পোয়াতি বানানোর খেলা


প্রকাশিত:
২৫ মার্চ ২০২১ ১৫:৪৬

আপডেট:
৩১ মার্চ ২০২১ ১৫:০৬

গার্মেন্টসের হাতি-গেটের কোল কেটে বানানো শাবক-দরজা দিয়া খুদি ভেতরে পা দেয়। ঢুকেই দেখে সামনে জটলা। সিঁড়ির কাছে দশ-বারোজন দাঁড়ানো। তাদের পেছন দিকটা কেবল চোখে পড়ে। কেননা সবাই সামনে ঝুঁকে কি যেন দেখছে।

ঘড়ির অস্থির কাঁটার এখন আটটা ছুঁই ছুঁই দশা। সবার হাজিরার সময়। নিজ নিজ সেকশনে গিয়া আপন উপস্থিতি জানান দেয়া জরুরি। কিন্তু তারে মার্জিনে রেখে ওরা ওখানে কি করছে? খুদি তা দেখার জন্য দু কদম আগায়ে জটলার পিঠ ঘেঁষে দাঁড়ায়। ফাঁক গলে সমানে মুখ বাড়াতেও সক্ষম হয়। আর তখনই তার নজরে পড়ে-- আকার-প্রকারে আজদাহা কিন্তু চেহারা-সুরতে রূপসী নোটিশটা।

চারতলা-জোড়া স্টার গার্মেন্টসের নিচতলায় অফিসঘর। তার দেয়ালে পিঠ বাধা অরিজিনাল নোটিশ বোর্ড। তাতে চৌকোণা সাদা কাগজের ছড়াছড়ি । তার কোনোটায় জাতীয় ছুটির চেহারা-সুরত আঁকা। কোনোটায় কারো চাকুরির গোড়ায় কুড়ুল মারার নিষ্ঠুর বয়ান। আবার কোনোটায় দু বাহু তুলে নতুন নতুন লোকজনরে ডাকাডাকির কাহিনি। তবে সবগুলোই প্রাণহীন, পুরানো। কোনো কোনোটা মরে হেজে যাওয়া, আউটডেটেড। তাই তাদের পানে কারো কোনো আগ্রহ নাই। চোখ তুলে তাকায়ও না কেউ।

কিন্তু নতুন নোটিশটা জাতে উঁচু, মানে ভারী, তাই তার জন্য আলাদা বোর্ড। সিঁড়ির গোড়ায় কাত করে দাঁড় করানো। মর্যাদায়ও সে অভিজাত, তাই রঙিন পোস্টার কাগজে তার আসন। আবার রূপে-গুণেও বনেদি। তাই কমলার কোয়ার মতো গোটা গোটা অক্ষরে সাজানো তার পুরো গতর। তারপর আবার একেবারে সদ্য-প্রসূত। কাল কাজ শেষে যাবার সময়ও তারে কেউ দেখেনি। আজ সকালেই মনে হয় খালাস করা। তাই ঢালায় তোলা কৈ মাছের মতো তরতাজা হওয়ায় তারে ঘিরে জটলা যেন শেষ হয় না। একদল যায় আরেকদল আসে।

তবে খুদি খাড়ায়ে থাকে। কেবলমাত্র হাজিরা ও বেতনের খাতায় সই দিতে পারার বিদ্যা দিয়া তার পক্ষে চারদিকে হাত-পা ছড়ানো এতো বড় নোটিশটা হজম করা সম্ভব হয় না। আবার এমন রাজকীয় ঘোষণার নাড়ি-নক্ষত্র না জেনেও নড়তে পারে না। তাই মুখ তুলে কাউরে খোঁজে। হাতের কাছে তার সেকশনের মিলু আপারে পেয়ে তার হাত ঝাপটে ধরে--এহানে কী লেহা আছে?

--কী আর! কারখানারে শিশু-শ্রম মুক্ত করা হইবে।

ওহ! এ তাহলে সেই সাদা মাগীর কারসাজি? খুদির বুঝতে বাকি থাকে না। কেননা আগেও যখন সাদারা আসছে, কারখানার আনাচ-কানাচ ঘুরে ঘুরে দেখছে। তারপর দেশে ফিরা গিয়া নতুন নতুন কায়দা-কানুনরে ইমেইলের ঘাড়ে তুইলা দিছে। তারা উড়ে এসে কারখানার গেটে গ্যাট হয়ে বসছে। যার তার পথে আগল দিছে। ফলে কতজনের যে কারখানায় ঢোকা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে আল্লাহ মালুম।

এই সাদা মাগী কয়েক মাস আগে আসে। প্রত্যেক ফ্লোর ঘুরে ঘুরে দেখে। সবার চেহারা-সুরত মাপে। খুদির সামনে এসে খাড়ায় পাক্কা দশ মিনিট। তখন চোখ তুলে তারে দেখে নেয়--যেন আস্তো তালগাছ। মাইয়া মানুষ যে এতো উঁচা-লম্বা হইতে পারে তা খুদির ধারণায় আছিল না। হাত পাঁচেক তো হইবেই। বয়স চল্লিশ ছাড়ানো। পাকা বুড়ির খাতায় নাম উঠে যাওয়ার কথা। কিন্তু জামা-কাপড়ে এখনো ঝকঝকা। স্ক্রিনের সাথে সাঁটা গেঞ্জি-প্যান্টে গা-গতরের ভাঁজ স্পষ্ট। তবে তার পানে তাকালে বিশাল বুক দুইখান সবার আগে চোখে পড়ে। তারা যেন গেঞ্জি ফুড়ে বের হয়ে আসার জন্য অস্থির। খুদি বার দুই দেখেই বুঝে যায়-- চৌদ্দ হাতের হাজারো কচলানি খাইলেও এখনো জঙলার লাউয়ের মতো ঝোলে নাই। বেলের মতো টাডি আছে পুরা।

ম্যানেজাররে দোহার বানায়ে মাগী খুদির সাথে কথা বলে। প্রথমেই জিগায় কারখানায় শিশু লেবার আছে কিনা। কোন সেকশনে তারা কাম করে। তারপর বেতন কত পাও, বোনাস কয়টা দেয় ইত্যাদি।

প্রশ্ন শুনে খুদি প্রথমে অবাক চোখে তাকায়। বুঝে পায় না-- সে যে উত্তরই দিক না কেন, তার কিছুই তো মাগী বুঝবে না। সে তো বুঝবে ম্যানেজারের কথা। আমলে নেবে তার ভাষা।

সে যে খুদির জবাবরে নিজের ইচ্ছার খাতে তুলে দেবে না তার নিশ্চয়তা কি? তারপরও মাথা নেড়ে, হাত তুলে, আঙুলের ইশারায় খুদি জবাব দেয়। কিন্তু যখন জিগায়--মাসিকের সময় হালকা কাজ দেয় কিনা তখন খুদি একেবারে লা-জবাব হয়ে যায়-- হায়! মাগী নাকি বিদেশে থাকে। সাদা চামড়ার গর্বে ফাইট্টা পড়ে। কিন্তু ম্যানেজারের মতো আস্তো পুরুষের সামনে মাইয়াগো নাভির তলের রক্তের জোয়ার-ভাটা নিয়া কথা তুলতে নাই তাও বোঝে না। খুদি তাই লজ্জায় মাথা নোয়ায়ে রাখে। কোনো জবাব আর খুঁজে পায় না।

তবে মিলু আপা তো মেয়েমানুষ। তার সাথে আর লজ্জা কি? তাই খুদি নোটিশের আরো তলে নামতে কসুর করে না-- নিচে আর কি কি লেহা?

-- আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সকল শিশুদের বাদ দেয়া হবে। তাগো আর কাম-কাইজে রাখা হইবে না।

অ্যাঁ! কও কী? এবারে ঘাবড়ানোর চক্করে পড়ে খুদি। তার দাপটে দিশাহারা হয়ে মিলুরে আঁকড়ায়-- মোর সিতুর কি হইবে? হ্যায় তো এহনো শিশু। মোর দুধের বাচ্চা। হ্যারে কী বাদের ঘরে ফালাইবে? ছাঁটাইয়ের তালিকা কি তার নাগাল পাইবে? তা হইলে মুই আবার গহীন গাঙে পড়মু। ভাইসা যামু। আর বাঁচতে পারমু না।

হ্যাঁ, তা ঠিক। সিতুর ঘাড়ে সওয়ার হয়ে খুদি কয়েক মাস আগে একটু সুখের মুখ দেখছে। নিজেরা আলাদা খুপড়ি নিছে। দুইচার দিন মাছ-গোস্ত কেনার মুরোদ জুটছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা দু চার পয়সা হাতে থিতু হয়েছে। ঘরের টিনের ট্যাঙ্কের তলায় তারা গোপনে সুখ- স্বপনে আছে। তাদের ঘুম আরেকটু গাঢ় হলে, তাদের আরো দু চারজন সঙ্গী-সাথী জুটলে গাঁয়ে দু কাঠা ভূঁই নিজের নামে করার আশার বীজ বুনে রাখছে। কিন্তু সিতু ছাঁটাই হলে সে বীজ তো আর গজাবে না। বরং এক ধাক্কায় সব তাসের ঘরের মতো মুখ থুবড়ে পড়বে। খুদি তাই অস্থির হয়ে ওঠে। মিলু আপারে জিগায়-- নভেম্বর আইতে আর কয় মাস বাকি?

--তিন মাস।

--হায় খোদা! তিন মাস? নব্বইডা দিন মাত্তর?

এ কয়দিনে কি সিতু শিশুত্বের বেড়া টপকাইতে পারবে? জোয়ানির ঘরে পা দিতে পারবে?

জবাব খুঁজতে খুঁজতে খুদি নোটিশ বোর্ডের বগলতলা ছেড়ে সিঁড়ির আশ্রয় নেয়। দোতলায় তার সেকশন পানে আগায়-- কিন্তু সিতু তো বালেগা হইয়া গ্যাছে। বছর দুই আগেই তার নাভীর তলে চেরাদাগে রক্তের জোয়ার দেখা দিছে। এখন তা মাসে মাসে নিয়মিত বইয়া যায়।

বিয়া দিলে এতো দিনে নিজের কোলজুড়েই এক-দুইখান পোলাপাইন হাজির হতো। তাহলে কী আর হ্যায় শিশু থাকে কেমনে? তারপরও খুদি নিশ্চিত হতে পারে না। কেননা এই সব গার্মেন্টস কারখানাগুলার ভাব-চক্কর আলাদা। এরা এই দেশের রাস্তা-ঘাটের আশপাশে আসন খিলায়, সাত-আট তলা ভবন জুইড়া বসে কিন্তু হুকুম তামিল করে বিদেশের। তাদের কথা মতো উঠবস করে। তাই তারা কি বলেছে সেটা জানা দরকার। তার জন্য চাই রাকিব ভাইরে। কেননা খুদির গা-ঘেঁষাদের মধ্যে একমাত্র সে-ই কারখানার নাড়ি-নক্ষত্র নখের

আগায় নিয়া ঘোরে। সুতরাং তারে ধরতে হবে। লাঞ্চ টাইমে না পাইলেও ছুটির পর নিশ্চয়ই তার নাগাল ধরা আর অসম্ভব হবে না। খুদি তার প্ল্যান ঠিক করে একটার পর একটা সিঁড়ি ভাঙে।

দোতলায় তার সেকশনে পা দিয়া দেখে ডিজিটাল ঘড়ির লাল-গতর আটটা তিনে সই। নতুন নোটিশটা পাক্কা তিন মিনিট খাইয়া দিছে। তা না হলে আজ খুদির এক মিনিটও লেট হতো না। তাও ভালো ডিজিটালের লাল-ঘোড়া পাঁচে পা দেয় নাই। তাহলে মেশিনে আর বসতে হতো না। বরং ঘাড়ে চাপত বান্ডিল বান্ডিল কাপড় ঘাড়ে তুলে বওয়া, সবাইরে সাজ-সরঞ্জাম দেয়া, এমনকি সবার লাঞ্চের প্লেট-বাটি ধুয়ে মুছে রাখা। কেননা যার লেটের ফিতা পাঁচ মিনিট ছাড়ায়ে যায় তার ঘাড়ে এ সব কামের বহর তুইলা দিয়া শাস্তি দিতে সেকশন ইনচার্জ নিলুফার বানুর এতটুকু কাপণ্য নাই। ফলে প্রোডাক্টশন বিহিন কামে দিনটা প্রায় মাটি হয়ে যায়। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলার আর উপায় থাকে না। হায়! গার্মেন্টসের কাম, হায়!

কামলা-জীবন। খুদি মনে মনে গজরাতে গজরাতে মেশিনে বসে।

আজ বোধহয় ইলার লেট। তাই মেশিনে বসতে পারে নাই। ঘুরে ঘুরে তাই সবার কাছ থেকে ফাই-ফরমাসের ফর্দ নেয়। মিনিট বিশেক পর সে খুদির কাছে আসে--আপা, তোমার কিছু লাগবে? সুতা কিংবা মেশিনে নতুন সুঁই?

খুদি সেলাইয়ের মেশিন চালাতে চালাতে ইলার দিকে তাকায়। মেয়েটা একটু সরল-সোজা টাইপের। যারা ওরে দেখতে পারে না তারা দু চার ডিগ্রি বাড়ায়ে বলে আস্তো বোধাই।

কেননা কোন কথা সবার সামনে বলতে হবে কোনটা হবে না সে হিসাবের জটিল অঙ্ক ওর খাতায় মেলানো নাই। যখন তখন যার তার সামনে হাঁড়ি ভাঙে। তাতে অনেকের গোপন কথা ফাঁস হয়ে যায়। তাই সেকশনের বেশিরভাগই ওরে এড়ায়ে চলে। কিন্তু খুদির খুব পছন্দের, ছোট বলে স্নেহের।

মেশিন চালানোতে মনোযোগ থিতু রেখে খুদি ইলার পানে মাথা নাড়ে-- না, কিছু লাগবে না।

কিন্তু তারপরও সে নড়ে না দেখে জিজ্ঞাস করে-- কিছু বলবি?

