হত্যা ষড়যন্ত্র ও আমার বঙ্গবন্ধু


প্রকাশিত:
১৬ ডিসেম্বর ২০২১ ১০:৫০

আপডেট:
১৭ আগস্ট ২০২২ ২২:৪৫

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভূমিকা বাঙালি তথা সারাবিশ্ব মনে রাখবে। আগামী ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপিত হবে। টুঙ্গিপাড়ায় এক কৃষক পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সেখান থেকে নিজের রাজনৈতিক দক্ষতা ও স্মরণ শক্তির গুণে তিনি বর্তমান বাংলাদেশের জনক হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান চির উজ্জ্বল।

কলকাতায় ছাত্র-জীবনে তিনি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মুসলিম লীগের ছাত্র শাখার নেতা হয়ে ওঠেন। তিনি যে পাকিস্তানের অত্যাচার পছন্দ করেননি সে-কথা তিনি কখনও চেপে রাখেননি। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে দেখা যায়, ১৯৫৫ সালের ১৭ জুন পাকিস্তানের গণপরিষদে তার অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক ভাষণ, পাকিস্তান গণপরিষদে তার বক্তৃতায় স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন, “পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ পূর্ব বাংলার পরিবর্তে ওরা পূর্ব পাকিস্তান রাখতে চায়।” এই ছিল তার বক্তৃতার মূল কথা, তিনি বক্তৃতায় বলেন, “আমরা বহুবার দাবী জানিয়েছি যে, আপনারা এটাকে বাংলা নামে ডাকেন, ‘বাংলা’ শব্দটির একটি নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে একটা ঐতিহ্য। আপনারা এই নাম আমাদের জনগণের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পরিবর্তন করতে পারেন। আপনারা যদি ঐ নাম পরিবর্তন করতে চান, তাহলে আমাদের বাংলায় আবার যেতে হবে এবং জনগণের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবেÑ তারা নাম পরিবর্তনকে মেনে নেবেন কি না? এক ইউনিটের প্রশ্নটা শাসনতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আপনারা এই প্রশ্নটাকে এখনই কেন তুলতে চান? বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে কী হবে? যুক্ত নির্বাচনী এলাকা ঠিকের প্রশ্নটারই কী সমাধান? আমাদের স্বায়ত্তশাসন সম্বন্ধেই বা কী ভাবছেন? পূর্ব বাংলার জনগণ অন্যান্য প্রশ্নের সমাধানের সাথে এক ইউনিটের প্রশ্নটাকে বিবেচনা করতে প্রস্তুত। তাই আমি আমার ঐ অংশের বন্ধুদের কাছে আবেদন জানাব, তারা যেন আমাদের জাপানের ‘রেফারেন্ডাম’ অথবা গণভোটের মাধ্যমে দেওয়া রায়কে মেনে নেন।

স্বদেশের মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল গভীর। এই ভালোবাসাই তাকে উদ্যম জুগিয়েছে। কারোর প্রতি ঘৃণা কখনও তাকে চালিত করেনি।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চে তার ঐতিহাসিক ভাষণ, যা মুক্তিকামী বাংলার মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল স্বাধীনতার জন্য। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরে তার অনুপস্থিতিতে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রবাসী সরকার গঠিত আর ১৮ এপ্রিল থেকে পূর্ব পাকিস্তান না, পূর্ব বাংলা না, দেশটির নাম হয় বাংলাদেশ, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, আবু হেনা মো. কামারুজ্জামান, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ষড়যন্ত্রী নেতা মোস্তাক আহমেদ, কর্নেল ওসমানী এবং অধ্যাপক ইউসুফ আলী। অনুষ্ঠান শেষে তাজউদ্দীন সাহেব আমাকে ডেকে ফিসফিস করে বলেছিলেন, আপনারা এই জায়গাটার নাম প্রকাশ করবেন না। তাহলে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী এখানকার সব মানুষকে হত্যা করবে, অফিসে এসে বসকে জানাতেই তিনি বললেন তুমি লাইব্রেরিতে গিয়ে বলো আমি আসছি। একটু পর তিনি হন্তদন্ত করে বলেন, তার হাতে অনেকগুলো কাগজ ছিল, তাতে অনেক জায়গার নাম লেখা ছিল। এরপর তিনি একটি কাগজ দেখিয়ে বললেন- এটাই হবে সেই জায়গার নাম। আমি দেখলাম তাতে লেখা মুজিবনগর। তিনি এই নাম দিয়েছিলেন গত সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখে, তারও জন্মশতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে। তারও আদিবাড়ি ফরিদপুরের রাজবাড়িতে। পরদিন দেখা গেল কলকাতাসহ সারাবিশ্বের বিভিন্ন কাগজে ডেটলাইন দেওয়া হয়েছিল- ‘Some where from border..’ এমনকি আমাদের ইংরেজি কাগজ Hindustan Standard–এও লেখা হয়েছিল `Some where from border.’ প্রবাসী সরকারের নেতাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল এক নাটকীয়ভাবে। সীমান্ত ঘোরার সময় হাজার হাজার মানুষের মুখে শুনেছি নেতারা কলকাতায়।

