প্রথম পর্ব

মার্কসের 'পুঁজি': প্রাথমিক বিষয়াদি


প্রকাশিত:
১৯ নভেম্বর ২০২০ ১১:৫৫

আপডেট:
২৩ নভেম্বর ২০২০ ১৪:৩৪

ছবি : সংগৃহীত

[এই লেখাটি গত ১৭ আগস্ট, শনিবার চিন্তা পাঠচক্রে ‘পুঁজি’ বইটি পাঠের পরিপ্রেক্ষিতে ফরহাদ মজহারের আলোচনার ভিত্তিতে লেখা। আলোচনায় আমার কাছে যে কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তুলে দিচ্ছি। এটি চলবে। অন্যদের গুরুত্বপূর্ণ কোন পয়েন্ট বা প্রশ্ন থাকলে আশা করি যোগ করবেন। ‘পণ্য’ নিয়ে সরাসরি আলোচনা আরেকটি পোস্টে পেশ করা হবে]

১. সতেরো অগাস্টে পাঠচক্রে নির্ধারিত আলোচনার বিষয় ছিল পুঁজি গ্রন্থে বিধৃত মার্কসের ‘পণ্য’। গ্রন্থের প্রথম কয়েক পাতা পড়া এবং বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে অন্যদের পড়তে উৎসাহিত করা ছিল উদ্দেশ্য।

‘পণ্য’ নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে ফরহাদ মজহার‘পুঁজি’ সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত চিন্তা থেকে আবারও মুক্ত হবার পরামর্শ দিলেন। সাধারণ ভাবে আমরা পুঁজি সম্পর্কে মনে করি পুঁজি মূলত সঞ্চয়জাত সম্পদ, মূলধন, ফ্যাক্টর অফ প্রডাকশান, ইত্যাদি। এই সঞ্চিত সম্পদটা বিনিয়োগে খাটানো যায়, যে বিনিয়োগ থেকে লাভ আসে। তার মানে পুঁজি শুধু সঞ্চিত সম্পদই না, একই সাথে লাভেরও উৎস। কাজেই পুঁজি হলো সুদ, লাভ বা মুনাফা তৈরি করার ক্ষমতা সম্পন্ন টাকা। এভাবে ভাবলে মার্কসের ‘পুঁজি’ বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তখন পুঁজিকে টাকার ভেতরকার এক ধরণের ভূতুড়ে শক্তি হিশাবে গণ্য করা হয়, যে শক্তি এক অদৃশ্য যাদু বলে টাকা থেকে সৃষ্টি করে আরো টাকা। কিন্তু কেন এবং কোথা থেকে টাকার এই ক্ষমতার উৎপত্তি ঘটলো টাকা নিজে নিজে অথবা আদৌ সেটা টাকার ক্ষমতা কিনা সেসব বিচার করা হয়না। টাকা ও পুঁজির মধ্যে ফারাক ধরতে পারাও কঠিন হয়ে পড়ে।

