মার্কসের 'পুঁজি': পণ্য


প্রকাশিত:
১৯ নভেম্বর ২০২০ ১১:৫২

আপডেট:
২৩ নভেম্বর ২০২০ ১৪:৩৫

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯। মার্কসের ‘পুঁজি’ পড়বার চতুর্থ পাঠ শুরু হয়। মূল্যের রূপ নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শেষ হয়। ‘পণ্যের ভতুড়ে কারবার’ নামক গুরুত্বপূর্ণ অংশ আপাতত বাদ রাখা হয়। কারন এর সঙ্গে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন ও সমাজতত্ত্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তর্কবিতর্ক জড়িত। আগামিতে সেই বিষয়ে আলাদা ভাবে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখানে আলোচনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ পেশ করা হোল।

১. আবারও নতুন যাঁরা যোগ দিয়েছেন তাঁদের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে ‘পুঁজি’ সম্পর্কে বাংলাদেশে বিভ্রান্তিকর নানান চলতি অনুমান নিয়ে আলোচনা ওঠে। বাংলাদেশের বামপন্থি শিবিরে ‘পুজি গঠন’ নামক একটি অনুমান বা ধারণা কাজ করে। সেটা অনেকটা এরকম যে বিভিন্ন দেশে পুঁজি গঠনের ইতিহাস আলাদা, অতএব ইউরোপ, আমেরিকা বা পাশ্চাত্য দেশের পুঁজি গঠনের সঙ্গে আমাদের দেশের পুঁজি গঠনের পার্থক্য বোঝা দরকার। সেটা বিচার করেই বাংলাদেশে আমাদের রাজনৈতিক কর্তব্য ঠিক করতে হবে। ‘পুঁজি গঠন’ বলতে বোঝানো হয় এখানে পুঁজিপতিদের হাতে টাকা কিভাবে জমেছে, তারা কিভাবে সম্পদ কুক্ষিগত করেছে, ইত্যাদি। অর্থাৎ টাকাওয়ালারা কিভাবে টাকা বানিয়েছে সেটা জানলে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আমরা বুঝব।

২. বাংলাদেশের অল্প কিছু পরিবার কিভাবে টাকা বানিয়েছে এবং অল্প কিছু পরিবারের হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং হচ্ছে তথ্য হিশাবে সেইসব জানা দরকার। কিন্তু ‘পুঁজি’ মানে স্রেফ টাকা বানানো না। মার্কসের ‘পুঁজি’ বই কিভাবে অল্পকিছু মানুষ টাকা বানায় তার খবর প্রদান বা ব্যাখ্যার বই নয়। হাতে টাকা জমলে তা বাণিজ্য পুঁজির চরিত্র কিছুটা বোঝা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ইংরেজি শাসনামল বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও কিছুটা কাজে লাগে। কিন্তু বাংলাদেশে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের উদ্ভব সম্পূর্ণ ভিন্ন তর্ক। কারন সেই উদ্ভবের শর্ত কিভাবে তৈরি হোল সেটা বোঝা পুঁজির সামগ্রিক চলন ও বিচলন ব্যাখ্যা থেকে আলাদা। বিশেষুত পুঁজি যখন আর কোন বিশেষ দেশের সীমানার মধ্যে বন্দী নয়। বিশেষ ভাবে ভূমির মালিকানা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ উৎখাত হবার প্রক্রিয়া বুঝতে হবে নিজের শ্রম বিক্রি ছাড়া যারা বেঁচে থাকতে পারে না। এ ব্যাপারে প্রাথমিক ধারনা করবার জন্য মার্কসের ‘পুঁজির উদ্ভব’ পুস্তিকটি সংগ্রহে থাকা দরকার। এটিবাংলায় অনুবাদ করা মার্কসের কয়েকটি লেখার সংকলন।

৩. নিজেই টাকা থেকে টাকা বানানোর কর্তা হিশাব কিভাবে পুঁজি খোদ নিজেই নিজের পুঞ্জিভবন ও স্ফীতি নিশ্চিত করে মার্কস সেই দিকটা বিশেষ ভাবে ব্যখ্যা করতে চেয়েছেন যাতে পুঁজির নৈর্ব্যক্তিক শক্তি সম্পর্কে আমরা সম্যক ধারণা করতে পারি এবং এর বিরুদ্ধে লড়বার নীতি ও কৌশল ঠিক করতে পারি। পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের রূপ সব দেশে এক রকম নয়, কিন্তু সেটা বুঝতে হলে মার্কস ‘পুঁজি’ বলতে কি বুঝিয়েছেন, কাকে বুঝিয়েছেন কিম্বা কোন বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন সেটা আগে বুঝতে হবে। ধারণাগত দিকগলো পরিষ্কার হলে বাস্তবে কি ঘটেছে তার সঙ্গে আমরা তুলনা করে দেখতে পারি মার্কসের পদ্ধতি ও বিশ্লেষণ আমাদের কতোটা কাজে লাগে। পুঁজি বই লিখবার সময় মার্কস একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুমান করেছেন। যা প্রাক পুঁজিতান্ত্রিক অবস্থা থেকে পুঁজিতন্ত্রে রূপান্তরের ইতিহাস থেকে আলাদা। কিম্বা একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সীমানার মধ্যে বাস্তবে পুঁজিতন্ত্র কিভাবে কাজ করে সেই বাস্তবতা থেকেও আলাদা।