--কাইল ছুটির পর শফিক্যা মোরে ইশারায় ডাইকা নিয়া জাপটাইয়্যা ধরছিল।

--কিছু করছে?

-- না, পারে নাই। তার আগে হঠাৎ কেডা জানি সে স্টোরের মইদ্যে ডুইকা পড়ে। তহন মোরে ছাইড়া দিয়া দৌড়াইয়্যা পালায়।

--খবরদার, আর কহনো শফিক্যা ডাকলে যাবি না।

--ক্যান যামু না। মোরও তো মজা লাগছিল।

দুই

--তোর মাইয়্যা তো মোগো ইউনিয়নের না। মুই হ্যার সারটিফিকেট দেই ক্যামনে? ওর বাপ জলিল ফহির আছিল কালিকাপুর গাঁওয়ের বাসিন্দা। হ্যাগো ইউনিয়ন খলিকাকোটা। তুই হেই ইউনিয়নে যা। হ্যার নতুন চেয়ারম্যান এহন সেলিম তালুকদার। মোর চেনাজানা।

লাগলে ক’মোবাইল দিয়া কইয়া দেই। হ্যায় ওর জন্মনিবন্ধন করবে। সারটিফিকেট দিয়া দেবে।

আক্কেলপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আফজাল চাচার কথা সত্য। সিতু যে ইউনিয়নের মাইয়্যা না সে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জন্ম-নিবন্ধন সার্টিফিকেট দেবে কেমনে? আর দিলেও তা ধোপে টিকবে? বিদেশীগো যে শকুনে চোখ, যাচাই-বাচাইয়ের সময় নির্ঘাত ধরা পড়ে যাবে। খুদি তাই আফজাল চাচারে জোরাজুরি করার পথ ধরে না। তার কাছে আকুতি-মিনতি করার রাস্তায় হাঁটে না। বরং সিতুর হাত ধরে আস্তে আস্তে ইউনিয়ন পরিষদের দোতলা পাকা ভবনের থেকে বের হয়ে আসে। তবে আফজাল চাচার বাতলে দেয়া পথ ধরারও দরকার পড়ে না। কেননা সে পথ খুদির আগেই পাড়ি দেয়া সারা।

গার্মেন্টস থেকে তিন দিনের ছুটি নিয়া গ্রামের বাড়িতে এসে খুদি প্রথমেই ছোটে কালিকাপুর পানে। তিন গাঁ ওপারে তার শ্বশুর-ভিটার পথে পা বাড়ায়। দূর থেকে বাড়িটা দেখে মনটা মোচড় খায়। বছর পনেরো আগে বধূবেশে আসার দিনটার কথা মনে পড়ে। তারপরের বছরই সিতু পেটে এসে হাজিরা দেয়। কিন্তু দশ মাস পর দুনিয়ার আলো-বাতাস পেলেও বাপরে পায় না আর বেশি দিন। একদিন সকালে জলজ্যান্ত মানুষটা ক্ষেতের কাম করতে যায়। আর দুপুরে ফিরে আসে লাশ হয়ে। কেননা আকাশ থেকে নেমে আসা ক্ষুরধার এক আলোর ঝলক তার জানডা হাতের মুঠায় নিয়া আবার নিরুদ্দেশ হয়। আর মানুষটার দেহডারে বানায়ে দিয়া যায় লোহার মতো শক্ত। এ ঘটনার পরও খুদি বছরখানেক শ্বশুরের ভিটা আগলে ছিল। কিন্তু খুঁটিবিহিন শ্যাওলা কতদিন আর বিপরীত স্রোতের সাথে লড়াইকরে টিকে থাকতে পারে? তাই শাশুড়ি গত হলে একদিন এক কাপড়েই খাদিমনগরে বাপের বাড়ি এসে ওঠে।

তারপর এক যুগ ধরে কতো আলো এ বাড়িতে লুটোপুটি খেলে যায়, কত বাতাস তার আনাচে-কানাচে ঘুরে ফিরে বেড়ায় কিন্তু খুদির আর এ বাড়ি পানে একবারও মুখ ফেরানো হয় না।

আজকে তাই কাছাকাছি এসে তার পায়ে কম্পন বাসা বাধে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার সুদৃঢ় হয়। ভয় কী? সাথে সিতু, দাদির প্রিয় নাতনি, সিতারা বেগম আছে না? সে তো এ বাড়ির মেয়ে। তার ঘর-দুয়ার সহায়-সম্পত্তির পুরা আট আনার হকদার। তাই খুদি জোর কদমে আগায়। কিন্তু শ্বশুরের ভিটার একমাত্র বাসিন্দা বড়ভাসুর তো প্রথমে চিনতেই পারে না।

ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, তার চোখ বিট্রের ঘরে বসত নেয়। খুদি পরিচয় দিলে তাবেই খলিল মিয়া মুখ খোলে-- ‘ওহ! তুমি জলিলের বউ?’ বড়জা অবাক চোখে তাকায়। খুদির শহুরে পোশাক-আশাক হাতে পরখ করে। আর সিতুর পানে ফিরে তার মুখ হা হয়ে যায়-- ‘ওমা!

মাইয়্যা দ্যাহি কতো ডাঙগর হইয়্যা গ্যাছে।’

--ওর জন্ম-নিবন্ধন সারটিফিকেট লাগবে।

খুদির কথায় খলিল মিয়া আবার চোখ তোলে-- জলিলের বেহায়া বউডা কী চায়? এতো বছর শহরে থাইকা বুদ্ধির পুঁজি-পাট্টারে ভরপুর কইরা আবার লড়তে আইছে? বছর বারো আগে হাইরা গিয়া এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়া হবার শোধ নিতে চাইছে? তাই মাইয়্যার জন্ম-নিবন্ধন দিয়া খুঁটি গাড়বে? তারপর জমি-জমা বাড়ি-ঘরের ভাগ দাবি করবে? না, খলিল ফহির বাঁইচা থাকতে তা হইতে দিবে না। সে তাই খুদিরে তাড়ানোর আয়োজন করে-- যাও, চেহারম্যানের কাছে যাও। নিবন্ধন সারটিফিকেট-টিকেট তো হ্যায় দেয়।

-- হুনছি হ্যায় নতুন। মোগো চিনবে না। আপনে লগে লন।

--মোর কাম আছে। যাইতে পারমু না। ভূঁই-ক্ষ্যাত চাইয়্যা রইছে। হ্যাগো রোওন-বীজন দিতে অইবে।

অগত্যা খুদিরা একলা একলাই খলিকাকোটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেলিম তালুকদারের দরবারে গিয়া হাজির হয়। কিন্তু কী আশ্চর্য! ওদের দেখেই সে চিনে ফেলে-- ও! তোমরা আইছো? বসো।

খুদিরা চেয়ারম্যানের ঘরের দেয়াল ঘেঁষা বেঞ্চে বসে-- তাহলে কি বড়ভাসুরে মোবাইলে করে দিছে-- মোরা আসমু। জন্ম-নিবন্ধন সার্টিফিকেট চামু। তাই এতো আদর-যতন।

