দ্বিতীয় পর্ব

মার্কসের 'পুঁজি': প্রাথমিক বিষয়াদি


প্রকাশিত:
১৯ নভেম্বর ২০২০ ১২:০৩

আপডেট:
২৩ নভেম্বর ২০২০ ১৪:৩৪

ছবি : সংগৃহীত

২৪ আগস্ট, ২০১৯। চিন্তা পাঠচক্রের ‘পুঁজি’ পড়ার ছিল দ্বিতীয় পাঠ। প্রধান আলোচক ছিলেন ফরহাদ মজহার। ‘পণ্য’ নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, এই ক্লাস ছিল তারই ধারাবাহিকতা। পাঠ শুরুর আগে ‘পুঁজি’ পাঠের ভূমিকা হিশাবে কিছু বিষয় আলোচনা করা হয়।

১. ‘চিন্তা পাঠচক্রের ‘পুঁজি’ পাঠের ক্লাস সকলের জন্যে। যারা অর্থনীতি নিয়ে পড়েছেন কিম্বা পড়েন নাই তাতে কিছু আসে যায় না। আগ্রহ এবং নিয়মিত থাকার চেষ্টাই প্রধান। আমাদের তরুণ সমাজের জন্যে, যাদের কার্ল মার্কস সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা রয়ে গেছে। সেসব ভুল ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে মার্কসের ‘পুঁজি’ গ্রন্থটি নিষ্ঠা ও মনোযোগের সঙ্গে পড়বার আগ্রহ তৈরির জন্যই এই উদ্যোগ।

২. উদাহরণ হিসেবে ল্যুদভিগ ফয়েরবাখের এগার নম্বর ‘থিসিস’-এর প্রসঙ্গ উঠল: “দার্শনিকরা নানান ভাবে জগৎ ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু পয়েন্ট হোল একে বদলানো”। প্রথাগত মার্কসবাদ, বিশেষত বাংলাদেশে, এই বাক্যটির ব্যাখ্যা এরকম তাঁড় করিয়েছে যে এই পর্যন্ত দর্শনে সব ব্যাখ্যা হয়ে গিয়েছে, যা বলবার সবই বলা হয়েছে, কাজেই মার্কসের পরে দর্শন, চিন্তার পর্যালোচনা বা গোড়ার চিন্তাভাবনা করবার কাজ শেষ। এখন দরকার শুধু দুনিয়া বদলানো বা বিপ্লব করা।

এটা সর্বনাশা ভুল চিন্তা। মার্কস যদি আসলে চিন্তাভাবনা বা জগতকে ব্যাখ্যা করার কাজ বাদ দিতেন তাহলে তাঁকে ঢাউস ‘পুঁজি’ গ্রন্থ লিখতে হোত না। সারাজীবন মার্কস লেখালিখির কাজেই তাঁর আয়ুর প্রধান অংশ ব্যয় করেছেন। কিন্তু তরুণদের মধ্যে এখনও এই ভুল চিন্তা ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা হয় যে পড়াশুনা চিন্তাভাবনার দরকার নাই, দলের সাইনবোর্ড টানিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোই বিপ্লবী কাজ। বিপ্লবের কাজ করতে হলে আর চিন্তা-পর্যালোচনার দরকার নাই, চিন্তা আর পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে সামাজিক চিন্তাচেতনার বিকাশ সাধন করারও আর কোন প্রয়োজন নাই। এখন ধরো তক্তা মারো পেরেক! এই ধারণার পেছনে অনুমান হচ্ছে চিন্তা-পর্যালোচনা করা কোন বিপ্লবী ‘কাজ’ না।

কিন্তু আমরা দেখছি জর্মন দার্শনিক ফয়েরবাখ প্রসঙ্গে এই বাক্য খসড়া হিসাবে নিজের নোট খাতায় লিখে রাখলেও কার্ল মার্কস সারা জীবন চিন্তা ভাবনা লেখালিখির মধ্যেই নিজেকে পুরাপুরি নিয়োজিত রেখেছিলেন। কারন চিন্তাভাবনা লেখালিখি সরাসরি বিপ্লবী তৎপরতা ও কর্মকাণ্ডের অন্তর্গত। বিপ্লবী কাজ। এই কাজ মার্কস করে না গেলে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক বিপ্লব হোত না, কিম্বা মাওজেদং-এর নেতৃত্বে চীনা বিপ্লবও হোত না। পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এই কালে আমরা যদি আসলেই বিপ্লব সাধনকে জীবনের কর্তব্যকর্ম হিশাবে ভাবি তাহলে চিন্তাহীন স্টুপিড থাকার কোন যুক্তি নাই। আমাদের অবশ্যই সব স্ময়ই সবকিছুরই প্ররযালোচনা করতে হবে। এমনকি মার্কসেরও। আমাদের আগের চিন্তাশীল মানুষ চিন্তা ও পর্যালোচনার যে সূত্র রেখে গিয়েছেন এবং দিগন্তে এসে দাঁড়িয়েছেন সেখান থেকে আবার ভাবনা চিন্তা শুরু করতে হবে। নতুন ভাবে ভাবতে হবে। পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এই কালের ‘পুঁজি’কে যদি আমরা বুঝতে চাই, েবং তার পরিপ্রেক্ষিতে আমামদের রাজনোইতিক কর্তব্য নির্ণয় করতে চাই তাহলে মার্কসের ‘পুঁজি’ বই পাঠের ছাড়া আমামদে বিকল্প নাই। ;পুঁজি’ পাঠ শুধু পুঁজির রূপ ও চলন বোঝার জন্য না, একই সঙ্গে আমাদের পর্যালোচনা শক্তির বিকাশ ঘটানোর জন্যও জরুরি।