কিন্তু কোথায়, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। হন্যে হয়ে কলকাতার যেসব জায়গায় তারা থাকতে পারে সেসব জায়গায় খোঁজ নিলাম, পেলাম না। একদিন বিএসএফের সদর দপ্তরে আইজি গোলোক মজুমদারের ঘরে নিয়ে তাকে অনুনয় বিনয় করলাম- দয়া করে বলুন নেতারা কোথায় আছেন? মন খারাপ করে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে যখন নামছি তখন একতলার একটি ঘরে কিছু লোকের কথা শুনতে পেলাম, সাহস করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখি- ওরা চার-পাঁচজন মেঝেতে চাদর পেতে শুয়ে আছেন আর একজন বসে আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ছেন। তার নাম অধ্যাপক ইউসুফ আলী। ইউসুফ আলীকে আমি নিজের পরিচয় দিতেই তিনি বললেন, এই তো আপনি দিনাজপুরে গিয়েছিলেন। আমার বাড়িও দিনাজপুরে, আপনার লেখাই পড়ছি। হঠাৎ দেখি গোলোক মজুমদার খবর পেয়ে দুজন বিএসএফ অফিসারকে পাঠিয়ে দিলেন। তারা ধমকের সুরে আমাকে বললেন, ‘আপনি কেন এখানে ঢুকেছেন? আপনি চলে যান।’ তাজউদ্দীন সাহেব অফিসারদের পাল্টা বললেন, ‘আমরা ওর সাথে কথা বলে অনেক কিছু জানতে পারছি। আপনারা ওকে সরিয়ে দেবেন না।’ তাজউদ্দীন সাহেবের কথাতেই বিএসএফ অফিসার উপরে উঠে গেলেন। দীর্ঘ সময় আলোচনার পর নিজেকেই খুব উত্তেজিত বোধ করছিলাম। কারণ যাদের আমরা খুঁজেছিলাম, তাদেরই পেয়ে গেছি আর তাদের সাথেই কথা বলছি।

তখন পূর্ব বাংলার সঙ্গে ভারতের কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু আমরা তার বক্তৃতা শুনেছি রেডিওতে। রেডিও অর্থাৎ আকাশবাণী কোথা থেকে খবর পেয়ে বক্তৃতাটি আমি সংগ্রহ করলাম, যে বক্তৃতা বাঙালির হৃদয়কে কেড়ে নিয়েছিল। ইতোমধ্যে খবর পাওয়া গেল পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ ও পূর্ব বাংলার বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যরা কলকাতায় এবং আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন এবং ঐ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, আমি অবিশ্যি সেদিন লিখিনি যে ঐ নেতাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছে, তবে ঐ নেতারা যে কলকাতায় আছেন সে খবর আমি লিখেছিলাম।

