্যে বেশ হাঁস-হাঁস একরকম শিথিলতা ছিল,

দুর্ভাগ্যও ছিল,

হাঁসগুলি গলা উঁচু করে সত্যি বলতে হাই-ই কি তুলছিল?

শ্রুতি ম্যাডামের কথা মতো ওই গলাই কাটা হয়েছিল

ঠিক সেদিন যেদিন বাইডেন জিতেছিল,

আর বরগুনা গলাচিপার কাছে তা নিয়ে আনন্দও হচ্ছিল,

কারণ বাইডেন জিতেছিল—

তাই দারওয়ানেরা পানি থেকে টেনে তুলে

বোনলেস মাংস চাইছিল।

হাঁসগুলি শেষ পর্যন্ত

দেখতে সাদা ফুলগোছার মতোই লাগছিল—

ছড়িয়ে-ভরিয়ে থাকা ট্রাম্পেট ফুলেদের মতো,

কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প হেরেছিল;

কিন্তু আমার ধরে রাখার ক্ষমতা ওই পর্যন্তই ছিল,

যেহেতু শ্রুতি ম্যাডাম আমার মাসী হয় খালা হয় মা-ও হতে পারে,

যদিও ম্যাডাম দুই পা ফাঁক করে বহু কিছুর ইঙ্গিত রাখছিল—

বহু কিছু গুঁড়ো গুঁড়ো, বহু কিছু কানে কানে বলা—

তবু সব প্রকাশ্য দিবালোকে পিছলে যাচ্ছিল,

যেরকম হাঁসগুলির পিঠে পানি,

যেমত পৃথিবীতে সন্ধ্যা হবে হবে,

যেমত হাঁসেদের পদভারে সিমেন্টে ভরা নদী,

তার সিমেন্টে ভরা পাড় দুর্ভাগ্যের সীমানাতেই ছিল—

ওই পাড় ভেঙে পড়ছিল;

সব আমার হাতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল—

দৈববাণী মতে আর অর্থবিজ্ঞানে যাকে

নিশ্চয়তা বলে ডাকে, সেই সবই পিছলে যাচ্ছিল

দুর্গ্রহবশত নাকি নিয়মের ফেরে, তা তো জানি না তো, জানি না তো।

শুধু জানি—কিছুই ধরে রাখা না যাচ্ছিল,

এমনকী চেতনাও,

এমনকী ম্যাডামের দুই পায়ের জুতো,

এমনকী ম্যাডামের সালোয়ার প্যান্টিও;

আহা, পরিস্থিতিবশত, মনে হচ্ছে ওইগুলি

কিছু ঢিলেঢালা হলেই বরং ভাল হতো,

যেরকম হাঁসগুলি ছিল পেট-মোটা ঢিলেঢালা প্রেগন্যান্ট মহিলাদের মতো,

যেরকম ভারী-পেট ঘাসে ঘোরা কিছু কিছু জানোয়ারের মতো;