মোলায়েম সুরে বসতে বলা। কিন্তু চেয়ারম্যান সামনের দুজনরে বিদায় দিয়া খুদিদের পানে ফিরে এক কথায় না করে দেয়-- তোমরা যে জলিলের কথা কও হ্যারে মুই চিনি না। জীবনে দ্যাহি নাই কোনো দিন। মোর ভোটার আছিল না কোনো কালে। হ্যার মাইয়্যা কবে জনম নিছে, দেড় যুগ পাড়ি দিছে, হ্যার কিছুই মোর জানা নাই। মুই হ্যার জন্ম-নিবন্ধন করি ক্যামনে? সারটিফিকেট দেই কোন ভরসায়? তোমরা অন্য পথ দ্যাহো।

খালি হাতে বাড়ি ফিরে এলে মায় বুদ্ধি বাতলায়-- মোগো আক্কেলপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এহন আফজালে। মোগো জ্ঞাতি-বংশের মানুষ। হ্যার ইলেকশনের সময় তোর বাপে বাঁইচা থাকতে কতো নাড়া দিছে। মিছিল-মিটিংয়ে গ্যাছে। তুই হ্যার কাছে যা। তোর বাজানের কথা ক গিয়া। দেহিস নিবন্ধন-সারটিফিকেট যা লাগে সব দিয়া দেবে।

কিন্তু আফজাল চাচায় শুরুতে অন্য প্রসঙ্গ তোলে- এতোকাল কই আছিলি? মুই দুই দুইবার চেয়ারম্যান অইলাম তোরে দেখলাম না। এহন আইছো মাইয়্যার জন্ম-নিবন্ধন নিতে? সারটিফিকেট চাইতে?

--শহরে গারমেন্টসে কাম করি। ছুটি-ছাঁটা একদম পাই না। ইলেকশনের সময়ও আইতে পারি নাই।

--সারটিফিকেট দিয়া কি করবি, কোন কামে লাগবে?

-- সিতু নতুন কামে ঢুকছে। এহনো পাকা হয় নাই। সারটিফিকেট না পাইলে ওর চাকরিই থাকবে না। ছাঁটাইয়ে পইড়া যাবে।

এত কৈফিয়তের পরও আফজাল চাচার মন গলে না। সার্টিফিকেট না দিয়া খলিকাকোটার পথ দেখায়। খুদি তাই পরিষদ ভবন ছেড়ে বাড়ির পথ ধরে। দু চার কদম আগানোর পর এক ছেলে ছুটে এসে সামনে দাঁড়ায়-- খোদেজা বুবু! তোমার মাইয়্যার জন্ম-নিবন্ধন লাগবে? সারটিফিকেট দরকার? মুই সব জোগাড় কইরা দিমু।

খুদি ছেলেটার পানে তাকায়। একেবারে অচেনা। আগে কখনো কোথাও দেখেছে বলে মনে পড়ে না। অথচ দেখো, ছুটে এসে পাশে খাড়াইছে, অবলীলায় বুবু বুবু বলে ডাকছে। খুদি ছেলেটার আপাদমস্তকে একবার চোখ বুলায়। কিন্তু না, চেনা-জানার কোনো আওতা-ই পড়ে না।

চিনবে কীভাবে? দেখবে কোথায়? কেননা খুদি কালিকাপুর থেকে এক কাপড়ে এসে বাপের ঘাড়ে সওয়ার হয়। তখন ভাইরা যে যার সংসার নিয়া আলাদা। কিন্তু বছর দুই পর বাজান ওপাড়ে পাড়ি দিলে মার সংসার একেবারে অচলের হাতে পড়ে। মাস চারেকও আর সচল থাকে না। বরং চুলায় হাঁড়ি চড়াতে অক্ষম হয়ে পড়ে। তাই সিতুরে মায়ের কাছে রেখে খুদি আছিয়া খালার হাত ধরে কামের সন্ধানে শহরে পাড়ি দেয়। দুচার সপ্তাহ সে দূরের খালার ঘাড়ে চড়ে থাকে। তারপর গার্মেন্টেসে হেলপারের চাকরি জোটে। শেষে মেশিনের কামও। তখন ছুটি-ছাঁটায় দু চার দিনের জন্য বাড়িতে এলে মা ও মেয়ের সাথেই কেটেছে তার দিন-রাত। গাঁও-গেরামের কারো পানে আর চোখ ফেরানো হয় নাই। এ সুযোগে বারোটা বছর ছুটে পালায়। তবে তার আলো-বাতাস তাদের খেলা থামায়নি। তারা বরং জোট বেধে গ্রামের অনেক ছেলেকে ঘাড়ে-গর্দানে মোটা তাজা করে তুলেছে। উঁচালম্বায় তালগাছ বানাইছে। সুতরাং তাদের চেনার বা আগেভাগে দেখার কোনো সুযোগই হয় নাই খুদির।

তবে তারা এখন নানা ফন্দি-ফিকিরে গ্রামের রাস্তা-ঘাটে, হাট-বাজারের মোড়ে মোড়ে খাড়ায় থাকে। খুদি আরো দু দফা চোখ বুলায়ে সহজেই বুঝতে পারে এ ছেলে তাদেরই একজন। কিন্তু দুই চেয়ারম্যানে যা পারে নাই এ ছেলে তা পারবে কী করে? নিবন্ধন-সার্টিফিকেট জোগাড় করবে কোত্থেকে? খুদি তাই চোখ-মুখ জুড়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন নিয়া ছেলেটার পানে চেয়ে থাকে।

তবে তাতে সে মোটেই ঘাবড়ায় না। বরং সুর-স্বরে দৃঢ়তারে সুস্থির করে তার প্ল্যান-প্রোগ্রাম হাজির করে-- দু চার দিনের মইদ্যে সব জোগাড় কইরা দিমু। খালিকাকোটার চাও তো তাই। নইলে আক্কেলপুরেরটা। তোমার কিচ্ছু করতে অইবে না। বাড়িতে বইয়্যা থাকবা মুই সব জোগাড় কইরা দিয়া আমু।.. .. .. আইজকাল শুনি গারমেন্টসে চাকরিতে অনেক পয়সা। কম কইরা অইলেও মাসে মাসে দশ-পনেরো হাজার টাকা। তোমরা একটা সারটিফিকেট নিয়া মাসে মাসে, বছরে বছরে হাজার হাজার টাকা কামাইবা। লাখও ছাড়াইয়্যা যাইবে। তার থাইকা মোরে কেবল দুই মাসেরডা দেবা। মাত্তর দুই মাসের বেতনের সমান.. .. .. ।