৩. পুঁজি পাঠের পাঠচক্র প্রসঙ্গে একজন ফরহাদ মজহারকে প্রশ্ন করেছিল, কমিউনিস্ট পার্টি করবেন না তাহলে মার্কস পড়াচ্ছেন কেন? প্রশ্নটিকে আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না। এটাও সমাজে চিন্তার একটি প্রভাবশালী ধারা যে মার্কস পড়তে হবে কমিউনিস্ট পার্টি করার জন্য। এর ভয়ংকর ক্ষতির দিক হচ্ছে অধিকাংশ তরুণের ধারণা কমিউনিস্ট পার্টি না করলে বা কমিউনিজম করতে না চাইলে মার্কস পড়ার কোন দরকার নাই। অর্থনীতিবিদ এবং সমাজতাত্ত্বিক হিশাবে মার্কস দুনিয়ার প্রধান চিন্তকদের একজন। মার্কস না পড়ার অর্থ হোল আমাদের মতো দুর্বল, গরিব ও প্রান্তিক দেশের তরুণরা সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি কিম্বা সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে ভাবনা ও পর্যালোচনার ক্ষেত্রে অতিশয় শীর্ণ ও দুর্বল হয়ে রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার কারিকুলামই তাদের চিন্তার বিকাশের প্রতিবন্ধক।

আরেকটি দিক ভাববার আছে। বাংলাদেশে ধর্ম এবং মতাদর্শ হিশাবে ইসলাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাদ্রাসার তরুন ছাত্র কিম্বা ইসলামের আদর্শে অনুপ্রাণিত তরুণদের ধারণা মার্কস নাস্তিক, তাকে পড়া যাবে না। স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে এই মার্কিনী প্রপাগান্ডা প্রবল। এর উদ্দেশ্য মার্কস পড়া থেকে ইসলামপন্থিদের দূরে সরিয়ে রাখা। নাস্তিক আখ্যা দিয়ে মার্কস পড়া নিষিদ্ধ রাখা, জ্ঞানার্জনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা, ইত্যাদি স্পষ্টতই সাম্রাজ্যবাদী নীতি। ইরানের বিপ্লব সফল করবার বুদ্ধিবৃত্তিক কর্তব্য হিশাবে আলী শরিয়তির মতো চিন্তকরা মার্কস পড়েছেন এবং মার্কসের পর্যালোচনা করেছেন। ইসলামের জায়গায় দাঁড়িয়েই মার্কস পর্যালোচনার হিম্মত তিনি দেখিয়েছিলেন। তাহলে বাংলাদেশে ইসলামের কোন ইতিবাচক ধারা তৈরি করতে হলে মার্কস পড়া এবং পর্যালোচনার কোন বিকল্প নাই। মার্কস না পড়ার ফলে মানবেতিহাসের বৈপ্লবিক মূহূর্ত হিশাবে সমাজ, দর্শন ও অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে ইসলাম যে স্বতন্ত্র চিন্তা হাজির করেছে তার মর্ম বোঝা এবং অপরকে বোঝানো কঠিন। কারন কোন চিন্তার স্বাতন্ত্র্য বা বৈশিষ্ট অন্য চিন্তার সঙ্গে তুলনা ও পর্যালোচনার ছাড়া বোঝা যায় না। অর্থাৎ মার্কস পড়তে হবে স্রেফ মার্কসবাদী হবার জন্য নয়, বরং সমাজ, অর্থনীতি, দর্শন সংস্কৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে পর্যালোচনামূলক চিন্তার হিম্মত অর্জনের জন্য। মার্কসের মধ্যে চিন্তা যে শিখরে পৌঁছেছে তাকে অতিক্রম করে যাবার জন্য। তা না হলে একালে বিপ্লব অসম্ভব।

@ল্যারি লুই। শিরোনাম A Working Day in Dhaka, Bangladesh (ঢাকায় শ্রমিকের একটি কাজের দিন) ছবিটি ওয়েবে Dodho ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া হয়েছে। ঢাকাশহরে মানুষ গ্রাম থেকে উৎখাত হয়ে ছুটে আসছে নিত্যদিন। রোহিঙ্গা মায়ানমারে রাষ্ট্রীয় এবং ভূ-রাজনোতিক সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিজের বাসভূমি থেকে উৎখাত হয়ে বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে বাধ্য হয়ে প্রবেশ করেছে, ঠিক তেমনি অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়নের অদৃশ্য সন্ত্রাস ও সহিংসতার শিকার হয়ে বছরে কমপক্ষে তিন লক্ষ গৃহ হারা উন্মূল উদ্বাস্তু মানুষ ঢাকা শহরে স্রেফ বেঁচে থাকার জন্য ছুটে এসেছে। হয়তো পেটে দুই কণা ভাত জুটবে, কোথাও কাজ পাবে। সন্ত্রাস ও সহিংসতাকে আরও বড় পেক্ষাপটে ভাবুন ভাবতে শিখুন পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক ও বিশ্বব্যবস্থার কাঠামোগত সন্ত্রাস হিশাবে।

৪. মার্কসে প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রেণির ধারণা নিয়ে আলাদা আলোচনা করতে হবে। এ নিয়ে অনেক বিস্তৃত আলোচনার কেন দরকার তা বুঝবার জন্য ‘মার্কস পাঠের ভূমিকা’ বইতে ‘শ্রেণী: এখানে এসে পাণ্ডুলিপি থেমে গিয়েছে’ লেখাটি পড়ে রাখলে ভাল। ওপরে ঢাকা শহরে উন্মূল উদাস্তু সর্বহারার ছটি দেখুন। অবাক মনে হতে পারে কিন্তু কমিউনিস্ট ইশতেহারে ‘প্রলিতারিয়েত’ যেভাবে এসেছে ‘পুঁজি’ গ্রন্থে সেটা নাই। পুঁজি সর্ভারা শ্রেণি’ সংক্রান্ত কোন সন্দর্ভ নয়। থাকার কথাও না। কিম্বা অর্থনৈতিক শোষোন-বঞ্চনার তত্ত্বও নয়। সুনির্দিষ্ট হাব ‘পুজি’ বলতে মার্কস কি বুছেছেন তার ব্যাপখ্যা। কিন্তু সেটাও তিনি ‘তত্ত্ব’ আকারে পেশ করেন নি। ত৬য়ার আগের বা তাঁর সময়কালের অর্হশাস্ত্রবিদদের লেখা পর্যালোচনার মধ্যে দিয়ে পেশ করেছেন।

৫. ইশতেহারে কিভাবে প্রলেতারিয়েত এসেছে সেটা মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। কমিউনিস্ট ইশতেহারে মার্কস ও এঙ্গেলস প্রশ্ন তুলছেন, “সমগ্র ভাবে প্রলেতারীয়দের সঙ্গে কমিউনিস্টদের কী সম্বন্ধ?”