যেরকম বাইডেন বলছিল—

এই পরিবেশে ক্যাট ব্যাট ডগ ফিশ প্রত্যেকের বেঁচে থাকার গুরুত্বের কথা,

এমনকী উলফ আর হায়েনারও।

কিন্তু, অনিবার্যভাবে, চেতনা ছিল না কারো তাই

তাঁর কথা থেকে বাদ পড়েছিল ‘ডাক‘ কথাটুকু,

যাকে অন্তত প্যাক-প্যাক বললেও তো হতো,

যেহেতু বাংলাতে ‘ডাক’ মানে

শ্রুতি ম্যাডামকে ভেতর ঘরে ডাকা বলে, হাহা।

আর যেহেতু সে মুহূর্তে আমাকে বলা হলো—

কবি, চোখ খোলা রাখো,

কবি, ভেতর ঘরে কাপড় খুলবার নামে চামড়া খোলা হচ্ছে বস্তুত,

কবি, পেছন দিক দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বহুকিছু,

কবি, পৃথিবীর অন্য পাশ থেকে লক্ষ্য করে দ্যাখো

যেভাবে ডাকছে সামরিক বেসামরিক ইত্যাকার সার্কাসের হাঁসগুলি,

তাতে করে আজকে এই বিজয়ের কালে,

এই অনিবার্য ভুনা মাংসের ভরো-ভরো সন্ধ্যার কালে

তোমার মা-মাসী-খালাসহ আমাদের সকলেরই জাহান্নাম যাওয়া শুধু বাকি—

পৃথিবীর বিধানসভাগুলি ঘিরে বসে থাকা মানবের বেঁচে থাকা যেহেতু

বিপর্যস্ত অসহায় হাঁসগুলিদের মতো—একরকম সমস্যাইকণ্টকিত।

-----

কামারজুরির পথে

 

বহুদিন পরে গ্রামে আসা হল—

বহুদিন পরে কদবেলগুলো পড়ে গেল ব্যাগ ছিঁড়ে

যখন দা হাতে এক লোক ডাব পাড়ছিল—

ডাব পেড়ে ফেলছিল কোপে কোপে গোল গোল চোখে,

আর পাতাবাহারের পাশ জুড়ে

বাদামি যত পাতা

দেখি বাদামি যত পাতা

এবং তাতে গ্রামখানি ছাওয়া।

আহা জামের বনে হাওয়া (যেমন উৎপল দেখেছিল),

আহা জামের বন ধরে মনে হল হরিণ দৌড়াল—

ছাগলছানাও হতে পারে যেহেতু পা চারখানাই ছিল।

তো, সেই পথে সাবান-খাওয়া কাকগুলো

মনে হয় চার পায়েই দৌড়াল মনে হয় ধুলোয় ডানা টেনে তারা

উড়েটুরেই গেল আমাকে দেখে ভয় পেয়ে,

এবং সেই একই পথে যদ্দুর চোখ যায় হ্যাংলা বালকেরা

গামারির পাশে আজও,

তারা গামারির পাশে তারা জামবনের পাশে

চুপচাপ দেখি একইভাবে বসা মুখ সামান্য হা করে—

হুমম মনে আছে শেষবার এর আগে

ব্যাগ ছিঁড়ে একইভাবে একই পথে ইলিশও পড়ে গিয়েছিল,

যেমন আজ পড়ে আছে বাদামি যত পাতা ঐ জামবনের পাশে

যেইখানে ভেকু মেশিন দাঁত বের করে

হা করে আছে—ঐ একই হা করে ভেকু মেশিন পড়ে আছে।

হাহ্! একদিন মনে আছে কিছু পয়সাও পড়ে ছিল একইভাবে কামারজুরির দিকে;

তারা আমাকে উবু হয়ে সেই পয়সা মাটি থেকে তুলে নিতে দেখে

বলেছিল—‘শহরের এই ভদ্রলোক বাবু এইখানে কেন এসব নিতে আসে?’

আহ্ হা, আমি জানি না তো কেন

ছিলাম সেইখানে গতকাল সন্ধ্যার আগেভাগে?

তো, সেইখানে যদি যাও অবসন্ন সন্ধ্যার ঠিক আগে,

গেলে ডাবের মুখ কেটে দিলে দিয়ো, ছিদ্র কোরোনাকো, কামারজুরির ওই দিকে;

আহ্ হা, অবিচার করবার দরকার নেই কারো সাথে, কামারজুরির ওই দিকে;

এমনকী মুরগিরও সাথে

যারা ময়লা মাখছিল দল বেঁধে বালুতে শুয়ে থেকে,

এমন একভাবে যা থেকে পুরো গ্রামটাকে

মঙ্গলের অগ্নিগিরি অলিম্পাস মন্স বলেই মনে হচ্ছিল।

কেন কেন?

অন্যায়ভাবে বাবুলরা জমি ছাড়ছিল না বলে?