প্রায় প্রতিদিনই খবর আসতে লাগল পাকিস্তানের দূতাবাসগুলো থেকে বাঙালি অফিসাররা চাকরি ছেড়ে কেউ কলকাতা কেউবা দিল্লি এসে পৌঁছাচ্ছেন। আর যিনি ৭ মার্চ স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন তিনি কোথায়? তার সন্ধান কেউ জানাতে পারছে না, আমি বিএসএফের নিষেধ সত্ত্বেও প্রায় প্রতিদিনই ঐ নেতাদের কাছে যেতাম। একদিন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আমার সঙ্গে বাইরে এসে বললেন, একটা সিগারেট দিন। সৈয়দ সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনাদের নেতা মুজিব কোথায়? তিনি আমাকে দিয়ে কসম খাইয়ে বললেন, কাউকে বলবেন না। পাকিস্তানিরা তাকে গ্রেফতার করে রাওয়ালপিন্ডি নিয়ে গেছে, আমরা কূটনীতিকের সাহায্যে খবরাখবর রাখছি।

বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, যা মুক্তিপাগল বাঙালি জাতির অভূতপূর্ব জাগরণের শ্রেষ্ঠতম কবিতা হিসেবে বিবেচিত, তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে। জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ইউনেস্কো ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ এই ঐতিহাসিক ভাষণ ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে’ অন্তর্ভুক্ত করেছে। গত ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কথা প্যারিসে অবস্থিত ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে প্রকাশ করেন।

ইউনেস্কোর ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড (এমওডব্লিউ) কর্মসূচির উপদেষ্টা কমিটি মোট ৭৮টি দলিলকে রেজিস্টারে যুক্ত করার পক্ষে মত দেয়। এগুলোর অন্যতম ৭ মার্চের ভাষণ। এর মধ্য দিয়ে পৃথিবীর নানা দেশের ৪২৭টি অতি গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হলো বাঙালি জাতির হৃদস্পন্দন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা ৭ মার্চের ভাষণ। বাঙালি জাতির মর্যাদা বিশ্বদরবারে আবারও এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাল। এই বৈশ্বিক তথ্যভিত্তিক ঐতিহ্যের মর্যাদা লাভের ফলে সারা পৃথিবীর মানুষ জানতে পারবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ও বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের দিক-নির্দেশনামূলক তথ্য সংবলিত পৃথিবী-সেরা সাহসী এবং নান্দনিক বক্তৃতার কথা। এই বক্তৃতা পৃথিবীর দেশে দেশে শোষিত, নির্যাতিত ও মুক্তিকামী মানুষের জন্য প্রেরণা ও সংগ্রামের অফুরন্ত উৎস হিসেবে এক অনন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে। যে ভাষণ শুনে আবেগাপ্লুত স্মৃতিকাতর বাঙালি নিজের অজান্তেই বারবার ফিরে যায় একাত্তরের উত্তাল রেসকোর্স ময়দানে, সেই ভাষণের আন্তর্জাতিক সাফল্যের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির পিতার অসাধারণ নেতৃত্বের গুণ সম্মোহনী ক্ষমতা ও জীবন সংগ্রাম এবং শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালির জেগে ওঠার ইতিহাসটি বিশ্ববাসী অবাক নয়নে দেখবে। দেরিতে হলেও ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, এজন্য ধন্যবাদ অবশ্যই প্রাপ্য।

