হ্যাগারের ড্যাগার


প্রকাশিত:
২৫ মার্চ ২০২১ ১৬:১১

আপডেট:
৩১ মার্চ ২০২১ ১৫:০৬

 

এক

লৌহ সভ্যতার প্রতীক শিরচ্ছেদ। তিন সহস্রাধিকাল পরও আলফাবিটাগামা যুগ অদ্যাবধি চকচকে লৌহ ধাতবটির নিকট পরাস্ত। একটি টিপেই মহাবিশ্ব ধূলিস্যাৎ হবে এমত শক্তিধরদের কাটা মুণ্ডু গড়াড়ড়ি খায় মরুভূমির তপ্ত বালু কণায়। চৈনিক, বৈদিক উঠে আসছে কেবল- হেলেনিক তো মৃত প্রায়; সেমেটিক প্রতাপের নিচে পঞ্চ সহস্রাধিকাল ত্রিভুবন কম্পমান। তাদেরই সব্বোর্চ বিকাশোত্তর যবনিকায় চকচক করছে হ্যাগারের ড্যাগার! পুনরায় পুরাতন বৃত্তে প্রবেশ।

দুই

গল্প নড়বড় হয়, যখন ভাষা গড়বড় হয়। আব্রাহাম-ইব্রাহিম-এডাম-আদম, ইভ-হাওয়া, যোশেফ-ইউসুফ, জ্যাকব-ইয়াকুব ইত্যাদিতে রূপ নেয়। ফলত গল্পের ধর্মান্তকরণ সিলগালা অনিবার্য হয় এইরূপে যে- ইহাদের পর আর কোনো নবী আসিবে না। সুতরাং আমরা আব্রাহামের একটি পুরান কথা বলি।

আব্রাহামের পুরাতন স্ত্রী সন্তান উৎপাদনে ব্যর্থ হলে তিনি কেনান প্রদেশের হ্যাগারকে বিয়ে করেন। হ্যাগারের গর্ভে সন্তান উৎপাদিত হওয়া কালেই আব্রাহামের সর্দার স্ত্রীরও একটি সন্তান উৎপাদিত হয়। গোত্র প্রধানের দণ্ডধারক দুই পুরুষ সন্তান, ফলত তাঁবু ষড়যন্ত্রে সূচনাকালেই শিশু পুত্রসহ হ্যাগার নির্জন তপ্ত বালুকাময় মরুতে নির্বাসিত হয়।

হ্যাগারের শৈশবে কেনান প্রদেশে মাঝে মাঝে মরু ঝড়ের সঙ্গে হানা দিত নৃশংস সব আধিপত্যকামী বর্বর সেনাপতি। প্রতিরোধ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পলায়নের মধ্য দিয়ে শেষ হতা। গোত্র প্রধান এক নির্জনে আত্মরক্ষার জন্য একটি ড্যাগার উপহার দেয় হ্যাগারকে। এবং অতিশয় সঙ্গোপনে লুকিয়ে রাখার প্রতিশ্রুতিতে একটি দুইদিক বের করা যায় এমত চকচকে

তীক্ষ্ম ড্যাগারের মালিকানায় হ্যাগার শিহরিত। যদিও হ্যাগার নিরীহ গোবেচারা ধরনের নারী তবু কৈশোর থেকেই দেহের অস্পৃশ্য ¯স্থানে ড্যাগারটি লুকিয়ে রাখে আর মাঝে মাঝে শানদেয় অতি গোপনে। জন মনুষ্যহীন এক পাহাড়ের পাদদেশে শিশুপুত্র ইসমাইলকে নিয়ে হ্যাগার বিলাপ করেন আর একা একা কাঁদেন। এটি ছিলো প্রথম ষড়যন্ত্র। দ্বিতীয়টি আরো ভয়াবহ।

শুষ্ক মরুতে খাদ্যাভাবে হ্যাগারের বুকের দুধ শুকিয়ে গেলে হ্যাগার বিচলিত হয়। তখন এক ফোটা জলের সন্ধানে ছোটাছুটি করতে থাকেন নবী জননী। ইসমাইলের কান্না উচুঁ থেকে উচুঁ স্বরে মরু কম্পিত করে তোলে। তখন অলৌকিক কিংবা দৈব প্রেরীত কেউ হ্যাগারকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি এমনকি ছায়ার মতো অনুসরণ করা স্যাটানও ছিলো নিশ্চুপ।