ইশতেহারেই উত্তর দিচ্ছেন:

“শ্রমিক শ্রেণীর পার্টিগুলির প্রতিপক্ষ হিশাবে কমিউনিস্টরা পৃথক পার্টি গঠন করে না। সমগ্র ভাবে প্রলেতারিয়েতের স্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র কোনো স্বার্থ তাদের নাই। প্রলেতারিয়েত আন্দোলনকে রূপ দেওয়া বা গড়ে পটে তোলার জন্য তারা নিজস্ব কোন গোষ্ঠিগত নীতি খাড়া করে না”।

খুব স্পষ্ট কথা। কমিউনিস্ট পার্টি করবেন না, কিন্তু মার্কসের ‘পুঁজি’ পড়ছি কে? এই প্রশ্ন কমিউনিস্ট ইশতেহারেই খুব সাফ সাফ বলা আছে।

কিন্তু এখনও ‘ধরো তক্তা মারো পেরেক’ মার্কা স্টুপিড প্রশ্ন হাজির আছে। চিন্তা দরকার নাই। দরকার শুধু সাইনবোর্ডসর্বস্ব পার্টি বানানো। অক্ষম চিন্তার ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া এর মধ্যে আর কিছু অবশিষ্ট নাই। সমাজে লড়াই সংগ্রাম থাকবে, সেখানে অবশ্যই অংশগ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন উদ্দেশ্য আদায়ের জন্য নিপীড়িতের নানান দল থাকতেই পারে। থাকতে পারে কৃষক, শ্রমিক সর্বহারার দল থাকতেই পারে। কিন্তু কমিউনিস্ট হওয়ার মানে আলাদা দল বানিয়ে তাদের প্রতিপক্ষ হিশাবে নিজেদের একটা স্বতন্ত্র ‘গোষ্ঠি’ দাঁড় করানো না। এটা কমিউনিস্টদের কাজ না।

৬. কেন কমিউনিস্টরা আলাদা পার্টি করে না? কারণ, শ্রমিক শ্রেণির বাইরে তাদের আলাদা কোন স্বার্থ নাই। শ্রমিক আন্দোলনকে গড়ে পিটে তোলার জন্য তারা কোন গুষ্টি বা গোষ্ঠিগত নীতি খাড়া করে না। বাংলাদেশের তরুণদের নতুন করে কমিউনিস্ট ইশতেহারের একথা বুঝতে হবে। তাহলে আমরা বুঝব মার্কসের ‘পুঁজি’ পড়া এবং বাংলাদেশের বাস্তবতায় নিজেদের ঐতিহাসিক ভূমিকা নির্ণয়ের এই চর্চা কমিউনিস্ট ইশতেহারের ঘোষণ ও চিন্তার সঙ্গে খুবই সঙ্গতিপূর্ণ। সাইনবোর্ড মার্কা কমিউনিস্ট পার্টি বানিয়ে বাংলাদেশে ধর্ম বিদ্বেষ প্রচার ও চর্চা বন্ধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

কমিউনিস্টরা তাহলে কি করে?

ক. “নানান দেশের প্রলেতারিয়েতের জাতীয় সংগ্রামের মধ্য থেকে তারা সমস্ত জাতি নির্বিশেষে সমগ্র প্রলিতারিয়েতের সাধারণ স্বার্থটার দিকেই আকর্ষণ করে, তাকেই সামনে টেনে আনে”।


খ. বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর লড়াইওকে যে বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তার মধ্যে তারা সর্বদা ও সর্বত্র সমগ্র আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে”

তাহলে কমিউনিস্ট মানে কি?

ক. “একদিকে কার্যক্ষেত্রে প্রতি দেশের শ্রমিক পার্টিগুলির সর্বাপেক্ষা অগ্রসর ও দৃঢ়চিত্ত অংশ – যে অংশ অন্য সবাইকে সামনে ঠেলে নিয়ে যায়”


খ. “অপরদিকে তত্ত্বের দিক দিয়ে প্রলিতারিয়েতের অধিকাংশের তুলনায় তাদের এই সুবিধা যে, প্রলেতারীয় আন্দোলনের এগিয়ে যাওয়ার পথ, শর্ত এবং শেষ সাধারণ ফলাফল সম্বন্ধে তাদের স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে”।


এই দিকগুলো জানা, ব্যখ্যা ও বোঝা জরুরী। যাতে চিন্তা পাঠচক্রের ভূমিকা আমরা আরও ভালভাবে বুঝতে পারি।

তাহলে কমিউনিস্ট পার্টি বানাবোনা অথচ মার্কস পড়ছি কেন? – এর উত্তর আর আমাদের দিতে হচ্ছে না। কমিউনিস্ট ইশতেহারেই তার ব্যাখ্যা আছে। কমিউনিস্ট হওয়ার অর্থ কমিউনিস্ট পার্টি করা না। কিনতি পার্টির কি দরকার নাই? অবশ্যই আছে। ক্ষমতার চর্চা ও গণশক্তি পরিগঠনের কাজ আলাদা। বাস্তব অবস্থা সাপেক্ষে পার্টির প্রয়োজনীয়তা ও ভূমিকা আলাদা। দেশ কাল পাত্র ভেদে পার্টির রূপ এবং ভূমিকা বিভিন্ন প্রকার রূপ নিতে পারে।পুঁজি বিভিন্ন বাস্তব পরিস্থিতিতে কি ধরণের সামাজিক বিরোধ ও শ্রেণী দ্বন্দ্ব তৈরি করে মজলুম জনগ্ণ বা শ্রমিক শ্রেণীর স্বররথের পক্ষে যারা কাজ করে তাদের পার্টির রূপ ও ভূমিকা সেই বাস্তবতা সাপেক্ষেই স্থির হয়।