ইতোমধ্যে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বিবৃতিতে একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করায় ইউনেস্কো এবং এর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি বিবৃতিতে বলেছেন, ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষার জন্য বিশাল গৌরবের। বাঙালি জাতির অবিস্মরণীয় এই সাফল্য ও মর্যাদাকে অভিবাদন জানাতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঘোষণা করেছে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি। তবে এই অসাধারণ সাফল্য লাভের জন্য তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে সাহায্য করেছেন দুজন বাঙালি, তারা হলেন- ফ্রান্সের প্যারিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি জনাব শহিদুল ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি জনাব মফিদুল হক তাদেরও অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ জনতার জনসমুদ্রে যে তেজোদীপ্ত জ্বালাময়ী কাব্যিক ভাষণ দিয়েছিলেন, তা বাঙালির মনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, বাঙালিকে স্বাধীনতা লাভের জন্য উন্মত্ত করেছিল, বাংলার সকল মানুষ বর্ণ, গোত্র ও ধর্ম ভুলে গিয়ে দেশের জন্য হাসিমুখে জীবন দিতে শপথ নিয়েছিল। ৭ মার্চের গোটা ভাষণটি ছিল অলিখিত, বাঙালির শোষণ ও বঞ্চনা নিয়ে বুকে জমা কষ্টের কথাগুলোই এমন তেজোদীপ্ত ও অপূর্ব বাগ্মিতায় শেখ মুজিব বলেছিলেন যে পুরো ভাষণটি বাঙালির একটি মহাকাব্যে পরিণত হয়েছিল। রাজনীতির কবিই শুধু এরকম ব্যঞ্জনাময় অনন্য ভাষণ দিয়ে বিশ্ব দরবারে ইতিহাস হয়ে থাকেন। এজন্যই বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতা হিসেবে শেখ মুজিব সম্পর্কে নিউজ উইকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল ‘Poet of Politics` অর্থাৎ রাজনীতির কবি। রাজনীতির কবি বলেই তো তিনি পাকিস্তানের জেলের মধ্যে বন্দী থেকেও ’৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধে সমগ্র বাঙালি জাতিকে আলোড়িত ও আন্দোলিত করতে পেরেছিলেন এবং তার নামেই সমগ্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাঙালির জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। ওইদিন সব পথ ধরে মানুষের জনস্রোত এসে মিশেছিল রমনার রেসকোর্স ময়দানে। শ্রমিক, ছাত্র, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, নারী, যুবক-যুবতী, কিশোর, ভবঘুরে ও বৃদ্ধসহ সাধারণ মানুষের ঢল নামে ময়দানে। এ দিন জাতি, ধর্ম, দলমত নির্বিশেষে বাঙালির ঐক্যের মিলন ঘটেছিল এবং দুপুর থেকেই রেসকোর্স ময়দানে সমবেত লাখো জনতার স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’। বঙ্গবন্ধু সভামঞ্চে আসা মাত্রই ‘শেখ মুজিবের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘মুজিব ভাইয়ের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘মা-বোনেরা অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘বাঁশের লাঠি তৈরি কর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ ও ‘আমার দেশ তোমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ ইত্যাদি স্লোগানে উত্তাল জনতা আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে। প্রচ- রোদ উপেক্ষা করে লাখো জনতা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন প্রিয় নেতার বক্তৃতা শুনতে। ওই জনসভায় সেদিন কোনো সভাপতি ছিলেন না, ছিলেন না অন্য কোনো বক্তাও। বেলা ৩টা ২০ মিনিট সাদা পাজামা-পাঞ্জাবির ওপর কালো মুজিব কোট পরিহিত বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ভাষণ শুরু করেন। প্রায় ১৭ মিনিটের একটি ভাষণ দিয়ে বাঙালির জন্য এক অমর কাব্যগাথা তিনি রচনা করেন। বাঙালির আবেগ, দ্রোহ ও স্বাধীনতার দাবিকে মাথায় রেখে যে ভাষাশৈলী ও শব্দ তিনি ভাষণে ব্যবহার করেছেন, তা পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ বক্তা ও রাজনীতিবিদের পক্ষেই কেবলমাত্র সম্ভব। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিল্লুর রহমান খানের মূল্যায়ন স্মরণ করা যায়। তিনি লিখেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান এমন এক রাজনৈতিক নেতা, যিনি ক্যারিশম্যাটিক এবং একই সঙ্গে একান্তই স্বদেশীয়। মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহরু, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এরা সবাই পাশ্চাত্যে শিক্ষা লাভ করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু পড়াশোনা করেছেন গোপালগঞ্জ, কলকাতা ও ঢাকায়। তিনি যা চাইতেন, জনগণ সেটাই করতেন। তিনি একজন সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী থেকে তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম প্রধান ক্যারিশম্যাটিক নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। ১১০৮টি শব্দ সংবলিত অপূর্ব হৃদয়গ্রাহী এ ভাষণে যেমন ছিল বাঙালির ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস, রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করার ইতিহাস, ছিল নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করার পরও বাঙালির নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠার ইতিহাস, ছিল স্বাধীনতা সংগ্রাম কেন বাঙালির জন্য অনিবার্য তার ইতিহাস। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি সংবলিত দিক-নির্দেশনা দিয়ে বাঙালিকে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বানও প্রতিধ্বনিত হয়েছে কাব্যিক এ ভাষণে। এ ভাষণের আর একটি অনন্য দিক ছিল Civil disobedience-এর সরাসরি নির্দেশনা। এছাড়াও আন্তর্জাতিক আইন ও সম্প্রদায়ের কথা মাথায় রেখে একতরফাভাবে তাকে যেন আলোচনা ভঙ্গের জন্য দায়ী না করা হয় তার জন্য তিনি এই ভাষণে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সংবলিত কূটনীতির চালও ব্যবহার করেছিলেন। ভাষণে নিজেদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বানও প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এ ভাষণকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণ বলা যায়। আব্রাহাম লিংকন গেটিসবার্গে ২ মিনিটের যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন তা হোয়াইট হাউস থেকে লিখে আনা হয়েছিল এবং এর জন্য তিনি প্রায় ১৭ দিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিব তাৎক্ষণিকভাবে ভাষণ দিয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন এবং স্বাধীনতার জন্য জীবনবাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়তে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