বাল্যের স্মৃতিতে কেনান প্রদেশে দেখা একটা কূপের কথা মনে পড়ল হ্যাগারের। হিন্নোন উপত্যকার শীলহীরোর পুকুর বলে খ্যাত এই কূপের জলধারা মরুতল দিয়ে পেনিনসুলায় প্রবাহিত। একটু নরোম মাটির সন্ধান করতে করতে হ্যাগার পাহাড়ের পাদদেশেই পেয়ে গেলেন সরোবরের মৃত্তিকা আ”ছাদন। কোমর থেকে ড্যাগার বের মাটি খুঁড়তেই ফিনকির মতো জলধারা ছুটলো। ইসমাইলকে কূপের গোড়ায় বসিয়ে দিয়ে হ্যাগার গেলো বনে- লতাগুল্মের সন্ধানে।

ড্যাগারটি ছিলো লৌহ যুগের চরম উৎকর্ষতার নির্দশন ২৫০০ বছর পরও ইসমাইলের পদাঘাতে সৃষ্ট কূপটি অদ্যাবধি বর্তমান। কূপের জল পৃথিবীর শুদ্ধতম সুপেয় জল। কূপের এক ফোটা জল দশ লিটার জলের ভেতর ফেলে মানবকূল স্বর্গের স্বাদ উপলব্ধি করে! মরুতলে ফরাসি কলের কথা আজানা এই আধুনিক যুগেও।

এরপর কি করে যেনো হ্যাগার পুত্রসমেত আব্রাহামের তাবু প্রাসাদে স্থান পেলো। তারও কিয়ৎকাল পর দ্বিতীয় তাবু ষড়যন্ত্রের শিকার হ্যাগারের পুত্র ইসমাইল। ঈশ্বারাদেশে তাকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বলি দিতে হবে। প্রথম পুত্র যোশেফ নয়, হ্যাগার পুত্র ইসমাইলই ঈশ্বর কৃর্তক নির্বাচিত। এর পূর্বে হ্যাগারের ড্যাগরটি আব্রাহামের হস্তগত হয়।

ইসমাইলকে উৎসর্গ করতে যাওয়ার পথে স্যাটান কানে কানে বলে দেয় শিশু বালকটিকে- তোমাকে তোমার জননীর ড্যাগার দিয়ে হত্যা করা হবে। দুর্ভাগা স্যাটানকে অদ্যাবধি লোকে পাথর মেরেই চলছে। শেষ পর্যন্ত ইসমাইল বেঁচে গেলেও ড্যাগারটি আর পাওয়া যায়নি।

তিন

আরব্য রজনীর নিচে মার্কিনী দিনরাত। মধ্য আশিতে কৈশোর উত্তীর্ণ রাজন পিতলের বাটঅলা একটি মাছ মার্কা ড্যাগার কিনেছিলো। দুই গুণিতকের সহস্রাব্দ ততোদিনে পার হয়েছে। এটি কোমরে থাকলে নিজেকে খুব হিরো হিরো লাগে আর সাহসের প্যারামিটার সবর্দা উচুঁতে টগবগ করে। আত্মপ্রেমের এই পুলক ব্যতিত রাজনের দ্বিতীয় কোনো কাজে লাগেনি ড্যাগারটি। তবু প্রত্যহ একবার শিরিষ মেরে তেল দিয়ে চকচকে করে তুলত আর মুগ্ধ চোখে তাকাত। ড্যাগারের সঠিকব্যবহার না জানায় হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় রাজন আত্মরক্ষার্থে একজনকে আঘাত করে দুর্বিপাকে পড়ে। এরপর বহুদিন রাজন মারাত্মক এই অস্ত্রটি ভুলে যায়।

যুবা বয়েসে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ককটেল পিস্তল থেকে কাটা রাইফেল বহু আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে রাজনকে। রাজন অবলীলায় এই সব নাইন এম এম, একে-৪৭ ব্যবহার করে আন্দোলনের মাঠ গরম রাখত। কিš‘ এসবের কিছুই তাকে টানতো না। তার দুর্নিবার আকর্ষণ একমাত্র নতুন নতুন স্টাইলের ড্যাগার। জাপানী সামুরাইয়ের নির্দয় পরাজয়ের পরও ড্যাগার খুব টানে রাজনকে। ব্যক্তিগত জীবন অত্যন্ত নিরীহ গোবেচারা টাইপ রাজন ভেতরে ধাতব ব¯‘র জন্য কাতর। তার এই কাতরতায় থাকে কেবল দুর্দান্ত এক আত্মশ্লাঘা প্রবল অহম কিংবা চরমতম... ও হাত থেকে পরিত্রাণের প্রয়াস।