অ্যাঁ, পনেরো-বিশ হাজার টাকা? খুদি আঁতকায়। সামান্য একটা কাগজ, চেয়ারম্যানের সই-সাবুদঅলা সাদা পাতা তার এতো দাম? চেয়ারম্যানরা যা বিনা পয়সায় বিলায়, তার জন্য এতোগুলা টাকা দিতে খুদির মন নড়বড়ে করে, সায়ের ঘরে থিতু হয় না। আর হলেও লাভ কি, দিবে কোত্থেকে? পাবে কোথায়? শুধু কি তাই, এতোগুলা টাকা একত্র করলে তার চেহারা-সুরত কেমন হয় তাই তো খুদির জানা নাই। তারা কি গুচ্ছ গুচ্ছ করে কোমড় বেঁধে শোয় নাকি একমুঠোতেই সুস্থির হয়ে বসে? তবে বোঝে, তার বাক্সের তলায় যা জমা আছে তা দিয়া এতো বড় চাহিদার মূল খাবার তো দূরের কথা চাটনির জোগান দেওয়াও সম্ভব না। তাহলেএতো টাকা আসবে কোত্থেকে? রকিব ভাইরে জিগাই? কেননা তার মস্তিষ্কেই তো জন্ম-নিবন্ধন সার্টিফিকেট জোগাড় করার বুদ্ধিটা জনম নেয়। তারপর তা খুদির মাথায় এসেগ্যাঁট হয়ে বসে। তাই তো তিন দিনের ছুটি নিয়া গ্রামের বাড়িতে ছুটে আসা।

খুদি ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে। আঙুলের ছোঁয়ায় কল লাগায়। রাকিবভাই স্টার গার্মেন্টসের গোড়ার কর্মি। এক যুগ পাড়ি দিয়া এখন ফ্লোর ম্যানেজার। খুদিদের দোতলার পুরাটাই তার শাসনে। তবে বউ-বাচ্চারা এখনো বাইরে। গাঁওয়ের বাড়িতে। রাকিব ভাই তাই সপ্তাহে সপ্তাহে, ছুটি-ছাঁটায় দৌড়ায়। তবে ওভার টাইমের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেলে, কোনো সপ্তাহে যেতে না পারলে ছুটির পর খুদিরে নিয়া ঘোরে। রিকশায় রাস্তা পাড়ি দেয়। ফুসকা-চটপটি খায়। মাসের শুরুতে হলে সিনামায়ও যায়।

অন্ধকারে তখন তার হাত খুদির দেহের আনাচে কানাচে হাঁটাহাঁটি করলেও সে কিছু মনে করে না। বরং ডাকলেই পিছু নেয়।

তবে আজদাহা সাইজের নোটিশটা দেখার দিন খুদিই ডাকে। লাঞ্চের টাইম শেষ হবার আগেই টানা বারান্দার কোনায় রকিবভাইরে মুখোমুখি দাঁড় করায়-- মোর সিতুর কি অইবে?

--অর বয়স কতো অইছে?

খুদি কর গুণে হিসাবে নামে-- ঝড়ে উঠানের বড় আমগাছটা উপড়ে পরার বছরে জন্ম, তিন বছরের মাথায় বাপ মরে। এক বছর পার করে খুদি এক কাপড়ে শ্বশুরের ভিটা ছাড়ে। দুই

বছর পাড়ি দেবার পর বাজান যায়। তারপর শহরে এসে গার্মেন্টসে কাম নেয়ার বয়স সাত পার হলে সিতুরে নিয়া আসে। রাকিবভাইরে ধরে কারখানার হেলপারিতে ঢুকাইয়া দেয়। তাও তো বছরখানেক হয়ে গেছে। তাহলে মোট কত হয়, চৌদ্দ তো ছাড়ায়ে যায়।

--কিন্তু ওরে দেখতে তো একেবারে বাচ্চা বাচ্চা লাগে। গা-গতরে গোস্ত-মাংসের কোনো দেখা সাক্ষাৎ নাই। মুখখান যেন চির মরুভূমি। সব সময় শুকনা। আবার উঁচা-লম্বায় তিন হাতও না।

গায়ে গোস্ত-মায়স আসবে কোত্থেকে? উঁচা-লম্বা হবে কী করে? এতো বছর ছিল মার কাছে, গাঁও-গেরামে। খাইছে ঘাস-পাতা, শাক-লতা। খুদির পাঠানো দু চার টাকায় তার চেয়ে বেশি আর কি জুটবে?

--সেদিন ওরে দেখেই জেনিফার চোখ বড় করে ‘হাউ দিস লিটল চাইল্ড ওয়ার্ক হেয়ার?’

তারপরই দেশে গিয়া ইমেইলে হুমকি-ধামকি চড়ায়-- ‘তিন মাসের মধ্যে শিশু-শ্রম বন্ধ করো। চৌদ্দ বছরের নিচে যারা আছে তাদের বাদ দাও। ছাঁটাইয়ে ফেলো। নইলে অর্ডার বন্ধ, সাপ্লাই বাতিল।’ সাথে সাথে এমডি নোটিশটা হাজির করে। তারে হাতির মতো আজদাহা সাইজ দেয়। যাতে কারো নজর না এড়ায়।

--তাহলে এখন উপায়? খুদি বারান্দায় ছোটাছুটি করা হাজারো চোখের সামনেই রাকিবভাইর হাত আঁকড়ে ধরে।

--চৌদ্দ পার হইলে তার একটা সার্টিফিকেট জোগাড় করো। তোমাগো ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে জন্ম-নিবন্ধন নিয়া আও। এমডিরে দেখাও। কিন্তু সে সার্টিফিকেট তো জোগাড় হলো না। এমডিরে দেখাবে কী? তিন মাস পর যাচাই-বাচাইয়ের সময় কী বলবে? জবাবের আশায় রাকিবভাইরে করা খুদির প্রথমবারেরমোবাইল কল ফেল করে, রিং হয়ে যায়। কেউ ধরে না। এখন তো ডিউটি টাইম। রাকিবভাই বোধ হয় ব্যস্ত। ফ্লোরের এমাথা থেকে ওমাথায় ছোটাছুটিতে বেহুঁশ। খুদি তাই দ্বিতীয়বার কলা চালায়। এবার দু নম্বর রিংয়ের দৌড় মাঝ বরাবর পৌঁছার আগেই রাকিবভাইর স্বর হাজির হয়-- শিপমেন্টের টাইম কাছাইয়্যা আইছে। ওভারটাইম বাড়াইয়্যা দিছে। এ সপ্তাহে আর গাঁওয়ে যাওয়া হইবে না। তুমি তাড়াতাড়ি চইলা আসো। সিতুর লাইগা ভাইবো না। একটা উপায় হবেই।

তিন

--সিতুরে পোয়াতি বানাইয়্যা দে। প্যাডে তরল বীজ রুইয়্যা দে। তারপর দ্যাখ হের জাদু। দুই দিনে গোস্ত-মাংসরে ডাইকা আইনা অর গায়ে বসত দেবে। সাত দিনে উঁচা-লম্বার পথে নামাইবে। আর মাস গেলে তো অরে চল্লিশের বুড়ি বানাইয়্যা দেবে। .. .. .. ক্যান তোর মনে নাই? সিতু প্যাডে পড়ার পর তোর কী অইছিল। আর মোর নিজের তো এহনো মানস চোখে ভাসে। একেকটা প্যাডে আইছে আর মুই ফুইল্যা ফুটবল অইছি। চাইর চাইর বার। তুই তাই কর, তারপর এমডির সামনে দাঁড় করা। তহন দেখবি, কোন বাপের সাধ্য আছে অরে শিশু কয়। কাম থাইকা বাদ দেয়। ছাঁটাইয়ের খাতায় অর নাম তোলে?