এগারো আর তিন—পনেরো কাঠা হবে,

সরকার রাস্তা পনেরো ফিট পনেরো ফিট করে

দুইপাশে রাস্তা কেটে নিয়ে যাচ্ছিল?

তবু বাবুল জমি ছাড়ছে না—বাবুলের চোখে,

বিষাদকরুণাভরা তার খিন্ন-বিচলিত চোখে হিমবিকেলের চিত্তবিকলতা...

বন বন মন কেমন করে

বন বন বুকে খচ করে ওঠে, কামারজুরির ওই দিকে—

যেখানে বাখর আলীর বউ কানু কাউকেই সহানুভূতিশীল না দেখে

চিৎকার দিচ্ছিল জোরে—

‘এগারো আর তিনী পনেরো কোত্তে হলো ব্যাটা?

সরকার পনেরো ফিট করে নেবে, কিছুই দেবে নাকো?

এত বড় অন্যায় কাজ হবে?’

—আহা আপা, কী এমন ক্ষতি হয় আরেকটু অন্যায়ই হলে,

যেহেতু কলতলার ধারে চড়থাপ্পড়লাথি ইত্যাদি আগেই হয়েছিল?

আমার কথা হলো সালিশবিচারের এই দিনে,

পাতাবাহারের পাশে যদি যেইভাবে বিড়ালের গলা কাটা হল (ভয় দিতে),

যেইভাবে আগুন দেওয়া হল ময়ূরের লেজে (ভয় দিতে),

সেইভাবে আর্ত রবে-রবে দলিল করে নিয়ে গেলে,

ছোটখাট জমিগুলো এক্সচেঞ্জ করা তবু ভাল—

এইটাই, কানু, অভিমত আমাদের লোকেদের,

শিক্ষিত-সাধু-ভদ্রলোক শহরের বাবু বলো যাকে।

কিন্তু এই তারা আমাকে আজ গ্রামে দেখে বলে দিল

বলে দিল সোজাসুজি—কী এমন কারণ আছে

আপনাকে বিশ্বাস করব যে, শহরের বাবু,

আপনাকে বিশ্বাস করব যে!

তখনই ভাল মনে পড়ে (গতকালকের কথা!)—

ফুলকিওড়ানো শব্দে ক্রমাগত এই শীতরাত্রির ঢালে গা দিয়ে

বলছি যে যা বোঝা গেল, হুমম, বাখর আলী কম পাবে,

যা জমি কাটা হবে তাতে তার ঘরের সামনেটা যাবে।

—আহ্-হা ষড়যন্ত্র ছিল এর মাঝে

–আহ্-হা সমূহ বাজে মন্ত্রণাও ছিল এর মাঝে...

কারণ, চুলাই মন্ডলের জমি সনাই বিবিসহ দুই মেয়ে পাঁচ ছেলে

আবুল হাসনাতসহ মোট ১৬০ বিঘা

উল্লাস মন্ডলের সাথে ইচর-পলাশোনা-গাছা ইত্যাদি

যত সীমাহীন কুয়াশায় ঢাকা গ্রাম এইদিকে আছে সেইদিকে, কামারজুরির দিকে—

‘সাগর ব্র্যান্ডের দা‘ কথাটুকু হাতলের পাশে

মূল দায়ের লোহার ওপরে আছে লেখা

ময়ূরের বেড়ালের উৎলানো-কাঁপানো-দোলানো পথে পথে...

হুম হুম হুম, তাহলে দেখে ফেললাম সব খোকা!