সময় সুযোগ পেলে রাজন নিত্য নতুন ড্যাগার কেনে এবং কোমরে রেখে ঘুরে বেড়ায়। কাকপক্ষীও টের পায় না- টের পায়না তার সুশীল বন্ধুরাও। উৎফুল্ল আনন্দে, অজানা অচেনা শিহরণে রাজন গোপনে বয়ে বেড়ায় তার ক্ষুদ্রকায় স্বপ্নটি। রক্তে তার দামামা বাজে। দেহ চিত্ত অস্থির হয় এবং একরাতে রাজন স্বপ্নে দেখে তার নিকট থাকা ড্যাগারটি বিবি হ্যাগারের। এবিষয়ে আব্রাহামের পত্নী সাগা তাকে অবহিত করে। প্রায় ৩০০০ হাজার বছরের পুরনো এই ড্যাগারটি দিয়ে রাজন একটি রক্তকূপ খনন করবে। শোনিতের ধারায় ধরণী প্লাবিত হবে। সকলে সেই কূপ থেকে একফোটা রক্ত নিয়ে ক্রমশ বিশুদ্ধ হয়ে উঠবে এই আশায় রাজন বুকের ভেতর একটি রক্তকূপ খনন শুরু করে। আর হঠাৎই একদিন সন্ধ্যায় এক মোল্লার মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলে অতিশয় সাহসে তীব্র রাগে অকারণে। বর্বরতার ভেতর পৈশাচিক আনন্দে নেচে নেচে ডুবে যায় গরাদে অন্ধকারে...।

খৃস্টাব্দ ২০১৫

গল্প লেখার গল্প

বড় বড় দালানওলা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নাই। অশিক্ষিত। তবে সমাজের দুয়েকটি স্তর বাদে প্রতিটি স্তর যাপন করেছি সীমাহীন স্বাধীনতায়। ফলত এই বিচিত্রবঙ্গের অঙ্গেঅঙ্গে ভাঁজেভাজে যে কুরূপস্বরূপমধুবিষ সকল দিদৃক্ষা এক ধরণের অতৃপ্ততায় ভরপুর। যখন মেট্রিক দেই সেইকালে কবিতা লেখার চেষ্টা আর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই সেইকালে সাংবাদিকতা করার মত কতক অপরিপক্ক লেখালেখির ব্যর্থ প্রয়াসে মুদ্রিত অক্ষরে স্বীয় নাম দেখে গোপন পুলকিত হৈতাম। তারপর নীরবে চুপিসারে তিন দশক গল্প চর্চায়।

অনিন্দ্য, দুয়েন্দ, প্রতিশিল্প, দ্রষ্টব্য,গাণ্ডীব, চালচিত্র, ডানার করাত, নিসর্গ, কফিন টেক্সট ছোটকাগজকেন্দ্রিক সকল গল্প জার্নাল প্রবন্ধ রচিত। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার গত শতকীয় আঙ্গিকটি এখন পাঠকদের নিকট অপরিচিত।

সেটি নতুন করে পরিচিত করার দায়িত্বও আপাত অনুভব করছি না। ২০০০ খৃস্টাব্দে শিল্পী শাহীনুর রহমানের সম্পূর্ণ অবাণিজ্যিক জ্যা প্রকাশনী থেকে জটিলের জটিলতাজনিত জটিলতা প্রকাশিত। ২০০৭ খৃস্টাব্দে জ্যা প্রকাশনী থেকেই টেররর হানট প্রকাশিত এবং সর্বশেষ ২০১২ খৃস্টাব্দে কাকা কাকে কেনো কা কা করে মুদ্রিত ও প্রকশিত। বস্তুত শিল্প সৃজনের একটি নবতর বিন্দু হিসেবে গল্পের সঙ্গে অলংকরণের অপরিহার্যতায় তিনটি পুস্তকই মুদ্রিত। এই যৌথতায় শিল্পী শাহিনুর রহমানের ড্রয়িং গল্পসমূহকে অতিক্রম করে গেছে। এই শিল্প বন্ধুর প্রতি ঋণ অপরিসীম।সংকটগুজববাগড়াঝগড়া কোনো কিছুকেই ধর্তব্যে না রাখা বন্ধুর মহান অবদান আমার গল্পও অতিক্রম করে গেছে। নিরীক্ষার ভিতর এখনও শব্দ দিয়ে অনুভূতি নির্মার্ণ যজ্ঞের এইসব ব্যর্থ প্রয়াস। মূলত নার্সিসাস ফলত আত্মবিনাশী নিরীক্ষাপ্রবণ শাব্দিক বাখোয়াজি...।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top