কমিউনিস্ট নিয়ে কথা হচ্ছে, কমিউনিস্ট পার্টি না। আমরা উদ্ধৃতি দিচ্ছি 'কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার' থেকে। মার্কস-এঙ্গেলস জররন সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন, বাস্তব অবস্থার পরিবর্তন হলেও পুস্তিকায় বিধৃত 'সাধারন মূলনীতি' ঠিকই আছে। কমিউনিস্টদের কাজ শ্রমিক শ্রেণীর বিদ্যমান আন্দোলন ও সংগঠনের প্রতিপক্ষ হওয়া না, কোটারি বা গোষ্ঠিগিরি চর্চা না। বরং দরকার বিদ্যমান বিভিন্ন চিন্তা পর্যালোচনা করবার হিম্মত অর্জন: মানুষের পারলৌকিক ও ইহলৌকিক সকল বিষয়ের নির্মোহ পর্যালোচনা। উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ ও জগতের সম্বন্ধকে জ্ঞানগত এবং ঐতিহাসিক ভাবে বোঝা, সম্বন্ধের ধাঁধা মোচন এবং সমাজে ও ইতিহাসে নিজের ইতিহাস-সঙ্গত ভূমিকা নির্ণয়। নিজের কর্তারূপ এবং তার ভূমিকা সম্বন্ধে সজ্ঞান হওয়া। যেন মেহনতি শ্রেণী ও মজলুম জনগণের এগিয়ে যাওয়ার পথ, শর্ত এবং শেষ সাধারণ ফলাফল সম্বন্ধে 'স্বচ্ছ ধারণা' আমরা গড়ে তুলতে পারি। নিজেদের আমরা কমিউনিস্ট বলি কিম্বা না বলি, তেতে কিচ্ছু আসে যায় না। যারা এই কাজ করে তারা কমিউনিজম কায়েমের কাজই করেন।

বাস্তবের ‘কমিউনিস্ট আন্দোলন নামে আমরা যা ইতিহাসে দেখেছি তার পতনের অন্যতম প্রধান কারণ, এই এগার নম্বর থিসিসের ভুল ব্যাখ্যা এবং ভুল ব্যাখ্যার কারণে ভুল চিন্তা বহাল রাখা। দর্শন, অর্থাৎ চিন্তা ও পর্যালোচনার আর কোন দরকার নাই, এখন, 'ধর তক্তা মারো পেরেক'। কাজ হচ্ছে ক্ষমতা দখল – অর্থাৎ চিন্তা চর্চা বাদ দিয়ে শুধু পার্টি কেন্দ্রিক তৎপরতা, গোষ্ঠ নীতি ও কোারি স্বার্থ চর্চা, ইত্যাদি।

৭. মার্কসের আবির্ভাব জর্মন দর্শনের মধ্যে। জর্মন ভাবাদর্শে মানুষ নিজেকে এবং তার বাইরের জগতকে ( যাকে আমরা কখনও প্রকৃতি কখনও জগত বলি) যেভাবে বিচার করেছে সেখানে একদিকে আছে চিন্তার কর্তা, আর অন্যদিকে চিন্তার বিষয়। এই সম্বন্ধের মধ্যে যে চিন্তার চর্চা সেটাই জর্মন ভাবাদর্শিক দার্শনিক পরিমণ্ডল। মার্কস এই পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে এসে চিন্তা চর্চাকে জাগতিক করে তুলতে চাইলেন। তাই তিনি দেখালেন মানুষ আর জগতের সম্বন্ধ পর্যালোচনার শুরু হতে হবে মানুষ কিভাবে জগতে উৎপাদন, বিতরণ, বিনিময় এবং ভোগ সম্পাদন করে। মানুষ যা চিন্তা করে তা তার জাগতিক সম্বন্ধের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ চিন্তার কর্তা আর চিন্তার বিষয়ের সংকীর্ণ দার্শনিক বৃত্তে বুঝলে সেই সম্বন্ধের মধ্যে জাত চিন্তার তাৎপর্য আমরা বুঝবো না। আগে বুঝতে হবে রক্তমাংসের মানুষের সঙ্গে জগতের সম্বন্ধ। সেই সম্বন্ধের বিচার করলেই আমরা কোন বিষয়ে চিন্তা করি, কিভাবে করি, কেন করি ইত্যাদির উত্তর মিলবে।

মার্কস চিন্তাকে জাগতিক করতে চাইলেন। চিন্তা ও পর্যালোচনার চরিত্র ছিল চিন্তার বিষয়ের সঙ্গে যিনি চিন্তা করছেন সেই চিন্তাকর্তার সম্বন্ধ বিচার, বিষয়ীর সঙ্গে বিষয়ের সম্বন্ধ পর্যালোচনা। তিনি তাকে মানুষের সঙ্গে তার বৈষয়িক জগতের সম্বন্ধ চর্চায় উন্নীত করলেন। দর্শন আর প্রাচীন দর্শন থাকলো না, হয়ে উঠল অর্থশাস্ত্রের পর্যালোচনা। সেই দিক থেকে ভাবলে ‘পুঁজি’ একটি দার্শনিক বিপ্লবও বটে। একে সংকীর্ণ অর্থে স্রেফ অর্থশাস্ত্রীয় বিদ্যায় পর্যবসিত করা ভুল। চিন্তা পাঠচক্রে আমারা তাই যথাসাধ্য ‘পুঁজি’ গ্রন্থকে দর্শনের গ্রন্থ, অর্থাৎ চিন্তার চর্চা আকারে সুযোগ পেলেই পড়বার চেষ্টা করব।