বাংলাদেশে অনেকে টাকা বানানো বা অল্প কিছুর লোকের হাতে টাকার পুঞ্জিভব্নকেই ‘পুঁজি গঠন’ বলে থাকেন। এর সঙ্গে মার্কসের ‘পুঁজি’র কোন সম্পর্ক নাই। এই ধারণা গুলো মাথা থেকে খারিজ না করলে মার্কস ‘পুঁজি’ গ্রন্থে আসলে কি আলোচনা করেছেন তার কিছুই আমরা বুঝব না। তাই পাঠচক্রে মার্কস ‘পুঁজি’ বলতে কী বুঝিয়েছেন সেই দিকেই আমরা আমাদের মনোযোগ নিবদ্ধ রাখব। এতে অনেক গোলমাল আমরা এড়াতে পারব।

৪. প্রাথমিক ভাবে বোঝার সুবিধার জন্য আমরা কয়েকটি কথা মনে রাখতে পারি।

ক. প্রতিটি সমাজকেই উৎপাদন, বিনিময়, বিতরণ ও ভোগের ব্যবস্থা করতে হয়। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে এই ব্যবস্থাটা কিভাবে সম্পন্ন হয় মার্কস সেটাই ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। বলাবাহুল্য বিভিন্ন প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের তুলনায় পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে এই ব্যবস্থার চরিত্র ভিন্ন এবং তুলনামূলক ভাবে জটিল। কিন্তু পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার জটিলতা বোঝা গেলে পুরানা সমাজ সম্পর্কেও আমাদের বোঝাবুঝির ক্ষমতা বাড়ে, পদ্ধতিগত দৃষ্ঠিভঙ্গিও আরও পরিণত হয়। বাস্তব ইতিহাসের দিক থেকে এর আলোচনা তিনটি পর্যায়ে সাধারণত হয়ে থাকে। প্রথম হচ্ছে প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক থেকে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কে উদ্ভবের ইতিহাস, দ্বিতীয়ত, 'পুঁজি'র আবির্ভাবের পরে পুরানা সম্পর্কগুলো ভেঙে ফেলা ও পুঁজির অধীনস্থ করবার ইতিহাস এবং তিন, 'পুঁজি'র আত্মস্ফীতি ও পুঞ্জিভবনের ইতিহাস। এই শেষের পর্যায়ে মুদ্রা বা টাকার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আজকাল যাকে বিশ্ব অর্থনীতির 'ফাইনান্সিয়ালাইজেশান' বলা হয় তা টাকাপুঁজির পর্যালোচনা ছাড়া বোঝা অসম্ভব। যে কারণ মার্কসের মুদ্রাতত্ত্ব একালে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। চিন্তা পাঠচক্রের আগামি বৈঠকগুলো টাকাপুঁজি বিশ্লেষণ ও বোঝার প্রতি বিশেষ ভাবে মনোযোগী হবে।

খ. ‘পুঁজি’ যৌথ সৃষ্টি এবং নৈর্ব্যক্তিক শক্তি। মার্কস দেখাতে চেয়েছেন পুঁজি কিভাবে সমাজের যৌথ প্রয়াসের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে এবং নৈর্ব্যক্তিক শক্তি হিশাবে সক্রিয় থাকে।

গ. নৈর্ব্যক্তিক পুঁজি কোন ব্যক্তি মানুষের ইচ্ছায় চলে না, বরং পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তির ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা কামনা বাসনা আদতে পুঁজির প্রণোদনা হিশাবেই সাধারণত সক্রিয় হয় এবং সক্রিয় থাকে। পুঁজির পরিমণ্ডল থেকে বাইরে আসা খুব সহজ নয়। পুঁজি ও পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের ইচ্ছা অভিপ্রায় ও আকাংখার মানবিক ও ঐতিহাসিক চরিত্র বুঝতে শেখে ও বুঝতে পারে।