দেখে ফেললাম এখানে কীভাবে বংশপরম্পরা সরকারের সাথে

লেখা হচ্ছেটচ্ছে ওই সাগর ব্র্যান্ডের দা দিয়ে।

তো, কদবেলগুলো এইসব দেখে ফের পড়ে গেল ব্যাগ ছিঁড়ে,

ফের পাতাবাহারের পাশ জুড়ে দেখি বাদামি যত পাতা—

দেখি বাদামি যত পাতা আর জামবনে

কখাক্রখা কাকের ভুল-শোনা-যাচ্ছে-মতো ডাকে

গ্রামখানি ছাওয়া

ঘোর অন্ধকারে

দেখি সাগর ব্র্যান্ডের দা দিয়ে—

শোনো, সেইখানে, হরিণই দৌড়াল।

-------

তারিন্দ

বন্ধুর মৃত্যুদিনে জানালার বাইরের দিকে

দেখা হল গালে হাত রেখে—পুরাতন পৃথিবীকে।

ঘরের ভেতরের দিকে সবকিছু সুস্থিরই থাকে,

তা-ই দেখা গেল আছে আজও—

টাকাকড়ি-অর্থলোভ-প্রেমপ্রীতি ইত্যাদি যেরকম থাকে

গৃহঅভ্যন্তরে

কড়িবর্গা সাংসারিক মণ্ডপ ঘিরে, সেরকমই আছে—

তবে মাম্মির শুধু খালি

একটু গা ম্যাজ ম্যাজ করছিল

আর তার বড় ব্যাটাসন্তানগুলো একটু বেশি হ্যালো হ্যালো—

'গিরিধারী, হ্যালো হ্যালো, বলেছি তো গির্জের বামে!'—এরকম একটু বেশি

বেশি করছিল।

আর ঘরের বাইরের দিকে, আসো, লুক লুক—

জানালার বহিস্পার্শে উট ও ড্রাগনের সম্মিলিত রূপে

পেঁচিয়ে গলা উঁচু ক’রে

তারিনদ্ নামে যে এক প্রাণী যে এক প্রাণী আমাদের

দুঃস্বপ্নে ঘুঙ্ করে আসে,

সে দেখা গেল শীতের নরম রোদ পিঠে আলম্বিত করে

শিউলি বা শেফালিতে বসা মিসেলটোগুলো ছিঁড়েভিড়ে

সিরিঞ্জের মতো গলা বাঁকিয়ে মুচড়িয়ে

আখস্-আখস্-আখস্-আখস্-ম্লো বলে উন্নাসিক আওয়াজ করে করে

আমাকে ঝাঁকি দিল জোরে—

আর তাই দাঁত ভেঙে পড়তেই কিছু রক্ত বের হলো।

ওহ, কিছু ব্লাড চলে এল তুলো ভরে,

ওহ, কিছু ইউরিন কালচার করার কথা বলে,

গ্রে এক জলবয়াম ভরে হিসসস্ হিসসসস্ শব্দ করা হল...

এইভাবে হিসহিস্ এইভাবে ব্যাটাছেলেগুলো—

ওদেরকে মাম্মিরা এইভাবে পেশশাব করতে বলবার পরে (তারিনদ্-কে দেখে ভয় পেয়ে?) মনে হল—

আহ্ বোধ হল ঠিক এমন যে বসে আছি

পৃথিবীর নিম্নতম লেভেলের ডাক্তারের চেম্বারের আড়কাঠির ‘পরে—

যেখানে চিকিৎসা নামে কিছু উদ্যোগের কথা

বস্তুত পিছলে চলে গেছে পৃথিবীরই উর্ধ্বের দিকে

(‘ধারতি মা-তা কি জ্যায়‘ বললে বোঝা যায় তাকে),

যেহেতু অসুখ চিরকাল বাসা বেঁধে ছিল

ডানে বামে সারি সারি বিল্ডিং ও বাড়িঘর ধরে,

আর তারিনদ্ নামের ওই না-উট না-ড্রাগন প্রাণীটাকে দেখে

মানুষেরা চিৎকার করছিল বড় বেশি:

‘ও গ্রে—ও ময়ূর—ও পাখি, ঠকালি রে তুই’—এইভাবে ঘুঙ্ করে বলে।

উফফ্, তাই যদি হবে তাহলে বন্ধুর মৃত্যুর এরকম দিনে

আমার আর কী করার থাকে?