৮. মার্কস পুঁজি লিখতে যেয়ে অর্থাৎ অর্থশাস্ত্রের পর্যালোচনা করতে যেয়ে দেখেন, সমাজে মানুষ কী চিন্তা করে, কীভাবে চিন্তা করে বা কোন বিশেষ বিষয় নিয়ে ভাবে সেইসব বুঝতে হলে উৎপাদন সম্পর্ক বুঝতে হবে। মানুষের চিন্তা-ভাবনার মর্ম উৎপাদন সম্পর্কের বিচার করলে স্পষ্ট হয়। এই অর্থেই তিনি দাবি করেছিলেন চিন্তার ওপর উৎপাদন সম্পর্কের ভূমিকা থাকে। এই অর্থে যে চিন্তা তো আর হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় না। মানুষই চিন্তা করে। হোক তা নিজেকে নিয়ে, কিম্বা জগত বা যা সে চোখে দেখে না কল্পনা করে ইত্যাদি নিয়েই তার চিন্তা। মানুষের চিন্তা করার শর্ত হচ্ছে তার রক্তেমাংসে বেঁচে থাকা। আর রক্তেমাংসে বেঁচে থাকতে হলে তাকে তো উৎপাদন করতেই হবে। আর সে যেভাবে উৎপাদন করে সেটা তার চিন্তার বিষয় ও ধরণকে প্রভাবিত করে। এই কারণে তিনি অর্থশাস্ত্রের প্রতি মনোযোগী হলেন। অর্থশাস্ত্রের মধ্যে দিয়ে তিনি অ্যাডাম স্মিথ, ডেভিড রিকার্ডো, মার্শল, জে.বি.সে., জন স্টুয়ার্ড মিল প্রমুখদের হাতে অর্থনীতির যে সকল ধারণা ও বর্গ তৈরি হয়েছে তাদের পর্যালোচনা করলেন। তার আগের বা সময়কালের অর্থনীতিবিদদের চিন্তা পর্যালোচনার করতে করতেই তিনি ‘পুঁজি’ লিখলেন।

৯. তাহলে দর্শন চর্চা কি ? দার্শনিক চিন্তা আসে কোত্থেকে ? এটা রহস্যজনক কিছু না। যা আমরা দেখি তা নিয়ে চিন্তা করা সহজ। আর যা দেখি না, তা কঠিন বটে কিন্তু নানান জনের নানান অভিজ্ঞতা, কল্পনা, অনুমান, তর্ক বিতর্কের মধ্য দিয়ে দার্শনিক জিজ্ঞাসা তৈরি হয়। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ গড়ে ওঠার আগে মানুষের অনুমান, বিশ্বাস উপলব্ধি ইত্যাদি ধর্মের মধ্য দিয়েই হাজির হয়েছে। প্রকৃতি ও সমাজ নিয়ে বিভিন্ন ধারণা ও চিন্তা-ভাবনার পর্যালোচনা থেকেই ধর্ম তার রসদ জোগাড় করে। কিন্তু সেটা হাজির থাকে বিশ্বাস বা উপলব্ধির নিশ্চয়তা বা কিম্বা নিশ্চয় সত্যের রূপ নিয়ে, যা ধর্মের তত্ত্ব বা ধর্মতত্ত্ব নামে পরিচিত। একটা পর্যায়ে মানুষ যখন তার বুদ্ধি দিয়ে নিজের উপলব্ধির সত্যাসত্য বিচার করতে শিখল, তখন সত্যের নিশ্চ্যয়তাকে স্রেফ উপলব্ধি হিশাবে গণ্য না করে সে যুক্তি দিয়ে প্রকাশ করতে সমর্থ হোল তখন পাশ্চাত্যে ধর্মতত্ত্ব দর্শন থেকে আলাদা হয়ে গেল।

তাহলে সব ধর্মেই জগত ও সমাজ সম্পর্কে যেমন চিন্তা আছে, তেমনি অর্থনীতি সম্পর্কেও চিন্তা মজুদ আছে। যে সময়ে ধর্মগুলোর উদ্ভব ঘটেছে সেই সময়ের প্রতিফলন ধর্মে ও ধর্মতত্ত্বেও আছে। হোক তা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টিয় বা অন্য যে কোন ধর্ম। বলাবাহুল্য ধর্মের উৎপত্তি পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নয়, তাই পুঁজি ধর্মতত্ত্বের বিষয় হয় নি। কিন্তু অর্থশাস্ত্র আয়ত্ব করলে আমরা ধর্মের আর্থ-সামাজিক মর্ম অনেক ভালভাবে বুঝতে পারি।

১০. আধুনিক কালে যা অর্থশাস্ত্র নামে গড়ে উঠেছে তার পরিগঠন ঘটেছে প্রধানত ইংলন্ডে, কারন সেখানে পুঁজিতান্ত্রিক বিকাশে ঘটছিল এবং পুঁজির একটা চেহারা চিন্তা জাগিয়ে তোলার জন্য সামনে হাজির ছিল। আমরা তাই দেখি অর্থশাস্ত্র একটি বিজ্ঞান হিশাবে গড়ে উঠবার সময় পাশ্চাত্যে প্রথম দিককার প্রায় সকল অর্থনীতিবিদই ছিলেন ইংল্যান্ডের। কৃষি ও কারিগরদের সন্ধিক্ষণে পুঁজিতন্ত্র সেখানে হাজির হয়েছিল। তাকে চিন্তাশীল ব্যাক্তিরা বর্ণা ও ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন।

১১. পাশ্চাত্যে উৎপাদন সম্পর্কে সবচেয়ে প্রাচীন ধারণা সম্ভবত গার্হস্থ ব্যবস্থাপনা এবং তার সঙ্গে সন্তান বা প্রজাতি পুনরুৎপাদন। আদিতে ‘ইকনমি’(Economy) গ্রিক দুটো শব্দ থেকে তৈরি। একদিকে ‘গৃহ’ (οίκος) আর তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে (νέμoμαι ) ‘ব্যবস্থাপনা’। পুরোটার মানে দাঁড়ায় গৃহ ব্যবস্থাপনা। শুরুর দিকে যারা গৃহ না, বরং বৃহত্তর সমাজের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করলেন তারা তাই বাধ্য হয়ে তাদে তাদের বিষয়ের নাম ‘ইকনমি’ বললেন না, বললেন Political Economy। পলিটিকাল ইকনমির অনুবাদ অনেকে করেন ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ কিম্বা ‘রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র’। আসলে কিন্তু দরকার নাই। তাঁরা আসলে অর্থনীতিরই আলোচনা করেছেন। গার্হস্থ ব্যবস্থাপনার ধারণা না হয় ইকনমি হয়ে উঠেছে সমাজের উতপাদন, বিতরণ, বিনিময় ও ভোগের বিচার। এভাবে আধুনিক অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা দানা বাঁধে।