২. মার্কস তাঁর তরুণ বয়সেই বুঝেছিলেন যে, পুঁজির এই ভূতুড়ে শক্তির ধারণা খামাখা কথা। পুঁজি গ্রন্থ রচনার বহু আগে তিনি আর এঙ্গেলস ঘোষণা করেছিলেন, “পুঁজিপতি হওয়া মানে উৎপাদনব্যবস্থার মধ্যে শুধু ব্যক্তিগত নয়, একটা সামাজিক প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন। পুঁজি একটা যৌথ সৃষ্টি, সমাজের অনেক লোকের মিলিত কাজের ফলে, এমনকি শেষ বিশ্লেষণে, সমাজের সকল লোকের মিলিত কর্মেই পুঁজিকে চালু করা যায়। পুঁজি তাই ব্যক্তিগত নয়, একটা সামাজিক শক্তি।” (কমিউনিস্ট ইশতেহার )। পুঁজি সম্পর্কে এই অতি প্রাথমিক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা স্পষ্ট না হলে ‘পুঁজি’ গ্রন্থের মর্মোদ্ধার কঠিন। এই প্রসঙ্গে নিজ উদ্যোগে ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ মনোযোগের সঙ্গে পাঠচক্ত্র উপস্থিত সবাইকে আবার পড়বার পরামর্শ দেওয়া হয়। যেখানে ‘বুর্জোয়া মালিকানার উচ্ছেদ’ চাওয়া হয়েছে বটে কিন্তু পুঁজি সম্পর্কে পুঁজিবাদ বিরোধী পেটি বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়া নাই। বরং প্রাক-পুজিতান্ত্রিক সম্পর্কে উৎখাতের ক্ষেত্রে এবং ঐতিহাসিক ভাবে বুর্জোয়া শ্রেণীর ‘বৈপ্লবিক ভূমিকা’র ভূয়সি তারিফ রয়েছে। বাংলাদেশে পেটি বুর্জোয়া, জমির মালিক, জোতদার, সামন্তসহ নানান ক্ষয়িষ্ণু শ্রেণী কিভাবে ‘সমাজতন্ত্র’ কায়েমের নামে গত শতাব্দির ষাট দশক থেকে আজ অবধি নীতিবাগীশ জায়গা থেকে পুঁজির বিরোধিতা করেছে সেটা বোঝা খুবই দরকার। যার ফলে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং পুঁজিতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল এবং এখন তার পরিণতি ঘটেছে চরম ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। ইশতেহার এই দিকগুলো বুঝতে আমাদের সহায়তা করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ‘পুঁজি’ বইটা পড়ার সময় আমাদের মধ্যে যাতে কোন ভুল অনুমান বা বিভ্রান্তি না থাকে সেই বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের জন্যে আরও কিছু আলোচনা চলে।

৩. ‘পুঁজি’ বইয়ের পুরা নাম শুধু ‘পুঁজি’ বা ‘দাস ক্যাপিটাল’ না। পুরা নাম ‘পুঁজি: অর্থশাস্ত্র পর্যালোচনার একটি ভূমিকা’। অর্থাৎ মার্কস ‘পুঁজি’ সম্পর্কে কোন তত্ত্ব পেশ করছেন না, বরং তাঁর আগের বা সমসাময়িক অর্থশাস্ত্রবিদদের তত্ত্ব ‘পর্যালোচনা করছেন’। বিশেষত যাঁরা ক্লাসিকাল বা ধ্রুপদি অর্থশাস্ত্রবিদ নামে পরিচিত। এদের অর্থনৈতিক চিন্তা ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ নামেও পরিচিত যেমন, আদম স্মিথ, জাঁ ব্যপ্তিস্ত সে, ডেভিড রিকার্ডো, টমাস রবার্ট মালথুস, জন স্টুয়ার্ট মিল, প্রমুখ। ‘ইকনমি’ শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে তৈরি। যার আক্ষরিক অর্থ ‘গৃহ ব্যবস্থাপনা’। তাই একটি সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, উৎপাদন, বিনিময়, ভোগসহ সামগ্রিক ব্যবস্থার বিচারকে বলা ‘পলিটিকাল ইকনমি’। এখন ইকনমি বা অর্থশাস্ত্র বলতে বোঝায় মালামাল(Goods), উৎপাদিত দ্রব্য (Output) এবং বাজারের মাধ্যমে চাহিদা ও সরবরাহ (Supply & Demand) অনুযায়ী আয় বন্টন (Income distribution) , ইত্যাদি। আধুনিক অর্থনৈতিক হিশাবনিকাশের বিদ্যা নিউ-ক্লাসিকাল ইকনমিক্স নামে পরিচিত। এর বিরুদ্ধে বিস্তর সমালোচনা রয়েছে, কিন্তু আধুনিক অর্থনীতি হিশাবে এটাই স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। এর পঠন-পাঠন পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্র গোপন রাখে বা আড়াল করে। এর সঙ্গে জন মেনার্ড কেইনসের অর্থনৈতিক চিন্তা যুক্ত হয়েছে। দুটো মিলে তথাকথিত আধুনিক অর্থনীতি বিদ্যার মূল ধারা গড়ে উঠেছে।