যেহেতু ভালো-আছি খারাপ-আছি এইসব কথা

মিলেমিশে এক হয়ে গেছে,

যেহেতু তারিনদ্ আমাদের মানবের বাগানের বেড়াগুলো ধরে...লুক-লুক ওই দ্যাখো—

দুলছে ফিতের মতো মুখে উলুকুলুউলুধ্বনি করে!

তো, আমি সেই আমি তারিন্দের সামান্য ধাক্কাঝাঁকি খেয়ে

ডাক্তারের কাছে কেন?—

জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এ কথা জিগ্গেশা করবার পরে,

বলার কিছুই থাকে না ভিটামিন-ডি ভরা রোদ গায়ে মেখে—

গ্রে, চললাম; গ্রে, বাই-বাই; গ্রে, চলে যাচ্ছিরে...বলবার ছাড়া!

তখনই জানালার ধারে

না-মানুষ না-কুকুর—নাম টমি,

মানবিতিহাসে মৃত্যু থেকে ফিরে আসা একমাত্র প্রাণী বলে নিজেকে দাবি করে

(অতএব তার কথা সবচাইতে বেশি দামি!)

চিৎকার দিল জোরে খ্রনহ-খ্রনহ ধরনের আওয়াজ করে-টরে

আমাদের জীবনের সারাংশ

একবারে এক ডাকে তুলে ধরে—

ওদিকে তারিনদ্ যে তার দু বানানের ঘোলাটুকু নিয়ে শীতের নরম রোদ গায়ে মেখে

তাঁবু গেড়ে

বসে গেছে

গোলাবাড়ি আনাজ ও আমাদের নাটকীয় বনমহোৎসব সব ঘিরে,

তাহা আহা-হাহা কুকুরের নেত্র দিয়ে চতুর্দিকে প্রত্যক্ষ করে।

 

এমত দৃশ্য দেখিছু জীবুনে আরু

যে ভাষাতে বাংলা লেখো তা কিন্তু কোনো কোরিয়ান লোকের কাছে হিব্রুতেই লেখা—

সে বলল কথাটা তার বান্ধবীকে,

বনানী কোরিয়ান মার্টের খোলা দরজা পথে,

যেখানে জড়ো হচ্ছে হাওয়া কিছু পরে ঝড় হয়ে যেতে।

আমি তাকে বলিনি যে কথা ঠিকই আছে

পৃথিবীতে যোগাযোগের সমস্যা এইগুলো,

হেরোডোটাস এ নিয়ে লিখে গেছেন ‘হিস্টোরি’ নামের

এক বড় বইয়ে।

আর তার কাছে বাংলা অবশ্যই হিব্রু হতে পারে,

কিন্তু তাদের কোরিয়ান লেখা দেখতে তো

আমার কাছে ছোট ছোট তেলের পাইপের মতো লাগে;

আরও নির্দিষ্ট করে যদি বলি—

কোরিয়ান লেখা চাঁদের আলোয় ফেলে রাখা মেশিনপত্তরের মতো,

যখন কিনা আকাশে পাখি নেই, থাকলেও নেই,

কারণ অন্ধকার চারদিকে,

যখন মাটিতে শুধু কুকুরগুলো ডাকে—

তারা রেস্টুরেন্ট থেকে বিতাড়িত, আহা!

কারণ ঝড় হবে ঝড় শুরু হবে, হে মাতা হে পিতা!

তোমাদেরকে বিপদের দিনে মা-গো বাবা-গো বলে মানুষেরা নানা ভাষায় ডাকে নানাভাবে

—তবে একইভাবে, হা হা!