আছিয়া খালা কথা শেষ করে চারদিকে নজর বুলায়। টিনের কোনো দেয়াল কান খাড়া করে আছে কিনা পরখ করে। না, আশপাশের খুপড়িতেও কারো কোনো সাড়াশব্দ নাই। তারপরও খুদির কানের কাছে মুখ নিয়া স্বররে আরো খাটো করে-- লোকজনের কথা ভাবিস না।

সবাইরে কবি, গেরামে গিয়া মাইয়্যা বিয়া দিয়া নিয়া আইছি। জামাই ভূঁই-খ্যাতে কামে আছে। রোয়ার মৌসুম শ্যাষ অইলে আইবে। দেখবি সকলের মুখে তালা পইড়া গ্যাছে। কেউ আর কিছু কইবে না। আর কার এত ঠেকা পড়ছে কাম কামাই দিয়া গাঁওয়ে গিয়া তোর কথার তলে হাত দেয়, হাচা-মিছা যাচাই করে?

--কিন্তু ফ্যাক্টরি তো পোয়াতি রাখবে না। দুইদিন পর খেদাইয়্যা দিবে।

--পয়সা হজম হইয়া গেলে আর খেল দেখাইয়া লাভ কি? চাকরি পাকা অইয়া গেলে আর রাখবি ক্যান? ফ্যাক্টরির স্যারেরা টের পাওয়ার আগে ফালাইয়া দিবি। আইজকাইল কতো রহমের বড়ি বাইরাইছে। দুইডা খাইলেই সব খালাস। আবার নিয়ম মতো রক্তের জোয়ার।

আর একটু দেরি অইলে হাসাপতালে যাবি কিংবা ক্লিনিকেও যাইতে পারো। তারা তো রাস্তার মোড়ে মোড়ে খাড়াইয়া দুই হাত তুইলা ডাকতাছে। ঘন্টাখানেকের কারবার। তারপর যে-ই সিতু সেই সিতু অইয়া হাঁইটা হাঁইটা ঘরে ফিইরা আইবে। তোর খালু বাঁইচা থাকতে মোর দুইচাইর বার যাইতে অইছে। তহন দেখছি-- সব জলভাত। বেথা-বোথা কিছু নাই।

--তাঅইলে রাকিবভাইরে জিগাইয়া লই।

--হ্যারে আবার টানো ক্যান? এগুলা মাইয়্যা মানষের কারবার। পুরুষেরা কি বোঝে? হ্যারে বাদ দে। তুই কিছু ভাবিস না। মুই সব বেবস্থা কইরা দিমু। দুই যুগ ধইরা শহরে আছি, হ্যার আলো-বাতাস খাইছি। এসব কামের পথ-ঘাট এখন হাতের মুঠায় চকচকায়।

কিন্তু খুদি রাকিবভাইরে বাদ দিবে কিভাবে? গ্রাম থেকে ফিরে এসে তোর তার কাছেই যায়।

রিকশায় ঘুরতে ঘুরতে একবার হাত আঁকড়ে ধরে- সিতুরে নিয়া কি করি?

--অরে এই কয়দিন খাওয়াইয়া-দাওয়াইয়া মোটাতাজা বানাইয়া ফালাও। এতো বছর গেরামে রইছে। ঘাস-পাতা খাইছে। তাই শরীরে গিট ধইরা গেছে। হাত-পা চোখ মেলার চান্স পায় নাই।

ঘুমাইয়া আছে। গা-গতর তাই শুটকা দিয়া রইছে। এখন ভালো-মন্দ খাওয়াও। কথায় আছে মাংসে মাংস বাড়ে। পাতে তা বেশি বেশি কইরা দেও। দেখবা দুই দিনেই হাত-পা চোখ মেইলা চাইছে, হাইব্রিডের নাহান মোটাতাজা অইয়া উঠছে। তহন আর বাচ্চা বাচ্চা লাগবে না। পুরা যুবতি মনে অইবে। এমডি স্যার আর চোখ ফিরাইতে পারবে না।

খুদি প্রথমে মুরগি কেনে। অষুদ-বিষুদ খাওয়াইয়া হাতি-সাইজ বানানো হাইব্রিড মুরগি কেটে-ছিলে বস্তির বাজারে ভাগা দিয়া বেচে। খুদি তার পেট ও রান মিলায়ে নেয়। কিন্তু সিতুর মুখ এমনিতেই গোস্ত-মাংসে অনভ্যস্ত। গ্রামে থাকতে মিলাদ-জেয়াফতে দু চারদিন যার স্বাদ পাইছে তা একেবারে খাঁটি। গরু হোক কিংবা মুরগি সব দেশি। তাই হাইব্রিড মাংস মুখে দিয়া ছ্যাত করে ওঠে--ও মা! কী গোস্ত রানছো। এতে দেহি স্বাদ-গন্ধ কিছুই নাই। ঘাস ঘাস লাগে।

ওহ! আবার ঘাস? খুদি তাই মুরগি বাদ দেয়। বরং বস্তির মাথার দোকান থেকে আংটায় ঝোলানো গরম গোস্ত কেনা শুরু করে। এক পোয়া দেড় পোয়া করে নেয়। তার পুরাটাই সিতুর পাতে তুলে দেয়। নিজে দুএকটা টুকরা চেখেও দেখে না। যদি মাইয়্যার কম পড়ে? মোটাতাজা হওয়ার পথে দু এক কদম পিছাইয়া যায়?

কিন্তু কই! সিতুর গতর তো আগায় না মোটেই। এতদিন হয়ে গেল মেয়ের গতর তো আগের মতোই শুকনা-পটকা। কোথাও মাংসের কোনো বসতি নাই। তাহলে কি এক দেড় পোয়ায় কোনো কাজে হচ্ছে না? তাতে হাড্ডি-ফ্যাসকা বেশি থাকে বইলা তারা গলা থেকে নেমে নিচ থেকে নির্বিঘ্নে বাইর হইয়্যা যায়? গতরের কোথাও এতটুকু বসতি গাড়ে না? খুদি তাই একদিন ট্রাঙ্কের তলা থেকে আস্তো নোট বের করে দোকানে যায়। ইচ্ছা মতো কেনে।

তারপর পলিথিনের ব্যাগে করে ঝুলায়ে বস্তির সদর সড়ক দিয়া হেঁটে হেঁটে নিজের খুপড়ি পানে আগায়। সাথে সাথে ব্রেকিং নিউজের মতো সারা বস্তিতে খবর হাত-পা ছড়ায়—খুদি পুরা এক কেজি গোস্ত কিনছে। ব্যস, ফ্যাক্টরি ফেরত মেয়েরা তার দরজায় উঁকি দেয়। কেউ কেউ দু কদম আগায়ে মুখ খোলে-ওমা! এ দেহি গোস্তের পাহাড়। কার জেয়াফতে লাগবে?