তাহলে মোটা দাগে অর্থনীতিতে তিন ধরণের স্কুল আছে। এক. ক্লাসিকাল বা ধ্রুপদি অর্থাশাস্ত্রের ধারা, যার উদ্দেশ্য সমাজের উৎপাদন, বিতরণ বিনিময় ব্যবস্থাপনার বিচার, শ্রেণী গঠন ও বিভিন্ন শ্রেণীর দ্বন্দ্ব, বিভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণীর মধ্যে সম্পদ ভাগবাঁটোয়ারার চিত্র তুলে ধরা, ইত্যাদি। দুই. নিউ-ক্লাসিকাল। যে ধারায় আর্থ-সামাজিক সম্পর্ক নয়, অর্থনৈতিক হিশাব নিকাশ মুখ্য। এই ধারা পুঁজিতান্ত্রিক আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা সামগ্রিক ভাবে বিচার করতে অক্ষম। এই ধারা পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে অসাম্য ও বিরোধ লুকিয়ে রেখে অর্থনীতিকে হিশাবশাস্ত্রে পর্যবসিত করে। তৃতীয় ধারা বা কেইন্স অনুসারীদের মূল ক্ষেত্র হচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক সংকট যখন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি নড়বড়ে করে দেয়, যা বারবারই ঘটে, তা সামাল দেওয়া বা কাটিয়ে ওঠার পরামর্শ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। মোটা দাগে এই তিনের ফারাক মনে রাখলে আমরা মার্কসের ‘পুঁজি’ বইয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য সহজে ধরতে পারব। যার অন্তর্নিহিত মর্ম হচ্ছে সামাজিক সম্পর্ক বিচার: মানুষের সঙ্গে মানুষ এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির, ইত্যাদি।

৪. মার্কস তার গ্রন্থকে ‘পুজি’ সংক্রান্ত তত্ত্ব না বলে ‘ক্রিটিক’ বা পর্যালোচনা বলেছেন। সমালোচনা এবং পর্যালোচনার মধ্যে তফাৎ কি ? বাংলা ভাষায় সমালোচনা শব্দটা সাধারণত নিন্দা অর্থে ব্যবহার করা হয় । এই কারণে ‘পর্যালোচনা’ ব্যবহারই সঠিক। যার অর্থ কোন বিষয় বা চিন্তা পুরাপুরি নাকচ বা বিরোধিতা করা না, বরং তার ইতিবাচক সারার্থ আত্মস্থ করে চিন্তাকে আরও অগ্রসর করে নেওয়া। পর্যালোচনা না বলে ‘বিচার’ কথাটাও ব্যবহার করা যায়। যেমন, ‘রাজনৈনৈতিক অর্থনীতির বিচার’। কিন্তু বিচার বললে বাংলায় আইনা-আদালত মনে হয়। তাই পর্যালোচনা। শব্দটা তুলনামূলক ভাবে ভালো শব্দ । কারণ, পর্যালোচনার অর্থও বিচার বা ক্রিটিক করা। তাহলে মোটা দাগে ক্রিটিক অর্থ হলো, একজন মানুষের চিন্তার জায়গায় কোন দুর্বলতা বা ভুল থাকলে, সেটা একদিকে যেমন যুক্তিতর্ক দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া, পাশাপাশি একই সঙ্গে চিন্তার ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি ঘটেছে তা স্পষ্ট ধরিয়ে দিয়ে চিন্তার ইতিহাসের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা। মার্কস কখনোই তার লেখাকে ‘তত্ত্ব ‘বলেন নাই, কারন মার্কসেই চিন্তার শেষ এই দাবি তিনি করতে চান না। যে কোন বিষয় নিয়ে কীভাবে আমরা ভাবতে পারি সেটা শেখা । অর্থ াৎ চিন্তা করার পদ্ধতি বা কিভাবে আমরা চিন্তা করতে পারি । সেই জন্যই তার পুঁজি গ্রেন্থের আরেকটা নাম দিয়েছেন, A Critique of Political Economy বা অর্থশাস্ত্রের বিচার । পুঁজি গ্রন্থে উনি স্মিথ, রিকার্ডো থেকে শুরু করে জে.বি. সে সকলের এবং অর্থশাস্ত্রের সকল বিষয় মুদ্রা, ব্যাংকিং, কর্পেোরেশন ইত্যাদির পর্যালোচনা করেছেন।