ঘ. ওয়াশিংটনে, ব্রাসেলস, ইংলন্ড, দিল্লি ইত্যাদি শহরে বসে কেউ স্রেফ ষড়যন্ত্র করে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালনা করে না। পুঁজির চরিত্রকে আমলে না নিয়ে কারো পক্ষেই নিজেদের জন্য কোন সুবিধা আদায় করা সম্ভব নয়। তেমনি পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইইয়ের সাফল্য নির্ভর করবে পুঁজির চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষমতার ওপর। ‘পুঁজি’ না বুঝলে সাম্রাজ্যবাদ বা পরাশক্তির ভূমিকা যেমন বোঝা যাবে না, তেমনি ভূ-রাজনীতির জটিলতাও না।

আপাতত এই কথাগুলো মনে রাখলেই যথেষ্ট।

৫. অনেকের কাছে অবাক মনে হতে পারে, কিন্তু মার্কসকে সারাজীবন সমাজতন্ত্রী কিম্বা নৈরাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে। মার্কস যাদের চিন্তার বিরোধিতা কিম্বা পর্যালোচনা করেছেন তাঁরা কেউই মন্দ মানুষ ছিলন না। শোষণের বিরুদ্ধে মেহনতি শ্রেণির লড়াই কিম্বা নিপীড়িত জনগণের মুক্তির সংগ্রামে তাঁদের আন্তরিকতার অভাব ছিল না। লড়াইটা ছিল মতাদর্শিক। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই মার্কস একসঙ্গে লড়েছেন। এদের একজন হলেন পীয়ের-জোসেফ প্রুধোঁ (১৮০৯-১৮৬৫)। মার্কস যখন ফ্রান্সে ছিলেন তখন বেশ কয়েক রাত প্রুধোঁর সঙ্গে কাটিয়েছেন। কিন্তু ‘পুঁজি’ বোঝা ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে দুইজনের চিন্তার তফাতের কারনে তাদের সেই বন্ধুত্ব টেঁকে নি। প্রুধোঁর ‘দারিদ্রের দর্শন’ (১৮৪৭) বইটি বেরুবার পর মার্কস তীব্র ভাষায় তার সমালোচনা করে ফরাসি ভাষায় যে বই লেখেন তার নাম দিয়েছিলেন ‘দর্শনের দারিদ্র’ এরপর তাঁদের সম্পর্ক ভাল থাকার কোন শর্তই আর রইল না। এটিও বেরোয় ১৮৪৭ সালে। আশ্চর্য হলেও সত্য যে মার্কসের জীবদ্দশায় বইটি আর বেরোয় নি। এর অর্থ হচ্ছে মার্কসের নামে ‘সামাজতান্ত্রিক’ চিন্তা হিশাবে যেসকল ধ্যাণধারণার প্রবল প্রচার হয়েছিল এবং এখনও রয়েছে তার সঙ্গে মূলত প্রুধোঁর চিন্তারই মিল, যে চিন্তার বিরুদ্ধে মার্কসকে লড়তে হয়েছে।

প্রুধোঁর ‘সম্পত্তি কী?’ বইটি সে সময়ের সমাজতন্ত্রীদের প্রবল প্রভাবিত করেছিল এবং প্রুধোঁর সমাজতান্ত্রিক চিন্তার গোড়ার অনুমান ও ধারণাগুলো সম্পর্কে জানার জন্য এখনও খুবই গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যপুস্তক। প্রুধোঁই প্রথম নিজেকে এনার্কিস্ট বা নৈরাজ্যবাদী হিশাবে ঘোষণা করেন। কিন্তু মার্কস প্রুধোঁর চিন্তাকে কঠোর ভাবে সমালোচনা করেছেন। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে নানান কিসিমের সমাজতান্ত্রিক ধারাকে চেনার জন্য প্রুধোঁকে পড়া খুব কাজের হতে পারে। চিন্তা পাঠচক্রে আমরা বইটি প্রুধোঁর বইটিও হাতের কাছে রাখব, যেন মার্কসের সঙ্গে প্রুডধোঁর ফারাক আমামদের কাছে স্পষ্ট থাকে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক ধারার সঙ্গে মার্কসের চিন্তার মৌলিক বিরোধগুলি সহজে আমরা ধরতে পারি।