পুঁজি এসে বিষয় হিশাবে অর্থনীতির পরিগঠন ত্বরান্বিত করে। উৎপাদনের ধারণায়ও আমুল পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়। শুধু তাই না, পুঁজি নৈর্ব্যক্তিক শক্তি আকারে হাজির হয়, যার মধ্যে আত্মস্ফীতি ও পুঞ্জিববনের শক্তি নিহিত। যার কারনে পুজিতান্ত্রিক গোলকায়ন বিপুল বেগে ঘটেছে। কিন্তুসেটা সম্প্রতি ঘটেছে ভাবা ভুল। মার্কস বলেছিলেন পুঁজি ‘বিশ্ব-ঐতিহাসিক’। এর আবির্ভাবের পর সারা দুনিয়া পুঁজির অধীনস্থ হবে, পুঁজির চলন ও গতির বাইরে কিছুই নিজের অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকতে পারবে না, সেটা পুঁজির স্বভাবের মধ্যেই নিহিত। খুবই তাৎপর্য বিষয় হচ্ছে মার্কসে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ হিশাবে পুঁজির কোন বিশেষ পর্বের উল্লেখ নাই। তাঁর ‘বিশ্ব-ঐতিহাসিক’ ধারণার মধ্যে শুধু সাম্রাজ্যবাদ নয়, বিশ্ব ইতিহাসের ধারণাও অন্তর্ভূক্ত। আশির দশকে ‘সাম্রাজ্যবাদের পরিবর্তে ‘গ্লোবালাইজেশান’ কথাটির চল শুরু হয়। গ্লোবালাইজেশানকে ইতিবাচক অর্থে ‘বিশ্বায়ন’ অনুবাদের চেষ্টা চলে। সেই সময় ‘গ্লোবালাইজেশান’কে বিশ্বায়ন না বলে চিন্তা পাঠচক্রে আমরা ‘গোলকায়ন’ অনুবাদ করি। পুঁজির স্বভাব মনে রাখলে পুঁজির ‘গোলকায়ন’ অনেক বেশী অর্থ ধারণ করে। এটি স্রেফ আক্ষরিক অনুবাদ না, পুঁজির স্বভাব বোঝার সহায়ক।

১২. মার্কসের একটা গুরুত্বপূর্ণ নোশন বা ধারনা ক্যাপিটালিস্ট ক্রাইসিস বা পুঁজিতান্ত্রিক সঙ্কট। পুঁজির চরিত্রের মধ্যে এই সঙ্কট সবসময়ই সম্ভাবনা হিশাবে রয়েছে। আধুনিক পুঁজিতন্ত্র এই সঙ্কট কখনো দূর করেনা বা করবেনা। ক্রাইসিসের ব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়েই রুলিং ক্লাস বা ক্ষমতাসীন শ্রেণী তাদের ক্ষমতা বজায় রাখে। সংকট যেমন বৈপ্লবিক রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি করে, ঠিক তেমনি পুঁজিকে সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য নিত্য নতুন বাজার ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র আবিষ্কার করতে হয়। যেমন কাঁচামাল সংগ্রহ ও পণ্যের বাজার বাড়াবার জন্য পরদেশ দখল। আগে পুঁজি বিনিয়োগ হতো কল-কারখানায়। এখন পুঁজি বিনিয়োগ হয় নারীর শরীরে, নারীর নারীর সৌন্দর্য চর্চা পুঁজিতান্ত্রিক বিনিয়োগের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বিক্রির জন্য তাকে মিথ্যা প্রচারের মধ্য দিয়ে চাহিদা তৈরি করতে। এতে সৌন্দর্যবোধের ধারণা যেমন পুঁজি নির্ণয় করে, তেমনি পণ্যের চাহিদাও তৈরি করে। যেমন : ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী। কিম্বা তৃষ্ণার ধারণা, কোকাকোলা, পেপসিকোলা, ইত্যাদি।

১৩. মার্কস অর্থনীতির আলোচনা মনস্তত্ত্ব দিয়ে শুরু করেন নি। ওর্থাৎ মানুষের চাহিদা এবং তার যোগান কি করে হয় সেখান থেকে শুরু করেন নি। পণ্য দিয়ে তিনি শুরু করেছেন এবং পুঁজির নৈর্ব্যাক্তিক স্বভাব ও শক্তি বিচার করে আমাদের ইচ্ছা-আকাঙ্খাগুলোকে পুঁজি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সেটা দেখান। এমন কি পুঁজিকে প্রতিরোধ করবার কিম্বা পুঁজির বিরুদ্ধে লড়বার আকাংখাও পুঁজির স্বভাব, গতি বা চলন থেকে সৃষ্ট হয়। অর্থাৎ পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমাদের কর্তাগিরি এবং তৎপরতা পুঁজিরই কর্তাগিরি এবং তৎপরতা, যা পুঁজির আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে তৈরি হয়, যা এক সঙ্গে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কার কিম্বা রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি করে। পুঁজির সংকট সবসময়ই পুঁজিকে নতুন ভাবে সাজাতে কিম্বা পুরা ব্যবস্থা উৎখাতের সম্ভাবনা তৈরি করে। এটা প্রবণতা হিশাবে সবসময়ই বিরাজ করে। তাই মার্কস পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গঠিত ‘শ্রমিক শ্রেণী’র মধ্যেই বিদ্যমান ব্যবস্থা ভেঙে নতুন করে মানুষের সমাজ ও ইতিহাস গড়বার শর্ত সন্ধান করেছিলেন।