আর রাস্তায় দ্যাখো মানুষ কত কত

তারা জলদি যাচ্ছে বাড়িঘর ঘরসংসার এসবের দিকে

তাদের যার যার মায়ের সাথেও এই ঝড়ের রাতে

কোনো যোগাযোগ নেই দেখে—

হিব্রু বাইবেলে লেখা শাশ্বত অপরাধবোধ থেকে।

সে তখন কুকুরগুলোর সাথে লোভ থেকে

যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে নিল

(এটা আমার অন্ধবিশ্বাস থেকে বলা),

আর আমাকে বলল ভাঙা ইংরেজিতে—যান, যান,

আকাশ জুড়ে ধূমকেতু ছুটে যাচ্ছে চারদিকে

ওরা কোরিয়াতে বানানো নিউক্লিয়ার মিসাইলও হতে পারে।

সেটা আমার ভুল বোঝা ছিল, কারণ বিরাট নভোমণ্ডল জুড়ে

তখন রাত শুধু আর অন্ধকার আর বাতাসের ধীরে ধীরে

বেড়ে ফেটে-কেটে-পড়া হুংকার শুধু—

এর মধ্যে বলো ধূমকেতু আসবে কোত্থেকে?

তার মানে এই ঝড়ের আগে খেলা

আমাদের ব্যাডমিন্টন খেলাগুলো

এ মুহূর্তে ইতিহাস হয়ে আছে,

এখন ওখানে নেট পড়ে আছে মাঠে,

পাখির পালকও কিছু পড়া নিচে 

যেহেতু কেউ সাক্ষাৎ পাখি দিয়ে একটা ফুল-ম্যাচ খেলে, ওদেরকে ফেলে রেখে চলে গেছে

ঝড়-ঝড়-ঝড় চিৎকার করে বাংলাতে।

আমি তাকে বললাম—এই চিৎকারগুলো কোরিয়ানে

কীরকম হবে তবে দাদা?

এই যে যোগাযোগের সমস্যা ও ভুল বোঝাবুঝি,

এই যে অভ্যাস ও রীতি সব টালমাটাল করে টলে আসে

এই যে কামানগুলো তিন হাত লম্বা ও চার হাত ব্যাসে

এই যে ভুসুকপা ছাড়ে না হরিণের পিছু,

এই যে মধুখাঁর টাস ধরা মন

এই যে ঝড়ের মাঝখানে টেটা লকলক ছোবলায়

হিস হিস ভাল্লা ছোটে,

এই যে কোরিয়ান তুমি বাংলার দেশে এসে

মাথায় লোহার টুপি পরে অস্তিত্বসংকটে পড়ে গেছ,

সুন্দর বান্ধবীকে নিয়ে এসেছিলে হরিণের মাংস খাবে বলে,

পরে এই যে কুকুরের নলা বিয়ার দিয়ে খেলে–

আর তখনই ঝড় উঠে গেল বাংলাতে ইচ্ছা ও কল্পনার থেকে—

তার সবই বুঝি, বুঝি দূরত্বের এইসব চিরকালীন স্বার্থপর কথা দেশে দেশে।

—ড্যাম ইট, এমত দৃশ্য দেখিছু এ জীবুনে আরু

এমত আত্মানমজ্যুহোমি সো আ হা, হা হা।

যেতে দিচ্ছে না সামনের দিকে

(উৎসর্গ: ‘অহেতু গুঞ্জনমালা’- কবি কামরুজ্জামান কামু)

......

‘ইকরা মোটরস‘ পার হতে বৃক্ষরোপণের কথা মনে এলো

—ঝট করে বুক কেঁপে উঠে,

পেছনে রেললাইন ধরে আমার প্রিয় জারুল গাছগুলো ছিল

অ্যাভেরোয়া বিলিম্বিও ছিল কতগুলো,

আইএসপিআর-এর ঘোষণার পরে তারা এখন নেই আর

তারা এখন নেই আর ওইখানে।

তাদেরকে উপড়ে নেওয়া হয়েছে কি শেকড়ের থেকে?

—কাকে জিজ্ঞেস করি আমি কাকে?