৬. ‘সম্পত্তি কী?’ বইয়ের শুরুতে প্রুধোঁ বলছেন, যদি কেউ প্রশ্ন করে দাসব্যবস্থা কী? তাহলে খুব সহজেই এক কথায় উত্তর দেওয়া যায় যে এটি হচ্ছে খুনী ব্যবস্থা। মানুষ খুন করা। এভাবে বললে লোকে খুব সহজেই বুঝবে। কোন মানুষের চিন্তা বিবেক ইচ্ছা ব্যক্তিত্ব তার জীবন ও মৃত্যর ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। অতএব একজন মানুষকে দাসে পরিণত করারা অর্থ তাকে খুন করা। তেমনি এক কথায় যদি সম্পত্তি কী, এই প্রশ্নের আমরা উত্তর দিতে চাই তাহলে বলা যায় এটা ডাকাতি। স্রেফ ডাকাতি। এতে কোন ভুল বোঝাবুঝি থাকতে পারে না।
propertyসম্পত্তি হচ্ছে ডাকাতি, এই অনুমান থেকে শুরু করলে ব্যক্তিগত মালিকানার উদ্ভব ব্যাখ্যা করা হয় না। বরং আগাম তার অস্তিত্ব মেনে নেওয়া হয়। অন্যের মালিকানা থেকে সম্পত্তি জবরদস্তি ছিনিয়ে নিয়ে ধনোপার্জন মানে সেই ধনের মালিকানা ছিল অন্যের, জবরদস্তি তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ব্যাক্তিগত মালিকানার ধারণাই এতে প্রতিষ্ঠিত হয়, ব্যখায় হয় না। চুরি, ডাকাতি, হানাদারি ইত্যাদি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। নৈতিক নিন্দা আলাদা ব্যাপার। কিন্তু সামাজিক-ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান হিশাবে ব্যক্তিগত মালিকানার ব্যাখ্যা চুরি বা ডাকাতি তত্ত্ব দিয়ে হয় না।

মানুষ কেন ব্যক্তি মালিকানাকে স্বীকৃতি দেয়, আইন এবং রাষ্ট্র কেন তা পাহারা দেয়? ব্যক্তিগত মালিকানা সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিশাবে কিভাবে গড়ে ওঠে তার ব্যাখ্যা চুরি বা ডাকাতি দিয়ে হয় না, করা যায় না। চুরি-ডাকাতির তত্ত্ব দ্বারা ব্যাক্তিগত মালিকানার ঐতিহাসিক বিকাশ বোঝা যেমন অসম্ভব তেমনি ব্যক্তিগত মালিকানার সর্বোচ্চ রূপ হিশাবে কিভাবে পুঁজি নৈর্ব্যক্তিক ক্ষমতা হয়ে মানুষের ওপর প্রভূত্ব করে সেটা বোঝাও দুঃসাধ্য। কিন্তু সমাজে শোষণ, বঞ্চনা, জুলুম নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পত্তি মানেই চুরি বা ডাকাতি এই চিন্তা বদ্ধমূল হতে পারে সহজে। এই সকল সস্তা ধারণা থেকে মুক্ত না হলে মার্কসের ‘পুঁজি’ বোঝা কঠিন।

অনেকেরই ধারণা মার্কসের ‘পুঁজি’ এই ডাকাতিকেই বুঝি ব্যাখ্যা করেছে। অবাক হলেও সত্য, বাংলাদেশে এই ধারণা যথেষ্ট প্রবল। প্রুধোঁর ডাকাতি তত্ত্ব থেকে তাই আমাদের দূরে থাকতে হবে। এর দ্বারা আমরা ‘পুঁজি’ বুঝবো না। ব্যক্তিগত মালিকানা ও ধনসম্পত্তির প্রতি ঈর্ষা কিম্বা ধনির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকার রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ভুমিকা আছে, কিন্তু যখন এই ঈর্ষা এবং ক্ষোভ রাজনীতির নির্ধারক হয়ে ওঠে তখন তার লক্ষ্য হয়ে ওঠে ধনিদের সম্পত্তি কেড়ে নিজেরা নিজেরা মালিক হওয়া। এটা নিছকই ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রতিক্রিয়া। ‘পুঁজির’ প্রতি প্রতিক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়াশীলতা দ্বারা ‘পুঁজি’ মোকাবিলা করা যায় না। সমাজতান্ত্রিক চিন্তা কিভাবে প্রতিক্রিয়াশীল হতে পারে তার অধিকাংশ কারণএই ঈর্ষা ও ক্ষোভের মধ্যে নিহিত। কমিউনিস্ট ইশতেহারের শেষের পাতাগুলোতে প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতন্ত্র নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আছে।