সোনার তরী, গীতাঞ্জলি যত মূল্যবান কাব্য হোক না কেন, ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবা না’ ’৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধে এর চেয়ে অন্য কোনো কাব্য শ্রেষ্ঠ হতে পারে না। ৭ মার্চ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সে-সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা ও আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান মরহুম আবদুর রাজ্জাক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, ওই দিন কী ঘোষণা দেবেন বঙ্গবন্ধু? এ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। আগের দিন (৬ মার্চ) ইকবাল হল থেকে সব ছাত্র আমার কাছে এসে দাবি করল, কাল (৭ মার্চ) যেন স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু। রাতে ৩২ নম্বরে গেলাম। বঙ্গবন্ধু বাসার উপরতলায় ছিলেন। অনেকের মাঝে স্বাধীনতার ডাক দেওয়া নিয়ে দ্বিমতও রয়েছে। তাদের মতে, স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই তো দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে না। বঙ্গবন্ধু বললেন ‘চুপ থাক’। টিপিক্যালওয়েতে বঙ্গবন্ধু আমাকে চোখ টিপ দিলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘যথাসময়ে সঠিক কথাটাই বলব আমি।’ সত্যিই ইতিহাসের মহানায়ক সেদিন সঠিক কথাটাই বলেছেন, বাঙালির জন্য সেদিন যা ন্যায্য তাই বলেছেন। তিনি অতি বিপ্লবীদের উগ্রতার রাশ টেনে ধরলেন, নিজেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে পরিচিত না করায় সুযোগ সন্ধানীদের হতাশ করলেন, আবার একই সাথে স্বাধীনতার ডাকও দিলেন। আর পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে তিনি ওইদিন সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বিশ্ব দরবারে কেন বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত হবেন? তাই তিনি স্বাধীনতার ডাক দিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। অবশেষে ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পৃথিবীর সকল মানবতাকে পদদলিত করে নিরীহ ঘুমন্ত বাঙালির ওপর পাকিস্তানিরা পৃথিবীর সবচেয়ে বর্বরোচিত হত্যাকা- চালালো। ২৬ মার্চ প্রত্যুষে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে চট্টগ্রামে দলীয় নেতা জহুর হোসেন চৌধুরীসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