৫. ‘পুঁজি’ তিন খণ্ডের বই। তবে মার্কস এর প্রথম খণ্ডই শুধু নিজে সম্পাদনা করেছেন এবং নিজে দেখে দিয়েছেন। বাকি দুই খণ্ড: দুই ও তিন নম্বর ভলিউম ফিডরিখ এঙ্গেলসের সম্পাদিত। এর আগে খুবই সংক্ষিপ্তভাবে মার্কস ‘রাজনৈতিক অর্থনীতির পর্যালোচনায় একটি অবদান’ (A Contribution to the Critique of Political Economy) লিখেছিলেন। তবে সবগুলো ভলিউমের খসড়া নোট মার্কস খাতায় লিখেছিলেন। সম্পূর্ণ করবার জন্য আয়ু পান নি। পুঁজির বাকি দুই ভলিউম এঙ্গেলস মার্কসের খসড়া দেখে, কেটে ছেঁটে সম্পাদনা করেছেন। ‘মার্কস, ফুকো ও রুহানিয়াত’ গ্রন্থে কিভাবে মার্কসের চিন্তা সম্পর্কে এঙ্গেলস-এর সারমর্ম কমিউনিস্ট চিন্তা ও রাজনীতির মূলকথা হয়ে যায় সেটা আলোচিত হয়েছে। তাই মনে রাখতে হবে মার্কসের ‘কমিউনিজম’ আর কমিউনিজম সম্পর্কে প্রথাগত চিন্তা ও রাজনীতির বিস্তর ফারাক আছে। ‘পুঁজি’র ক্ষেত্রেও এঙ্গেলসের সম্পাদনা সম্পর্কে সতর্ক না থাকলে মার্কসকে বোঝার ক্ষেত্রে মুশকিল হতে পারে।

৬. তথ্য হিশাবে জেনে রাখা দরকার যে ১৯০৫-১৯১০-এর দিকে কার্ল কাউৎস্কি মার্কসের খসড়া নোটবই থেকে বেছে নিয়ে ‘বাড়তি মূল্য তত্ত্ব’ (Theories of Surplus Value) নামে তিন খণ্ডে বই বের করেন। তবে মার্কস যেভাবে চেয়েছেন তা না করে কাউৎস্কি নিজের মতো করে লেখা সাজিয়েছেন, তাছাড়া অনেক কিছু তিনি বাদ দিয়েছেন কিম্বা সম্পাদনা করে পরিমার্জনাও করেছেন। এর বাইরে ‘পুঁজি’ বই লিখবার প্রস্তুতি হিশাবে তাঁর আরেকটি বিখ্যাত খসড়া আছে, যা ‘গুন্ড্রিসে’ (Grundrisse) নামে পরিচিত। মার্কস এক বিশাল চিন্তার ভাণ্ডার, তাকে দুই একটা প্রচলিত কমিউনিস্ট মার্কা সস্তা অনুমান দিয়ে বোঝা যাবে না। আমাদের চেষ্টা বাংলাদেশে মার্কস পাঠে তরুণদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা।

৭. প্রচলিত কমিউনিজম সম্বন্ধে আমরা লোকমুখে যা জানি তা মূলত এঙ্গেলসের বয়ান। এঙ্গেলস এবং মার্কস পরম বন্ধু বটে, কিন্তু দুজন আলাদা ব্যক্তি। অতএব তাদের চিন্তার পার্থক্য বুঝতে হবে। তবে আরও জরুরি হচ্ছে আরও সহজ কিন্তু গভীর ভাবে বুঝতে চেষ্টা করা। যেমন, সমাজে বা সমষ্টির মধ্যে ব্যক্তির মুক্তি কিভাবে অর্জন করা সম্ভব বা মানুষের পরমার্থ কিভাবে নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে প্রতিটি সমাজই নানান ভাবে ভাবনা চিন্তা করে এবং করেছে। কমিউনিজম সেই ভাবনার বাইরের কিছু না, বরং এই ভাবনা এবং ভাবনার বাস্তবায়ন চেষ্টারই অপর নাম কমিউনিজম; অর্থাৎ কমিউন গঠন । কমিউন বা ‘সমাজ’ গঠন মানে মানুষের পরস্পরের সঙ্গে জুলুম বা শোষণের সম্পর্ক না, বরং পরমার্থিক বন্ধনের ভিত্তিতে এক সঙ্গে বসবাসের বাসনা ও সাধনা। ‘শোষণমুক্ত সমাজ’ কথাটার নৈতিক মর্ম এখানে নিহিত। ‘সমাজ’ তখন স্রেফ যে কোন সমাজ নয়, সত্যিকারের ‘সমাজ’। সেটা সম্ভব হয় যদি মানুষের সম্বন্ধ কোন জাগতিক প্রয়োজনের বাধ্যবাধকতার দ্বারা নির্ধারিত না হয়, যদি জীবের জীবন রক্ষার জৈবিক বাধ্যবাধকতা ও জৈবিক আকাঙ্ক্ষা থেকে মানুষ মুক্ত হতে পারে। মার্কসের দাবি, সেটা বাস্তবে ঘটবে যদি উৎপাদন শক্তির বিকাশ এমন স্তরে পৌঁছে যে জীবের জীবন রক্ষার জন্য মানুষকে অপর মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আর অপর মানুষকে শোষণ করতে না হয়। সামাজিকতার বাসনা মানুষের স্বভাবের মধ্যেই রয়েছে কারন মানুষ মাত্রই বিচ্ছিন্ন দেহ নয়। মানুষ সামাজিক।