৭.পুঁজিবাদ, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের ক্ষোভ, ভুল কিম্বা ভাসা ভাসা জ্ঞান থাকার ফলে আমরা অনুমান করি পুঁজিবাদ, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা ইত্যাদি বুঝি একান্তই অবশ্যম্ভাবী ভাবেই স্রেফ ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ শোষণ। অর্থাৎ শোষণের তত্ত্ব ছাড়া আমরা ‘পুঁজি’ বুঝতে পারি না। পুঁজি কিভাবে বাড়তি মূল্য যোগ করে সেই বিশ্লেষণ পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন বোঝার জন্য খুবই নির্ধারক ধারণা, সন্দেহ নাই। কিন্তু উৎপাদন ‘পুঁজি’র সামগ্রিক বিচলনের একটি মুহূর্ত মাত্র, সমান গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক বিনিময়, বিতরণ ও ভোগ। বাড়তি মূল্য উৎপাদনের বিশেষ ধরণ বা রূপ বোঝার মধ্যেই পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক বোঝার রহস্য নিহিত রয়েছে।

পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অবশ্যই শোষণ রয়েছে, কিন্তু 'পুঁজি' সশষণ মাত্র নয়। শোষণ তত্ত্বে ধরে নেয়া হয় ধনী গরিবকে শোষণ করে ধনী হয়। কিন্তু মার্কস জানাচ্ছেন, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় শোষণ আছে ঠিক, কিন্তু এই শোষণ, দাস বা সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে একেবারেই ভিন্ন বা আলাদা। সমাজ ও অর্থনীতির বিশ্লেষণে শোষণবাদ বা শোষণতত্ত্ব অতিশিয় সস্তা পেটিবুর্জায়া চিন্তা। মার্কস বোঝার ক্ষেত্রে যা প্রকট প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। সাধারণ ভাবে শোষণবাদী তত্ত্বে ধরে নেওয়া হয় শ্রমিককে শোষণের মাধ্যমেই বুঝি শিল্পের আয় বৃদ্ধি ঘটে এবং শ্রমিক তার ন্যায্য মজুরি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবার কারনও এখানে। অথচ, মার্কসের বাড়তি বা উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্বে ন্যায্য মজুরির কোন ধারণাই নেই। পুঁজিতন্ত্রে ন্যায্যতার মানদণ্ড কি হবে সেটা এক কঠিন ও জটিল প্রশ্ন। পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা অসম্ভব। বরং পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক উৎখাতই একমাত্র ন্যায্য কাজ ও কর্তব্য। সে কারণে মার্কস পুঁজিতান্ত্রিক শোষণ ব্যাখ্যা করেছেন বটে, কিন্তু ‘পুঁজি’ গ্রন্থে জোর দিয়েছিলেন পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের ওপর।

ন্যায্য মজুরির নির্ণয় অসম্ভব বলার অর্থ এই নয় যে ন্যায্য মজুরির জন্য শ্রমিকেরা আন্দোলন বা সংগ্রাম করবেন না। অবশ্যই করবে কিন্তু মার্কসের অনুসারীদের কাজ হচ্ছে তাকে স্রেফ মজুরির জন্য দর কষাকষিতে পর্যবসিত না করে এর মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের শিক্ষা ও সচেতনতার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ন্যায্য মজুরির দাবি শ্রেণি সংগ্রামের একটি বিশেষ রূপ মাত্র এবং তার অভিমুখ পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের রূপান্তর সাধন।

পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অবশ্যই শোষণ রয়েছে, কিন্তু শোষণসর্বস্ব তত্ত্ব আমরা পরিহার করতে চাই কারণ মার্কস জোর দিয়ে বলেছেন পুঁজি হলো মূলত সামাজিক সম্পর্ক। শ্রমিক তার শ্রম বিক্রি ছাড়া সমাজে টিকে থাকতে পারেনা। পুঁজির জন্যই আমরা পুঁজির কাছে আমাদের নিজেদের বিক্রি করি, নিজেকে বিক্রির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে পুঁজি ‘সামাজিক সম্পর্ক’ কথাটার মর্ম আমরা কিছুটা বুঝি। কিন্তু আমরা আরও গভীরে প্রবেশ করতে চাইছি।