এ তো গেল আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের পরিস্থিতি যখন মুক্তিপাগল মানুষগুলো স্বাধীনতা সংগ্রাম করছে তখন ঢাকায় বসে পূর্বাঞ্চলের পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট নিয়াজী, রাওফরমান আলী, টিক্কা খান এরা পাকিস্তান রেডিও-টেলিভিশন ব্যবহার করে ভারত-বিরোধী প্রচার শুরু করে দেয়। তারা বলতে যাকে যে, ভারতের উসকানিতে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠেছে। তারা যে স্বাধীনতা দাবি করছে তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে একটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নামে একটি নতুন বেতার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। পাকিস্তানের অপপ্রচারের জবাব দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা যোগ দেন। ৫০ বছর পর সকলের নাম আমার মনে নেই। তবে বিশেষভাবে মনে পড়ছে- কামাল লোহানি, এম আর আখতার মুকুল, আবদুর গাফফর চৌধুরী ও আরও অনেক। এম আর আখতার মুকুলের কলামটির নাম ছিল ‘চরমপত্র’। বাংলাদেশের গায়ক-লেখক নতুন নতুন গান রচনা করে পাল্টা জবাব দিতেন দখলদার বাহিনীকে, আর রণাঙ্গন থেকে বিভিন্ন সাংবাদিক খবর পাঠাতেন এই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। সেই খবর রেকর্ড করে আকাশ বাণীর মাধ্যমে প্রচার করা হতো। ফলে দখলদার বাহিনী একতরফা ভারত-বিরোধী প্রচার করে খুব একটা লাভ করতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গে তখন রাষ্ট্রপতির শাসন, প্রবাসী সরকারের সঙ্গে নিয়মিত খোঁজ রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ও বিদেশমন্ত্রক দপ্তরের অফিসাররা আর একটি অফিস খুললেন, ২/বি বালীগঞ্জ পার্ক রোডে। আজও অফিসটি আছে। এদিকে ভারতের বিদেশমন্ত্রকের জয়েন্ট সেক্রেটারি জেএন দীক্ষিত, ডেপুটি সেক্রেটারি অরুন্দুতি ঘোষ ও আরেকজন ডেপুটি সেক্রেটারি লাম্বা এবং ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের শেষ ডেপুটি হাইকমিশনার অশোক রায়। অবসর গ্রহণের পর অবশ্য অশোক রায় আরএসএস-এ যোগ দেন।

৯ মাস কঠোর পরিশ্রম করার পর ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারিনি। সকাল ৭টা থেকে আমি এবং যুগান্তর পত্রিকার সাবেক চিফ রিপোর্টার অনিল ভট্টাচার্য ফোর্ট উইলিয়ামে বসেছিলাম। আমাদের প্রতি আধাঘণ্টা অন্তর বলা হতো আর একটু অপেক্ষা করুন। বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ আমাদের বলা হলো কুয়াশা থেমে গেছে আর কোনো হেলিকপ্টার উপরে উঠবে না। এ-কথা বলতেই আমি কর্নেল রিকির সঙ্গে অনিল ভট্টাচার্যের প্রচ- বাগ্যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল, মন খারাপ করে হাঁটতে হাঁটতে অফিসে ফিরে এলাম। লিফটচালক আমাকে বলল, সম্পাদক আপনাকে উনার ঘরে যেতে বলেছেন। আমাকে দেখে তিনি একগাল হেসে বললেন, কী দেখলেন ঢাকায়? আমি বললাম, যাওয়া যায়নি। তখন তিনি প্রচ- রেগে দিল্লিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবনরামকে ফোন করলেন। জগজীবনরাম তার দীর্ঘদিনের পরিচিত। দুজনে একইসঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেছেন। জগজীবনরামের পড়াশোনা কলকাতাতেই। জগজীবনরাম অশোকবাবুকে কথা দিলেন একদিন পরে একটি হেলিকপ্টার আমাকে নিয়ে ঢাকাতে যাবে। প্রায় পৌনে চার ঘণ্টা ঢাকায় থাকাকালীন অনেক কিছু প্রত্যক্ষ করেছি রিপোর্ট করেছিলাম।