তাই ‘কমিউনিজম’ ধারণাটিকে আমাদের আরও বড় পরিসরে ভাবতে হবে। যেমন, আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক যে শুধু কমিউনিস্টরা কেন, ইসলাম, খ্রিস্টিয়, হিন্দু বা ধর্মীয় হোক বা নাহোক কোন সামাজিক মতাদর্শের মধ্যেও পরস্পরের সঙ্গে পরমার্থিক বন্ধন তৈরির বাসনা রয়েছে, এটা কমিউনিস্টদের একচেটিয়া নয়। পরমার্থিক বন্ধনের ভিত্তিতে মানুষের এক সঙ্গে বসবাসের বাসনা কিভাবে বিভিন্ন মতাদর্শে হাজির রয়েছে, থাকে কিম্বা হাজির হয় তার পর্যালোচনা জরুরী কাজ। ইসলামকে কিম্বা নদীয়ার ভাবচর্চাকে আমরা এই জায়গা থেকেও বুঝতে চাই, কারন ওর মধ্যেও কমিউনিস্ট বা পরমার্থিক বন্ধনের সম্পর্কে গঠিত সমাজের বাসনা রয়েছে। কমিউনিজম ধরো তক্তা মারো পেরেক জাতীয় ব্যাপার না।

এই গোড়ার দিকগুলো বুঝলে কমিউনিজমকে আমরা আরও বিচিত্র ও বিস্তৃত ইতিহাসের মধ্যে সক্রিয় দেখতে পাবো। ‘পুঁজি’ বোঝার মধ্যে দিয়ে মার্কস কমিউনিজমের সম্ভাবনা কিভাবে পুঁজির ইতিহাসের মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে সেটা বোঝাতে চেয়েছেন। তাই এঙ্গেলস বলেছেন অন্যন্য মতাদর্শের মধ্যে কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র থাকতে পারে, তবে মার্কসের মধ্যে যেভাবে আছে সেটা ‘বৈজ্ঞানিক’। ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ কথাটা এঙ্গেলসের, মার্কসের না। কিন্তু এঙ্গেলস স্বীকার করেছেন খ্রিস্টধর্মও আদিতে ছিল সমাজতন্ত্রই। ‘আদি খ্রিস্ট ধর্মের সঙ্গে আধুনিক শ্রমিক শ্রেণির লড়াইয়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে’ (পড়ুন, এঙ্গেলসের On the History of Early Christianity)। মার্কস আর এঙ্গেলস ইসলাম সম্পর্কে খুব একটা জানতেন না। জানলে ইসলামের আদি ইতিহাস, বিশেষত জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের পরমার্থিক সম্বন্ধের ভিত্তিতে ‘সমাজ’ বা ‘উম্মাহ’-গঠনের বাসনার মর্মে কমিউনিজমই দেখতেন। কমিউনিজম কমিউনিস্টদের একচেটিয়া নয়।

এঙ্গেলস দার্শনিক ছিলেন না, উনি ছিলেন ব্যবসায়ী। বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। তার আগ্রহের জায়গা ছিল অর্থনীতি এবং ইতিহাস । অন্য দিকে, মার্কস প্রথমে আইন শাস্ত্র নিয়ে পড়েছেন, পড়তে পড়তে তিনি বুঝলেন, আইন দিয়ে আইনকে বোঝা যাবেনা । আইনের অর্থনৈতিক মর্ম বোঝা দরকার। তখন তিনি অর্থশাস্ত্রের দিকে মনোনিবেশ করলেন।