মূল্য এবং মূল্যের রূপ
৮. আমরা দেখেছি, পণ্যের দুটো রূপ অর্থাৎ কোনকিছুকে পণ্য হতে হলে দুটো গুণ থাকতেই হবে : ব্যবহারের সম্ভাবনা এবং বিনিময়ের সম্ভাবনা। এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন ওঠে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোরআন শরীফও একটা পণ্য কিনা? আর যে কোন পণ্যের মতোই বাজারে কোরান শরিফ একটি পণ্য। একে ‘হাদিয়া’ বললেও পণ্য পণ্যই থাকে। কোরান শরিফের উপযোগিতা মূল্য হচ্ছে এই পণ্যটি আমাদের আধ্যাত্মিক উপযোগিতা মেটায়। চাহিদা বৈষয়িক হতে হবে এমন কোন কথা নাই, যেমন, চেহারা সুন্দর করবার জন্য কসমেটিক নন্দনতাত্ত্বিক চাহিদা মেটায়, তাহলে বৈষয়িক, আধ্যাত্মিক, নন্দনতাত্ত্বিক ইত্যাদি যাই হোক, কি চাহিদা মেটায় সেটা পুঁজির জন্য গুরুত্বপূর্ণ না, একথা তাহলে অস্বীকার করবার উপায় নাই যে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সব কিছুই পুঁজির রঙে রঙিন হয়ে যায়, আধ্যাত্মিক জগতও ব্যতিক্রন নয়। পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে না দাঁড়ালে ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতাও পুঁজির কায়কারবারের বাইরে যেতে পারে না। পুঁজির বিরুদ্ধে জিহাদ ছাড়া পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে থেকে ধর্ম চর্চার কথা বলা মূলত পুঁজিরই পূজা করার অধিক কিছু নয়, হতে পারে না।

৯. অর্থশাস্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বর্গ হচ্ছে মূল্য। মার্কস পণ্যের বিশ্লেষণের শুরুতেই বলছেন পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে সম্পদ আমাদের সামনে ‘হাজির’ হয় বিপুল পণ্যের সমাহার হিশাবে। ‘হাজির’ হয় কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা পণ্য দেখি বটে, কিন্তু পণ্য ব্যাখ্যা করলে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের অভ্যন্তরে আমরা প্রবেশ করতে পারি। দেখাচ্ছেন পণ্যের দুটো দিক আছে। এক: ব্যবহারিক বা উপযোগিতা মূল্য আর দুই: বিনিময় মূল্য বা সংক্ষেপে মূল্য। তাহলে কোন কিছু যদি পণ্যরূপ পরিগ্রহণ করতে চায় তাহলে ব্যবহার ও মূল্য দুটোই একসঙ্গে থাকা চাই।পণ্যের উপযোগিতা রূপ বা তার ব্যবহারের গুণ তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নিহিত। পণ্যের শরীর, গঠন বা প্রকৃতি দ্বারাই তার ব্যবহারিক রূপ ঠিক হয়। এটা পণ্যের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ অস্তিত্ব। সংক্ষেপে মার্কস একে বলেছেন, পণ্যের ‘গুণ’। মার্কস বলছেন, “পণ্য বাইরের জিনিস, যা নিজের গুণের কারণে মানুষের চাহিদা মেটায়। এই চাহিদার প্রকৃতি, সেটা পেটের ক্ষুধা থেকে জাগুক কিম্বা কল্পনা থেকে তৈরি হোক, তাতে কোন ইতরবিশেষ ঘটে না। কিভাবে তারা চাহিদা মেটায় তাতেও কিছু আসে যায় না, হতে পারে সরাসরি, কিম্বা উৎপাদনের উপায় হিশাবে”।

প্রাকৃতিক গুণ কথাটা তিনি ব্যবহার করেছেন বিপরীতে পণ্যের অপর দিক, অর্থাৎ মূল্য রূপের সামাজিক মর্মের ওপর জোর দেবার জন্য। প্রাকৃতিক গুণ বা রূপের বিপরীতে আছে পণ্যের মূল্য রূপ (value form)। পণ্যের ‘মূল্য রূপ’-এর দিকটা তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিনিময় মূল্য বা ‘মূল্য’ হচ্ছে মার্কসের ভাষায়, পণ্যের ‘সামাজিক রূপ’। কারন বিনিময় মূলত সামাজিক সম্পর্ক। উৎপাদন ব্যক্তিগত বা বিচ্ছিন্ন হলেও যখন উৎপাদক পণ্যকে বাজারে নিয়ে আসে, তখন বিনিময় সম্পাদনার মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত উৎপাদন সামাজিক উৎপাদন হয়ে ওঠে।