এদিকে মুজিবকে ৭ জানুয়ারি রাওয়ালপিন্ডি জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের একটি বিমানে তাকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেয়। লন্ডন থেকে সরাসরি দিল্লি এসে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করে ফিরে গিয়ে ঢাকায় যখন বিমান থেকে নামলেন তখন শীতের পড়ন্তবেলা। তেজগাঁও বিমানবন্দরে দূরে দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম বিমানের দরজা দিয়ে নেমে আসছেন আর তার পেছনে রয়েছেন আর এক কারাবন্দি নেতা ড. কামাল হোসেন। বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানায় মুক্তিযুদ্ধের সেই চার নায়ক। খোলা জিপে করে সোহরাওয়ার্দী ময়দানে গিয়ে বিশাল জনসভায় তিনি ভাষণ দিলেন। দেশ স্বাধীন করার জন্য ইন্দিরা গান্ধীর নাম করে তার কাছে কৃতজ্ঞা প্রকাশ করলেন। কলকাতায় (মুজিনগরে) থাকাকালীন চার নেতাকেই আমি বারবার অনুরোধ করেছিলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাকে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার জন্য। তারাও আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেবেন। তারা কথা দিয়েছিলেন প্রথম সাক্ষাৎকারটি আমিই পাব। আমি ওই চার মন্ত্রীর সঙ্গে রোজই দেখা করে বলেছি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎকারের কী হলো? আমার মনে আছে, ১৩ তারিখে রাতে হোটেলের ফোন বেজে উঠল। কামারুজ্জামান সাহেবের। ফোনে তিনি বললেন, কাল সকাল সাড়ে ৮টার সময় হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকো, আমরা তোমাকে তুলে নেব। ছুটে গিয়ে পাশের ঘরে আনন্দবাজারের বর্তমান কর্ণধার অরূপ সরকারকে খবরটা দিলাম। তারপর সোজা ৩২নং ধানমন্ডি রোডে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে চলে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি আগেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন সাহেব। পরিচয় পর্ব শেষ হতেই বঙ্গবন্ধু বলে উঠলেন, আমি সব শুনেছি। আপনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আসুন আমার সঙ্গে আমার লাইব্রেরিতে। তিনি কেঁদে উঠে বললেন, দখলদার বাহিনীরা আমার রবীন্দ্রনাথকে পুড়িয়ে দিয়েছে। তিনি একটি পোড়া বই তুলে আমার হাতে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে অরূপ বাবু আমাকে ইঙ্গিতে বললেন, বলে দিন দু-তিন দিনের মধ্যে রবীন্দ্র রচনাবলী পেয়ে যাবেন।

আমরা কন্টিনেন্টাল হোটেলে ফিরে এসে রবীন্দ্র রচনাবলী কলকাতা থেকে পাঠাতে বললাম। দুদিনের মধ্যে রচনাবলী তেজগাঁও বিমানবন্দরে পৌঁছাল। সেখান থেকে আমি ও অরূপ রচনাবলী সংগ্রহ করে ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে পৌঁছে দিতে গেলাম। আমরা বইয়ের প্যাকেটটি মাটিতে নামালাম, তখন তিনি লুঙ্গি পরে দাড়ি কাটছিলেন। তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। দুপুরে বাড়িতে খাওয়ালেন। ৫০ বছর পরে আজও সেসব কথা মনে পড়েছে।

সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে আমি এতটাই আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম যে, আমি তাকে কোনো প্রশ্নই করতে পারিনি, এটাই বোধহয় আমার সাংবাদিক জীবনের প্রথম ব্যর্থতা। কারণ তিনিই সব বলে গেলেন। পাকিস্তান জেলে যে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল তার সমস্ত বর্ণনা দিলেন। খরবের সন্ধানে আমি প্রত্যেক দিনই বিকেল ৫টা সাড়ে ৫টা নাগাদ গণভবনে যেতাম। কখনও তার ঘরের সামনে বেঞ্চিতে বসে থাকতাম আবার কখনও তার রাজনৈতিক সচিব ও মুজিব বাহিনী গঠনের নায়ক তোফায়েল আহমেদ সাহেবের ঘরে বসে থাকতাম।