লোকগুলো তো দেখি ‘জাহাদ রেস্তোঁরা‘-তে বসে

পরোটার সাথে কিডনি খাচ্ছে মন দিয়ে,

মুরগির লিভার কিডনি আরও যা যা আছে,

‘উন্মার্গগামিতা‘ বলতেন বুদ্ধদেব বসু একে—

‘তিথিডোর‘ পড়োনি কি রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পড়তে গিয়ে

ভ্রমাত্মক সিদ্ধান্তের থেকে?

আর ‘ট্রাভেল ফ্যান্টাসি’ ও ‘তারো-বাংলা‘ দালানের ছাদে

এক বাচ্চা ছেলে বৃক্ষের মৃত্যু দেখে

পেশাব করছে রাস্তার দিকে মুখ রেখে চ্যাটাং চ্যাটাং

তার পেশাব-মেশিন উঁচু করে—

পেশাব করছে সে গাছ কাটার প্রতিবাদ থেকে,

যেহেতু গাছের সঙ্গে তার পাখিরাও উড়ে গেছে তালেগোলে উদ্বাস্তু হয়ে,

সম্ভবত চলে গেছে ক্ষারজলে, ভাগাড় ও পঙ্কিল স্রোতে—

সাধারণ পাখি যেমন টিয়া

যেমন ক্যাকোমেন্টিস মেরুলিনাস

ফ্র্যাঙ্কোলিনাস ফ্র্যাঙ্কোলিনাসও আছে

(আমি বৈজ্ঞানিক নাম বলছি ইচ্ছে করে;

পড়তে থাকুন বুঝে যাবেন কেন তা ধীরে ধীরে।)

হাহ, আর্মিদের গাড়ি দেখছে বাচ্চাটাকে দেখছে ঠিকই;

কিন্তু তারা ওরকম বাচ্চাকে

গুলি করবে কী করে

গুলি করবে কী করে একটা বাচ্চাকে?

যদিও তাদের হাতে টরাস রাইফেল রিভলভার ও সাবমেশিন-গান নিঃসন্দেহে আছে,

স্টিল-ফ্রেম পলিমার-ফ্রেম আরও নানা কিছু—

ব্রাজিল বানিয়েছে ওগুলো রিও গ্র্যান্দি দু সুলে

আমাদের রাষ্ট্র-ব্যবস্থার কথা মনে রেখে।

তারা সামরিক স্বরে বলছে ‘বজ্র্য‘ পৃথকীকরণের কথা

বলছে যে—‘উচ্ছিষ্ট খাদ্যসামগ্রী, ব্যবহৃত টিস্যু হলুদ বিনে ফেলতে হবে‘—

‘বর্জ্য‘ কে ‘বজ্র্য‘ বলছে কেন ওই সেনা,

সে কি ক্লাস ফোরও পাশ করেনি তবে?

ফেরেশতারা কী যে হাসছে কী যে হাসছে তা দেখে।—

আর পাশে ‘পুস্প ক্লিনিক‘,

মালিকের নাম শাহেদ ধরা গেল,

তো তাকে অযথা ঘৃণা করছে কেন

হড়বড় করে পরোটা দিয়ে কিডনি খাওয়া লোকে?

তাকে ঘৃণা করছে তারা কোন্ অধিকার থেকে—

ক্লিনিকের নাম সে ‘পুস্প‘ রাখবারও পরে?

আর ওই দ্যাখো ওই দ্যাখো

‘নিউ বিসমিল্লাহ হোটেল‘-এর ছোট দরজা ধরে

এক ছেলে চেষ্টা করছে বান্ধবীকে ভেতরে নিয়ে যেতে—

যেও যেও না তুমি বাচ্চা মেয়ে,

সে সেক্স ছাড়া আর কিছু চায় না তোমার কাছে;

চাইতেও পারে জানি না জানি না আমি ঠিক করে,

তবে একদিন সেক্স তো করতেই হবে

একদিন মেনোপজও হবে,

আর ভালোভাবে যদি সেক্স করো সেই নেশায় পড়ে

ছেলেটা তোমাকে পরে বিয়ে করতেও পারে মনে রেখে।

জীবনে সবকিছুর এরকম দুই-দিক তিন-দিক আছে।

তবে সাবধান, এই সিচুয়েশনে কে যে কী করে বসে

কে যে কী করে বসে কাকে!