১০. আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট খেয়াল করতে হবে। মার্কস ‘মূল্য’কে সামাজিক বলার মধ্য দিয়ে পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে ‘সমাজ’ কথাটা আমরা কিভাবে বুঝব তার একটা ইঙ্গিত আছে। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের সামাজিকতা মূলত পণ্য বিনিময় ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত সামাজিক সম্পর্ক। তাছাড়া পণ্যের মূল্য রূপ মূলত পণ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে জাত। পণ্যের উৎপাদনে কতোটা শ্রম ঘণ্টা ব্যয় হয়েছে সেটা মুল্যরূপের সঙ্গে যুক্ত, মূলত সেই দিকটার প্রতি শুরু থেকেই মার্কস আমাদের নজর আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। তাঁর মূল্য সংক্রান্ত শ্রমতত্ত্বের গোড়ায় একই ভাবে রয়েছে শ্রম সামাজিক হয়ে ওঠার তত্ত্ব। পণ্যে নিহিত শ্রম বিনিময়ের মধ্য দিয়ে পণ্যের মূল্য হিশাবে সামাজিক নৈর্ব্যক্তিক রূপ ধারণ করে, মার্কসের ভাষায় যা ‘বিমূর্ত শ্রম’। কাঠমিস্ত্রি যখন কাজ করে তখন সেই শ্রমের একটা মূর্ত বা কংক্রিট রূপ আছে, তেমনি ময়রা যখন মিষ্টি বানায় সেই শ্রমের রূপও মূর্ত, বিমূর্ত নয়। কিন্তু বাজারে যখন টেবিল বা মিষ্টি বিক্রি হয় তখন বিনিময় প্রক্রিয়ার মধ্যে দুই প্রকার মূর্ত শ্রম মূল্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে বিমূর্ত হিশাবনিকাশের জগতে প্রবেশ করে। সেখানে তাদের হিশাব হয় বিমূর্ত শ্রম হিশাবে। বিভিন্ন প্রকার শ্রম সমাজের সামগ্রিক শ্রমের অংশ হয়ে ওঠে এবং তখন তাদের মূর্ত রূপ নয়, তাদের বিমূর্ত হিশাব, অর্থাৎ কি পরিমান সামাজিক শ্রম তারা প্রত্যেকে ধারণ করে তার দ্বারা তাদের মূল্য প্রকাশিত হয়। এই মূল্য সম্পর্ক একই সঙ্গে শ্রমের সঙ্গে শ্রমের কিম্বা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কে নির্ণায়ক। পণ্যের সঙ্গে সম্পর্কই পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কে পর্যবসিত হয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধ যখন স্রেফ পণ্যের সম্পর্ক হয়ে ওঠে তাকে মার্কস ‘পণ্যের ভুতুড়ে কারবার’ হিশাবে ব্যখ্যা করেছেন।

১১. বিনিময়ের মধ্য দিয়ে পণ্যের মূল্য রূপ সামাজিক হয়ে ওঠে কোন্‌ অর্থে? মার্কস বলছেন, " ব্যবহার্যতা বা উপযোগিতা মূল্য হতে পারে কারণ ওর মধ্যে বিমূর্ত শ্রম নৈর্ব্যক্তিক রূপ হয়ে নিজেকে প্রকাশ করছে, কিম্বা ওর মধ্যে বাস্তবায়িত রয়েছে। কি ভাবে তাহলে এর পরিমাণ মাপা যাবে? 'মূল্য গঠন করবার উপাদান' দিয়ে, ওর মধ্যে যে শ্রম নিহিত তার দ্বারা। এই পরিমান মাপা হয় সময় দ্বারা, আর সময় মাপা হয় ঘন্টা, দিন ইত্যাদি পরিমাপের মানদণ্ড দিয়ে"।

পণ্যের মূল্য রূপকে মার্কস চারটি শিরোনামে আলোচনা করেছেন। পাঠচক্রে প্রতিটি শিরোনাম ধরে ধরে আলোচনা করা হয়। সেইগুলো হচ্ছে: ১. সরল মূল্য রূপ ২. সামগ্রিক কিম্বা সম্প্রসারিত মূল্য রূপ ৩. সাধারণ মূল্য রূপ এবং ৪. মুদ্রা রূপ

আমরা শিরোনামগুলোর সঙ্গে পরিচিত হবো।

সরল মূল্য রূপের উদাহরণ:

২০ গজ লিনেন = ১টি কোট

অথবা

বিশ গজ লিনেনের মূল এক কোট

এই সরল রূপের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কস কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত টেনেছেন।

মূল্য রূপের এই প্রকাশের ধরণের মধ্যে বাঁ দিককে মার্কস বলছেন আনুপাতিক মূল্য রূপ (Relative Value Form) আর ডান দিককে, অর্থাৎ যে পণ্যের মধ্য দিয়ে ২০গজ লিনেনের মূল্য প্রকাশ করা হয়েছে তা হচ্ছে মূল্যের সমমান রূপ (Equivalent Value Form)। মূল্যের সমমান রূপ এমনই যে তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়ে পর পণ্যের আনুপাতিক মুল্য প্রকাশ করা হচ্ছে।

বলাবাহুল্য এই সরল রূপকে উলটা লেখা বা প্রকাশ করা যায়:

১ টি কোট = ২০গজ লিনেন

অথবা

১টি কোটের দাম বিশগজ লিনেন।

ওপরের সমীকরণ আর নীচের সমীকরণ এক না। কারণ আমরা এখানে এলজেব্রা বা গণিত করতে বসিনি। আসল রহস্য হচ্ছে কে কাকে প্রকাশ করছে। এখানে লিনেন সমমান রূপ এবং কোট আনুপাতিক মূল্য রূপ ধারণ করছে। এখানে খেয়াল করারা বিষয় হচ্ছে:

-- মূল্য রূপের দুটি প্রান্ত পরস্পর থেকে অবিভাজ্য। মূল্য প্রকাশের দিক থেকে আনুপাতিক ও সমমান একই মূল্যেরই অভিব্যাক্তি। তারা পস্পরকে অর্থবহ করারা মধ্য দিয়ে তাদের অবিভাজ্যতা প্রমাণ করে।

-- মূল্যের এই দুই রূপ একই মূল্যের দুই প্রান্ত। অথচ তাদের এক করে ভাবা যাবে না। যেমন যদি বলা হত ২০ গজ লিনেনের দাম কত? তখন একথা বললে কোন অর্থ হবে না যে ২০ গজ লিনেনের দাম ২০ গজ লিনেন। কিম্বা এক কোটের মূল্য এক কোট। অন্য পণ্যের প্রাকৃতিক গুণের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় বলে আনুপাতিক ও সমমানের মূল্য একাকার করে ফেলা যাবে না। পণ্য যখন বাজারে থাকে তখন পণ্যের আনুপাতিক মূল্য সব পণ্যের মধ্যেই হাজির থাকে, কিম্বা হাজির হয়ে যায়।

-- আনুপাতিক ও সমমান দুটোই মূল্যের রূপ মাত্র। কোন পণ্য কী রূপ প্রদর্শন করছে সেটা নির্বর করে কে কার মধ্য দিয়ে নিজের মূল্য প্রকাশ করছে তার ওপর।

আনুপাতিক মূল্য রূপ দুটো পণ্যের মধ্যে সমতা জ্ঞাপন করে দুটি পণ্যের মধ্যে বিনিময়ের সম্পর্ক মূলত মূল্যের সম্পর্ক। কারণ ধরে নেওয়া হয় তারা সম্পঊর্ন ভিন্ন হলেও মুল্যের দিক থেকে একই পরিমান মূল্য ধারণ করে।

কিন্তু সমমানের মূল্য যখন অন্য পণ্যের মূল্য প্রকাশ করে তখন সেই প্রকাশ তার প্রাকৃতিক গুণের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়।

আনুপাতিক মূল্য রূপ সব সময়ই সুনির্দিষ্ট পরিমাণ প্রকাশ করে। সমমান মূল্য রূপ তাৎক্ষণিক বিনিয়োগযোগ্য

পণ্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে পণ্যের মূল্য রূপ থেকে কিভাবে মূদ্রারূপের আবির্ভাব ঘটে সেই বিষয়ে পাঠ চক্রে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

১২. এবার আমরা মার্কসের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, Socially Necessary Labor Time বা সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রম সময় নিয়ে কথা বলব। অর্থাৎ একটা পণ্য তৈরি করতে সেই সময়ের কৃৎকৌশল, শ্রমকের দক্ষতা উৎপাদনের পরিবেশ সবকিছু মিলিয়ে গড়ে যতটা শ্রমসময় লাগে। বিভিন্ন কারখানায় বিচ্ছিন্নভাবে যখন উৎপাদন হয়, তখন ভিন্ন ভিন্ন শ্রমিকের একই জিনিস উৎপাদন করতে ভিন্ন ভিন্ন শ্রম সময় দিয়ে লাগতে পারে। তাহলে পণ্যের মধ্যে অন্তর্নিহিত শ্রমের হিশাব আমরা কিভাবে করব? কারণ উৎপাদন করতে কারো বেশী কারো কম সময় লাগছে। মার্কস বলছেন, এভাবে শ্রম সময়কে দেখলে আমরা সামাজিকভাবে উৎপাদিত শ্রম সময় এবং পণ্যের মূল্য বের করতে পারবনা। আমাদের দেখতে হবে, সামাজিকভাবে গোটা শ্রমসমাজ কতটুকু একটি পণ্য উৎপাদন করতে গড়ে কতোটা শ্রম শ্রমসময় ব্যয় মূল্য রূপকে মার্কস যেভাবে চারটি শিরোনামে আলোচনা করেছেন তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। এই বিষয়গুলো অনেকের কাছে তুলনামূলক ভাবে কঠিন মনে হওয়ায় আগামি পাঠচক্রে আলাদা নোট দেওয়াঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যারা নতুন আসছেন, আশা করি তারা পাঠচক্রের প্রতিবেদংগুলো পড়ে আসবেন।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top