খুদির স্বরে রাগ-ক্ষোভ যৌথভাবে বসত নিয়া থাকে-- তোর বুইড়া লাংয়ের জেয়াফত দিমু। খবর পেয়ে আছিয়া খালা ছুটে আসে-- তোর কি মাথা খারাপ অইছে? তুই তো ফতুর অইয়া যাবি। তারপরও তোর মাইয়া মোটাতাজা অইবে না।

--তা অইলে কি করমু?

শিকারের সামনে কি শিকার নিয়া কথা বলা যায়? আছিয়া খালা তাই প্রথমেই সিতুরে খুপড়ি থেকে বার করে। বস্তির ওমাথায় তার নিজের খুপড়িতে পাঠায়-- ‘যা তো মনি মোর পানের বাটাডা লইয়া আয়।’ তারপর ঘর নিরিবিলিতে এলে খুদির কানের কাছে মুখ আনে—বিয়া দিয়া দে। মোর তালাসে ভালো পোলা আছে।

অ্যাঁ, খালায় কয় কি? এতো বছর ধইরা তেল-জলের জোগান দিয়া বড় কইরা তুলছি। যতো রকমের ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে বাঁচাইছি। আর এখন যখন ফল দিতে শুরু করছে, আয়-ইনকামের ঘরে পা দিছে, অমনি তারে অন্যের হাতে তুইলা দিমু? ফলের স্বাদ দু চার বছর নিমু না?

অন্তত গাঁওয়ে দু কাঠার ভূঁই না কেনা পর্যন্ত কাছে রাখমু না? বিয়া দিলে তো আয়-রোজগার যা করবে তার সবটাই জামাইয়ের পকেট পানে দৌড়াইবে। মোর পানে তো কানাকাড়িও আর হাঁটবে না। খুদি তাই ডানে বামে মাথা নাড়ে-- না, এহনই বিয়া দিমু না। আর কয়ডা বছর যাক। খালায় তখন পোয়াতি বানাইয়া দেয়ার কথা তোলে। এবারে তার মুখের উপর না করতে পারে না খুদি। কেননা খালার হাত ধরেই তো শহরে আসা। পাকা সাতটা বছর তার সাথে এক খুপড়িতে বাস করা। তখন খালায় যেমন খুদির সুখের খবররে সানন্দে তার আঁচলে বাইন্ধা নিছে, মন দিয়া শুনছে। আবার দু:খের খবরে আঁচলের পুরাটাই বিছায়ে দিছে। তাতে খুদি নিশ্চিন্ত মনে বসে সব ঝড় পাড়ি দিছে। তবে রাকিবভাইরে কিছু বলা যাবে না তা কি হয়?

সে-ই তো সিতুর কামটা জোগার কইরা দিছে- এহন হেলপার হিসাবে শুরু করুক কাম শিইখা গেলে মেশিনে বসাইয়া দিমু। কিন্তু আছিয়া খালা তারপরও রাজি হয় না-- না, কাউরে কিছু বলার দরকার নাই। এসব কামের কথা যত কম কানে যায় ততোই মঙ্গল।

চার

শফিক কাম করে স্টোরে। কিন্তু সারা ফ্যাক্টরিতে চর্কির মতো ঘোরে। দেখতে শুনতে সুর্দশন। আবার শরীর স্বাস্থ্যেও সুবল। উঁচা-লম্বায় তালগাছ। পাঁচ হাত খাড়া। জটলার মধ্যে দাঁড়ালে সবার আগে চোখে পড়ে। মেয়েরা তাই তারে পছন্দ করে। ডাকলেই পিছু নেয়।

খুদির সেকশনের ইলা তো ডাকের জন্য মুখিয়ে থাকে। সিতুও নিশ্চয়ই পছন্দ করবে। খুদি তাই একদিন শফিকরে পাকড়ায়। ফ্যাক্টরি থেকে বস্তিতে ফেরার পথে রাস্তার পাশে নিরিবিলিতে দাঁড় করায়ে অফারটা দেয়-- মোর মাইয়্যাডারে পোয়াতি বানানো দরকার। হ্যার প্যাডে একটু বীজন রুইয়্যা দিবি? দুই দিনে পোয়াতি অইয়্যা যাইবে।

-- তোমার মাইয়্যা সিতু? মুই দেখছি। কোয়ালিটি সেকশনে হেলাপারি করে। অয় তো শুটকি। গায়ে গোস্ত-মাংস কিছু নাই। কাঠের পুতুলের নাহান গতর। কেবল ক’হান হাড্ডি দিয়া গড়া।

অরে চুদুম ক্যামনে? পোয়াতি বানামু কী কইরা? ঠাপ দিতে গ্যালে তো ল্যাওড়া তো ক্যাবল হাড্ডিতে বাজবে? তাতে ধাক্কা খাইবে। ল্যাওড়া ভাইঙাও যাইতে পারে। মুই কতো সুন্দরী সুন্দরী মাইয়্যা চুদি। হ্যাগো গালগোল ভরা মুখ। গা-গতর কী পেলেব। গোস্ত -মাংসে থৈ থৈ। তোমার মাইয়্যার তো হ্যার কিছুই নাই। তাই হ্যারে চোদার কোনো শখ নাই মোর। তুমি অন্য কাউরে দ্যাহো।

শেষে আছিয়া খালা সাইদুলের সন্ধান হাজির করে। সে ওস্তাদি খেলোয়াড়। পাকা চাষি। আছিয়া খালার মতে- আগেও সে অনেক ক্ষেত-খামার রুইছে। অনেকরে পোয়াতি বানাইছে। এমনকি ফলনও ফলাইছে। তার জলজ্যান্ত প্রমাণ-- আরিফ আর আনিক। তারা সাইদুলরে বাপ ডাকে। তবে মায়ের সাথে আলাদা থাকে। আর সে খুপড়িতে খুপড়িতে পাল দিয়া বেড়ায়। এবস্তি থেকে সেবস্তিতে হায়ারে ছোটে। স্বামী সোহাগে বঞ্চিত প্রোষিতভর্তৃকা জুয়ান জুয়ান মাইয়্যারা গোপনে গোপনে কল দিয়া নিয়া যায়।

খুদিও একদিন কল দেয়। চকচকা মোটরসাইকেল দাবড়ে এসে মা ও মেয়েরে দেখে যায়। তার দু দিন পর খালা খবর আনে-- সাইদুল মোরে কল দিছিল। হ্যায় তোরেও চায়। সিতুর নাহান তিতা, হাড্ডিসার পুচকে মাইয়্যারে পোয়াতি বানাইতে রাজি যদি তোর নাহান জুয়ান মিঠা পায়।

--অ্যাঁ, বলো কী? খুদি যেন আকাশ থেকে পড়ে।

-অ, এতে অবাক হওয়ার কি আছে। পোয়াতি বানাইতে পরিশ্রম আছে না? তোর মাইয়্যার যা অবস্থা, তার শেষ মাথায় যাইতে তো সাইদুলের ঘাম ছুইটা যাইবে। হ্যায় শ্রম দেবে তার মজুরি দিবি না?

-- হেয়া মুই?