যেমন ধরো তারা আমাকে আটকে রেখেছে

যেতে দিচ্ছে না সামনের দিকে,

আমার কী দোষ?

আমি বলেছি আমাকে আমার

ঘুম বৃক্ষ প্রশান্ত বাতাস আর সন্ধ্যার লাল রং মেঘগুলো দিলে

আমি চলে যাব এনএসআই এজেন্টদের দিকে কোনোরকম ভ্রুকুটি না হেনে;

—ওরা ওই যে ঝুড়িতে বসে গোল হয়ে পাখি সেজে

ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষের মাঝে,

কেউ কি বুঝছে না সেটা মনে করো?

মানুষের গলা দিয়ে পাখিদের বৈজ্ঞানিক নাম ধরে ধরে

কক্ কক্ করলেই তুমি

সাকসেসফুল মুরগির ছদ্মবেশে যাবে, মনে করো?

সেজন্যই বলছি যে আমাকে ছাড়ো

স্রেফ আমার পাশ-ফেরা হাই-তোলা আর মাথা গরম করার স্বাধীনতাটুকু দিয়ে,

তাহলেই আমি চলে যাব তোমাদের মহাখালী আরও খালি করে!

কারণ দ্যাখো মহাখালী থেকে সিরাজগঞ্জ যাচ্ছে

‘এসআই এন্টারপ্রাইজ’-এর বাস দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে ছুটে—

সামান্য মহাখালী থেকে একদম সিরাজগঞ্জ!

কথা নেই বার্তা নেই একদম সিরাজগঞ্জ চলে যাবে?

—কারা যাবে? যারা যাবে

তারা যাবে কি দুঃখ না শোক না লজ্জার থেকে?

—আর কেন যাবে?

এমন কি যে এই পৃথিবীতে এসে মানুষেরা মুক্তি শুধু সিরাজগঞ্জে গেলে পাবে?

আর ‘আজমেরী গ্লোরি’ বাসের পেছনের দিকে

হায় খোদা, ওরা দেখি নরকের আগুন এঁকে রেখেছে

ওরা দেখি জাহান্নাম বুঝিয়েছে ওরকম করে—

তবে আবার ওটা তো আগুন না-ও হতে পারে,

এমন তো হতে পারে দাগিগলা কাঠকুড়ালিরা দল বেঁধে এসে

তাদের রক্তলাল মাথা ঠুকে যাচ্ছে লাল রং রাজঅশোকের ঝাড়ে—

এ পৃথিবীতে বহু কিছুই বহু কিছু হতে পারে।

মাসরুর আরেফিনের পরিচিতি: জন্ম ৯ অক্টোবর, ১৯৬৯; বরিশাল। এমএ (ইংরেজি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এমবিএ (মার্কেটিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স), অস্ট্রেলিয়া। পেশায় ব্যাংকার। প্রকাশিত বই : ১. ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প (কাব্যগ্রন্থ; ২০০১; দ প্রকাশনী) ২. ফ্রানৎস কাফকা গল্পসমগ্র (অনুবাদ; ২০১৩; পাঠক সমাবেশ) ৩. হোমারের ইলিয়াড (অনুবাদ; ২০১৫; পাঠক সমাবেশ) ৪. আগস্ট আবছায়া (উপন্যাস; ২০১৯; প্রথমা প্রকাশন) ৫. আলথুসার (উপন্যাস; ২০২০; প্রথমা প্রকাশন) ৬. পৃথিবী এলোমেলো সকালবেলায় (কাব্যগ্রন্থ; ২০২০; পাঠক সমাবেশ) ৭. স্যাঁ-ঝন প্যার্সের আনাবাজ (অনুবাদ; ২০২০; পাঠক সমাবেশ) ই-মেইল : [email protected]




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top