আমি বোধহয় ভারত তথা বিশ্বের প্রথম সাংবাদিক যে জানতে পেরেছিলাম মুজিবকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে আর এই ষড়যন্ত্রের নায়ক জিয়াউর রহমান ও খোন্দকার মোশতাক আহমেদ। আমার সহকর্মী তুষার পণ্ডিত আমাকে বলল, তাজউদ্দীন সাহেব তাকে বারবার ফোন করছে। তুই একবার তাজউদ্দীন সাহেবকে ফোন কর। তাজউদ্দীন সাহেবকে ফোন করতেই তিনি বললেন, এখনই আমার বাড়িতে চলে আসুন। আমাকে তাজউদ্দীন সাহেব বললেন, আপনি কালই কলকাতা গিয়ে বিএসএফের প্রধান গোলক মজুমদারকে খবরটা দিন যে মুজিব হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত জিয়াউর আর খোন্দকার মোস্তাক আহমেদ। তাজউদ্দীনকে জিয়া প্রস্তাব দিয়েছিল তাকে প্রেসিডেন্ট করা হবে। এই প্রস্তাবে তাজউদ্দীন সন্দেহের গন্ধ পেয়েছিলেন এবং জিয়াকে তার ঘর থেকে তাড়িয়ে দেন। তাজউদ্দীন সাহেব কামারুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে খবরটি জানান।

কলকাতায় এসে আমি গোলক মজুমদারকে সব জানালাম। গোলক মজুমদার তার বস এফ রুস্তমজীকে সব ঘটনাটি জানান। গোলক মজুমদার এফ রুস্তমজীকে প্রথম চিঠি লেখেন ২৫ নভেম্বর ১৯৭৪ আর শেষ চিঠি লেখেন ৩১ মার্চ ১৯৭৫ সালে। আমরা তখন ঢাকার অফিস তুলে দিয়েছি। মাঝে মধ্যে ঢাকায় যাই। শেষবার ঢাকায় গিয়ে অনেকের মুখে জিয়া-খোন্দকার ষড়যন্ত্রের কথা শুনেছি। একদিন বিকেলে গণভবনে দেখে আমাকে বললেন, ‘এই যে বরিশাল, এতদিন কোথায় ছিলে, অনেক দিন দেখিনি?’ এ ব্যাপারে আমি প্রথম পৃথিবীতে মুজিব হত্যার ষড়যন্ত্র নিয়ে একটি বই লিখেছিলাম। বইটির নাম ‘মিডনাইট ম্যাসাকার ইন ঢাকা’। বইটি পৃথিবীর ৬টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়া বাংলাদেশে বইটি নিষিদ্ধ করে এবং আমার ঢাকা সফরের ভিসা বন্ধ করে দেয়।

সুযোগ পেয়ে বঙ্গবন্ধুকে বললাম, আপনার সম্পর্কে কীসব শুনছি? আপনাকে না-কি হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে? তিনি হেসে উত্তর দিলেন, ‘আমি জাতির পিতা। আমারে কে মারবে?’ কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় জাতির পিতার বিশ্বস্ত পুত্ররাই আমেরিকার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে বঙ্গবন্ধুকে তার পরিবারসহ হত্যা করে। দিনটি ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সাল। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরোধিতা করেছিল এক বীর যোদ্ধা টাঙ্গাইলের কাদের সিদ্দিকী। সেজন্য তাকে ২০ বছর দেশের বাইরে থাকতে হয়। আর এই কাদের সিদ্দিকী ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সৈন্যদের কনভয় করে রাস্তা দেখিয়ে ঢাকার রমনা ময়দানে নিয়ে যায়।

লেখক : সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত, কলকাতার বুদ্ধিজীবি



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top