১৪. নোক্তা হিশাবে বলে রাখি। মানুষের বিপ্লবী ভূমিকা পালনের সম্ভাবনা এবং তার বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলাদা আলোচনা দরকার। বিশেষত তার জন্য ব্যবস্থার বাইরে মানুষ নিজের মধ্যে কোন শক্তি নিজে উপলব্ধি করতে পারে কি, যা মানুষের ‘ফিতরাত’ কিম্বা ‘সহজ’ স্বভাব হিশাবে পুঁজির আগেই সম্ভাবনা হিশাবে মজুদ থাকে। কিন্তু ব্যবস্থার চাপে হারিয়ে যায় কিম্বা নষ্ট হয়। সেই শক্তির বলে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিপ্লবী কর্তা হিশাবে মানুষের নিজেকে প্রস্তুত করা করা আদৌ সম্ভব কি? এটি একালে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তর্ক। মার্কসে সবকিছুই অর্থনীতি দ্বারা নির্ধারিত, এই ধরনের চিন্তা রয়েছে। ফলে এই তর্ক প্রচলিত মার্কসবাদে হারিয়ে যায়। নাফসানিয়াত বা পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুঁজি যেভাবে আমাদের জৈবিক ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা কামনা বাসনা তৈরি বা নির্ধারন করে তার বাইরে মানুষ স্বতন্ত্র কোন ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা কামনা বাসনা তৈরি করতে পারে কিনা , যাকে নাফসানিয়াতের বিপরীতে রুহানিয়াত বলা যায়। ইসলামের আভ্যন্তরীণ তর্কবিতর্কের (discursive tradition) মধ্যে এই তর্ক আছে, যা আমাদের চিন্তা উদ্রেক করতে পারে। চিন্তার নতুন দিগন্তের সন্ধান দিতে পারে। ইসলাম ও ইসলামের নিজস্ব ইতিহাসের জায়গা থেকে কার্ল মার্কসের পর্যালোচনার হিশাবে এই তর্কের সম্ভাবনা আমরা আলী শরীয়তির লেখালিখিতে পাই।

তাছাড়া সিন্টেম বা প্রচলিত বদ্ধমূল ব্যবস্থার বাইরে মানুষের ‘সহজ’ বৈশিষ্ট্যের সম্ভাবনা নিয়ে নদীয়ার ভাবান্দোলনেও ইন্টারেস্টিং প্রস্তাবনা রয়েছে। মানুষ যেমন ব্যবস্থার অধীন, তেমনি মানুষের পক্ষে ব্যবস্থার বাইরে আসাও সম্ভব। এর সহজ উদাহরণ হচ্ছে মানুষের পক্ষে জীব জীবনের বিপরীতে বা উর্ধে তার ইচ্ছাকেই একমাত্র সত্য প্রমাণ করা সম্ভব। হেগেল তাই বলেছিলেন, মানুষ নিজের ইচ্ছায় নিজের জীব জীবন বিসর্জন বা আত্মহত্যা করতে পারে, জীবে পারে না। মানুষের পক্ষে ব্যবস্থার বাইরে থাকার চেষ্টা, কিম্বা ব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে ভিন্ন কিছু সম্ভব সেটা আমাদের দেশের ফকির-ফ্যাকড়ারা খুব ভালো বুঝেছিলেন। মানুষ জীবমূলক আকাঙ্ক্ষা না করে পরমার্থিক বাসনা করতে সক্ষম। জীবিত থেকেও মানুষ জীবের আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে মুক্ত ত্রাখতে পারে। নদীয়ায়া ‘ফকির’ হওয়ার অর্থ তাই ‘জ্যান্তে মরা’ হওয়া। এই বিষয়ে অন্যত আলোচনা করা যাবে।

১৫. বৈপ্লবিক বাসনার সম্ভাবনা কেন এবং কিভাবে তৈরি হয়, সেটা তাহলে খুবই গুরুতর একটি জিজ্ঞাসা। মিশেল ফুকো একে ‘কাউন্টার এফেক্ট’ বলেছিলেন এবং সেটা বাস্তবে কিভাবে রূপ নেয় বোঝার জন্য ইরানের বিপ্লবের সময় ইরানে ছুটে গিয়েছিলেন। ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব যেমন বিপ্লব, তেমনি ইরানের বিপ্লবও বিপ্লব, একটি বিশ্ব-ঐতিহাসিক ঘটনা। পশ্চিমারা তাদের বিপ্লবকে স্বীকৃতি দিলেও ইরান বিপ্লবকে স্বীকৃতি দিতে রাজি নয়। ইরান বিপ্লবের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য মেনে নিতে রাজি না। মিশেল ফুকোর ইরান বিপ্লবের প্রতি মনোযোগী হবার এটিও একটি কারণ। পাশ্চাত্য অনুমান, যেমন হেগেলে, যে পৃথিবীতে বিপ্লবের চিরায়ত রূপ ও মর্ম হাজির হয়ে গিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে মানুষ স্বাধীন ও সার্বভৌম সত্তা হিশাবে হাজির, এর বাইরে আর কোন বিপ্লব নাই। বিপ্লব ঘটা শেষ। কিন্তু ইরানে কেন হঠাৎ করে তা ঘটলো সেটা বোঝার জন্য মিশেল ফুকোর আগ্রহ খুবই ইন্টারেস্টিং ঘটনা।

এই দিক থেকে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজির বিচার একই সঙ্গে ধর্ম এবং ধর্ম চিন্তার স্বাতিন্ত্র্য, গুরুত্ব ও তাৎপর্য বোঝার সহায়ক। ইসলামপন্থীরা মার্কসের বিরোধিতা করবার কারন হচ্ছে ধর্মকে তারা একটি বিশেষ শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার বানাতে চায়। ইসলামকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতিয়ার বানিয়ে রাখার চেষ্টা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামরিক নীতি ও কৌশলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মার্কসকে ‘নাস্তিক’ প্রচার করে মার্কস পাঠে অন্তরায় তৈরির প্রয়াস একান্তই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী প্রয়াস। ইসলামের আভ্যন্তরীণ তর্কবিতর্কের জায়গা থেকে মার্কসের পর্যালোচনা একটি জরুরী কাজ।