৮. এবার আমরা পণ্য নিয়ে আলোচনা শুরু করতে পারি। পণ্য মানে যা বাজারে কেনা হয় । পুঁজিবাদ হলো এমন এক সমাজ ব্যবস্থা যেখানে সবকিছু পণ্য আকারে হাজির হয় । যেসব বর্গ দিয়ে ‘পুঁজি’র বিশ্লেষণ শুরু হতে পারে তার প্রথম বর্গ হচ্ছে পণ্য । পুঁজিতন্ত্রের একেবারে প্রাথমিক রূপ। মার্কস শুরু করেছেন এটা বলে যে , ‘পণ্য প্রথমত বাইরের বিষয়':

“পণ্য প্রথমত বাইরের বিষয়, এমন জিনিস যা নিজের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে মানুষের চাহিদার প্রকৃতি যেমনই হোক মেটায়”।

এখানে ভেতর-বাইরের সম্পর্কের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। বাইরের পণ্যের সাথে কিভাবে মানুষের ভেতরের সম্পর্ক তৈরি হয় ? এই প্রশ্নটা মার্কস উত্থাপন করবার পেছনে রয়েছে জার্মান ভাবাদর্শের দীর্ঘ ইতিহাস। আমাদের মনে রাখা দরকার, মার্কস যখন তার লেখালেখি করেন, সেই সময়ে জার্মান দর্শনের আধিপত্য ছিল প্রবল। সেই দর্শনের মুখ্য বিচার্য ছিল, চিন্তার ‘কর্তা’ হিশাবে মানুষের ভেতরের সঙ্গে চিন্তার বাইরে হাজির ‘বিষয়’-এর সম্বন্ধ পর্যালোচনা। জর্মন দর্শন সেই বিচার করেছে চিন্তার পরিমণ্ডলে। কিন্তু চিন্তা তো আসমানি কিছু না। চিন্তা মানুষের রূপ নিয়ে রক্তে মাংসে হাজির থাকে। তাহলে বিচার করতে হবে রক্ত মাংসের মানুষের সঙ্গে তার বাইরের জগতের সঙ্গে সম্বন্ধ নির্ণয় দিয়ে। কিন্তু সেটা বিমূর্ত কায়দায় করলে চলবে না। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে সমাজের সম্পদ মানুষের সামনে হাজির হয় পণ্যের বিপুল সমারোহ দিয়ে। পুঁজিতন্ত্রে মানুষের জগত মানে মূলত পণ্যের জগত। প্রকৃতি বা জগতের সঙ্গে আমামদের সম্পর্ক পণ্য-সম্পর্কের মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়। জর্মন ভাবাদর্শ বা ব্যাপকার্থে পাশ্চাত্য দর্শন মানুষ ও তার জগতের সম্বন্ধ বিচার করছে স্রেফ চিন্তার চর্চা বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বিষয় হিশাবে , কিন্তু মার্কস দাবি করছেন মানুষ ও জগতের সম্বন্ধ এভাবে বিমূর্ত জ্ঞানচর্চার জায়গা থেকে শুরু করলে হবে না। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে মানুষের জগত মূলত ‘পণ্যের বিপুল সমারোহের জগত’ হিশাবে হাজির হয় যা আদম স্মিথের ভাষায় ‘জাতির সম্পদ’ (Wealth of Nations) বলে পরিচিত। ‘পুঁজি’ গ্রন্থটি তাই এই তাৎপর্যপূর্ণ বাক্যটি দিয়েই শুরু হয়েছে:

“পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় সমাজের সম্পদ ‘পণ্যের বিপুল সমারোহ’ হিশাবে হাজির হয়; একটি পণ্য হাজির হয় তারই প্রাথমিক রূপ নিয়ে। আমাদের বিশ্লেষণও তাহলে আরম্ভ করতে হবে পণ্য দিয়েই”।