--আসলে তোর বিস্বাদি মাইয়্যারে পোয়াতি বাইয়া দেবে বিনিময়ে তোর সুস্বাদ নিতে চায় আর কি।

গতরে কি সুস্বাদের কিছু আছে? খুদি তার দেহের আগামাথায় চোখ বুলায়। স্বাদের ভান্ডার খোঁজে। কিন্তু কই! কিছুই তো এখন নজরে পড়ে না। তবে সবই আছিল সিতুর বাপ বাঁইচা থাকতে-- চান্দের নাহান মুখ, ঢোলের নাহান পাছা আর পাকা তালের নাহান বুক। শাড়ি সরাইলে মিনসে হা হয়ে তাকায়ে থাকত। চোখে পলক না ফালায়ে মুখে এ সব বিড়বিড় করত।

কিন্তু বারো বছর ধরে অযত্ন-অবহেলা আর গাধার মতো খাটুনি চার হাত-পায়ে সব লুটে নিছে। জৌলুসের আর কিছুই বাকি রাখে নাই। আছে কেবল সুঢৌল দুখান হাত, সঘন হয়ে আসা জংঘা আর ফর্সা মুখ। তা দেখেই সাইদুল কাত? আপাদমস্তক নেয়ার জন্য পাগল?

হায় আল্লাহ! এখনো তাহলে গতরে ধার আছে? জুয়ান মরদরে কাত করতে সক্ষম? খুদির বুক তাই দুই ইঞ্চি উঁচায়- আইতে কও সাইদুলরে, কী স্বাদ চায় সব দিয়া দিমু। সুস্বাদের বহর ছুটামু। কিন্তু মা ও মাইয়্যা এক সিরিয়ালে? একজনের লগে কেমনে?

-- কী আর করবি? আর তো কেউ রাজি অয় না। আরো দুইজনরে কইছিলাম। তোর মাইয়্যার কন্ডিশন শুইনা মুখ ফিরাইয়া নিছে। তয় দুইজনে একজনের লগে তো নতুন না। সাংমাগো জগতে যুগ যুগ ধইরা চইলা আইছে। ওরা নিজেরাও তো মা-মেয়ে সতিন। তুই জানোস না?

হ্যাঁ জানে। না জানার কিছু নাই। বস্তির এমাথা থেকে ওমাথার সবাই জানে-- মাটিতে ঢেউ খেলানো এলাকার মেয়ে সাংমা। সিতুর মতো তিন বছর বয়সে বাপ মারা যায়। মায় তখনো পুরা জুয়ান। কিন্তু আবার বিয়া করতে চাইলে সবার এক কথা-- তোমার লগে তোমার মাইয়্যারেও চাই। তার লগেও গাঁটছড়া বাইন্ধা রাখতে হবে। শেষে মায়ের সাথে মেয়েরে বোনাস নিয়া নেয়। তারপর শুরুতে শুধু বেসিকের সাথেই ঘর করে। কিন্তু বোনাসের বয়স হলে, লায়েকের ঘরে পা দিলে তারেও ডাকে। তখন মা ও মেয়ে দুই সতিন মুখোমুখি হয়।

মাটির ঢেউ খেলানো, মাথা তুলে দাঁড়ানো এলাকায় এমন ভুড়িভুড়ি। তাই সাংমা রাগে ক্ষোভে শহরে এসে গার্মেন্টসে কাম নেয়। কিন্তু তাতেও রক্ষা নাই। বুইড়া এখন কিছু দিন পাহাড়ে, কিছু দিন নগরে দুই সতিনের ঘরে পাল দিয়া বেড়ায়।

-- কিন্তু অগো নাহান তো তোর বছর বছর না। একবার দুইবার যা লাগে। মাইয়্যার লাইগা এতো কিছু করলি। চৌদ্দটা বছর ঘাড়ে তুইলা রাখলি। এহন তরি যখন ঘাটে আইছে, দুই চারইডা বৈঠার টান, তোর দুইএকবার কাপড় খোলা বাকি, এহন কি তুই তারে ডুবাবি, অ্যাঁ?

না, চৌদ্দ বছর ধরে একটানা বেয়ে এসে এখন দুচার টানের জন্য খুদি তরি ডোবাবে না। যে করেই হোক তারে ঘাটে নিয়া যাবে। তাই সাইদুলের সাথে চুক্তি হয়-- সে সিতুরে পোয়াতি করে দেবে বিনিময়ে তার পারিশ্রমিক পাবে। মিঠাই ও সুস্বাদ সবই। কিন্তু তার জন্য চাই সিতুর দেহে অনুকূল গোন। বুক টান টান করে দাঁড়ানো ডেঞ্জার পিরিয়ড। সপ্তাহখানেক পর সে উঁকি দেয়। দুদিনে পেকে টইটুম্বুর দশায় পৌঁছে। তখন খুদি সাইদুলরে কল লাগায়-- আসো, পোয়াতি বানানোর খেলা শুরু করো।

রাত দু চার কদম আগালে, চারপাশটা একটু নিজ্জুমের ঘরে পা দিলে সাইদুল আসে। খুদি তারে খুপড়িতে সিতুর কাছে পাঠায়-- যাও, ভেতর থেকে দরজার ছিঁটকিনি তুলে দিও। মুই বাইরে আছি।

সাইদুল দু কদম আগায়ে খুপড়ির ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যায়। খুদি চারপাশে একবার চোখ বুলায়-- না, কেউ নেই। কারো নজরে পড়ে নাই। তারপর খুপড়ির সামনে বিছানো ইটে পাছা পেতে বসে। তবে মেয়ের মতো অনুরূপ বিপদজ্জনক গোন এখন তার শরীরে নাই। কিন্তু তারপরও তারে বিশ্বাস করা যায় না। কেননা, কে না জানে, বিশ্বাসঘাতকতায় সে ওস্তাদ।

যে কোনো সময় বিপদ ঘটিয়ে ফেলতে পারে। খুদিরেও দাঁড় করিয়ে দিতে পারে পোয়াতির সারিতে। তাই তার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে, তার যে কোনো চক্রান্ত চার হাত-পায়ে ঠেকাতে, পুরু প্রটেকশন, জোড়া কনডম হাতে আঁকড়ে ধরে খুদি তার পালার অপেক্ষায় থাকে।

জিয়া হাশান : জন্ম ১৯৬৬ সালে পিরোজপুর শহরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে মাস্টার্স। দৈনিক খবর, ভোরের কাগজ ও প্রথম আলো পত্রিকায় সাংবাদিকতা শেষে ব্র্যাকে কাজ করেন। একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে কর্মরত। তার লেখা বইয়ের মধ্যে রয়েছে- খেয়ালি ভুঁই ও তার ফসল বিন্যাস (গল্পগ্রন্থ), সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয় (গল্পগ্রন্থ), শোনো বাতাসের সুর ( হারুকি মুরাকামির উপন্যাসের অনুবাদ) পাসপোর্ট (হার্তা মুলারের উপন্যাসের অনুবাদ) বাঁক বদল (মো ইয়ানের উপন্যাসের অনুবাদ) চোর দেখার ফাঁদ (কিশোর গল্পগ্রন্থ) বুড়িগঙ্গায় কালো জাহাজ (কিশোর গল্পগ্রন্থ) এবং নির্বাচিত ছোটগল্প (সম্পাদনা)।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top