ধর্মের ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে বুঝতে হলে এঙ্গেলসের ‘প্রথম দিকে্র খ্রিস্ট ধর্ম’ (On the History of Early Christianity) লেখাটি অবশ্যই পড়া দরকার। এনগেলসের দাবি, ‘খ্রিস্ট ধর্ম আদিতে ছিল মজলুমদের আন্দোলন’। ইসলামের আদি ইতিহাসে দিকে তাকালে আমরা ইসলাম শুরু থেকেই ছিল রাজনৈতিক এবং বৈপ্লবিক। আদি ইসলামের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে হলে শুধু বিশ্বাস আর ধর্ম প্রীতি যথেষ্ট না, বিচার বিশ্লেষণের ক্ষমতাও শক্তিশালী করা চাই। এই জন্যই আমরা বারবার দাবি করি, মার্কস পড়ার বিকল্প নাই। যীশুকে কে এঙ্গেলস বিপ্লবী হিশাবে ভাবতে শেখালেও পাশ্চাত্য হেন কুকথা নাই যা মোহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে প্রচার করে না। কারন ইসলামের ইতিহাসকে ধর্মতাত্ত্বিক ইতিহাস ছাড়া মানুষের ইতিহাস হিশাবে পাঠ করবার কোন শক্তিশালী ধারা আলেম-ওলেমা কিম্বা তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিচর্চার মধ্যে গড়ে ওঠে নি। ফলে ইসলাম পাশ্চাত্যের বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার। যারা মার্কস পড়েছেন মানবেতিহাস হিশাবে ইস্লামের ইতিহাস পাঠ করার বুদ্ধিবৃত্তিক আঞ্জাম তৈরি করা বড় একটি কাজ হয়ে আছে।

পুঁজিবাদি ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে এবং কিভাবে ইতিহাসের পুঁজিতান্ত্রিক স্তর আমরা দ্রুত পেরিয়ে যেতে পারি সেটা বোঝার জন্যে মার্কসের দার্শনিক বয়ান জানা ও বোঝাটা খুব জরুরী। আমাদের ‘পুঁজি’ পাঠের গুরুত্ব নিয়ে তাই এতো কথা বলতে হচ্ছে। কথা ফুরাবারও নয়।

১৬. মার্কস পণ্য দিয়ে শুরু করেন কারন তিনি দেখাবেন ভোক্তা হিশাবে মানুষের চাওয়া পাওয়া বাসনা চাহিদা ইত্যাদি পুঁজি থেকে স্বাধীন কিছু না, পুঁজিই তা নির্ণয় করে। তাই তিনি সজ্ঞানে ভোক্তার কামনা বা চাহিদা থেকে কিম্বা পণ্যের সরবরাহ বাজারে কতোটুকু আছে কি নাই তা দিয়ে পণ্যের মূল্য নির্ণয় আলোচনা শুরু করছেন না। মার্কস ‘পণ্য’ দিয়ে পুঁজির যে কথা শুরু করছেন সেই পুঁজি আগাম বা আগে থেকেই মানুষের কোন কামনা বাসনা ইচ্ছা সংকল্প অনুমান করে না। সরবরাহ ও চাহিদা দিয়ে পুঁজিকে তাই বোঝা যাবে না। পুঁজির বিচার মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞান না।

দ্বিতীয়ত ‘পুঁজি’ ডাকনামে মার্কস এমন এক বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করছেন যা সরাসরি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় নয়, বরং বিমূর্ত। বিমূর্ত এই অর্থে যে যাকে চোখে দেখা যায় না, হাতে ছোঁয়া যায় না, ইত্যাদি। ‘পুঁজি’ বুঝতে হলে কল্পনা ও বুদ্ধি দুইয়েরই দরকার হয়ে পড়ে। কল্পনা এই অর্থে যে যা সামনে দেখছি সেটাই তার সব সত্য না, সমগ্র না। ‘পুঁজি’ বুঝতে হলে বুদ্ধির দরকার কারণ যা সামনে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু বা বিষয় হয়ে হাজির নাই তাকে বুদ্ধির পরিমণ্ডলে পরিগঠিত সত্তা হিশাবে নির্মাণ করা দরকার হয়ে পড়ে। তার আদল, স্বভাব এবং গতি বুদ্ধির বিচারে না ফেললে বোঝা যায় না। এই জন্যই ‘ক্রিটিক’ বা পর্যালোচনা।

আমামদের এতো কথা বলতে হোল শুধু ‘পুজি’ গ্রন্ত্রের প্রথম কয়েকটি লাইন বুঝতে গিয়ে। মার্কস শ্রুই করছেন এভাবে:

The wealth of societies in which the capitalist mode of production prevails appears as an ` immense collection of commodities ` the individual commodity appears as it’s elementary form. Our investigation therefore begins with the analysis of the commodity

অর্থাৎ “ যে সমাজে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম থাকে, সেখানে সমাজের সম্পদ হাজির হয় অপরিমেয় পণ্যের সমাহার হিশাবে, সেখানে একেকটি পণ্য পুঁজির প্রাথমিক রূপ। অতএব আমাদের তদন্ত শুরু করতে হবে পণ্যে মর্মোদ্ধার দিয়ে’

‘পুঁজি’ শুরুতেই দাবি করছে যেখানে পুজিতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা জারি থাকে সেখানে:

ক. ‘সম্পদ’ হাজির হয় বিপুল পরিমান পণ্যের সমাহার হিশাবে। পুজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘সম্পদ’ মানে পণ্য। এখানে আদম স্মিথের সম্পদ নামক বিমূর্ত ধারণা মার্কস এড়াতে চাইছেন। দেখুন (W


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top