জগতকে স্রেফ জ্ঞানের বিষয় হিশাবে নয়। বরং পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে মানুষের সঙ্গে জগতের সম্বন্ধ বিচারটা শুরু করতে হবে ‘পণ্য’ নামক জাতীয় সম্পদের বিশ্লেষণ দিয়ে। কার মানুষের জগত তার ‘সম্পদ’ হিশাবে এই সমাজে পণ্যের রূপ নিয়ে হাজির হয়।

৯. পণ্য ‘বাইরের জিনিস’ হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হয় এবং আমাদের কোন না কোন চাহিদা মেটায়। সেটা খাদ্য, পোশাক, আসবাব, বইপত্র যা খুশি হোক। সবই । সেই হিসেবে কোরআন শরীফও পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘পণ্য’। তেমনি বাইবেল, তৌরাত, গীতা, রামায়ন, উপনিষদ, সবই। এই সকল ‘পণ্য’ পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমাদের আধ্যাত্মিক চাহিদা মেটায়। পুঁজিতন্ত্র ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়কেও স্রেফ পণ্যে পর্যবসিত করে। অর্থাৎ চাহিদার প্রকৃতি দিয়ে পণ্যের চরিত্র ঠিক হয় না। খাওয়া দাওয়া পোষাক পরিচ্ছদ প্রভৃতি বৈষয়িক চাহিদা ছাড়াও , আধ্যাত্মিক চাহিদাও মানুষের চাহিদা। কিন্তু পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাজারে ‘পণ্য’ না হয়ে কোন কিছুই আমাদের চাহিদা মেটাতে পারে না। হতে পারে কোন বিষয় বা জিনিস এখনও পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের সম্পূর্ণ অধীনস্থ নয়, কিন্তু পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক কালে কালে সবকিছুকেই গ্রাস করে।

সেই জন্য পাঠের এই পর্যায়েও আমরা বলতে পারি, পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা লড়াই ছাড়া কিম্বা তার বাইরে মানুষের আধ্যাত্মিক চাহিদা মেটানো অসম্ভব ও বাস্তব। মানুষের রুহানিয়াতের বৈশিষ্ট্যের জালিমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পরিমণ্ডলেই ঘটে। পুঁজির বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়া একালে ধর্ম অসম্ভব। কমিউনিস্ট ইশতেহার বলছে, ‘মানুষের যেসব বৃত্তিকে লোকে এতদিন সম্মান করে এসেছে, সশ্রদ্ধ বিস্ময়ের চোখে দেখেছে বুর্জোয়া শ্রেণী তাদের মাহাত্ম ঘুচিয়ে দিয়েছে’। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে ধর্মের নিজস্ব কোন মাহাত্ম নাই। তা কোন না কোন শ্রেণীর মতাদর্শিক হাতিয়ার। অন্যত্র ইশ্তেহার বলছে, ‘আত্মসর্বস্ব হিশাবনিকাশের ঠাণ্ডা জলে এরা ডুবিয়ে দিয়েছে ধর্ম-উন্মাদনার স্বর্গীয় ভাবোচ্ছাস’। পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের যুগে ধর্মীয় উন্মাদনা স্রেফ পুঁজিতন্ত্রেরই অভিক্ষেপ, পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার আভ্যন্তরীণ শ্রেণী দ্বন্দ্ব। পুঁজির বিচার বাদ দিয়ে ধর্ম বা ধর্মতত্ত্ব দিয়ে তার বিচার বেকার ও অর্থহীন।

পণ্যের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্যই আমাদের চাহিদা মেটায়। কিন্তু এই বৈশিষ্ট্য সবসময় মানুষের জানা থাকে তা ঠিক নয়। একটা জিনিস তার কোন্‌ বৈশিষ্ট্য নিয়ে পণ্য হয়ে ওঠে তার আলাদা ইতিহাস আছে। লোহা আমাদের যে সকল প্রয়োজন মেটায় সেটা লোহার গুণ আবিষ্কারের পরেই মানুষ তা আদায় করে নিতে পেরেছে। তার আগে নয় । কাজেই পণ্যের গুণও শাশ্বত নয়। ঐতিহাসিক। পুঁজিতন্ত্রের আবিষ্কার পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার দ্বারা পরিচলিত হয়।পণ্যের চিরায়ত কোন গুণ নেই । আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে তার বৈশিষ্ট্যের সম্ভাবনা ব্যক্ত হয়। (চলবে)



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top